সিদ্ধান্তটা যে শেষ পর্যন্ত নেওয়া হবে, মোটামুটি সবাই জানতেন। চমকের কিছু ছিল না। প্রশ্ন ছিল সিদ্ধান্তটা কবে নেওয়া হয়, শুধু সেটা নিয়ে। মিরপুরের পিচ যেমন ঐতিহ্যগতভাবেই ধীর গতির, এতে যেমন চমকের কিছু নেই, আজ হোক বা কাল প্যাট কামিন্সও যে অস্ট্রেলিয়ার অধিনায়ক হবেন—এ ব্যাপারটাতেও চমকের কিছু ছিল না। তবে কামিন্সের ভাগ্য খারাপ বলতেই হয়। যে পরিস্থিতিতে অধিনায়কত্ব পেলেন, এভাবে হয়তো চাননি।
পুরো অস্ট্রেলিয়া যখন টিম পেইনের ‘সেক্সটিং’ বিতর্কে উত্তাল, ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া তখন একরকম বাধ্য হয়েই কামিন্স নামের তুরুপের তাসটা খেলতে বাধ্য হলো। অ্যাশেজ শুরুর মাত্র দু'সপ্তাহ আগে এই পেস বোলারের হাতে দেওয়া হলো নেতৃত্বভার। তাই বলে কামিন্স নিজে যে এই ভূমিকার জন্য প্রস্তুত ছিলেন না, বলা যাবে না। ওই যে, সবাই জানতেন, আজ হোক বা কাল, কামিন্স নেতৃত্ব দেবেনই!
বছরের শুরুর দিকে ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া নিউ সাউথ ওয়েলসের রাজ্য দলকে বলেকয়ে যে কামিন্সকে অধিনায়ক বানাল, তা তো এমন দিনের কথা মাথায় রেখেই! কখনো অধিনায়কত্ব না করা কামিন্স এবারই চারটা ৫০ ওভারের ম্যাচে নিউ সাউথ ওয়েলসকে নেতৃত্ব দিলেন, জেতালেন প্রত্যেকটাতে। জাতীয় দলে পেইনের সহকারী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন এর আগে। সবকিছুই ওই মহাপরিকল্পনার অংশ। প্যাট কামিন্সকে স্টিভ ওয়াহ, রিকি পন্টিং, মাইকেল ক্লার্কদের উত্তরসূরি বানানোর মহাপরিকল্পনা। যে মহাপরিকল্পনার বাস্তবায়ন অবশেষে হচ্ছে আজ ভোরে, ব্রিসবেনের গ্যাবায় হতে যাওয়া অ্যাশেজের প্রথম টেস্টে।
আগের দুজন ন্যক্কারজনক কাণ্ড ঘটিয়ে মাথা নত করে বিদায় নিয়েছেন অধিনায়কত্বের মঞ্চ থেকে। প্রতিভাবান, অভিজ্ঞ, তারুণ্যে ভরপুর, আদর্শ অস্ট্রেলীয় অধিনায়কদের মতো সংবাদমাধ্যমের সামনে দুর্দান্তভাবে নিজেকে উপস্থাপন করতে পারার ক্ষমতা, প্রচণ্ড আত্মবিশ্বাসী, হারার আগে হার মানতে না চাওয়ার মানসিকতা, বিতর্কহীন সফল ক্যারিয়ার, টিম পেইন আর স্টিভ স্মিথ যুগ থেকে বেরিয়ে আসার জন্য কামিন্সের মতো শ্বেতশুভ্র ভাবমূর্তির একজনকেই দরকার ছিল অস্ট্রেলিয়ার। গ্যালারি থেকে বার্মি আর্মিরা যাকে স্লেজ করার আগে দুবার ভাববে, স্মিথ বা পেইনের মতো অতীত ঘেঁটে কালিমাযুক্ত কিছু বের করে খোঁটা দিতে পারবে না।
অধিনায়কত্বের বাহুবন্ধনী পরে আজ ভোরে গ্যাবায় যখন নামবেন, ইতিহাসের অংশ হয়ে যাবেন কামিন্স। পেস বোলার অধিনায়ক অস্ট্রেলিয়ার টেস্ট ইতিহাসে এর আগে এসেছিলেনই যে মাত্র একবার! কিংবদন্তি রে লিন্ডওয়ালের কপালে সে সৌভাগ্য অবশ্য মাত্র এক টেস্টের জন্যই জুটেছিল।
কামিন্স সে দিক দিয়ে অনন্য। স্থায়ী টেস্ট অধিনায়ক হিসেবেই দায়িত্ব শুরু করতে যাচ্ছেন। তবে শুধু অস্ট্রেলিয়া বলেই নয়, টেস্ট খেলুড়ে দেশগুলো যেন কোনোভাবেই পেস বোলারদের অধিনায়কত্ব দিতে চায় না। ইএসপিএন ক্রিকইনফোর তথ্য অনুযায়ী, দেশকে অন্তত দশটা টেস্টে নেতৃত্ব দিয়েছেন, এমন অধিনায়কদের মধ্যে মাত্র ৪.৩ শতাংশ হলেন ফাস্ট বোলার। যা যুগ যুগ ধরে অধিনায়ক হিসেবে পেসারদের অযোগ্য মনে করার মানসিকতারই বহিঃপ্রকাশ।
দলের যে ব্যাটসম্যানটা সবচেয়ে ভালো, অধিনায়কত্বের দায়িত্বটাও তাঁর ঘাড়েই পড়ে। অলিখিতভাবে যেন সবাই মেনে নেন, ব্যাট হাতে যে ভালো, দলকে নেতৃত্ব দেওয়ার গুণাবলিও তাঁরই আছে। যে কারণে আধুনিক যুগের সেরা টেস্ট ব্যাটসম্যান বিরাট কোহলি, কেইন উইলিয়ামসন, স্টিভ স্মিথ, জো রুট ও বাবর আজমদের প্রত্যেকেই পেয়েছেন টেস্ট অধিনায়কত্বের স্বাদ।
কিন্তু আসলেই কী পেস বোলারদের নেতৃত্বগুণ নেই? বব উইলিস, ইমরান খান, কপিল দেব, ওয়াসিম আকরাম, শন পোলক আর ওয়াকার ইউনিসরা এই কথায় ভ্রু কুঁচকাতে পারেন। ইতিহাস-সেরা টেস্ট অধিনায়ক না হলেও, নিজেদের দায়িত্বে তাঁরা বেশ সফলই ছিলেন।
অনেকের মতে, টেস্টে ব্যাটসম্যান বা উইকেটকিপারদের তুলনায় বোলারদের খাটনি অনেক বেশি। বল করে যেতে হয় নিরন্তর। এত খাটনির পর অধিনায়কত্বের চাপ নিতে কজনই বা প্রস্তুত থাকেন? পাঁচ দিনের ম্যাচের প্রতিটা মুহূর্তে একজন অধিনায়ককে সক্রিয় থাকতে হয়, ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়কে সজাগ রাখতে হয়। প্রত্যেকটা সিদ্ধান্ত নিতে হয়, প্রতিটা পরিস্থিতি সম্পর্কে ওয়াকিবহাল থাকতে হয়। সাধারণত কোনো পেস বোলার টেস্টে নিজের স্পেল শেষ করে ফিল্ডিংয়ের ছুতোয় ডিপ ফাইন লেগ বা ডিপ ব্যাকওয়ার্ড পয়েন্টে চলে যান, কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেন। দু-একবার নিজের কাছে বল আসলে সেটা ক্রিজে ফেরত দেওয়া ছাড়া ম্যাচ কী হচ্ছে না হচ্ছে সে দিকে তাঁর মনোযোগ না রাখলেও চলে।
কিন্তু অধিনায়কত্বের ভার মাথায় থাকলে সে বিশ্রামটুকু পাওয়ার কি অবকাশ আছে? ঠিক এই কারণেই কামিন্সদের হাতে টেস্ট অধিনায়কত্বের বাহুবন্ধনী দেখাটা একটু দুষ্কর। অস্ট্রেলিয়ার ৪৭তম টেস্ট অধিনায়ক কী পারবেন এই চ্যালেঞ্জ জয় করতে?
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সে প্রশ্নের উত্তর মিলবে নিশ্চিত। কিন্তু অধিনায়ক হিসেবে সফল হওয়ার আত্মবিশ্বাস যে তাঁর আছে, ২৮ বছর বয়সী এই বোলার ক্যারিয়ারের প্রতি পরতে পরতে দেখিয়েছেন। তাঁর অভিষেক টেস্টের কথাই ধরা যাক। বয়স ছিল মাত্র ১৮, তখনই নিয়মিত ঘণ্টায় ১৫০ কিলোমিটার বেগে বল করতেন। গতি আর সুইংয়ের মিশেলে ওয়ান্ডারার্সের মাটিতে কাঁপিয়ে দিয়েছিলেন স্বাগতিক দক্ষিণ আফ্রিকার ক্যালিস, স্মিথ, ডি ভিলিয়ার্স আর আমলাদের। সঙ্গে নিজেও কি কেঁপে ওঠেননি?
নিজেকে ছাপিয়ে যাওয়ার নিরন্তর প্রচেষ্টায় গোড়ালির ব্যথাকে তুচ্ছজ্ঞান করলেন। দুই ইনিংস মিলিয়ে ৪৫ ওভার বল করলেন, দ্বিতীয় ইনিংসে ছয়-ছয়টা উইকেটও পেলেন। মনে করিয়ে দিলেন বাংলাদেশের এনামুল হক জুনিয়রকে। টেস্ট অভিষেকে ইনিংসে এত কম বয়সে ছয় উইকেট নেওয়ার কৃতিত্ব এর আগে শুধু এনামুল জুনিয়রেরই ছিল। কিন্তু তা করতে গিয়ে দেখলেন, নিজের প্রতি বড্ড অবিচার করে ফেলেছেন ততক্ষণে।
যে অবিচারের মাশুল পরের ছয় বছর দিয়েছেন পই পই করে। ব্যাগি গ্রিন ক্যাপ পরে ২০১৭ সালে দ্বিতীয়বার যখন মাঠে নামলেন, তত দিনে সঙ্গী হয়েছে অস্ট্রেলিয়ান কিংবদন্তি পেসার ডেনিস লিলির মহামূল্যবান পরামর্শ। যে পরামর্শের কারণে নিজের অ্যাকশনে পরিবর্তন এনেছেন, বদল এনেছেন রানআপে। আর এ সবকিছুই করেছেন গোড়ালি আর পিঠের চোট থেকে নিস্তার পাওয়ার জন্য। তাতে যে কাজ হয়েছে, তা অস্ট্রেলিয়ার সর্বশেষ ৩৫ টেস্টে কামিন্সের রেকর্ড দেখলেই বোঝা যায়। পাকিস্তানের বিপক্ষে ২০১৮ সালে সংযুক্ত আরব আমিরাতে অনুষ্ঠিত হওয়া দুটি টেস্ট বাদে বাকি ৩৩ টেস্টেই খেলেছেন। কে বলবে, চোট এই পেসারের টেস্ট ক্যারিয়ার থেকে ছিনিয়ে নিয়েছে অর্ধযুগ? কারণ ওই একটাই, আত্মবিশ্বাসী কামিন্স হারার আগে হার মানেননি। থেমে যাওয়ার কথা ভাবেননি একবারের জন্যও।
যে আত্মবিশ্বাস আগামীকাল থেকে কামিন্সের সঙ্গী হবে অধিনায়কত্বের প্রতি পদক্ষেপে। পেইন-কাণ্ডের পর অ্যাশেজের এই মহারণে অস্ট্রেলিয়ার ওটাই সবচেয়ে বেশি দরকার।