ঘুরে দাঁড়ানোর এই গল্প হতে পারে প্রেরণার

সারেল এরউইয়ি আজ অনুপ্রেরণার নামছবি: এএফপি

কখনো কখনো হাজার চেষ্টার পরও সময় মুচকি হাসে। হাল ছেড়ে দিতে মন চায়। স্রেফ একটা সিদ্ধান্তই তো, তা–ই না?

২০১৯ সালের গ্রীষ্মে সারেল এরউইয়ি সিদ্ধান্তটা প্রায় নিয়েই ফেলেছিলেন। সেই গ্রীষ্মে ‘প্রায়’ যদি ‘একদম চূড়ান্ত’ সিদ্ধান্ত হয়ে উঠত, আজ ক্রাইস্টচার্চে আর এ দৃশ্যের জন্ম হতো না। গলায় দলা পাকিয়ে আসা থরথর আবেগ সামলানোর বৃথা চেষ্টায় চোখের বর্ষা আটকে বলতে পারতেন না, ‘ওই তো আমার বোন! অনেক কঠিন সময় গেছে ওর। অন্তত ওর মুখে হাসি ফোটানোর একটা উপলক্ষ তো এনে দিতে পেরেছি।’

অন্তর্দৃষ্টি না থাকলে এই গল্প হতে পারে সাধারণ যে কারও। মানুষের ভিড়ে মিশে থাকা এমন কেউ, যিনি কিনা হাজারো চেষ্টা করেও ঈপ্সিত লক্ষ্যের নাগাল পাচ্ছেন না। চোখেমুখে রাজ্যের হতাশা। মন ভেঙে গেছে, লড়ার স্পৃহা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে দিন দিন। সেই মানুষই যখন লড়তে লড়তে নিজেকে সামলে পথের দিশা পান, তখন তাঁকে অসাধারণ বলেন সবাই। এরউইয়ি ও তাঁর গল্পকে এর চেয়ে কম কিছু বলা যাচ্ছে না।

২০১৯ সালের নভেম্বরে নিজের ৩০তম জন্মদিনের কাছাকাছি ছিলেন এরউইয়ি। তত দিনে তাঁর আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে খেলার স্বপ্ন জলাঞ্জলি যাওয়ার পথে। প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে প্রায় দুই বছর—৩০ ইনিংস—শতক নেই, গড় মাত্র ২৮.৬৩। এর আগেও ৭৫ ম্যাচে তাঁর ব্যাটিং গড় ছিল ৩৫। দক্ষিণ আফ্রিকার ঘরোয়া ক্রিকেটে এই ব্যাটিং গড় নিয়ে তো কারও মাথাব্যথা থাকার কথা নয়। এরউইয়ি তাই নিজের শেষ দেখতে পাচ্ছিলেন।

‘খেলা ছেড়ে দেওয়া থেকে মাত্র একটি ফোনের দূরত্বে ছিলাম’—ক্রাইস্টচার্চে আজ শতকের পর দাহকালের সেসব দিনের গল্প শোনালেন এরউইয়ি।

জীবন থেকে পোড়া গন্ধ বের হলে সবার আগে পরিবার পাশে দাঁড়ায়। এরউইয়িও ভেতরে-ভেতরে পুড়ছিলেন, আর সে সময় পাশে পেয়েছেন পরিবারকে, ‘প্রচুর সমর্থন পেয়েছি। পরিবার, বিশেষ করে মা–বাবা আগলে রেখেছেন। ক্রীড়া মনোবিদের সঙ্গে কাজ করেছি প্রতিদিন। মনে মনে একবার সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর্যায়ে চলে আসার পর আবার ঘুরে দাঁড়িয়ে নিজের সেরাটা দেওয়ার প্রেরণা খুঁজে পাওয়া খুব কঠিন। একপর্যায়ে এসে মনে হয়েছে, এত বছরের পরিশ্রম জলে গেছে।’

মাথায় আঘাত পেয়েও হাল ছাড়েননি এরউইয়ি
ছবি: এএফপি

সিনেমার চিত্রনাট্যের মতোই এরউইয়ি মুদ্রার উল্টো পিঠ দেখা শুরু করলেন ঠিক এর পর থেকেই। ২০২০ সালের শুরুতে টানা দুই ম্যাচে শতক তুলে নেন এরউইয়ি। গত দুই বছরে তাঁর ব্যাটিং গড় বেড়ে হয়েছে প্রায় দ্বিগুণ—৫৪.৮০। ডাক আসে জাতীয় দল থেকে। কিন্তু সেখানেও বিধি বাম। এরউইয়ি ওপেনার, তত দিনে দক্ষিণ আফ্রিকা দলে এইডেন মার্করাম জায়গা পোক্ত। তবে মার্করামের বাজে ফর্ম এরউইয়িকে জাতীয় দলের পরিসীমায় রেখে দিয়েছিল। তবু শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান, ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও ভারতের বিপক্ষে সিরিজে ডাক পেলেও অভিষেক হয়নি।

শেষ পর্যন্ত নিউজিল্যান্ড সফরে কিগান পিটারসনের করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়া এবং মার্করামকে তিনে খেলানোর সিদ্ধান্তে কপাল খোলে এরউইয়ির।

ক্রাইস্টচার্চে প্রথম টেস্টে এরউইয়ির বলার মতো পারফরম্যান্স নেই। কিন্তু দ্বিতীয় টেস্টে এসে গত এক বছরের মধ্যে দক্ষিণ আফ্রিকার প্রথম ওপেনার হিসেবে দেখা পান শতকের। ২২১ বলে ১০৮ রানের এই ইনিংসে এরউইয়ি এক-তৃতীয়াংশ বলই ছেড়েছেন। এটুকুতেই বোঝা যায়, মানসিকভাবে ভেঙে পড়া একটা মানুষ ঘুরে দাঁড়ালে কতটা দৃঢ় হতে পারে! আর হ্যাগলি ওভালে ভাইয়ের এই দৃঢ়তা দুচোখভরে উপভোগ করেছেন তাঁর বোন শ্যানতেলে, যাঁর সঙ্গে চার বছর তাঁর কোনো দেখাসাক্ষাৎ নেই।

এরউইয়ি জানতেন শ্যানতেলে গ্যালারিতে আছেন। শতকের পর এ নিয়ে কথা বলতে গিয়ে শেষ করতে পারেননি, ‘গলাটা ধরে আসছে...।’ একটু দম নিয়ে ভাঙা গলায় বললেন, ‘পরিবারের সামনে শতক পেয়ে ভালো লাগছে। আমার বোন নিউজিল্যান্ডেই থাকে। দুঃখিত, গলাটা ধরে আসছে। বোনটা খুব কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে গেছে। তার মুখে হাসি ফোটানোর উপলক্ষ এনে দিতে পেরে ভালো লাগছে।’

বৈশ্বিক মহামারির কারণে দুই বছর ধরে বেশির ভাগ মানুষেরই বাজে সময় কেটেছে। মানসিকভাবে হতাশায় ভুগছেন অনেকে। এই তো গত পরশু দক্ষিণ আফ্রিকার র‌্যাপ গায়ক রিকি রিক আত্মহত্যা করেন। একটা সময় এরউইয়িও তার কাছাকাছি সময়ের মধ্য দিয়ে গেছেন। খেলাধুলায় কিংবা সৃজনশীল কাজে মানসিক হতাশা কত ভয়ংকর, তা বোঝানোর চেষ্টা করলেন এরউইয়ি, ‘এটা অনেক বড় বিষয়। দক্ষিণ আফ্রিকায় কেউ এসব গুরুত্ব দেয় বলে মনে হয় না। শুধু ক্রিকেট নয়, কোনো খেলাধুলায় এর গুরুত্ব খুব একটা নেই। নিজের কথাই বলতে পারি। আমি এখনো হতাশা কাটানোর প্রক্রিয়ার মধ্যে আছি। প্রতিদিন, প্রতি সপ্তাহ, প্রতি মাসেই চেষ্টা করছি...।’

৩২ বছর বয়সী একটা পূর্ণবয়স্ক মানুষ যখন এতটা ভাঙা-গড়ার মধ্য দিয়ে যাওয়ার পর এভাবে ঘুরে দাঁড়ান, তখন তাঁকে টুপি খোলা অভিবাদন জানাতেই হয়।