default-image

‘মুরগির খোপটার মধ্যে ঢুকলে আর দম নিতে পারি না!’

নিজের সরু বিছানাটি দেখিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন এক ফুটবলার। ছোট্ট এক রুমে চারটি খোপের মতো সরু জায়গায় চারজনের শোয়ার ব্যবস্থা। হাত-পা নাড়ানোরও সুযোগ নেই। নেই আলো-বাতাসের ব্যবস্থা। উল্টো রুমের মধ্যে বুট-জার্সি ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকায় উটকো গন্ধ।

এমন মানবেতর পরিবেশেই থাকছেন বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগের ক্লাব আরামবাগ ক্রীড়া সংঘের ফুটবলাররা। খেলোয়াড়দের ভাষায় যা ‘মুরগির খোপের মধ্যে থাকা’।

সাধারণত স্কুল-কলেজে পড়ুয়া ছাত্র আর স্বল্প আয়ের পেশাজীবী মানুষদেরই ঠিকানা উত্তরার এই সুপার হোস্টেল। ১০ জানুয়ারি এখানে ওঠানো হয় আরামবাগের বাংলাদেশি ফুটবলারদের। ২৫ জন খেলোয়াড় আর একজন স্টাফ থাকছেন ছয়টি রুম নিয়ে। খাওয়ার বন্দোবস্ত হোস্টেলের বাকিদের সঙ্গে একই ডাইনিংয়ে।

বিজ্ঞাপন

করোনাকালেও স্বাস্থ্যবিধি মানার কোনো ব্যবস্থা নেই। দেশের সর্বোচ্চ পর্যায়ে ফুটবল খেলতে এসে এ রকম অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে থাকাটা মেনে নেওয়া কষ্টকরই ফুটবলারদের পক্ষে।

ক্লাব কর্তৃপক্ষ অবশ্য বলছে আজ তাঁদের হোটেলে তোলা হবে। সেটি হলেও এই কয়টা দিন ভীষণ কষ্টেই কাটল খেলোয়াড়দের।

চলতি মৌসুম সামনে রেখে নীলফামারীতে কন্ডিশনিং ক্যাম্প করে এসে ঢাকায় ফেডারেশন কাপ খেলে আরামবাগ। টুর্নামেন্ট চলাকালে বিদেশি খেলোয়াড়, কোচিং স্টাফসহ পুরো দলটি ছিল আশকোনা হজ ক্যাম্পসংলগ্ন একটি আবাসিক হোটেলে।

default-image

দুজনের রুমে চারজন, চারজনের রুমে ছয়জন করে থাকতেন স্থানীয় ফুটবলাররা। ক্লাবের আর্থিক অবস্থার কথা ভেবে সেটি মেনেও নিয়েছিলেন তাঁরা। কিন্তু প্রিমিয়ার লিগের জন্য করা আবাসনব্যবস্থা যে আরও করুণ!

বিছানাগুলো এত সরু আর ছোট যে অনুশীলন করে এসে ঠিকভাবে হাত-পা ছড়িয়ে বিশ্রাম নেওয়ারও সুযোগ নেই। একটু লম্বা খেলোয়াড়দের পা তো নাকি বিছানার বাইরেই চলে যায়! নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক খেলোয়াড় বলেন, ‘জীবনে কখনো এভাবে থেকে প্রিমিয়ার লিগ খেলব ভাবিনি। শ্রমিকেরাও আমাদের চেয়ে ভালোভাবে থাকে। অনুশীলন করে এসে একটু আরামে শুতে পারি না। কারও মোবাইলে ভাইব্রেশন হলেও ঘুম ভেঙে যায়।’

২০১৯ সালে ক্যাসিনোবিরোধী অভিযানের পর থেকেই আর্থিক দুর্দশায় ভুগছে মতিঝিল ক্লাব পাড়ার দলটি। ক্লাবে এখনো তালা ঝুলছে।

খেলোয়াড়দের আবাসনের জন্য করতে হচ্ছে বিকল্প ব্যবস্থা। গত বছর সর্বশেষ বাতিল হওয়া লিগে জোড়াতালি দিয়ে দল গঠন করেছিল আরামবাগ। স্থানীয় ২১ খেলোয়াড়কে রাখা হয় পল্টনের একটি বড় ফ্ল্যাটে।

কিন্তু এরপর দলটিকে রাখা হয় এমন এক হোস্টেলে, যেটি অন্তত খেলোয়াড়দের আবাসন হিসেবে মোটেই উপযুক্ত নয়।

default-image

হোস্টেলে প্রথম দুই দিন ছাত্রাবাসের খাবারই খান ফুটবলাররা। সকালে ডাল ও রুটি, দুপুরে ভাতের সঙ্গে ডাল ও সবজি এবং রাতে ভাত, ডাল ও মুরগির মাংস। সাধারণ একজন মানুষের জন্য এ খাবারই হয়তো যথেষ্ট, কিন্তু খেলোয়াড়দের জন্য তা নয়।

খাবার নিয়ে খেলোয়াড়দের অভিযোগের পর ক্লাবের পক্ষ থেকে সকালের নাশতায় যোগ হয় দুটি ডিম ও একটি কলা, দুপুরে মাছ ও সন্ধ্যায় স্যুপ বা নুডলস। তবে মাছ-মাংস যে পরিমাণ দেওয়া হয়, খেলোয়াড়দের শারীরিক চাহিদার তুলনায় তা–ও অপ্রতুল। হয়তো সেটিরই প্রভাব পড়ছে মাঠে।

লিগে কাল টানা চতুর্থ ম্যাচে হেরেছে আরামবাগ। শেখ জামাল ধানমন্ডির কাছে হজম করছে আধডজন গোল।

বিজ্ঞাপন

খেলোয়াড়দের এভাবে রাখতে হচ্ছে দেখে অনুতাপ প্রকাশ করলেন ক্লাবের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি এজাজ জাহাঙ্গীর, ‘খেলোয়াড়দের জন্য এটি স্বাস্থ্যকর পরিবেশ নয়। কিন্তু আমরা নিরুপায়। আমাদের ক্লাবে তালা। আর্থিক অবস্থা ভালো নয়। এখান থেকে খেলোয়াড়দের অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছি আমরা।’

বর্তমানে আরামবাগের হোম ভেন্যু মুন্সিগঞ্জের বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমান স্টেডিয়াম হলেও সেটি হওয়ার কথা ছিল টঙ্গীতে। সে কারণেই তখন জরুরি ভিত্তিতে এই হোস্টেলে খেলোয়াড়দের থাকার ব্যবস্থা করা হয় বলে জানান ক্লাবের ফুটবল সম্পাদক গওহর জাহাঙ্গীর। তিনিই জানান, খেলোয়াড়দের আজই হোটেলে তোলার ব্যবস্থা করবেন তাঁরা।

default-image

মৌসুমের শুরুতে ভালো কিছুর প্রতিশ্রুতিই দিয়েছিল ২০১৭-১৮ মৌসুমের স্বাধীনতা কাপজয়ী ক্লাব আরামবাগ। দুই বিদেশি ফুটবলারের সঙ্গে নেওয়া হয় ভারতীয় কোচও। অবশ্য সেই বিদেশি খেলোয়াড়েরা এখনো ভালো খেলতে পারেননি।

প্রধান কোচ সুব্রত ভট্টাচার্য ফেডারেশন কাপের পর দেশে ফিরে যান। তাঁর জায়গায় দায়িত্ব দেওয়া হয় সুব্রতরই সহকারী ভারতীয় চন্দন রাঠোরকে। কাল তিনিও মাঠে ছিলেন না। ডাগআউটে ছিলেন ফিজিক্যাল ট্রেনার আজমল হোসেন। জানা গেছে, ক্লাবটি নাকি এখন আবার নতুন কোচের সন্ধানে আছে।

ফুটবল থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন