মুসলিম সতীর্থের গায়ে মদ ঢেলে অনুতপ্ত তাঁরা

ব্যাপারটা হয়তো ইচ্ছাকৃত নয়। একটা শিরোপা উৎসবে উচ্ছ্বাস প্রকাশের মুহূর্তে এক মুহূর্তের ভুল। ভুলে যাওয়া। সেটি থেকেই কত জটিল হয়ে গেল ব্যাপারটা।

গত রোববার বব উইলিস ট্রফি জেতে ইংলিশ ক্লাব এসেক্স। শিরোপা উৎসবে পাশ্চাত্যের রীতি মেনে বিয়ার ঢেলে উৎসব করছিলেন ক্রিকেটাররা। কিন্তু লর্ডসের বারান্দায় সেদিনের উৎসবে বাঁ দিকে এক কোণে দাঁড়িয়ে থাকা সতীর্থ যে মুসলিম, সেটি যেন বেমালুম ভুলে যান সতীর্থরা। তাঁর গায়েও বিয়ার ঢেলে বসেন! সমালোচনা তো হবেই। তবে এসেক্স ভুলটা বুঝতে পেরেছে, দলের অধিনায়ক টম ওয়েস্টলি দলের সবার হয়ে এমন কাজের জন্য ক্ষমা চেয়েছেন।

এসেক্সের মুসলিম ক্রিকেটারের নাম ফিরোজ খুশি। ২০ বছর বয়সী ব্যাটসম্যানের এবারের বব উইলিস ট্রফি দিয়েই অভিষেক হয় প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে। এরই মধ্যে একটা হাফ সেঞ্চুরিও পেয়ে গেছেন। টুর্নামেন্টের ফাইনালে এসেক্স মুখোমুখি হয়ে সমারসেটের। শিরোপা জিতে রোববার লর্ডসের বারান্দায় দলটার উৎসবের ছবিতে দেখা যায়, একে অন্যকে বিয়ারে ভিজিয়ে দিচ্ছেন। সে সময় ফিরোজ এক কোণে দাঁড়িয়ে ছিলেন, আর তাঁর গায়ে বিয়ার ঢেলে দিচ্ছিলেন দলের অতিরিক্ত উইকেটকিপার উইল বাটলম্যান। এই ছবি নিয়েই বিতর্কের ঝড় ওঠে যুক্তরাজ্যের এশিয়ান সমাজে।

পূর্ব লন্ডনে জাতীয় ক্রিকেট লিগের প্রতিষ্ঠাতা সাজিদ প্যাটেল সমালোচনা করেন এসেক্স ক্রিকেটারদের এমন আচরণের, ‘বেচারা (ফিরোজ খুশি) বারান্দার কোনায় দাঁড়িয়ে ছিল। নড়তেও পারছিল না। একটা কাজই সে করতে পারত—লাফ দেওয়া। তার গায়ে কারও অ্যালকোহল জাতীয় পদার্থ ঢালার ছবিটা—নারকীয় দৃশ্য।’ ঘটনাটাতে যে কোনো নেতিবাচক উদ্দেশ্য ছিল না, নিতান্তই আনন্দের আতিশয্যে এমনটা করা—এসেক্স বিবৃতি দিয়ে এমনটাই নিশ্চিত করেছে। ড্রেসিংরুমে দলের সবাই ফিরোজের কাছে দুঃখ প্রকাশ করেছেন, এবং সেটি ফিরোজ মেনেও নিয়েছেন বলে শোনা যাচ্ছে।

ঘটনাটা এমন এক সময়ে ঘটেছে, যখন ‘ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার’ আন্দোলন নিয়ে পুরো বিশ্ব আলোড়িত। যে আন্দোলনের সূত্র ধরে নিজেরা ইংলিশ ক্রিকেটে বর্ণবাদী আচরণ শিকার হয়েছেন বলে জানিয়েছেন মাইকেল ক্যারবেরি, এমিলি রেইনফোর্ড ও আজিম রফিকের মতো বেশ কিছু ক্রিকেটার। এর মধ্যে এভাবে মুসলিম একজন ক্রিকেটারের গায়ে বিয়ার ঢালা স্বাভাবিকভাবেই চোখে লেগেছে। গত পরশুই এসেক্স বিবৃতিতে জানিয়েছে, ঘটনাটা ক্লাবের ‘সবাইকে আপন করে নেওয়ার’ নীতির সঙ্গে কোনোভাবেই যায় না।

আরেক বিবৃতিতে কাল দলের সবার হয়ে ক্ষমা চেয়েছেন অধিনায়ক ওয়েস্টলিও। ‘রোববার লর্ডসে উদ্‌যাপনের সময়ে আমরা কারও মনে কোনোভাবে আঘাত দিয়ে থাকলে নিজের ও দলের হয়ে আমি ক্ষমা চাইছি। এসেক্সে আমরা খুব শক্তিশালী একটা ড্রেসিংরুম সংস্কৃতি গড়ে তুলেছি যেখানে মাঠে ও মাঠের বাইরে আমরা সবাই সবাইকে সাহায্য করি’—বিবৃতিতে লিখেছেন ওয়েস্টলি। এরকম কিছু যাতে আর না হয়, সে জন্য ইংলিশ ক্রিকেট বোর্ড (ইসিবি) ও পেশাদার ক্রিকেটারদের সংগঠনের (পিসিএ) কাছ থেকে ক্রিকেটাররা আরও শিখবেন বলেও প্রতিশ্রুতিও দিলেন।

পিসিএ-ও ঘটনাটার পর নড়েচড়ে বসেছে। রোববারের ম্যাচের পর থেকেই এসেক্স স্কোয়াডের দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। ‘রোববার সন্ধ্যায় লর্ডসের ব্যালকনিতে যা হয়েছে, সেটি জানার পর থেকেই পিসিএ এসেক্সের দলের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রেখে চলেছে, ক্লাবটার সদস্যদের সব ধরনের সাহায্য করে চলেছে’—জানিয়েছেন পিসিএ-র একজন মুখপাত্র। এসেক্স অধিনায়ক ওয়েস্টলির বিবৃতিকে তাঁরা সমর্থন করছেন বলেও জানিয়েছেন ওই মুখপাত্র।

এর আগে ফিরোজের ওপর এভাবে বিয়ার ঢালার ঘটনার পর এসেক্স ক্লাবটির পক্ষ থেকে বিবৃতিতে বলা হয়, ‘বহুদিন ধরেই জাতিগত বৈচিত্র্য, আলাদা আলাদা ধর্মের ক্রিকেটাররা খেলছেন দলে। ক্লাব এই জাতিগত বৈচিত্র্য নিয়ে সচেতনতা বাড়াতে কঠোরভাবে পরিশ্রম করে যাচ্ছে। তবে খেলায় জাতিগত বৈচিত্র্য ও সাংস্কৃতিক পার্থক্য নিয়ে খেলোয়াড়দের সচেতন করতে আরও কাজ করতে হবে।’