এ ইউরো ভুলে যেতে পারলেই বাঁচে তুরস্ক

তুরস্কের ভাগ্যে শুধুই হতাশা!ছবি : রয়টার্স

ইউরো বাছাইপর্বে ১০ ম্যাচ খেলে মাত্র তিন গোল হজম। বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ফ্রান্সের বিপক্ষে নেশনস লিগের দুই ম্যাচে চার পয়েন্ট। নেশনস লিগের ফাইনালিস্ট নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে ৪-২ গোলের দুর্দান্ত জয়, বুরাক ইলমাজের হ্যাটট্রিক। এসব অর্জন দেখে ইউরোর আগে অনেকেই টুর্নামেন্টের অন্যতম আন্ডারডগ হিসেবে তুরস্কের নাম বলছিলেন। তুরস্ক তেমন অঘটনের সম্ভাবনাই যে দেখাচ্ছিল!

মুদ্রার উল্টোপিঠ দেখতে ঠিক দশ দিন লাগল দলটার। ইতালি, বেলজিয়াম, ফ্রান্স, পর্তুগাল কিংবা জার্মানির মতো প্রতিষ্ঠিত পরাশক্তিদের বিপক্ষে যে দলটার চমক দেখানোর কথা ছিল, সে দলটা খারাপ পারফরম্যান্সের দিক দিয়ে উল্টো নিজেদেরই চমকে দিয়েছে। সাধারণ ফুটবলপ্রেমীদের তো বটেই।

অধিনায়ক বুরাক ইলমাজ গোটা টুর্নামেন্টেই গোলহীন
ছবি : রয়টার্স

৩ ম্যাচে ৩টি হার। ৮টি গোল খাওয়ার বিপরীতে প্রতিপক্ষের জালে মাত্র একবারই বল পাঠাতে পেরেছে দলটা। পয়েন্টের ঘরে লবডঙ্কা। ২০০২ বিশ্বকাপে যে কোচ তুরস্ককে সেমিফাইনালে তুলেছিলেন, সেই সেনোল গুনেসকে মনে হলো কোচিংয়ের অ-আ-ক-খ জানেন না। সেই অসাধারণ কীর্তির পর গুনেসের নামানুসারে তুর্কি ক্লাব ত্রাবজোনস্পোর নিজেদের মাঠের নাম রেখেছিল। এবার ইউরোতে দেশের এই ‘কীর্তি’র পর ত্রাবজোনস্পোর নিজেদের স্টেডিয়ামের নাম পুনর্বিবেচনা করছে কি না, এখনো জানা যায়নি যদিও।

গ্রুপপর্বে প্রতিপক্ষ ছিল ইতালি, ওয়েলস ও সুইজারল্যান্ড। এক ইতালিকেই ভাবা হচ্ছিল তুরস্কের চেয়ে শক্তিশালী দল। সেই ইতালি প্রত্যাশিতভাবেই তুরস্কের বিপক্ষে জিতেছে, কিন্তু তুরস্ক যেভাবে হেরেছে, দৃষ্টিকটু লেগেছে সেটা। ৩-০ ব্যবধানে জয়ের পথে তুরস্ককে গোলমুখে একটা শটও মারতে দেয়নি আজ্জুরিরা। ওয়েলস-সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষেও একই অবস্থা।

সেনোল গুনেস
ছবি : রয়টার্স

৩৬ বছর বয়সী অধিনায়ক বুরাক ইলমাজ মাত্রই লিলের হয়ে ১৬ গোল করে এসেছেন, নেইমার-এমবাপ্পেদের হাত থেকে লিগ আঁ'র শিরোপা কেড়ে নেওয়ার ব্যাপারে রেখেছেন মুখ্য ভূমিকা। সেই ইলমাজকেই ইউরোতে মনে হলো বড্ড অচেনা। স্বাভাবিকভাবেই বয়স বেড়ে গেলে খেলোয়াড়দের গতি কমে যায়, তখন মাঝমাঠ ও উইং থেকে সাহায্য লাগে। লিলে যে সাহায্যটা ইলমাজকে করে এসেছেন স্বদেশি ইউসুফ ইয়াজিকি ও কানাডার জোনাথান ডেভিড।

দেশের হয়ে খেলতে নেমে সে কাজটাই করতে ভুলে গেলেন ইয়াজিকি। চেঙ্গিজ ইউন্দা, ওজান তুফান কিংবা হাকান চালহানোলুরাও রইলেন নিষ্প্রভ। তিন ম্যাচেই ইলমাজকে মনে হলো বিচ্ছিন্ন দ্বীপের যোগাযোগহীন একমাত্র নাবিক, যার সঙ্গে মাঝমাঠের আড়ি।

সয়ুঞ্জুও কিছু করতে পারেননি
ছবি : রয়টার্স

তবে ইলমাজের আক্রমণভাগ নয়, তুরস্কের শক্তির জায়গা ভাবা হচ্ছিল দলের রক্ষণভাগকে। দলে জুভেন্টাসের মেরিহ দেমিরাল, লেস্টারের চাগলার সয়ুঞ্জু, লিভারপুলের ওজান কাবাক, লিলের জেকি চেলিক আছেন— কাগজে-কলমে যা অত্যন্ত সমীহ জাগায়। কোচ সেনোল গুনেস তিন ম্যাচে বেশি চিন্তা করতে গিয়ে একটা স্থায়ী রক্ষণভাগই গঠন করতে পারেননি।

প্রথম ম্যাচে ইতালির বিপক্ষে দেমিরাল আত্মঘাতী গোল করেছিলেন, কিন্তু খুব বেশি যে খারাপ খেলেছিলেন, বলা যাবে না। দ্বিতীয় ম্যাচে সেই দেমিরালকে বলির পাঁঠা বানিয়ে সয়ুঞ্জুর রক্ষণসঙ্গী বানানো হলো সাসসুয়োলোর কান আয়হানকে, লিভারপুলের কাবাক বেঞ্চে বসেই থাকলেন। অথচ ওয়েলসের দলে আছে সাড়ে ছয়ফুটি স্ট্রাইকার কিফার মুর, প্রথাগত স্ট্রাইকার হিসেবে প্রতিপক্ষ রক্ষণভাগে যন্ত্রণা সৃষ্টি করাই যার কাজ। এমন স্ট্রাইকারের বিপক্ষে দলের সবচেয়ে লম্বা ও শক্তিশালী ডিফেন্ডারকে বসিয়ে রাখার কী মানে, গুনেসের কাছ থেকে সদুত্তর আসেনি।

আয়হানের সঙ্গে আবারও নতুন করে রসায়ন সৃষ্টি করতে গিয়ে স্বভাবতই ঝামেলা হলো সয়ুঞ্জুর, যে সয়ুঞ্জুকে রিয়াল মাদ্রিদের বিদায়ী অধিনায়ক সের্হিও রামোসের উত্তরসূরি হিসেবে দেখছেন অনেকে। ঝামেলার সুযোগটা নিলেন ওয়েলসের বেল-র‍্যামসি। মাঝমাঠ থেকে আসা বেলের চুলচেরা লং বলটার হদিশ যখন তুরস্কের রক্ষণাত্মক মিডফিল্ডার ওকায় ইয়োকুসলু পেলেন, ততক্ষণে র‍্যামসির গোল উদ্‌যাপন শুরু হয়ে গিয়েছে।

ফলাফল? গুনেসের মনে হলো ইয়োকুসলুই রক্ষণে সমস্যা সৃষ্টি করছেন। সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে গতকাল ইয়োকুসলুর জায়গায় আয়হানকে রক্ষণাত্মক মিডফিল্ডার বানিয়ে দেমিরালকে আবারও ফেরানোর হলো সয়ুঞ্জুর পাশে। আবারও তুরস্কের রক্ষণভাগ সন্দিহান হলো নিজেদের ওপর অর্পিত দায়িত্বের ব্যাপারে। যে আয়হান মূলত একজন সেন্টারব্যাক, গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে তাঁকে রক্ষণাত্মক মিডফিল্ডারের ভূমিকা দিলে ভুল হওয়াই স্বাভাবিক। ফলে যা হওয়ার সেটাই হলো।

সুইজারল্যান্ডের জের্দান শাকিরির প্রথম গোলটাই দেখুন, বক্সের বাইরে বল নিয়ন্ত্রণ করার এন্তার সময় পেয়েছিলেন লিভারপুলের উইঙ্গার। সময় পেয়েছিলেন টপ কর্নারে শট নিখুঁত শট নেওয়ার। আয়হান-দেমিরালরা ওই সময়ে একবারও এলেন না শাকিরির পা থেকে বল কেড়ে নেওয়ার জন্য!

বাছাইপর্বে ১০ ম্যাচ খেলে যে দলটা মাত্র তিন গোল হজম করেছে, ‘ওপেন প্লে’ থেকে যার মধ্যে একটা গোলও নেই। আট ম্যাচে গোলহীন থেকেছে তাঁরা। শেষ আট ম্যাচে রক্ষণভাগে একই চারজন ব্যবহার করেছেন গুনেস, এমন হয়েছে মাত্র দুবার। এই সময়ে দল গোল হজম করেছে ১১বার। মূল টুর্নামেন্টে সেই দলের রক্ষণ নিয়ে এত নাড়াচাড়া করলে সমস্যা তো হবেই! দোষটা তাই গুনেসের ওপরেই পড়ে মূলত।

ইউরোর ইতিহাসে প্রথম রাউন্ড থেকে তিন ম্যাচে হেরে বিদায় নিয়েছে এমন উদাহরণ আছে ১১টি। এর মধ্যে শূন্য পয়েন্ট ও -৭ গোল ব্যবধান নিয়ে টুর্নামেন্ট শেষ করা তুরস্কের পারফরম্যান্স শেষ দিক থেকে পাঁচ নম্বর।

দেমিরালরা এই ইউরো ভুলেই যেতে চাইবেন।