আবার স্বপ্ন দেখছে  আর্জেন্টিনা।
আবার স্বপ্ন দেখছে আর্জেন্টিনা।ছবি: রয়টার্স

জুলাইয়ের চতুর্থ দিন। সালটা ১৯৯৩। বিটিভি আর হুমায়ূন আহমেদের যুগলবন্দীতে বাংলাদেশের সবাই তখন ‘বাকের ভাই’ নামের এক চরিত্রে বুঁদ। খেলার মাঠের আরেক চরিত্রেও তখন মজে ছিল দেশের আর্জেন্টাইন সমর্থকেরা। ডিয়েগো ম্যারাডোনা নামের সূর্য তখন অস্তগামী, লিওনেল মেসি বলে কারও আগমনের কথা চিন্তাও করা হয়নি। মেসি-ম্যারাডোনার মাঝের এই সময়টায় ঝাঁকড়া চুল আর নীল চোখের নায়কোচিত এক তারকার পায়ের জাদুতে মুগ্ধ হতো আকাশি-সাদাদের সমর্থকেরা। আদর্শ স্ট্রাইকার বলতে যা বোঝায়, ঠিক তাই ছিলেন তিনি। তাঁর দুই গোলেই সেদিন কোপা আমেরিকার শিরোপা ঘরে তোলে আর্জেন্টিনা। গ্যাব্রিয়েল বাতিস্তুতা নামের সেই স্ট্রাইকারের জোড়া গোলের জবাব জানা ছিল না মেক্সিকোর।

সেই ফাইনালের আগে কোপা আমেরিকার ইতিহাসের সেরা দল হিসেবে শীর্ষে সহাবস্থানে ছিল আর্জেন্টিনা আর উরুগুয়ে, ১৩টা করে শিরোপা নিয়ে। জোড়া গোল করে শিরোপা এনে দেওয়ার পাশাপাশি কোপা আমেরিকা নামের চূড়ার শীর্ষে আর্জেন্টিনার একাধিপত্য কায়েম করলেন বাতিস্তুতা।

বিজ্ঞাপন
default-image

মহাদেশীয় শ্রেষ্ঠত্ব পাওয়া হলো, চোখ এবার বিশ্ব-শ্রেষ্ঠত্বের দিকে। পরের বছরেই বিশ্বকাপ। আট বছরের খরা কাটিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে এই বাতিস্তুতার কাঁধে চড়েই তৃতীয়বারের মতো বিশ্বজয়ের আনন্দে মাতোয়ারা হবে আর্জেন্টিনা, এমনটাই আশা ছিল। প্রথম ম্যাচে গ্রিসের বিপক্ষে হ্যাটট্রিক করে সে আশার পারদটা তরতর করে বাড়িয়ে দিলেন বাতিস্তুতা। ক্যারিয়ার সায়াহ্নে পৌঁছালেও ম্যারাডোনার বুটজোড়ায় যে তখনো ধার ছিল, বোঝালেন একটা গোল করে। নাইজেরিয়ার বিপক্ষে দ্বিতীয় ম্যাচে ম্যারাডোনা-বাতিস্তুতা নন, জ্বলে উঠলেন আরেক লম্বাচুলো স্ট্রাইকার ক্লদিও ক্যানিজিয়া। দুই গোলেই সহায়তা করেছিলেন ম্যারাডোনা। আর্জেন্টিনা-ভক্তরা ভাবলেন, ‘যাক, শুধু বাতিস্তুতা-ম্যারাডোনার ওপর ভরসা করার দিন শেষ, নিজেদের দিনে জ্বলে উঠতে পারেন ক্যানিজিয়ারাও।’ দলে ছিল অস্কার রুগেরির মতো ডিফেন্ডারদের অভিজ্ঞতা, ছিল দিয়েগো সিমিওনে-ফের্নান্দো রেদোন্দোদের মতো প্রতিভাবান রক্ষণাত্মক মিডফিল্ডারদের কার্যকারিতা। এত কিছু সত্ত্বেও তৃতীয় ম্যাচে এসে সুর কেটে গেল, রিস্টো স্টইচকভের বুলগেরিয়ার কাছে এসে।

বার্সেলোনায় ইয়োহান ক্রুইফের গড়া সেই বিখ্যাত ‘ড্রিম টিম’–এর অংশ স্টইচকভ দুই বছর আগেই জিতেছেন ইউরোপিয়ান কাপ। বিশ্বের অন্যতম সেরা দুই-তিন স্ট্রাইকারের মধ্যে উচ্চারণ করা হয় তাঁর নামটাও। স্টইচকভ জাদুর জবাব জানা ছিল না আর্জেন্টিনার কাছে। ২-০ গোলে হারা সে ম্যাচে আর্জেন্টিনা এক ধাক্কায় গ্রুপের তৃতীয় স্থানে নেমে গেল। কপাল ভালো, এখনকার মতো সে বিশ্বকাপে গ্রুপের শীর্ষ দুই দলই পরের রাউন্ডে ওঠেনি, উঠেছিল ছয় গ্রুপে তৃতীয় হওয়া ছয় দলের মধ্যে সেরা চার দলও। সে নিয়মের কল্যাণে বিশ্বকাপে বাদ পড়ার হাত থেকে বেঁচে যায় আকাশি-সাদারা।

আরেকটা দুঃসংবাদ হানা দিল আর্জেন্টাইন শিবিরে। ডোপ টেস্টে উতরাতে না পারার কারণে দল থেকে বাদ দেওয়া হয় অনুপ্রেরণাদায়ী অধিনায়ক ম্যারাডোনাকে। সে ধাক্কাতেই কিনা, দ্বিতীয় রাউন্ডে কাগজে-কলমে সহজ প্রতিপক্ষ রোমানিয়ার কাছে আসল যন্ত্রণাটা পেলেন বাতিস্তুতারা। রৌদ্রকরোজ্জ্বল দিনে মাঠে নামা আকাশি-সাদারা সেদিন সূর্যের উত্তাপের পাশাপাশি গিওর্গি হ্যাজিদের ‘গরম’টাও টের পাচ্ছিল বেশ। দুর্দান্ত এক ফ্রি-কিক থেকে টটেনহামের স্ট্রাইকার ইলেয়া দিমিত্রেস্কু এগিয়ে দেন রোমানিয়াকে। চার মিনিট পরে পেনাল্টি থেকে বাতিস্তুতা সমতায় ফেরালেও রোমানিয়ার আত্মবিশ্বাসে চিড় ধরাতে পারেনি। দুই মিনিট পর হ্যাজির রক্ষণচেরা দুর্দান্ত এক পাসে নিজের দ্বিতীয় গোল করেন দিমিত্রেস্কু। দ্বিতীয়ার্ধে পরিবর্তন ঘটল ভূমিকায়, এবার সাহায্যকারীর জায়গায় দিমিত্রেস্কু, গোলদাতা হ্যাজি। শেষ দিকে আবেল বালবো ব্যবধান কমালেও, জয় পাওয়া হয়নি আর্জেন্টিনার। ম্যারাডোনা গ্যালারিতে বসে দেখেছিলেন বাতিস্তুতাদের হাহাকার।

পরের বছরই কোপার শিরোপা ধরে রেখে বিশ্বকাপ-ব্যর্থতায় প্রলেপ দিতে চাইল আলবিসেলেস্তিরা। দল থেকে তত দিনে বিদায় নিয়েছেন ম্যারাডোনা। আরিয়েল ওর্তেগার মতো প্রতিভাবান প্লে-মেকার চলে এসেছেন ম্যারাডোনার জায়গা নিতে। রুগেরির অভিজ্ঞতার জায়গায় এসেছে হাভিয়ের জানেত্তির তারুণ্য। বাতিস্তুতার জাদুতে বলিভিয়া ও চিলির বিপক্ষে গ্রুপ পর্বের প্রথম দুই ম্যাচ জিততে সমস্যা না হলেও, আর্জেন্টিনাকে চমকে দিল টুর্নামেন্টে খেলতে আসা দুই অতিথি দলের একটা—যুক্তরাষ্ট্র। ম্যাচের আগে আর্জেন্টিনা জানত, দ্বিতীয় রাউন্ডে যাওয়া নিশ্চিত। তাই সিমিওনে, জানেত্তি, বালবো, ওর্তেগাসহ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়কে বসিয়ে রেখেছিলেন কোচ দানিয়েল পাসারেলা।

ওদিকে ম্যাচের আগে রবার্তো আয়ালা জানালেন, যুক্তরাষ্ট্রের খেলোয়াড়দের তিনি চেনেন না। ব্যস, আর যায় কোথায়! শিরোপাধারীদের এহেন অবজ্ঞা বড্ড গায়ে লাগল যুক্তরাষ্ট্রের। আর্জেন্টিনাকে ৩-০ গোলে হারাল তো বটেই, ঠেলে দিল পয়েন্ট তালিকার দ্বিতীয় স্থানে, আর তাতেই বিপদে পড়ল আকাশি-সাদারা। গ্রুপের শীর্ষে থাকলে যেখানে অপেক্ষাকৃত দুর্বল মেক্সিকোর সঙ্গে দ্বিতীয় রাউন্ডে দেখা হতো, রানার্সআপ হওয়ার কারণে দ্বিতীয় রাউন্ডেই সদ্য বিশ্বকাপজয়ী ব্রাজিলের মুখোমুখি হতে হলো বাতিস্তুতাদের। পেনাল্টি শুটআউটে আরেকবার ভাঙল আর্জেন্টাইনদের হৃদয়। ফাইনালে ব্রাজিলকে পেনাল্টিতে হারিয়ে টুর্নামেন্টের শ্রেষ্ঠ দল হিসেবে আবারও আর্জেন্টিনার পাশে বসল উরুগুয়ে।

বিজ্ঞাপন

১৯৯৫ সালে এটা ছিল বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় আর্জেন্টিনার দ্বিতীয় ব্যর্থতা। বছরের শুরুতে ইউরোজয়ী ডেনমার্কের কাছে কনফেডারেশনস কাপের (তৎকালীন কিংস ফাহাদ কাপ) ফাইনালে হেরেছিল তারা।

১৯৯৭ সালে আবারও মহাদেশীয় শ্রেষ্ঠত্বের লড়াই। উরুগুয়ের কাছ থেকে কোপা-শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট ছিনিয়ে নিতে দেশের ক্লাবে খেলা খেলোয়াড়দের দিকেই বেশি নির্ভর করলেন পাসারেলা। ফলে দলে জায়গা হলো না বাতিস্তুতা, সিমিওনে, জানেত্তি, ওর্তেগা কিংবা রেদোন্দোদের। পরীক্ষা-নিরীক্ষার ফল ভালো হলো না তেমন। পেরুর কাছে দ্বিতীয় রাউন্ডে হারা আর্জেন্টিনা শিরোপা নিতে দেখল ব্রাজিলিয়ানদের, দেখল রোনালদো নাজারিও নামের এক দুর্দান্ত স্ট্রাইকারের একাধিপত্য।

default-image

দলের নিয়মনীতি না মানার দায়ে বহুদিন দলে বাতিস্তুতাকে ডাকেননি পাসারেলা। পরে দলের স্বার্থেই ১৯৯৮ বিশ্বকাপের আগে ঝামেলা মিটমাট করে ফেলেন দলের সবচেয়ে বড় তারকার সঙ্গে। বাতিস্তুতা, সিমিওনে, ওর্তেগা, জানেত্তিদের সঙ্গে এবার যুক্ত হলেন ভেরন, লোপেজরা। রক্ষণ, মাঝমাঠ, আক্রমণভাগ—সব দিক মিলিয়ে আর্জেন্টিনা তখন বেশ ভারসাম্যপূর্ণ এক দল। গ্রুপ পর্বে জাপান, জ্যামাইকা, ক্রোয়েশিয়াদের বিপক্ষে দুর্দান্ত প্রতাপ দেখিয়ে পূর্ণ ৯ পয়েন্ট নিয়ে দ্বিতীয় রাউন্ডে উঠল আর্জেন্টাইনরা। প্রতিপক্ষ বেকহাম-ওয়েনদের ইংল্যান্ড। পেনাল্টিতে সে দফায় রক্ষা পেলেও দুর্দান্ত ডাচদের আর আটকাতে পারলেন না সিমিওনে-বাতিস্তুতারা। ৯০ মিনিটে দুর্দান্ত এক গোল করে আর্জেন্টাইনদের বিশ্বকাপ-স্বপ্ন আরেকবারের মতো ভেঙে দিলেন ডেনিস বার্গক্যাম্প।

পরের বছরেই আবারও কোপার ডামাডোল। আর্জেন্টিনার স্বপ্নসারথি হয়ে তত দিনে দলে এসে গেছেন হুয়ান রোমান রিকেলমে। বাতিস্তুতা না থাকলেও, রিকেলমে সঙ্গী হিসেবে পেয়েছিলেন ভেরন, জানেত্তি, স্যামুয়েলদের। আর্জেন্টাইনরা আগের কোপাগুলোর মতো এই কোপার গ্রুপ পর্বেও অধারাবাহিকতা বজায় রাখল। ইকুয়েডর, উরুগুয়েকে হারানোর পর কলম্বিয়ার কাছে হারল। যে এক হার পরের রাউন্ডে তাদের আবারও ফেলল ব্রাজিলের সামনে। রোনালদো-রিভালদোর ‘দৌরাত্ম্যে’ সেবারও কোয়ার্টার থেকেই বিদায় নিল আর্জেন্টিনা। কলম্বিয়ার সন্ত্রাসবাদীদের কাছ থেকে মৃত্যুর হুমকি পাচ্ছেন খেলোয়াড়েরা, এমন কারণ দেখিয়ে পরের আসরে খেললই না আর্জেন্টিনা। দেশের মাটিতে প্রথম শিরোপা জিতল কলম্বিয়া।

বিশ্বজয়ের শেষ চেষ্টার স্বপ্ন চোখে এঁকে কোরিয়া-জাপানে পাড়ি জমালেন বাতিস্তুতারা, ২০০২ সালে। তত দিনে বয়স হয়ে গেছে ৩৩। পচেত্তিনো, আইমার, ওর্তেগা, ভেরনদের কাঁধে চড়ে বিশ্বকাপ জিতেই ক্যারিয়ার শেষ করবেন—ঘোষণা দিলেন এই কিংবদন্তি স্ট্রাইকার। বেঞ্চে মার্সেলো বিয়েলসার মতো ক্ষুরধার মস্তিষ্কের কোচ। প্রথম ম্যাচে নাইজেরিয়াকে আর্জেন্টিনা হারাল ওই বাতিস্তুতার গোলেই। কিন্তু ঝামেলা বাধল বাকি দুই ম্যাচে। ‘মৃত্যুকূপ’ গ্রুপের বাকি দুই দল সুইডেন আর ইংল্যান্ড জিততে দিল না আকাশি-সাদাদের। কান্নাভেজা চোখে গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নিলেন এই স্ট্রাইকার।

default-image

বাতিস্তুতা, সিমিওনেদের সময় শেষ হওয়ার পর আর্জেন্টিনা তত দিনে ঢুকে গেছে নতুন এক যুগে। দলে তখন কার্লোস তেভেজ, হাভিয়ের মাচেরানোদের তরুণ রক্ত এসে গেছে। ২০০৪ কোপায় তেভেজ, কিলি গঞ্জালেসদের দাপটে ফাইনাল পর্যন্ত উঠল আর্জেন্টিনা, ১৯৯৫ সালের সেই কনফেডারেশনস কাপের পর এই প্রথমবার। ফাইনালে উঠলেও, পরিচিত শত্রু ব্রাজিলে কাটা পড়ল তারা। গ্যাব্রিয়েল হাইন্স ও আন্দ্রেস ডি’অ্যালেসান্দ্রোদের পেনাল্টি মিস সুযোগ করে দিল ব্রাজিলিয়ানদের আরেকটি শিরোপা হাতে উল্লাস করার।

রানার্সআপ হলেও, দলের জয়ক্ষুধা দেখে আর্জেন্টাইন সমর্থকেরা আবারও আশায় বুক বাঁধলেন। হাজার হোক, এত দিন পর ফাইনাল পর্যন্ত ওঠা গেছে যেহেতু, শিরোপাও আর বেশি দূরে নেই! তত দিনে দলে চলে এসেছেন লিওনেল মেসি নামের এক বিস্ময়বালক। তেভেজ, ক্রেসপো, জানেত্তি, মাচেরানো, হাইন্স, ক্যাম্বিয়াসো, রদ্রিগেজ, রিকেলমে, আইমার, সাভিওলাদের সঙ্গে মেসি—আকাশি–সাদা শিবির তখন রীতিমতো তারার হাট! কোচ হোসে পেকারম্যানও খেলানো শুরু করলেন কার্যকরী ফুটবল। গ্রুপ পর্বে নেদারল্যান্ডস, আইভরি কোস্ট, সার্বিয়া-মন্টেনেগ্রো ও দ্বিতীয় রাউন্ডে মেক্সিকোকে টপকে কোয়ার্টারে আর্জেন্টিনা মুখোমুখি হলো জার্মানির। কিন্তু ওই যে, সেই পেনাল্টি-হতাশা! আগেরবার কেঁদেছিলেন বাতিস্তুতা, এবার চোখের পানি ফেলে তাঁকে মনে করিয়ে দিলেন ক্যাম্বিয়াসো। আর তাতে একটা বৈশ্বিক শিরোপার জন্য আর্জেন্টিনার হাহাকার বাড়ল।

টানা দুবার পেনাল্টিতে স্বপ্নের ভাঙন দেখতে দেখতে বিরক্ত মেসি-তেভেজরা এবার প্রথম থেকেই ৯০ মিনিটে ম্যাচ শেষ করার মিশন নিয়ে নামলেন। ২০০৭ কোপায় প্রথম থেকেই মারকুটে আর্জেন্টিনা। হারের হতাশা নেই, নেই ড্রয়ের বিরক্তি। একে একে যুক্তরাষ্ট্র, কলম্বিয়া ও প্যারাগুয়েকে হারিয়ে পূর্ণ ৯ পয়েন্ট নিয়ে নকআউট পর্বে উঠল আর্জেন্টিনা। কোয়ার্টারে পেরু, সেমিতে মেক্সিকোকেও উড়িয়ে দিল মেসি-রিকেলমের বিক্রমে। এবার আর্জেন্টিনার ট্রফি–খরা মিটবেই, খেলোয়াড়দের নামের ওজন তো বটেই, তারকাদের আগুনে ফর্ম দেখেও মোটামুটি সবাই নিশ্চিত। ওদিকে ২০০৬ বিশ্বকাপের পর রোনালদো, রোনালদিনিওদের হারিয়ে ব্রাজিলও তখন ভাঙা হাট। ছিলেন না কাকাও। রবিনিও-আদ্রিয়ানোদের নিয়ে ফাইনালে ওঠা ভঙ্গুর ব্রাজিলকে হারানো আর্জেন্টিনার জন্য ছেলেখেলা, অনেকেই মনে করলেন। কিন্তু কাগজে-কলমে যে জয়ী-পরাজয়ী নির্ধারিত হয় না ফুটবলে, মাঠের খেলায় হয়—তার পাঠ আরেকবার সবাইকে দিল ব্রাজিল। গোটা টুর্নামেন্টে অজেয় আর্জেন্টিনা ভেঙে পড়ল ফাইনালে, হারল ৩-০ গোলে। আরেকবার মেসিরা ফিরলেন খালি হাতে।

বিজ্ঞাপন
default-image

দলের এই হতোদ্যম অবস্থা দেখে এবার আটঘাট বেঁধে ফিরলেন ডিয়েগো ম্যারাডোনা। না, খেলোয়াড় হিসেবে নয়, এবার তাঁর ভূমিকা কোচের। ইতিহাসের সবচেয়ে বড় কিংবদন্তি ডাগআউটে, আর বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড় তারকা মাঠে—এই যুগলবন্দীতেই আসবে শিরোপা; এমন রোমান্টিকতায় ভুগতে শুরু করল আর্জেন্টিনা-ভক্তরা। কিন্তু স্বপ্নের আকাশে উড়তে থাকা আর্জেন্টাইনদের বাস্তবতার পাঠ দিল ‘যান্ত্রিক’ জার্মানরা। কোয়ার্টার ফাইনালে আর্জেন্টিনার জালে এক হালি গোল ঢুকিয়ে বুঝিয়ে দিল, শুধু নামের ওজনে নয়, বিশ্বকাপ জেতার জন্য দরকার হয় অব্যর্থ পরিকল্পনার।

কিছুতেই কিছু হচ্ছে না, এমন ভেবে তত দিনে হয়তো হতাশ হয়ে গিয়েছিলেন তেভেজ-মেসিরা। যার প্রভাব পড়ল ২০১১ কোপায়। ধুঁকতে ধুঁকতে কোয়ার্টারে ওঠা আর্জেন্টিনার ‘ঘাতক’ হিসেবে আবারও আবির্ভূত হলো পেনাল্টি শুটআউট। তবে এবার ব্রাজিল নয়, আর্জেন্টিনাকে আটকে দিল সুয়ারেজ-ফোরলানদের উরুগুয়ে। সেবার ইতিহাসের ১৫তম শিরোপা জিতে কোপার সবচেয়ে সফলতম দল হিসেবে আবির্ভূত হয়ে মেসিদের আক্ষেপ আরেকটু বাড়িয়ে দিলেন সুয়ারেজরা। পরের দুই কোপাতেও একই কাহিনি। টুর্নামেন্টে ভালো খেলে ফাইনালে ওঠা, ফাইনালে সেই পেনাল্টিতে আটকে যাওয়া। ২০১৬ সালের ফাইনালে যে পেনাল্টিতে হারার মতো আবেগে অবসরই নিয়ে নিয়েছিলেন মেসি!

ওদিকে অতীতের সব ভুল শোধরানোর প্রত্যয় নিয়ে ২০১৪ বিশ্বকাপটা খেলতে এসেছিল আর্জেন্টিনা। দল বেশি মেসিনির্ভর, মেসি ছাড়া দলকে তুলে ধরার কেউ নেই, দল হিসেবে খেলতে পারে না আর্জেন্টিনা—নিন্দুকদের এমন সব অভিযোগ বন্ধ করার প্রত্যয় নিয়ে খেলতে নামা আলেহান্দ্রো সাবেয়ার আর্জেন্টিনা ফাইনাল পর্যন্ত উঠেই গিয়েছিল। শেষমেশ জার্মান-যান্ত্রিকতায় যতি পড়ে সে যাত্রায়। ২০১৮–তে কিলিয়ান এমবাপ্পে নামের এক কিশোরের বিশ্বজয়ী দৌড়ের সামনে উড়ে গেছে আর্জেন্টিনা।
গত ১০ হাজার দিনে মোটামুটি এই-ই আর্জেন্টিনার খতিয়ান। যাতে সাফল্যের ভাঁড়ারে শুধুই শূন্য। আগামী কোপায় বা বিশ্বকাপে এই শূন্যতা ঘুচবে? অপেক্ষা করা ছাড়া উপায় নেই!

মন্তব্য পড়ুন 0