রোনালদো চলে গেলে মাঠের চেয়ে মাঠের বাইরেই ক্ষতি বেশি পর্তুগালের
বিশ্বকাপ শেষ হয়ে গেছে সপ্তাহখানেক হতে চলল। শেষ ষোলোতে স্পেনের কাছে পর্তুগালের ১-০ গোলে হারের পর তো কেটে গেছে বেশ কিছুদিনই। কিন্তু পর্তুগিজদের বুকের ভেতর জমে থাকা ভারটা এখনো কমেনি। বিশ্বকাপে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর শেষ দেখে ফেলেছেন যে তাঁরা!
২৩৩ আন্তর্জাতিক ম্যাচ। ১৪৬ গোল। এই দুটি সংখ্যা দিয়ে কি ২০ বছরের একটা মহাকাব্যকে মাপা যায়? ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো নিজেই ঘোষণা দিয়েছিলেন, ২০২৬ বিশ্বকাপই ছিল তাঁর শেষ বিশ্বকাপ। শেষ বাঁশি বাজার পর মাঠ ছেড়ে তিনি যখন হেঁটে বেরিয়ে যাচ্ছিলেন, সেটা শুধু একজন ফুটবলারের প্রস্থান ছিল না। মনে হচ্ছিল, মেঘের ছায়া নেমে এসেছে পর্তুগিজ ফুটবলের আকাশে।
তবে পর্তুগালের ফুটবলে আসল ঝড়টা অবশ্য মাঠে বইছে না। তোলপাড়টা শুরু হয়েছে পর্তুগালের ফুটবল অর্থনীতির অন্দরে। প্রশ্ন উঠছে, পর্তুগাল ফুটবল কি এত দিন ধরে আসলে একটা দেশ ছিল, নাকি কেবলই একটা মানুষের নাম?
পর্তুগিজ ইনস্টিটিউট অব মার্কেটিং অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের নির্বাহী পরিচালক দানিয়েল সা এক সাক্ষাৎকারে রূঢ় সত্যটাই বলে দিয়েছেন বিশ্ব ফুটবলের সামনে, ‘ব্র্যান্ডের দৃষ্টিকোণ থেকে বললে কথাটা কঠোর শোনাবে, কিন্তু রোনালদো একা পর্তুগাল জাতীয় দল এবং আরও অগণিত দেশের সমন্বিত আকারের চেয়েও তুলনাহীনভাবে বড়।’
তিনি কোনো ট্রফি বা গোলের হিসাব দিচ্ছিলেন না। বলছিলেন সেই এক মাধ্যাকর্ষণ শক্তির কথা, যা দিয়ে এশিয়ার প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে শুরু করে লাতিন আমেরিকা বা মধ্যপ্রাচ্যের কোটি কোটি মানুষকে টিভি পর্দার সামনে সেঁটে রাখা যেত। টিভির ব্রডকাস্টাররা যখন পর্তুগালের ম্যাচের সূচি সাজায়, তারা কিন্তু ব্রুনো ফার্নান্দেজ বা রাফায়েল লিয়াওয়ের ছবি দেখিয়ে সম্প্রচার বিক্রি করে না। তারা বিক্রি করে সোশ্যাল মিডিয়ায় ১০০ কোটি অনুসারী থাকা এক মহামানবকে। যাঁর ইউটিউব চ্যানেল ‘ইউআর ক্রিস্টিয়ানো’ চালু হওয়ার মাত্র ৯০ মিনিটেই ১০ লাখ সাবস্ক্রাইবার পেরিয়ে গিয়েছিল!
দুই দশক ধরে পর্তুগিজ ফুটবল ফেডারেশনের (এফপিএফ) প্রতিটি স্পনসরশিপ, প্রতিটি বাণিজ্যিক চুক্তি আর মিডিয়া স্বত্বের নথিতে অদৃশ্য পাতায় একটা না-লেখা সই থাকত। দানিয়েল সার ভাষায়, ‘তিনিই সেই একক সত্তা, যাঁর নাম ভাঙিয়ে ২০ বছর ধরে ফেডারেশন পর্বতপ্রমাণ চুক্তি আর কোটি কোটি ডলার পকেটে পুরেছে।’
দানিয়েল সা একটা ভয়াবহ রূপকও ব্যবহার করেছেন—‘দ্রুতগামী এস্কেলেটর থেকে নিচে পড়ে যাওয়া।’ তাঁর কথায়, ‘ক্রিস্টিয়ানো চলে গেলে কী পরিমাণ আন্তর্জাতিক আলো আর বিশ্বজোড়া মনোযোগ মুহূর্তের মধ্যে হারিয়ে যাবে, সেটা মানুষ এখনো ধারণাই করতে পারছে না। এটা কোনো ধীরগতির পতন নয়, এটা হবে দ্রুতবেগে নিচে নেমে আসার মতো।’
ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো আধুনিক ফুটবলের প্রথম বিলিয়নিয়ার। ফোর্বসের হিসাবে, তাঁর বর্তমান সম্পদ প্রায় ১২০ কোটি ডলার। ক্যারিয়ারে আয় ছুঁয়েছে ২০০ কোটি ডলারের মাইলফলক। নাইকির সঙ্গে তাঁর আজীবনের চুক্তিই প্রায় ১০০ কোটি ডলারের। আল নাসরের চুক্তি আর বাণিজ্যিক বিজ্ঞাপন মিলিয়ে বছরে যা আয় করেন, তা অনেক দেশের ফুটবল বাজেটের চেয়েও বড়।
কিন্তু প্রশ্নটা রোনালদোর সম্পদ নিয়ে নয়। প্রশ্ন হলো, তাঁর এই ভাবমূর্তি যেভাবে পর্তুগাল ফুটবলকে টেনে তুলে রেখেছিল, সেই ছাতাটা সরে গেলে পর্তুগিজ ফুটবল কতটা অরক্ষিত হয়ে পড়বে?
পর্তুগাল দলে মেধার অভাব অবশ্য নেই। জোয়াও নেভেস, ভিতিনিয়া, পেদ্রো নেতো কিংবা দিয়োগো কস্তা—ইউরোপের সেরা ক্লাবগুলোতে দাপিয়ে বেড়ানো একেকজন রত্ন। মাঠের নৈপুণ্যের দিক থেকে পর্তুগালের আগামী দিনগুলো সামলে নেওয়া হয়তো খুব কঠিন হবে না।
কিন্তু স্পনসরশিপের হিসাবের খাতায় যে শূন্যতা তৈরি হবে, তা পূরণ করার সাধ্য কার আছে?
কোনো বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ড যখন পর্তুগালের জার্সিতে টাকা ঢালে, তারা মূলত সিআর সেভেনের বিশাল সাম্রাজ্যে ঢোকার টিকিট কেনে। রোনালদোকে এই সমীকরণ থেকে বাদ দিলে পর্তুগাল মানে ইউরোপের এক প্রতিভাবান দল, যারা হয়তো নিয়মিত ম্যাচ জিতবে, কিন্তু একক শক্তিতে রাতারাতি বিশ্ববাণিজ্য তোলপাড় করে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে না।
সবচেয়ে কঠিন সত্যটা অবশ্য লুকিয়ে আছে একেবারে আড়ালে। রোনালদোর যে বিশাল বিশ্বজোড়া ভক্তগোষ্ঠী, তাদের সিংহভাগ পর্তুগালকে ভালোবাসে না, তারা ভালোবাসে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোকে।
রোনালদো যখন হেঁটে বেরিয়ে যাবেন, সেই কোটি কোটি অনুরাগীও সম্ভবত পর্তুগালের পতাকা তুলে রেখে অন্ধকারেই মিলিয়ে যাবে। আলো যখন নিভে যায়, তখন কি ছায়াও আর নিজের থাকে?