‘লারার চেয়ে ভালো’ ব্যাটসম্যানের বিশ্বকাপ জেতার স্বপ্ন

জ্যাকব বেথেলকে নিজের চেয়ে ভালো বলেছিলেন লারাছবি: আইসিসি

বীরেন্দর শেবাগ অবসর নিয়ে ফেলেছেন বেশ আগে। রামনরেশ সারওয়ান, আবদুল রাজ্জাক, মোহাম্মদ কাইফ, মারলন স্যামুয়েলস, কাইল মিলস, জ্যাক রুডলফরাও তাই। হরভজন সিং অবশেষে বাস্তবতা মেনে বিদায় নিয়েছেন গত বছর। যাই যাই করেও এখনো আছেন ক্রিস গেইল। ‘যাব’ শব্দটা মুখেই নিতে রাজি নন শোয়েব মালিক কিংবা ইমরান তাহির।

এদের সবার মধ্যে মিল হলো আবির্ভাবের কথাটা তাঁরা জানিয়েছেন সবাই একই মঞ্চে। ১৯৯৮ সালে নতুন করে শুরু হওয়া অনূর্ধ্ব-১৯ ক্রিকেট বিশ্বকাপে দেখা দিয়েছিলেন সবাই। তারকাখ্যাতিতে এ নামগুলোর সঙ্গে আরও দুটি নাম চাইলে টানা যায়—গ্রায়েম সোয়ান ও ওয়াইস শাহ। তবে শুরুতে বলা নামগুলোকে সেবার টেক্কা দিয়েছিলেন সোয়ানরা। যুব বিশ্বকাপের শিরোপা নিয়ে উল্লাস সেবার ইংল্যান্ডই করেছিল।

সোয়ানরা এত দিন সঙ্গীহীন ছিলেন। গত ২২ বছরে তাঁদের কোনো উত্তরসূরি যুব ক্রিকেট বিশ্বকাপের ফাইনাল খেলতে পারেননি। অবশেষে ২৪ বছরের খরা কাটছে। অ্যান্টিগার স্যার ভিভ রিচার্ডস স্টেডিয়ামে যুব বিশ্বকাপের ফাইনালে ভারতের মুখোমুখি ইংল্যান্ড। বাংলাদেশ সময় সন্ধ্যা সাতটায় শুরু হওয়া সে ম্যাচে ইংলিশদের ভরসা? ‘লারার চেয়েও ভালো’ জ্যাকব বেথেল।

এবারের বিশ্বকাপে দুর্দান্ত ফর্মে আছেন বেথেল। পাঁচ ম্যাচে ৪১ গড়ে ২০৩ রান তুলেছেন বাঁহাতি ব্যাটসম্যান। সেই সঙ্গে বাঁহাতি অর্থোডক্স স্পিনে ৫টি উইকেটও পেয়েছেন। তবে শুধু পরিসংখ্যান নয়, ম্যাচের ভাগ্য গড়ে দিতে পারার ক্ষমতাই টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড়ের বিবেচনায় বেথেলের নাম তুলে আনছে। বাংলাদেশের বিপক্ষে বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচেই বেথেলের ক্ষমতার কিছুটা টের পাওয়া গেছে। কিন্তু টুর্নামেন্টে ১১০ স্ট্রাইক রেটে ব্যাট করা এ অলরাউন্ডার তাঁকে নিয়ে নড়তে চড়তে বাধ্য করেছেন কোয়ার্টার ফাইনালে।

দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে সেদিন ভিভ রিচার্ডস স্টেডিয়ামেই খেলতে নেমেছিল ইংল্যান্ড। ২১০ রানের লক্ষ্য দিতে পেরেছিল প্রোটিয়ারা। সেটাও ‘বেবি এবি’ নামে পরিচিত ডেভাল্ড ব্রেভিসের ৮৮ বলের ৯৭ রানের ইনিংসের সুবাদে। কিন্তু সে ইনিংস স্মৃতি থেকে মুছে দিয়েছিলেন বেথেল। কঠিন হতে পারে, এমন এক লক্ষ্যকে হাতের মুঠোয় এনে দিয়েছেন অবিশ্বাস্য এক ঝড়ে। দলের ১১তম ওভারে আউট হয়েছেন বেথেল। এর মধ্যেই ৪২ বলে ৮৮ রান হয়ে গিয়েছিল এই টপ অর্ডার ব্যাটসম্যানের।

২০ বলে পঞ্চাশ পেরোনো বেথেল সেদিন ২০৯.৫২ স্ট্রাইক রেটে খেলেছেন। অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের হয়ে অর্ধশতক করা কোনো ইনিংসে এত দ্রুতগতিতে আর কেউ কখনো রান তোলেননি।

জ্যাকব বেথেল
ছবি: আইসিসি

সে ইনিংস আচমকা ঘটে যাওয়া কিছু নয়। বেথেল বরাবরই এমন খেলতে পছন্দ করেন, ‘আমি সব সময় ইতিবাচক শুরু করতে চাই। ব্যাটের মাঝে কয়েকটি বল লাগার পরই বুঝলাম, বল বেশ ভালো দেখছি। এটা এমন দিন ছিল, যেদিন কোনো কিছু আগে থেকে পরিকল্পনা করতে হয়নি।’ অবশ্য ১১ বছর বয়সেই যাকে ব্রায়ান লারার চেয়ে ভালো ভাবা হতো, তাঁর কাছ থেকে এমন কিছু দেখাটাই বরং স্বাভাবিক।

বার্বাডোজে জন্ম নেওয়া বেথেলকে ক্যারিবীয় অঞ্চলের অন্যতম সেরা প্রতিভা বলেছিলেন স্বয়ং লারা, ‘১১ বছর বয়সে তুমি আমার চেয়ে অনেক ভালো।’ বার্বাডোজ কিংবদন্তি ফ্রাঙ্কলিন স্টেফেনসনের একাডেমিতে নিজের টেকনিক নিয়ে কাজ করছিলেন বেথেল, আর মানসিক দিকটা শানিয়ে নিচ্ছিলেন কিংবদন্তি স্যার গ্যারি সোবার্সের সঙ্গে, ‘আমি ভাগ্যবান, গ্যারি সোবার্সের সঙ্গে কথা বলতে পেরেছি আমি। মানসিক দিক থেকে খুবই বড় একটা ব্যাপার। আমাকে সব সময় নিজেকে সুযোগ দিতে বলেন এবং আমি যখন ব্যাট করতে নামি, তখন আমি সেটাই ভাবি।’—বিবিসিকে বলেছেন বেথেল।

জ্যাকব বেথেল
ছবি: আইসিসি

বার্বাডোজে বেড়ে ওঠা এক কিশোর এখন খেলছেন ইংল্যান্ড অনূর্ধ্ব-১৯ দলের হয়ে। ওয়েস্ট ইন্ডিজের ক্রিকেট থেকে ইংল্যান্ডে প্রতিভা ‘রপ্তানি’ হওয়া অবশ্য নতুন কিছু নয়। ইংল্যান্ডের হয়ে খেলছেন ক্রিস জর্ডান, জফরা আর্চার ও ফিল সল্ট। ইংল্যান্ডে বৃত্তি পেয়ে চলে যান জর্ডান। পরে ওয়েস্ট ইন্ডিজ অনূর্ধ্ব-১৯ দলে খেলা আর্চারকেও ইংল্যান্ডে যেতে উৎসাহিত করেছেন। ২০১৯ সালে ইংল্যান্ডের পক্ষে খেলার সিদ্ধান্ত নিয়ে একটি ওয়ানডে বিশ্বকাপের স্বাদও পেয়েছেন আর্চার। ৯ থেকে ১৫ বছর পর্যন্ত বার্বাডোজে কাটানো সল্ট কদিন আগেই ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে টি-টোয়েন্টি অভিষেকে অর্ধশতক করেছেন।

সল্ট ১৫ বছর বয়সে বার্বাডোজে নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়েন। এ অবস্থায় ইংল্যান্ডে বৃত্তি পেতেই লুফে নিয়েছিলেন। বেথেলের গল্পটাও এমন। জন্মস্থানে সুযোগ না থাকায় ইংল্যান্ডে চলে গেছেন এই অলরাউন্ডার, ‘আমার জন্ম বার্বাডোজে, ১৩ বছর পর্যন্ত সেখানেই ছিলাম। আমার মা–বাবা এখনো সেখানেই থাকেন। বড় হওয়ার জন্য চমৎকার জায়গা, আবহাওয়া সব সময় দারুণ এবং মানুষ খুবই আন্তরিক। দুঃখজনকভাবে ১৩ থেকে ১৫ বছর বয়স হতেই সেখানে সুযোগ কমে যেতে থাকে। সেখানে আরও অনেক খেলোয়াড় আছে, যাদের মধ্যে বাড়তি কিছু ছিল কিন্তু এখন আর খুব একটা খেলে না। কারণ, সেখানে সে সুযোগ নেই। এটা খুবই হতাশার ব্যাপার।’

বল হাতেও অবদান রাখেন বেথেল
ছবি: টুইটার

তাঁর বাবা ও দাদা—দুজনই বার্বাডোজের হয়ে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট খেলেছেন। ১৭ বছর বয়সে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটের স্বাদ পেয়ে গেছেন বেথেলও, তবে ওয়ারউইকশায়ারের হয়ে। তিন সংস্করণেই ঘরোয়া ক্রিকেটে অভিষেক হয়ে গেছে তাঁর। মাত্র ১২ ম্যাচ খেলেছেন, আর তা দেখেই সাবেক ক্রিকেটার ইয়ান বেলের মনে হয়েছে, তাঁর দেখা ‘সেরা ১৭ বছর বয়সী’ এই বেথেল।

আজ নিজের প্রতিশ্রুতির পূর্ণতা দিতে চান এ অলরাউন্ডার। ভারতের বিপক্ষে ফাইনাল নিয়ে স্বপ্নটা জানিয়ে দিয়েছেন বিবিসিকে, ‘এটা একটা স্বপ্নই হবে, তাই না? সেদিন আমি আরও কয়েকজনের সঙ্গে গলফ খেলছিলাম। তখন হঠাৎ মনে হলো, বিশ্বকাপ জেতার সম্ভাবনা আছে। আর এতেই শিহরণ জেগেছে সবার। এত দূর আসতে পারাটাই দারুণ, এখনো কিছু পথ বাকি আছে। তবে আশা করি, ৫ ফেব্রুয়ারি আমরা এটা (বিশ্বকাপ) ঘরে নিয়ে আসব। একটা স্বপ্ন পূরণ হবে।’

ফাইনালে অবশ্য হতাশ করেছেন বেথেল। আজ ভারতের বিপক্ষে রবি কুমারের বলে এলবিডব্লু হওয়ার আগে মাত্র ২ রান করেছেন।