নেইমারও আলাদা নন। বিশ্ব (বিশ্বকাপ) হয়তো জেতা হয়নি। কিন্তু ক্লাব ফুটবলে ইউরোপ চষে বেড়াচ্ছেন। পেলে-ম্যারাডোনার যা জেতা হয়নি, সেই চ্যাম্পিয়নস লিগের দেখাও মিলেছে। কিন্তু নিজ আঙিনার শিশিরবিন্দু অধরাই থেকে গেছে।

নেইমার এখন সেই শিশিরবিন্দুর খোঁজে। নেইমার এখন সেই শিশিরবিন্দু থেকে এক ধাপ দূরে!

বলা বাহুল্য, এই শিশিরবিন্দু মহাদেশীয় শ্রেষ্ঠত্বের কোপা আমেরিকা। বলা বাহুল্য যে শিরোপাটার নিষ্পত্তির শেষ লড়াইয়ে নেইমারের মুখোমুখি অবস্থানে থাকবেন তাঁরই বন্ধু লিওনেল মেসি। হ্যাঁ, মেসিও শুধু বিশ্ব ছাড়া সব জিতেও নেইমারের মতো সেই শিশিরবিন্দুর প্রথম স্পর্শের অপেক্ষায়।

নচিকেতার সেই ‘অনির্বাণ’ গানের মতো, দুই বন্ধু মুখোমুখি দাঁড়িয়ে যুযুধান শেষে কাউকে বলতে হবে, ‘এখন তো সুখেই আছিস’ (প্রথম বড় আন্তর্জাতিক শিরোপা জয়ের পর তো তাই হওয়ার কথা)। নেইমার জিতলে মেসি অনির্বাণের মতো এ কথাটাও জুড়ে দিতে পারেন, ‘এখন তো তোর নাম হয়ে গেছে। সুখেই আছিস!’

নেইমারের ঝুলিতে আছে ফিফা কনফেডারেশনস কাপ। কিন্তু বড় আন্তর্জাতিক শিরোপার মাপকাঠিতে কোপার মাধুর্যের কাছে কনফেডারেশনস কাপের আবেদন সামান্যই, সে যতই মহাদেশীয় চ্যাম্পিয়নরা লড়াই করুক।

আন্তর্জাতিক ময়দানে যত টুর্নামেন্ট টিকে আছে, সেগুলোর মধ্যে কোপা আমেরিকাই প্রাচীনতম। ইউরোর ঝরনাধারার তুলনায় কোপা যতই শিশিরবিন্দু হোক না কেন, নিজ ‘ঘর’–এর ঐতিহ্য ও পরম্পরার শেষ লড়াইয়ে নেইমার তাই চেয়েছিলেন সেরা প্রতিদ্বন্দ্বীকে; সেমিফাইনাল জিতে সরাসরি বলেছিলেন, ফাইনালে আর্জেন্টিনাকে চাই।

তখন বন্ধুত্বের মোড়কে বলা তাঁর কথাগুলোর পেছনে কি গোপন এক বোঝাপড়াও ছিল?

পেরুর বিপক্ষে সেমিফাইনালের আগে নেইমারকে ধুয়ে দিয়েছিলেন এক আর্জেন্টাইন। নাম তাঁর অস্কার রুগেরি, ক্যারিয়ারজুড়ে কড়া সব ট্যাকলিংয়ের জন্য সুখ্যাতি-কুখ্যাতি—দুটোই কুড়োনো ’৮৬ বিশ্বকাপে ম্যারাডোনা-সতীর্থ।

গ্রুপ পর্বে পেরুর বিপক্ষে ব্রাজিলের ৪–০ গোলের জয়ের ম্যাচে নেইমারের বিরুদ্ধে দেখনদারি ফুটবল খেলার অভিযোগ তুলে রুগেরি বলেছিলেন, ‘আমি মাঠে থাকলে লাথি মেরে বের করে দিতাম। প্রতিপক্ষ ধ্বংস হয়ে গেছে, খেলায়ও আর পাওয়ার কিছু নেই; এমন পরিস্থিতিতে কেউ ওসব করে না। হ্যাঁ, সে (নেইমার) আলাদা, কিন্তু মেসির মতো নয়।’

রুগেরি পেরু কোচ রিকার্ডো গারেকার বন্ধু। বন্ধুত্বের টান থেকেও কথাটা বলতে পারেন। নেইমার যেমন বন্ধুত্বের টান থেকে ফাইনালে মেসিকে চেয়ে পেয়েও গেলেন। এখন সেমির ম্যাচটা স্মরণ করা যাক। ব্রাজিলের জয়ের ব্যবধান ১–০।

কিন্তু নেইমার সেমিতে যেমন খেললেন, তা যেন রুগেরির কথার জবাব! তিতের এই ব্রাজিল ‘জোগো বনিতো’ খেলে না, এমনকি ২০০৬ সালের পর এ সময়ের মধ্যে ব্রাজিলের খেলায় কবে সেই ছন্দবদ্ধ পদ্য ঝরেছে, তা–ও গবেষণার বিষয়।

কিন্তু এই দলের খেলায় ব্রাজিলিয়ান ‘পদ্য’ ঝরানোর মতো কেউ থাকলে সেটা নেইমারই। তিনি যেন অর্কেস্ট্রা দলের ‘কন্ডাক্টর’—বাকিরা বাজিয়ে কিংবা কবিতার প্রথম পঙ্‌ক্তি, শেষটা বাকিদের ছন্দবদ্ধ খেলার সুরে। উদাহরণ সেমিতে ব্রাজিলের গোলটি। বাঁ প্রান্তে তিন ডিফেন্ডারকে প্রথাগত ব্রাজিলিয়ান ড্রিবলিংয়ে ব্যস্ত রেখে ফাঁকা করেন ডান পাশে পাস দেওয়ার ‘চ্যানেল’। সরু জায়গা দিয়ে বলটা স্রেফ দেওয়ার পর লুকাস পাকেতার গোলটা যেন একটি অনুপদ্যের শেষ পঙ্‌ক্তি।

পেরুর রক্তাক্ত হৃদয়ের ক্যানভাসে এমন আরও পঙ্‌ক্তি লেখা হয়েছে সে ম্যাচে।

মুহূর্ত–মুহূর্ত বিরতিতে নেইমার ‘জোগো বনিতো’ শুরুর পর বাকিরাও যোগ দেন। সেমির আগে যে ব্রাজিলকে কখনো ব্যাক–হিল করে ডিফেন্স চিরতে দেখা যায়নি, সেটা করলেন কিনা কাসেমিরোর মতো রক্ষণাত্মক মিডফিল্ডার! কেন?

একটা শরীরে—দল—রক্তের হিল্লোল উঠলে স্পন্দন জাগে সব অঙ্গ–প্রত্যঙ্গে। আর এই হিল্লোল তোলার বার্তাটা আসে মাথা—নেইমার—থেকে। নইলে যে নেইমার সেমির আগে প্রথাগত ব্রাজিলিয়ান ‘স্টেপওভার’ না করে ইনসাইড–আউট ডজে খেললেন, তিনি কেন পেরুর বিপক্ষে সেটা ফিরিয়ে আনবেন? কে জানে, হয়তো রুগেরিকে বোঝাতে—দেখে নাও, এই আমার ঐতিহ্য, আমার পরম্পরা—আদেমির, দিদি, লিওনিদাস, হেলেনো ডি ফ্রেইতাস, গারিঞ্চা, পেলে, রিভেলিনো, জিকো, তোস্তাও, সক্রেটিস, রোমারিও, রোনালদো, দেনিলসন, রোনালদিনিও, কাকা, রবিনিও...এবং আমি।

রক্তে নাচন উঠলে শরীর পূর্বপুরুষের কথা বলবেই! যেভাবে বলেছে ’৫৮, ’৬২, ’৭০ ও ’৯৮–র ব্রাজিল; ঠিক সেভাবেই ঢেউগুলো ফিরে ফিরে আসে।

ছেঁড়া–ছেঁড়া মুহূর্তের মতো করে হলেও এবার সেই ঢেউ জেগেছে। নেইমার ঢেউয়ের ছন্দে ছুটে চলা মাঝি, যাঁর কপালে ব্রাজিলের ইতিহাসে প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে অলিম্পিক, কনফেডারেশনস কাপ ও কোপা জয়ের গৌরবতিলক লাগার অপেক্ষা। আর বিশ্বকাপ? সওয়ারি নিয়ে ২৯ বছর বয়সী মাঝির যাত্রা তো শেষ হয়নি। মাঝি তো এগোচ্ছেন প্রতীক্ষার ঢেউ কেটে।

হ্যাঁ—‘প্রতীক্ষাতে প্রতীক্ষাতে

সূর্য ডোবে রক্তপাতে।’