আর্জেন্টিনার চার গোলের ম্যাচেও নায়ক রোমেরো

আর্জেন্টিনার গোলরক্ষক সার্জিও রোমেরো। ছবি: এএফপি
আর্জেন্টিনার গোলরক্ষক সার্জিও রোমেরো। ছবি: এএফপি

এক দল বিশ্বের এক নম্বর। অন্য দল ফিফা র‌্যাঙ্কিংয়ে পড়ে আছে ৭৭ নম্বরে। শক্তি, প্রতিভা কি ঐতিহ্যে মাঝখানে আসলে অযুত-নিযুত ক্রোশের ব্যবধান। ম্যাচের ফলাফলও হলো তা-ই। অতীতের মতো আবারও ভেনেজুয়েলাকে আর্জেন্টিনা উড়িয়ে দিল। ৪-১ গোলের জয় নিয়ে উঠে গেল কোপা আমেরিকার সেমিফাইনালে। তবে গোলবন্যার এই রাতেও আর্জেন্টিনার নায়ক কিন্তু গোলরক্ষক সার্জিও রোমেরো।
গঞ্জালো হিগুয়েইন জোড়া গোল করেছেন। জোড়া অ্যাসিস্টের পাশাপাশি নিজে রেকর্ডছোঁয়া এক গোল করেছেন লিওনেল মেসি। বদলি হিসেবে নামার কয়েক মিনিটের মধ্যে গোলের খাতায় নাম লিখিয়েছেন এরিক লামেলাও। তবে আর্জেন্টিনার এই তারকা ফরোয়ার্ডদের কেউ নন; ম্যাচটা শেষ পর্যন্ত একতরফা দেখাল খ্যাপা রোমেরোরও জন্যই।
ম্যাচের প্রথমার্ধের শেষ প্রান্তে দুটি অবিশ্বাস্য সেভের পাশাপাশি একটি পেনাল্টিও ঠেকিয়েছেন। এই তিনবারই ভেনেজুয়েলা গোল পেতেই পারত। ২-০-তে শেষ হওয়া প্রথমার্ধ হয়ে যেতে পারত ২-৩, আর্জেন্টিনার বিপক্ষেই। এমনকি স্কোর ২-৪ হলেও হতে পারত বৈকি!
গত ম্যাচের নায়ক এজেকিয়েল লাভেজ্জিকে একাদশে রাখেননি জেরার্ডো মার্টিনো। আর্জেন্টাইন কোচের এই সিদ্ধান্তের চেয়েও বিস্ময়কর ঠেকল একাদশে হিগুয়েইনকে দেখে। এবারের কোপায় হিগুয়েইন তো রীতিমতো ফ্লপ। কিন্তু মার্টিনো দলে বেশি ওলট–পালটের পক্ষে কখনো নন। একাদশে পরিবর্তনের বদলে আস্থা রেখে একটা স্থিতি আনতে চান। ৮ মিনিটে করা হিগুয়েইনের সেই গোলই যেন আস্থার প্রতিদান।
মেসির বাড়ানো লং বল জায়গামতো গিয়ে রিসিভ করে পড়তি বলেই প্রথম স্পর্শে শট নিলেন গোলে। পারফেক্ট নাম্বার নাইনের পারফেক্ট ফিনিশিং। ২৮ মিনিটে হিগুয়েইন করলেন দ্বিতীয় গোল। কারও সাহায্য লাগল না। ভেনেজুয়েলার রক্ষণের ভুলের মাশুল তুললেন ব্যাক পাসটা চুরি করে নিয়ে, এগিয়ে আসা গোলরক্ষককে বোকা বানিয়ে ফাঁকা পোস্টে বল পাঠিয়ে। বুঝিয়ে দিলেন, কেন কোচ সমালোচনার মুখেও খেলাচ্ছেন তাঁকে।
২-০, ভেনেজুয়েলার জ্বলে উঠল তখনই। ৩৫ থেকে ৪৫ মিনিট পর্যন্ত ম্যাচের উজ্জ্বলতম মুহূর্ত উপহার দিল নিজেদের। ৩৫ মিনিটে হাভিয়ের মাসচেরানোর ভুলে প্রথম ডুবতে বসেছিল আর্জেন্টিনা। কিন্তু বাঁয়ে দুর্দান্তভাবে ঝাঁপিয়ে সেভ করেন রোমেরো। আগুন গোলার শট ঠেকিয়ে নিজের বুকের বাঁ পাশে সেই পরিচিত আলতো টোকা দেন, যেখানে বসানো আর্জেন্টিনার লোগো।
৩৯ মিনিটে কর্নার থেকে রনদনের হেডার বাঁ পোস্টে লেগে ফিরে আসে। পরপর দুটি সুবর্ণ সুযোগ হাতছাড়া করা ভেনেজুয়েলা কি তখনো জানত সামনে আরও দুটি প্রায় নিশ্চিত গোল থেকে তারা বঞ্চিত হবে? ৪১ মিনিটে ফেলতশ্চারের লম্বা শট বাঁক খেয়ে বার ঘেঁষে গোলমুখে ঢুকতে থাকা বল ফিস্ট করে ক্লিয়ার করেন রোমেরো।
৪৪ মিনিটে তাঁর ভুলেই ভেনেজুয়েলা পেয়ে যায় পেনাল্টি। নায়ক হতে হতে কি খলনায়ক হয়ে যাবেন? না! এবারও জালে বল ঢুকতে দেননি রোমেরো। সেইহাসের পানেনকা শট ঠিকই টের পেয়েছেন, পেনাল্টি ঠেকিয়েছেন বুক পেতে।

আর্জেন্টিনা শিবিরে জয়ের উৎসব। ছবি: এএফপি
আর্জেন্টিনা শিবিরে জয়ের উৎসব। ছবি: এএফপি

দ্বিতীয়ার্ধে যেন রোমেরোর অনুপ্রেরণাতেই আবারও জ্বলে ওঠে আর্জেন্টিনা, ঝলসে ওঠেন মেসি। ২-০ স্কোর হওয়ার পর যে মেসি আড়ালেই চলে গিয়েছিলেন। ৬০ মিনিটে আবারও আলোতে। হঠাৎ খেলার গতি বাড়িয়ে সতীর্থদের সঙ্গে দুর্দান্ত ওয়ান-টুর সফল পরিণতি দিলেন। টুর্নামেন্টে নিজের চতুর্থ গোল। শুধু এবারের আসরের গোলদাতার তালিকায় শীর্ষে বসলেন না, মেসি শীর্ষবিন্দু ছুঁয়ে ফেললেন আর্জেন্টিনারও। টুর্নামেন্ট শুরুর আগে সার্জিও বাতিস্তুতার চেয়ে চার গোল পেছনে ছিলেন। মেসি এখন বসে গেলেন ‘বাতিগোলে’র পাশে। আর্জেন্টিনার জার্সিতে দুজনই গোল এখন ৫৪টি।
৭০ মিনিটে রনদনের আরও একটি হেডার পোস্টে লাগল। কিন্তু এবার ঠিকই ঢুকে গেল জালে। ৩-১, ম্যাচে কি তবে কোনো নাটকীয়তা? যদি কারও মনে সেই আভাসটুকু ভেসেও ওঠে, মাত্র ৩০ সেকেন্ডে সেটা দূর করে দিল আর্জেন্টিনা। এবার মেসির বাড়ানো বলে দুর্দান্ত গোল করলেন লামেলা।
টুর্নামেন্টে ৪ ম্যাচে ১৪ গোল করে শেষ চারে উঠে গেল মেসির দল। ২২ জুন টানা তিন বছর টানা তৃতীয় বড় টুর্নামেন্টের ফাইনালে ওঠার পথে আর্জেন্টিনার বাধা স্বাগতিক যুক্তরাষ্ট্র।