গুগলির সঙ্গে মেয়েটিকে স্কুলের ‘হোমওয়ার্ক’ও করতে হয়

শেন ওয়ার্নকে আদর্শ মানেন অ্যামি স্মিথছবি: টুইটার

সময়টা এখন অন্য রকম। করোনার মধ্যে অ্যামি স্মিথের ১৬তম জন্মদিনটাও তাই অন্যান্যবারের মতো হলো না। পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলে হয়তো বন্ধুবান্ধব নিয়ে যেতেন পানশালায়, কেক কাটতেন পরিবারকে সঙ্গে নিয়ে। কিন্তু ২০২০ সাল আর যা–ই হোক কারও জীবনকেই স্বাভাবিক রাখেনি।

অ্যামি স্মিথ ১৬তম জন্মদিনের দেখা পেয়েছেন এক সপ্তাহের বেশি হয়ে গেছে। সেদিন তাঁকে থাকতে হয়েছে জৈব সুরক্ষিত পরিবেশে, মেয়েদের বিগ ব্যাশে সেরা কিছু ক্রিকেটারদের সঙ্গে। সময়টা একেবারে যে পানসে কেটেছে, তা নয়।

কেক, বেলুন, ‘হ্যাপি বার্থডে’ গান, হোটেলে ভূরিভোজ, তারপর ঘুমাতে যাওয়া। অ্যামির কাছে তবু এই ১৬তম জন্মদিন বিশেষ কিছুই, ‘আমি এটা অনেক দিন মনে রাখব। এটাই সম্ভবত এখন পর্যন্ত সেরা (উদযাপন)।’

খুব কম বয়সেই পরিণত ক্রিকেট-মস্তিষ্ক অ্যামি স্মিথের
ছবি: টুইটার

পরদিন সকালে অ্যামির সতীর্থরা চলে যান সৈকতে। অ্যামি যাননি, ‘আমি ঘুমিয়েছি। ওরা গিয়েছে সকাল আটটায়। আমার জন্য একটু বেশিই সকাল হয়ে যায়।’ অ্যামি কি তাহলে আর দশজন কিশোরীর মতোই? ঘুম থেকে উঠতে দেরি করেন, জীবন নিয়ে এত ভাবনা নেই! না, অ্যামি সে রকম নন।

নিজের রাজ্য তাসমানিয়ার হয়ে দুটি ৫০ ওভারের ম্যাচ খেলার পর অ্যামিকে এ বছরই ডেকেছে হোবার্ট হারিকেনস। মেয়েদের বিগ ব্যাশে মাত্র ১৫ বছর বয়সে সর্বকনিষ্ঠ খেলোয়াড় হিসেবে মাঠে নামার রেকর্ড গড়েছেন এই লেগ স্পিনার।

১৪ বছর বয়সে গড়েন মেয়েদের জাতীয় লিগে সর্বকনিষ্ঠ খেলোয়াড় হওয়ার রেকর্ড। তবে হোবার্ট হারিকেনসের ডাক পাওয়ার পর অ্যামিকে আর পেছন ফিরে তাকাতে হচ্ছে না।

বিগ ব্যাশে তাঁর প্রথম উইকেট দক্ষিণ আফ্রিকার তারকা ওপেনার লিজলে লি। টুর্নামেন্টের ইতিহাসে দ্বিতীয় সর্বকনিষ্ঠ উইকেটশিকারির রেকর্ড গড়েন তিনি ১৫ বছর ১১ মাস ১৮ দিন বয়সে।

সেদিন একই ওভারে তুলে নিয়েছিলেন সিডনি সিক্সার্সের অ্যাশলে গার্ডনার ও এরিন বার্নসকে। এক ম্যাচ পর অস্ট্রেলিয়ার হয়ে ১৩০ ম্যাচ খেলা র‌্যাচেল হেইনেসও শিকার হন তাঁর।

হোবার্টে খেলা নিউজিল্যান্ডের উইকেটরক্ষক র‌্যাচেল প্রিয়েস্ট এ নিয়ে মজা করেন অ্যামির সঙ্গে। ‘প্রিয়েস্টই মজা করে বলছিল, আমি শুধু আন্তর্জাতিক ক্রিকেটারদেরই আউট করছি। অথচ (সিক্সার্সের বিপক্ষে) ওই ওভারে বল করতে গিয়ে ভেবেছিলাম, কয়েকটি ছক্কা খেতে পারি! তাদের আউট করতে পেরে ভালো লাগছে,’ বিবিসিকে বলেন অ্যামি।

হোবার্ট সতীর্থদের সঙ্গে ভালোই সময় কেটেছে অ্যামি স্মিথের
ছবি: টুইটার

অস্ট্রেলিয়ান লেগ স্পিনার মানেই কোনো না কোনোভাবে শেন ওয়ার্ন তাঁর আদর্শ—বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এমন দেখা যায়। অ্যামিও ব্যতিক্রম নন। সর্বকালের অন্যতম সেরা ওয়ার্নই তাঁর আদর্শ। তবে ওয়ার্নের চেয়ে একটু দ্রুত হাত ঘোরান অ্যামি। গুগলি ও ফ্লাইটে বেশ ভালো দখল।

অস্ট্রেলিয়ার টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপজয়ী দলের গুরুত্বপূর্ণ ব্যাটার গার্ডনারকে গুগলিতে বোকা বানান অ্যামি। ‘এই বয়সে সে অবিশ্বাস্য পরিণত’—প্রশংসাপত্রও পেয়েছেন হোবার্ট অধিনায়ক কোরিনে হলের কাছ থেকে।

এই বয়সে অ্যামি শুধু তারকা ক্রিকেটারদের সঙ্গে খেলছেনই না, তাঁর জীবনের সঙ্গেও আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে গেছেন তাঁরা। করোনাভাইরাস মহামারিতে সবাইকে থাকতে হচ্ছে জৈব সুরক্ষিত পরিবেশে। প্রায় ২৫০ জন ক্রিকেটার, কোচ ও অন্যান্য স্টাফ একসঙ্গে থাকছেন জৈব সুরক্ষিত পরিবেশে। ২০০০ সালের সিডনি অলিম্পিকের জন্য যে অলিম্পিক ভিলেজ বানানো হয়েছিল, সেখানেই এখন তাদের আবাস।

অ্যামি অবশ্য কাউকেই বিরক্ত করতে চান না। অস্ট্রেলিয়ার অন্যতম সেরা তারকা এলিস পেরির সঙ্গে তাঁর একদিন জিমনেসিয়ামে দেখা হলো। ‘সে এলিস পেরি। অস্ট্রেলিয়ার হয়ে খেলে!’—রোমাঞ্চিত অ্যামি শুধু এতটুকুই ভাবতে পেরেছেন।

করোনার মধ্যে জৈব সুরক্ষিত পরিবেশের মধ্যে বসবাস একটু অদ্ভুতই লাগে তাঁর। নিউজিল্যান্ডের তারকা অ্যামি স্যাটারওয়েট ও লিয়া তাহুহু দম্পতি অলিম্পিক ভিলেজে তাঁদের ১০ মাস বয়সী সন্তান নিয়ে বসবাস করছেন।

অ্যামি এসব বড় বড় নামের ভিড়ে খুবই ছোট, অন্তত অভিজ্ঞতা, বয়স আর তারকাখ্যাতির বিচারে তো বটেই। খেলা আর অনুশীলনের বাইরে এখনো তাঁকে স্কুলের ‘হোমওয়ার্ক’ সারতে হয়।

বিবিসি অ্যামির সঙ্গে কথা বলার আগেও অঙ্কের হোমওয়ার্ক সেরেছেন অ্যামি। ইংরেজি, ইতিহাস, ভূগোল নিয়েও ব্যস্ত থাকতে হয় তাঁকে। অ্যামি মজা করে বলেন, ‘দলের সতীর্থদের চেয়ে আমাকে বেশি ব্যস্ত থাকতে হয়। (সতীর্থ) নিক ক্যারি মাঝেমধ্যে আমাকে অঙ্ক দেখিয়ে দেয়, ভুল শুধরে দেয়।’

হোবার্ট হারিকেনস এবার প্লে–অফে উঠতে পারেনি। অ্যামি তাঁর দলের হয়ে সব ম্যাচ খেলে ২৮.৬২ গড়ে নেন ৮ উইকেট। ‘কিছু ম্যাচে নিজের পারফরম্যান্স নিয়ে আমি সন্তুষ্ট নই। তবে সব ম্যাচ তো আর জেতা সম্ভব নয়,’ বলছিলেন অ্যামি।

বোঝাই যাচ্ছে, খিদেটা আছে অ্যামির। আছে সত্যিকারের প্রতিভাও। বাকিটা রইল সময়ের হাতে।