ইতালি যে পূর্বসূরিদের মতো খেলছে না, এ নিয়ে এর মধ্যেই এন্তার কথা হয়েছে। রবার্তো মানচিনির এ ইতালি শুধু রক্ষণ সামলাতেই জানে না, মাঝমাঠ নিয়ন্ত্রণে রেখে সৃষ্টিশীল সব আক্রমণ করতেও জানে। ফাইনালেও এর ব্যতিক্রম হবে না। কোচ মানচিনির পছন্দের ছক ৪-৩-৩; ফাইনালেও এই ছকেই খেলতে দেখা যাবে ‘আজ্জুরি’দের।
দুর্ভাগ্য, ২০১২ ইউরো ফাইনালের পর দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে খেলতে পারবেন না লিওনার্দো স্পিনাৎসোলা। আক্রমণাত্মক লেফটব্যাকদের খেলা কেমন হওয়া উচিত, ডেনমার্কের জোয়াকিম মেয়লে, জার্মানির রবিন গোসেনস, ইংল্যান্ডের লুক শ ও সুইজারল্যান্ডের স্টিভেন জুবেরের পাশাপাশি তিনিও এই ইউরোতে ফুটবলপ্রেমীদের দেখিয়েছেন নতুন করে। স্পিনাৎসোলা না থাকায় গত ম্যাচের মতো এ ম্যাচেও মাঠে নামবেন চেলসির এমারসন। তবে সেমিতেই বোঝা গেছে, স্পিনাৎসোলার মতো সমানতালে আক্রমণ ও রক্ষণ করার ক্ষমতা তাঁর ঠিক নেই। আর এ জায়গাতেই ইংল্যান্ড সুবিধা পেয়ে যেতে পারে। সে প্রসঙ্গে একটু পরে আসা হবে।
সেন্টারব্যাক হিসেবে যথারীতি থাকবেন দুই পোড়খাওয়া যোদ্ধা—দলের অধিনায়ক জর্জো কিয়েল্লিনি ও লিওনার্দো বোনুচ্চি। প্রথাগত ডিফেন্ডার হিসেবে দুজনের জুড়ি মেলা ভার। কিন্তু ওই যে, বয়স হয়ে গেলে যা হয়, গতিশীল ফরোয়ার্ডদের থামাতে বেশ বেগ পেতে হচ্ছে দুজনকে। তুরস্কের বুরাক ইলমাজ, ওয়েলসের কিফার মুর, সুইজারল্যান্ডের হারিস সেফেরোভিচ, বেলজিয়ামের রোমেলু লুকাকুকে যে কারণে আটকাতে সমস্যা না হলেও অস্ট্রিয়ার মার্কো আরনাউতোভিচ, স্পেনের দানি ওলমো ও ফেরান তোরেসের মতো অপেক্ষাকৃত গতিশীল ফরোয়ার্ডদের সামলাতে বেশ কষ্টই হয়েছে দুজনের।
রাইটব্যাক হিসেবে জোভান্নি দি লরেঞ্জো মূলত সেন্টারব্যাক, যে কারণে প্রথাগত উইংব্যাকের মতো পেছন থেকে সামনে বল এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার কাজটা অত ভালো করতে পারেন না। কিন্তু কিয়েল্লিনি-বোনুচ্চির তুলনায় মোটামুটি গতিশীল হওয়ায় বাকি দুজনের গতির ঘাটতি পুষিয়ে দিতে পারেন, বিপজ্জনকভাবে ভেতরে ঢুকে যাওয়া প্রতিপক্ষ ফরোয়ার্ডকে ধরে ফেলতে পারেন গতি দিয়ে। কিন্তু কিয়েল্লিনি-বোনুচ্চির মতো মার্কিংয়ে অত ভালো নন নাপোলির এই ডিফেন্ডার। তাও কোচ যখন যে পজিশনে বলছেন, সে পজিশনে বেশ ভালোই খেলা দেখাচ্ছেন, এমনকি সেমিফাইনালে এমারসন যখন ভালো খেলছিলেন না, তখন তাঁকে উঠিয়ে দি লরেঞ্জোকে রক্ষণভাগের বাঁ দিকে নিয়ে আসা হয়। সেখানেও বেশ ভালোই খেলেছেন ২৭ বছর বয়সী এই ডিফেন্ডার, যদিও এটা তাঁর মূল পজিশন নয়।
টুর্নামেন্টে মানের দিক দিয়ে স্পেনের পাশাপাশি যে দল মাঝমাঠে টক্কর দিতে পারে, সেটা ইতালির। রক্ষণাত্মক মিডফিল্ডার হিসেবে জর্জিনিও, তাঁর একটু বাঁয়ে মার্কো ভেরাত্তি ও ডানে নিকোলো বারেল্লা—তিনজনের কাজ তিন রকম। জর্জিনিওর কাজ পেছন থেকে আক্রমণভাগে নিখুঁত পাস পাঠানো। প্রতিপক্ষকে প্রেস করা বা বল কেড়ে নেওয়ার দিক দিয়ে জর্জিনিও অত ভালো নয়। এ কাজে মূলত সাহায্য করেন ভেরাত্তি। একই সঙ্গে আক্রমণভাগে বল পাঠানোর কাজটাও করেন। ওদিকে বারেল্লার কাজটা মূলত রাইট উইঙ্গারের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে সময়–সুযোগমতো ওপরে উঠে যাওয়ার। বল ইতালির পায়ে থাকলে রক্ষণভাগ থেকে লেফটব্যাক আর মাঝমাঠ থেকে বারেল্লা উঠে গিয়ে ইতালির ছক অনেকটা ৩-২-৫ করে ফেলেন। কিন্তু বল যখন পায়ে থাকে না, তখন চিরায়ত ইতালির মতো সবাই নিচে নেমে অনেকটা ৪-৫-১ ছকে রক্ষণে খেলে থাকেন। সেমিফাইনালের দ্বিতীয়ার্ধে যে ব্যাপারটা দেখা গেছে।
আক্রমণভাগে মূল স্ট্রাইকার চিরো ইম্মোবিলের দুই পাশে ফেদেরিকো কিয়েসা (ডান) ও লরেঞ্জো ইনসিনিয়ার (বাঁ) জায়গা পাকা। লেফটব্যাক আক্রমণ করতে উঠে গেলে ইনসিনিয়া অনেকটা ভেতরে চলে আসেন, ডান পা দিয়ে গোল বরাবর শট নিতে চান। স্বাধীন ভূমিকায় তাঁকে খেলান কোচ মানচিনি। ওদিকে বক্সে সরাসরি ঢুকে যাওয়ার প্রবণতা কিয়েসাকেও করে তুলেছে মারাত্মক। মূল স্ট্রাইকার হিসেবে ইম্মোবিলে প্রথম দুই ম্যাচে গোল পেলেও পরে সেই ফর্ম আর দেখা যায়নি, ফাইনালে ইতিবাচক ফলাফলের জন্য যাঁর গোলের ধারায় ফেরা বেশ জরুরি।
ওদিকে গোলকিপার জিয়ানলুইজি দোন্নারুম্মার ব্যাপারে নতুন করে কোনো কিছু বলার নেই। সদ্যই পিএসজিতে যোগ দেওয়া এই গোলকিপার যে বিশ্বমানের, সেটা এবারও দেখা গেছে। প্রায় সাড়ে ছয় ফুটি এই গোলকিপারের সবচেয়ে বড় শক্তির জায়গা তাঁর শক্তি, উচ্চতা ও পজিশনিং। প্রতিপক্ষ ফরোয়ার্ডরা শট কোন দিকে কীভাবে নিতে পারেন, সেটা আগেই আঁচ করে ফেলতে পারেন। প্রথমে আঁচ করতে যদি না-ও পারেন, সে ক্ষেত্রে একদম শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অপেক্ষা করেন, শট নেওয়ার পর দুর্দান্ত রিফ্লেক্সের সাহায্যে অধিকাংশ সময়েই ঠিক দিকে ঝাঁপ দেন। স্পেনের বিপক্ষে টাইব্রেকারে যে বিষয়টা দেখা গেছে। ফাইনাল যদি টাইব্রেকে গড়ায়, এ জিনিসটা ইতালিকে একটু হলেও এগিয়ে রাখবে।
দোন্নারুম্মার তুলনায় মানের দিক দিয়ে একটু হলেও পিছিয়ে আছেন ইংল্যান্ডের গোলকিপার জর্ডান পিকফোর্ড। এমনিতেই উচ্চতা একটু কম তাঁর, পুরো শরীর ও দুহাত প্রসারিত করলে অনেক সময়ই প্রত্যাশিত দূরত্ব পর্যন্ত যেতে পারেন না। খাটো গোলকিপারদের যে কারণে পজিশনিং একটু ভালো হতে হয়, যা উচ্চতার ঘাটতি পুষিয়ে দিতে পারে। পিকফোর্ডের পজিশনিং অতটা ভালো নয়, সঠিক সময়ে সঠিক জায়গায় থাকতে পারেন না অনেক সময়। তবে রিফ্লেক্স ও শট আটকানোর দিক দিয়ে এভারটনের এই গোলকিপার নিঃসন্দেহে বিশ্বমানের। জার্মানির বিপক্ষে লিওন গোরেৎস্কার এক শট, কোয়ার্টার ও সেমিতে বিপজ্জনক আরও বেশ কিছু শট আটকে যার প্রমাণ তিনি এর মধ্যেই দিয়েছেন।
ইতালির যেমন নির্দিষ্ট ছক আছে, ইংল্যান্ডের তেমন নেই। প্রতিপক্ষ বুঝে বুঝে ছক আর একাদশ নির্বাচন করছেন কোচ গ্যারেথ সাউথগেট। ম্যাচের যেকোনো মুহূর্তে সেই ছক বদলে যাচ্ছে, খেলোয়াড় পরিবর্তিত হচ্ছে। যে কারণে গোটা ২০১৮ বিশ্বকাপে ৩-৫-২ ছকে খেলা ইংল্যান্ড এবার ৪-২-৩-১ ছকে খেলা শুরু করলেও দ্বিতীয় রাউন্ডে জার্মানির বিপক্ষে ৩-৪-৩ ছকে খেলেছে ইংল্যান্ড। পরের দুই ম্যাচে আবারও ৪-২-৩-১ ছকে খেলেছে। একাদশে এক অধিনায়ক হ্যারি কেইন, সেন্টারব্যাক হ্যারি ম্যাগুয়ার আর গোলকিপার পিকফোর্ড ছাড়া কারও জায়গায় তেমন নিশ্চিত নয়। গত দুই রাউন্ডে ইংল্যান্ড যেমন দুর্দান্ত খেলেছে, সে হিসেবে বলা যেতে পারে, ফাইনালেও ৪-২-৩-১ ছকেই খেলতে পারে তারা। সেমিতে ডেনমার্ককে হারানোর অন্যতম কৌশল ছিল তাদের লেফট উইংব্যাক জোয়াকিম মেয়লেকে ক্রমাগত আক্রমণ করা। মেয়লে যেহেতু আক্রমণ করার জন্য বারবার ওপরে উঠে আসেন, তাঁর পেছনে ফেলে আসা ফাঁকা জায়গাটুকুর সদ্ব্যবহার করা। যে কারণে প্রথমার্ধে গতিশীল বুকায়ো সাকা ও পরে রাহিম স্টার্লিং ওই উইংয়ে মেয়লে ও তাঁর পাশে থাকা সেন্টারব্যাক ইয়ানিক ভেস্টারগার্ডের মাঝের জায়গায় ত্রাস ছড়িয়েছেন, দুটো গোলই এসেছে ওই জায়গা থেকে আসা আক্রমণের মাধ্যমে।
ইতালির লেফটব্যাক হিসেবে যেহেতু স্পিনাৎসোলা নেই, তাঁর বিকল্প হিসেবে খেলা এমারসন যেহেতু এখনো তেমন পারফরম্যান্স দেখাতে পারেননি, সাউথগেট যদি একই কৌশল ফাইনালেও খাটাতে চান, দোষ দেওয়া যাবে না। ইংল্যান্ড ৪-২-৩-১ ছকে খেলালে মূল স্ট্রাইকার কেইনের পাশে রাইট উইঙ্গার হিসেবে তাই এমন একজন খেলবেন, যিনি বেশ গতিশীল ও প্রতিপক্ষ রক্ষণে ফাঁকা জায়গাগুলোতে ত্রাস সৃষ্টি করতে পারেন। যে কারণে সাকা বা জেডন সানচোকে দেখা যেতে পারে এখানে। ডান দিকে যথারীতি রহিম স্টার্লিং থাকবেন। অন্য আক্রমণাত্মক মিডফিল্ডারদের মতো প্রেস করতে পারেন না কিন্তু দুর্দান্ত ড্রিবলিং করতে পারলেও মূল একাদশে জায়গা হবে না জ্যাক গ্রিলিশের। ম্যাচের শেষ দিকে তাঁকে নামানো হতে পারে, সে ক্ষেত্রে তাঁকে জায়গা করে দিতে ডান দিকে চলে আসবেন স্টার্লিং। দুই উইঙ্গারের গতির পূর্ণ সদ্ব্যবহার করতে প্রায়ই কেইনকে নিচে নেমে অনেকটা প্লেমেকারের ভূমিকায় দেখা যাবে।
ওদিকে আক্রমণাত্মক মিডফিল্ডার হিসেবে খেলার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি ম্যাসন মাউন্টের। খেলা গড়ে দেওয়া তো বটেই, ক্লাব-সতীর্থ জর্জিনিও যেন বল পায়ে বেশিক্ষণ না থাকতে পারেন, প্রেস করে সেটা নিশ্চিত করার দায়িত্ব থাকবে তাঁর ওপর। দুই সেন্ট্রাল মিডফিল্ডার হিসেবে এখন পর্যন্ত ডেকলান রাইস ও ক্যালভিন ফিলিপসকে খেলানো হলেও মাঝেমধ্যেই রাইস দেখিয়েছেন, চাপে একটু হলেও ভেঙে পড়েন। ইতালির বিশ্বমানের মাঝমাঠের বিরুদ্ধে যে কাজটা একদমই করা উচিত হবে না। সে হিসেবে ফাইনালে লিভারপুল অধিনায়ক জর্ডান হেন্ডারসনকেও চাইলে নামিয়ে দিতে পারেন সাউথগেট। তবে যাঁকেই নামানো হোক না কেন, মাঝমাঠে সৃষ্টিশীলতার দিক দিয়ে ইংল্যান্ড পিছিয়েই থাকবে।
রক্ষণভাগে অন্যান্য ম্যাচের মতো কাইল ওয়াকার (রাইটব্যাক), জন স্টোনস, হ্যারি ম্যাগুয়ার ও লুক শয়ের (লেফটব্যাক) থাকার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি। ম্যাগুয়ারকে এ ইউরোর সেরা সেন্টারব্যাক বললেও ভুল বলা হবে না। সেটা রক্ষণ করার দিক দিয়ে তো বটেই, পেছন থেকে নিখুঁত পাস দিয়ে আক্রমণ গড়ে তোলা বা সেটপিসে আক্রমণ করার দিক দিয়েও। বাঁ দিক দিয়ে স্টার্লিংয়ের সঙ্গে লেফটব্যাক শয়ের রসায়নের দিকে খেয়াল রাখতে হবে ইতালিকে।
সব মিলিয়ে আকর্ষণীয় এক কৌশলগত লড়াই-ই অপেক্ষা করছে ইউরোর ফাইনালে!