লিটনের ডারউইন-শিক্ষা

সংবাদ সম্মেলনে লিটন দাস l প্রথম আলো
সংবাদ সম্মেলনে লিটন দাস l প্রথম আলো

ঘরোয়া ক্রিকেটে সব সময়ই তাঁর ব্যাট হাসে। অনেকে বলেন, জাতীয় দলের ব্যাটসম্যানদের বাইরে ঘরোয়া ক্রিকেটের সবচেয়ে উজ্জ্বল নক্ষত্র এই লিটস দাস। ব্যাট হাতে সেটি তিনি প্রমাণ করেছেন অনেকবারই। সর্বশেষ প্রিমিয়ার লিগের কথাই ধরুন। ১৪ ম্যাচে ৫৩.৭১ গড়ে লিগের সর্বোচ্চ ৭৫২ রান করেছেন। দ্বিতীয় স্থানে থাকা মার্শাল আইয়ুবের রান তাঁর চেয়ে প্রায় এক শ কম।

কিন্তু আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে এই লিটনই কেমন অচেনা। ৯টি ওয়ানডে খেলেছেন, সবগুলোই দেশের মাটিতে। চার টেস্ট খেলে ব্যাট করেছেন ছয় ইনিংসে। এর মধ্যে বিদেশে শুধু শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে সর্বশেষ গল টেস্টটা। যে তিনটি টি-টোয়েন্টি ম্যাচ খেলেছেন, সেগুলোও সব ঢাকাতেই। তবু জাতীয় দলে ঘরোয়া ক্রিকেটের আলো নিয়ে তিনি জ্বলে উঠতে পারেননি কখনোই। ওয়ানডের ১২৪ রানের মধ্যে সর্বোচ্চ ইনিংস ৩৬। টেস্টে একটি ফিফটিসহ করেছেন ১৩৭। ঢাকার ক্রিকেট আর আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের পার্থক্যের প্রতীক বলতে পারেন এই লিটন দাসকে।

তবে যাঁরা ঘরোয়া ক্রিকেটে লিটনের ব্যাটিং দেখেছেন, তাঁরা এখনো আশায় জাল বোনেন। হয়তো আরও কিছু জিনিস শেখার রয়ে গেছে, যেগুলো আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের জন্য তাঁকে পরিপূর্ণ ব্যাটসম্যান করে তুলবে। বিসিবির হাইপারফরম্যান্স দলের সঙ্গে অস্ট্রেলিয়া সফরে সে রকমই কিছু জিনিস শিখে এসেছেন লিটন।

১৭ জুলাই দেশে ফেরার পর হাইপারফরম্যান্সের ব্যাটসম্যানরা কাল যোগ দিয়েছেন ফিটনেস ট্রেনিংয়ে। ট্রেনিং শেষে লিটন কথা বলেছেন ডারউইনে তাঁদের ‘শিক্ষাসফর নিয়ে’। লিটন ছিলেন দলের অধিনায়ক। সে জন্য তাঁর অভিজ্ঞতা সব দিক দিয়েই অন্য রকম, ‘খুব ভালো অভিজ্ঞতা ছিল। খেলোয়াড় হিসেবে তো সব সময় খেলি। এবার একটা বাড়তি দায়িত্ব ছিল, নেতৃত্ব সামলানো। অধিনায়কত্ব মজার একটি কাজ। আমি এটাকে উপভোগ করার চেষ্টা করেছি।’

নর্দার্ন টেরিটরি আমন্ত্রিত একাদশের বিপক্ষে পাঁচটি ৫০ ওভারের ম্যাচ ও একটি তিন দিনের ম্যাচের সবই ছিল হাইপারফরম্যান্স দলের অনুশীলন শিবিরের অংশ। ডারউইনে গিয়ে খেলার উদ্দেশ্যই ছিল ভিন্ন কন্ডিশন আর ভিন্ন আবহাওয়ায় অপরিচিত প্রতিপক্ষের সঙ্গে খেলে অভ্যস্ত হওয়া। সে উদ্দেশ্য ভালোই সফল হয়েছে বলে জানালেন এইচপির অধিনায়ক, ‘ওখানকার উইকেট আর আমাদের উইকেটে অনেক পার্থক্য। এটা খেললেই বোঝা যায়। তা ছাড়া আমাদের এখানে অনেক ঘাম হয়। ১০ মিনিট খেললেও শরীর অনেক ঘামায়। ওখানে ওটা হয় না। প্রচুর বাতাস থাকে। এটা অনেক সময় পক্ষে থাকে, আবার বিপক্ষেও চলে যায়। আমরা এগুলোর সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর চেষ্টা করেছি।’

নিজের ব্যাটিং নিয়ে অবশ্য কিছুটা আফসোস আছে লিটনের, ‘ব্যাটিংয়ে আমার আরেকটু ভালো করার জায়গা ছিল। কিন্তু পারিনি। ফর্ম সব সময় থাকে না। আর কন্ডিশনও আমাদের অনুকূলে ছিল না। প্রথম ম্যাচটি তো আমরা অনেক কষ্ট করে জিতেছি। দু-তিনটি পরিকল্পনা মার খেয়েছে।’ ডারউইনে এইচপি দলের প্রতিপক্ষ কারা হবে, সেটা নিয়ে শুরু থেকেই জল্পনা-কল্পনা ছিল। ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে ক্রিকেটারদের চলমান সমস্যায় একসঙ্গে দেশটির ২৩০ জন ক্রিকেটার খেলার বাইরে চলে যান। সে জন্য নর্দার্ন টেরিটরি আমন্ত্রিত একাদশে নাকি অনূর্ধ্ব-১৯ ক্রিকেটারদেরই ভিড় ছিল বেশি। তবে লিটন বলছেন, সব মিলিয়ে প্রতিপক্ষ দলটা খারাপ ছিল না, ‘হয়তো ওদের চুক্তিভুক্ত খেলোয়াড়েরা ছিল না। তবে যারা নর্দার্ন টেরিটরির ভালো খেলোয়াড়, তারাই খেলেছে আমাদের বিপক্ষে। নর্দার্ন টেরিটরি ও সাউথ অস্ট্রেলিয়ার কিছু ভালো খেলোয়াড় ছিল।’

অবশ্য প্রতিপক্ষ যেমনই হোক, সফরের উদ্দেশ্যটাকেই বড় করে দেখছেন লিটন। ওই কন্ডিশনে খেলে তাঁর সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি ভবিষ্যতের জন্য অভিজ্ঞতা সঞ্চয়। লিটনের মতো একজন ক্রিকেটারের জন্য ভবিষ্যতে বলতে জাতীয় দলই বোঝায়। কিন্তু সে প্রসঙ্গ উঠতেই কথা বলতে একটু যেন অনাগ্রহ তাঁর, ‘জাতীয় দল নিয়ে আমার মাথায় এখন কোনো কিছুই নেই।’

বিশ্বাস করার দরকার নেই। লিটনের মাথায় ‘জাতীয় দল’ না থেকে পারেই না। ওই কথা বলার কারণ হতে পারে একটাই। আবারও ব্যর্থতার ব্যাখ্যা দেওয়াটা যে বড় যন্ত্রণার!