বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
default-image

পুরো বছর ভালো খেলে শেষমেশ শিরোপা জেতার ওই এক বাড়তি পদক্ষেপ কখনোই নিতে পারেনি টটেনহাম। কখনো লিগ হেরেছে লেস্টার সিটি-চেলসির কাছে, কখনো চ্যাম্পিয়নস লিগ অধরা থেকে গেছে লিভারপুলের জন্য, কিংবা এফএ কাপের প্রশস্তিও জোটেনি ম্যানচেস্টার সিটির কারণে।


দলকে শিরোপা জেতাতে, খেলোয়াড়দের মধ্যে চ্যাম্পিয়ন মানসিকতা আনতে ড্যানিয়েল লেভি হাত বাড়িয়েছিলেন ইতিহাসের অন্যতম সেরা ম্যানেজার জোসে মরিনিওর দিকে। লাভ হয়নি। মরিনিও যে আর বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় ম্যানেজারদের কাতারে নেই, সেটাই যেন প্রকট হয়ে উঠেছিল ওই দুবছরে। পারফরম্যান্স বিচারে টটেনহামের অগ্রগতি তাই থেমে গিয়েছিল ২০১৯ সালেই।

default-image

আন্তোনিও কন্তে থেকে শুরু করে ইউলিয়ান নাগলসমান, জেনারো গাত্তুসো থেকে শুরু করে এরিক টেন হাগ, ম্যাসিমিলিয়ানো আলেগ্রি থেকে শুরু করে ব্রেন্ডান রজার্স, সাবেক কোচ মরিসিও পচেত্তিনো, গ্রাহাম পটার, পাওলো ফনসেকা; মরিনিও যাওয়ার পর ইউরোপে হেন কোনো ম্যানেজার নেই, যার দিকে টটেনহাম হাত বাড়ায়নি। কিন্তু মরিনিওর ভেঙে যাওয়া ঘর সামলাতে রাজি হননি কেউ। শেষমেশ নুনো এস্পিরিতো সান্তো স্পার্সের দায়িত্ব নিতে রাজি হলেও সবাই মোটামুটি নিশ্চিত ছিলেন, পান থেকে চুন খসলেই বিদায় করে দেওয়া হবে উলভারহ্যাম্পটনের সাবেক এ কোচকে।


সেটাই হয়েছে। বিদায় নিয়েছেন নুনো, আর মাস তিনেক পর হলেও নিজেদের সবচেয়ে পছন্দের ম্যানেজারকে দলের দায়িত্ব দিতে পেরেছেন ড্যানিয়েল লেভি। তবে কন্তেকে যতটা না লেভি পছন্দ করেন, তার চেয়েও বেশি পছন্দ করেন ফাবিও পারাতিচি। ইতালিয়ান এ ভদ্রলোক কয়েক মাস আগেই দায়িত্ব পেয়েছেন টটেনহামের ক্রীড়া পরিচালকের। এর আগে ১১ বছর জুভেন্টাস ম্যানেজমেন্টের অন্যতম সদস্য থাকা এ পরিচালক সামনাসামনি দেখেছেন কন্তে কী করতে পারেন। কন্তেকে যেকোনো মূল্যে টটেনহামে আনার পরিকল্পনার মূলে এই পারাতিচিই ছিলেন।

default-image

বুধবার টটেনহামের ম্যানেজার হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর এর মধ্যেই দলকে এক ম্যাচ কোচিং করিয়ে ফেলেছেন কন্তে। ৩-২ গোলে জেতা সে ম্যাচে কন্তে মোটামুটি বুঝিয়ে দিয়েছেন, দলকে কীভাবে খেলাবেন। এর আগে জুভেন্টাস, চেলসি, ইতালি ও ইন্টারকে যেভাবে খেলিয়েছেন, সেই ৩-৫-২ বা ৩-৪-৩ ছকের প্রাধান্য এবারও যে দেখা যাবে, সেটা মোটামুটি নিশ্চিত। টটেনহামের কোচ হিসেবে প্রথম লিগ ম্যাচে আজ এভারটনের বিপক্ষে খেলবে টটেনহাম। কন্তের অধীনে প্রথম লিগ ম্যাচের আগে তাই অনুমান করা যেতেই পারে, কন্তের টটেনহামের চেহারাটা কেমন হতে পারে।


নুনোর অধীনে টটেনহামের সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল আক্রমণভাগে। হ্যারি কেইনের ফর্ম ছিল না। দলের সবচেয়ে বড় তারকার ফর্মহীনতায় আক্রমণসঙ্গী হিউং মিন সনও জ্বলে উঠতে পারেননি। যে কারণে মাঝমাঠ থেকে বল আক্রমণভাগে গেলেও বক্সে টটেনহাম ফরোয়ার্ডদের অকার্যকারিতার কারণে গোল আসেনি একদম।

default-image

কন্তে আসার পর প্রথম ম্যাচেই টটেনহামের তিন গোল দেওয়া নিশ্চিত করে, নুনোর অধীনে টটেনহামের গোলখরা কাটাতে প্রথম থেকেই কাজ করা শুরু করে দিয়েছেন কন্তে। ৩-৫-২ বা ৩-৪-৩ ছকে কাগজে-কলমে পাঁচ ডিফেন্ডার নিয়ে দলকে খেলান বলে কন্তে যে মরিনিও-ধাঁচের রক্ষণাত্মক ম্যানেজার, সেটা বলা যাবে না মোটেও। আবার রক্ষণের চিন্তা ভুলে মার্সেলো বিয়েলসা (লিডসের ম্যানেজার) বা জেদেনেক জেমানের (রোমার সাবেক ম্যানেজার) মতো শুধু আক্রমণেই তুষ্ট হন না কন্তে। আক্রমণ ও রক্ষণের একটা সমতা দেখা গিয়েছে কন্তের প্রতিটি দলে। এবারও সেটার ব্যতিক্রম হচ্ছে না। আবার তাঁর দলকে প্রতি আক্রমণনির্ভরও বলা যায় না ঠিক। একবার এক অনুষ্ঠানে কিংবদন্তি ইতালিয়ান ম্যানেজার ফাবিও ক্যাপেলো কন্তের দলকে প্রতি আক্রমণনির্ভর বলেছিলেন দেখে কন্তের সে কী রাগ!

default-image

রক্ষণভাগ থেকে শুরু করা যাক। এ পর্যন্ত কন্তের অধীনে মূল গোলকিপার হিসেবে খেলেছেন জিয়ানলুইজি বুফন (জুভেন্টাস, ইতালি), থিবো কোর্তোয়া (চেলসি) ও সামির হানদানোভিচ (ইন্টার মিলান)। প্রত্যেকেরই কিছু গুণ ছিল, যাঁদের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো শট আটকানোর ক্ষমতা ও প্রতিপক্ষের খেলোয়াড় কখন শট নেবেন, সেটা আগে থেকে বুঝে ওই অনুযায়ী অবস্থান নিতে পারা। পেছন থেকে আক্রমণ গড়ে তোলার জন্য ডিফেন্ডারদের ঠিকঠাক পাস দেওয়াও কন্তের গোলকিপারদের অন্যতম একটা গুণ। আজ থেকে কয়েক বছর আগে হলেও প্রতিটা কাজ অনায়াসে করতে পারতেন টটেনহামের মূল গোলকিপার ও অধিনায়ক উগো লরিস। কিন্তু এখন বয়সের কারণে হোক, আর যে কারণেই হোক না কেন, কয়েক বছর আগের সে ধারটা আর দেখা যায় না লরিসের খেলায়।

default-image

৩-৫-২ ছকের তিন সেন্টারব্যাকের মধ্যে একজনের দায়িত্ব হবে পুরোপুরি রক্ষণনির্ভর। পেছন থেকে নিখুঁত পাস দেওয়া বা আক্রমণ গড়ে তোলার দায়িত্ব তাঁর ওপর থাকবে না অতটা। ঠিকঠাক রক্ষণের পাশাপাশি পেছন থেকে বল বের করে এনে মাঝমাঠের সঙ্গে সংযোগ ঘটানোর কাজটা করতে হয় বাকি দুই সেন্টারব্যাককে। যে কাজটা ইতালি ও জুভেন্টাসের হয়ে বেশ ভালোভাবেই করেছেন লিওনার্দো বোনুচ্চি। চেলসির হয়ে করেছেন দাভিদ লুইজ। টটেনহামের হয়ে এ কাজটা করার জন্য আর্জেন্টিনার সেন্টারব্যাক ক্রিস্টিয়ান রোমেরোর ওপর ভরসা করতে পারেন কন্তে। বল পায়ে রেখে খেলতে রোমেরো বেশ স্বচ্ছন্দ।

default-image

সাবেক ক্লাব আতালান্তার হয়েও এই ৩-৪-৩ ছকে দুই রক্ষণসঙ্গী নিয়েই খেলতেন তিনি। কন্তের ছকে অত সমস্যা হওয়ার কথা নয় তাঁর। রোমেরো চাইলে একটু উঠে গিয়ে দলের রক্ষণাত্মক মিডফিল্ডারের সঙ্গেও সংযোগ ঘটাতে পারেন, প্রতিপক্ষের হয়ে যিনি ‘নাম্বার টেন’ কিংবা সংযোগকারী স্ট্রাইকার হিসেবে খেলছেন, তাঁকে চোখে-চোখে রাখতে পারেন। রোমেরো একটু চড়াও হয়ে খেলতে পছন্দ করেন, যে কারণে ভুলও মাঝে মাঝে হয়ে যায়। সে ভুলগুলো কীভাবে কমানো যায়, সেটাই হবে কন্তের লক্ষ্য।

default-image

তিন সেন্টারব্যাকের বাঁ পাশে খেলার জন্য এমন একজন সেন্টারব্যাক দরকার, যিনি বাঁ পায়ে খেলতে স্বচ্ছন্দ। কন্তের জুভেন্টাস আর ইতালির হয়ে নির্ভরযোগ্যতার সঙ্গে যে কাজটা করে গেছেন জর্জো কিয়েল্লিনি, ইন্টারের হয়ে করেছেন আলেক্সান্দার কোলারভ কিংবা আলেসসান্দ্রো বাস্তোনি। চেলসিতে ওই পজিশনে বাঁ পায়ে খেলানোর মতো কোনো সেন্টারব্যাক পাননি কন্তে, কিন্তু ডান পায়ের গ্যারি কাহিল তাঁর পারফরম্যান্সে ওই ঘাটতি বুঝতে দেননি কখনো। টটেনহামে বাঁ পায়ের সেন্টারব্যাক হিসেবে আপাতত ওয়েলশ ডিফেন্ডার বেন ডেভিসকে পাচ্ছেন কন্তে। যদিও মূল একাদশে খেলার জন্য ডেভিস কতটুকু যোগ্য, প্রশ্ন তোলা যেতে পারে।

কন্তের চাহিদা অনুযায়ী ডেভিস খেলতে না পারলে আগামী জানুয়ারিতে বাঁ পায়ের একজন সেন্টারব্যাককে কিনতে পারেন কন্তে। সেটা হতে পারেন এসি মিলানের আলেসসিও রোমানিওলি। শুধু তা–ই নয়, কন্তে এমন একজন সেন্টারব্যাক চাইতে পারেন, যিনি দীর্ঘদেহী ও বাতাসে উড়ে আসা বল/ক্রস সামলাতে পারেন। টটেনহামের এই দলে অমন গুণসম্পন্ন সেন্টারব্যাক নেই বললেই চলে।

default-image

ডান দিকে খেলার জন্য একই রকমভাবে কন্তে এমন একজন সেন্টারব্যাক খেলিয়ে থাকেন, যিনি ডান পায়ে খেলতে স্বচ্ছন্দ। আন্দ্রেয়া বারজাগলি (জুভেন্টাস, ইতালি), সেজার আজপিলিকেতা (চেলসি), মিলান স্ক্রিনিয়ার (ইন্টার মিলান) সবাই এই কাজটাই কন্তের হয়ে করে গেছেন বছরের পর বছর। দুপাশের দুই সেন্টারব্যাককে আবার বেশ গতিশীলও হতে হয়। কারণ, কন্তের খেলানোর ধরন অনুযায়ী দুই উইংব্যাক বেশ আক্রমণাত্মক থাকেন। তাই দুপাশের দুই উইংব্যাক আক্রমণে চলে গেলে দুপাশের দুই সেন্টারব্যাক নিজেদের অবস্থান ও গতিশীলতার মাধ্যমে দুই উইংব্যাকের রক্ষণ-ঘাটতিটা পুষিয়ে দেন। টটেনহামে দাভিনসন সানচেজ কিংবা জ্যাফে তানগাঙ্গারা বেশ গতিশীল। কন্তে এখন তাঁদের ওপর ভরসা রাখেন কি না, সেটাই দেখার বিষয়।

কন্তের দলগুলোয় রাইট উইংব্যাকের দায়িত্ব থাকা স্টেফান লিখস্টাইনার (জুভেন্টাস), আন্তোনিও কানদ্রেভা (ইতালি), আশরাফ হাকিমি (ইন্টার মিলান), ভিক্টর মোজেস আক্রমণে চলে গেলে এই দায়িত্বে থাকতেন ডান দিকের সেন্টারব্যাক বারজাগলি (জুভেন্টাস/ইতালি), স্ক্রিনিয়ার (ইন্টার) ও আজপিলিকেতা (চেলসি)। একই কথা বলা যায় বাঁ দিকের সেন্টারব্যাকদের ক্ষেত্রেও। কাওয়াদো আসামোয়া (জুভেন্টাস), মাত্তেও দারমিয়ান (ইতালি), মার্কোস আলোনসো (চেলসি), ইভান পেরিসিচের (ইন্টার) মতো উইংব্যাকরা আক্রমণে উঠলে সেদিক সামাল দিতেন কিয়েল্লিনি (জুভেন্টাস/ইতালি), ক্যাহিল (চেলসি) কিংবা বাস্তোনিরা (ইন্টার)।

default-image

কন্তের উইংব্যাকদের আক্রমণে কুশলী হওয়ার পাশাপাশি গোটা ম্যাচ একই রকম প্রাণশক্তি নিয়ে ওঠানামা করতে হয়। যে কারণে উইংব্যাক হিসেবে শুধু ডিফেন্ডার নয়, অনেক সময় পেরিসিচ ও মোজেসদের মতো পরিশ্রমী উইঙ্গারদেরও খেলিয়ে থাকেন কন্তে। যাঁরা যন্ত্রের মতো একই গতিতে গোটা ম্যাচে দৌড়ানোর পাশাপাশি নিখুঁত ক্রস করার দিক দিয়েও পটু।

টটেনহামে এ কাজগুলো করার জন্য এমারসন রয়্যাল ও সের্হিও রেগিলনের মতো আদর্শ উইংব্যাক তো আছেনই, আছেন স্টিভেন বের্গভেইনের মতো পরিশ্রমী উইঙ্গারও, যাকে চাইলেই উইংব্যাকের ভূমিকায় খেলাতে পারবেন কন্তে। রায়ান সেসেনিওনের মতো প্রতিভাবান উইংব্যাকও কন্তে আসার কারণে উন্নতি করতে পারেন, এ আশা করাই যায়।

default-image

এবার আসা যাক মাঝমাঠে। কন্তে সাধারণত মাঝমাঠে তিনজন রেখে খেলতে পছন্দ করেন, যাঁদের মধ্যে একজনের ভূমিকা পুরোপুরি রক্ষণাত্মক হয়। তিনজন সেন্টারব্যাকের একটু ওপরে যিনি থাকবেন, ফলে আক্রমণে দলের ছক অনেকটা ৩-১-৬ করে দেবেন। ট্যাকল করা ও বল কেড়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে দুর্দান্ত হতে হবে তাঁকে।

শুধু তা–ই নয়, পেছন থেকে নিখুঁত পাস বা থ্রু বল বের করে সামনে পাঠানো, বল পায়ে রাখার ক্ষেত্রেও ভূমিকা রাখতে হবে। যে কাজটা কন্তের দলগুলোতে করে গেছেন আন্দ্রেয়া পিরলো (জুভেন্টাস), দানিয়েলে দি রসি (ইতালি), সেস ফ্যাব্রিগাস (চেলসি), মার্সেলো ব্রোজোভিচের (ইন্টার) মতো মিডফিল্ডাররা। এই ভূমিকায় খেলানোর জন্য কন্তে টটেনহামে ব্যবহার করতে পারেন ড্যানিশ তারকা পিয়েরে-এমিল হইবিয়াকে। হইবিয়াকে মরিনিও ও নুনোর মতো ম্যানেজাররা পুরোপুরি রক্ষণনির্ভর ফুটবলার হিসেবেই খেলিয়েছেন। ডিফেন্ডারদের আগলে রাখা, প্রতিপক্ষের পা থেকে বল কেড়ে নেওয়া, সেন্টারব্যাক ও ফুলব্যাকের মাঝের জায়গাটায় যেন প্রতিপক্ষ আক্রমণ করতে না পারে সেদিকে খেয়াল রাখা, ট্যাকল করা - ইত্যাদি করিয়েছেন ওই দুই ম্যানেজার। তবে হইবিয়া যে সুযোগ পেলে পেছন থেকে আক্রমণ গড়েও দিতে পারেন, সেটা বুঝিয়েছেন ডেনমার্কের হয়ে, এবারের ইউরোতে। ক্রিস্টিয়ান এরিকসেন অসুস্থ হয়ে দল থেকে ছিটকে যাওয়ার পর এরিকসেনের দায়িত্ব অনেকটাই নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন হইবিয়া, বেশ কয়েকটা গোলে সহযোগিতা করে বুঝিয়েছেন দরকার হলে দলের আক্রমণের কাজেও সাহায্য করতে পারেন তিনি। ফলে কন্তে হইবিয়াকে পুরোপুরি রক্ষণাত্মক মিডফিল্ডার হিসেবে খেলান, না একটু আক্রমণাত্মক, সেটার ওপর নির্ভর করবেন টটেনহামের কৌশল।

default-image

বাকি দুই মিডফিল্ডারদের বল পায়ে রাখার ক্ষেত্রে দক্ষ হতে হবে, আদর্শ বক্স-টু-বক্স মিডফিল্ডারদের মতো ওঠানামা করতে হবে, একটু দেরিতে প্রতিপক্ষের বক্সে ঢুকে সরাসরি আক্রমণে অংশ নিতে হবে। যে কারণে কন্তের মাঝমাঠের বাকি দুই মিডফিল্ডার গোল করাতে পটু হয়ে থাকেন। ক্লদিও মার্কিসিও (জুভেন্টাস/ইতালি), ইমানুয়েলে জাক্কেরিনি (ইতালি), আর্তুরো ভিদাল (জুভেন্টাস/ইন্টার মিলান), পল পগবা (জুভেন্টাস), এনগোলো কান্তে (চেলসি), নিকোলো বারেল্লা/এরিকসেন (ইন্টার মিলান) নিয়মিত গোল করার অভ্যাস গড়ে তুলেছেন কন্তের অধীনেই। তাঙ্গি এনদোম্বেলে ও জিওভান্নি লো চেলসোর মতো মিডফিল্ডাররা কন্তের অধীনে একেকজন ভিদাল-মার্কিসিওতে পরিণত হয়ে গেলে আশ্চর্য হবেন না যেন!

এনদোম্বেলের পেছনে এমনিতেও টটেনহামের খরচ হয়েছে অনেক, সে হিসেবে পচেত্তিনো, মরিনিও ও নুনোর অধীনে তেমন আলো ছড়াতে পারেননি এই ফরাসি মিডফিল্ডার। পেছন থেকে বল নিয়ে ড্রিবল করে সামনে এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে পটু এই মিডফিল্ডার প্রতিভার কারণে কন্তের দলে টিকে যেতে পারেন, এমনটাই মনে হচ্ছে। কন্তে নিজেও ইন্টারের কোচ থাকার সময় এনদোম্বেলেকে দলে আনতে চেয়েছিলেন। তবে গোটা ৯০ মিনিট একই প্রাণশক্তিতে খেলার মতো ক্ষমতা তাঁর নেই। যে কারণে মরিনিওর সঙ্গে তাঁর সম্পর্কেরও অবনতি ঘটেছিল। কন্তের অধীনে খেলতে হলে এই দক্ষতা এনদোম্বেলেকে বাড়াতেই হবে। এনদোম্বেলে বা লো সেলসোরা কন্তের চাহিদা অনুযায়ী খেলতে না পারলে এসি মিলানের ফ্র্যাঙ্ক কেসি, মোনাকোর অরেলিন চুয়ামেনি কিংবা নাপোলির ফ্র্যাঙ্ক অ্যাঙ্গিসার দিকে হাত বাড়াতে পারেন কন্তে।

default-image

ফরোয়ার্ড হিসেবে ৩-৫-২ ছকে খেলবেন দুজন, ৩-৪-৩ ছকে তিনজন। দুজন খেললে দুজন জুটি বেঁধে খেলবেন, তিনজন খেললে একজন বাকি দুজনের চেয়ে অপেক্ষাকৃত বেশি নিচে নেমে অনেকটা আক্রমণাত্মক মিডফিল্ডারের ভূমিকা পালন করবেন। দুর্দান্ত স্ট্রাইক জুটি গড়ে তুলতে কন্তের জুড়ি নেই। এই দুজনের মধ্যে একজনকে হতে হয় দীর্ঘদেহী ও শক্তিশালী। যিনি নিচে নেমে স্ট্রাইক সঙ্গী, একজন মিডফিল্ডার ও দুজন উইংব্যাককে বক্সে উঠে আক্রমণ করতে সাহায্য করবেন, বল ধরে রাখতে পারবেন ও সময় সুযোগমতো ডি-বক্সে থ্রু বল পাঠাতে পারবেন। বাতাসে ভেসে আসা বলগুলোয় হেড করতে পারবেন ভালো।

যে কাজগুলো কন্তের হয়ে করে গেছেন ফার্নান্দো ইয়োরেন্তে/ফাবিও কোয়ালিয়ারেল্লা (জুভেন্টাস), গ্রাৎসিয়ানো পেল্লে (ইতালি), দিয়েগো কস্তা (চেলসি) ও রোমেলু লুকাকু (ইন্টার মিলান)। টটেনহামের হয়ে এ কাজ করার জন্য হ্যারি কেইনের মতো বিশ্বের অন্যতম সেরা স্ট্রাইকারকে পাচ্ছেন কন্তে। অনেকের মতে, কেইন টটেনহামে থাকবেন কি না, এ নিয়ে মৌসুমের শুরুতে অনিশ্চয়তা থাকার কারণে কন্তে তখন টটেনহামে আসতে চাননি। কেইনের ক্লাবে থেকে যাওয়াও কন্তেকে আনার ব্যাপারে ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করছেন অনেকে। কন্তের কাউন্টারপ্রেসিং, দুই উইংব্যাকের অবস্থান ও ভূমিকা, সহকারী স্ট্রাইকারের কার্যকারিতা ও রসায়ন সবকিছুই কেইনকে গোল করার ক্ষেত্রে সহায়তা করবে অনেক।

default-image

আরেক স্ট্রাইকারের ক্ষমতার জায়গা হবে অন্যখানে। শক্তিশালী স্ট্রাইক সঙ্গীর ফেলে আসা জায়গায় গতিশীলতা দিয়ে আক্রমণ করবেন তিনি। ড্রিবলিং ও সুযোগ সৃষ্টি করার ক্ষেত্রে দুর্দান্ত হতে হবে তাঁকে। প্রতিপক্ষ ডিফেন্ডারকে বোকা বানিয়ে ছিটকে ফেলার ক্ষমতা থাকতে হবে। বছরের পর বছর ধরে কন্তের অধীনে যে কাজটা করেছেন কার্লোস তেভেজ/সেবাস্তিয়েন জিওভিঙ্কো/মিরকো ভুচিনিচ (জুভেন্টাস), এদের (ইতালি), এদেন হ্যাজার্ড/পেদ্রো (চেলসি) ও লাওতারো মার্তিনেজ (ইন্টার মিলান)।

এ কাজ করার জন্যও কন্তে পাচ্ছেন বিশ্বের অন্যতম সেরা একজন গতিশীল ফরোয়ার্ডকে, যার নাম হিউং মিন সন। সন আর কেইন যে জুটি বেঁধে প্রতিপক্ষের রক্ষণে কেমন ত্রাস ছড়াতে পারেন, সেটা মরিনিওর অধীনে দেখা গেছে। কন্তের দায়িত্ব দুজনের সেই হারানো ঝলক আবারও ফিরিয়ে আনা।

default-image

ইয়ুর্গেন ক্লপ, টমাস টুখেল, হানসি ফ্লিক কিংবা পেপ গার্দিওলার মতো কন্তের দলগুলো অত বেশি প্রেস করে না। যখন যতটুকু দরকার, ঠিক ততটুকুই প্রেস করে। বল হারিয়ে ফেললে বল আবারও দখলে আনার ব্যাপারে কন্তের দলগুলো অত বেশি তোড়জোড় করে না। যে কারণে প্রতিপক্ষ বল পায়ে রেখে আক্রমণ করার ক্ষেত্রে একটু বেশিই সময় পান। যে কারণে ইতালির ঘরোয়া প্রতিযোগিতাগুলোতে কন্তে চূড়ান্ত সফল হলেও ইউরোপীয় পর্যায়ে কন্তের সাফল্য নেই।

কারণ, ইতালির দলগুলো অত বেশি প্রেস করে খেলে না, ওদিকে ইউরোপের অন্যান্য দেশের দলগুলোর খেলার প্রেসিং থাকেই। প্রিমিয়ার লিগে কন্তে আগেরবার চেলসির হয়ে সফল হলেও, তখন লিভারপুল ছাড়া তেমন কোনো দলই সেভাবে প্রেস করে খেলত না। এখন সিটি, চেলসি, লিভারপুল তো বটেই, সাউদাম্পটন, ব্রেন্টফোর্ড, লেস্টার সিটি, ক্রিস্টাল প্যালেস, লিডস ও ব্রাইটনের মতো দলগুলোও নিরন্তর প্রেস করে। প্রিমিয়ার লিগের চাহিদা অনুযায়ী কন্তে নিজেকে কতটুকু পরিবর্তন করতে পারেন বা আদৌ তাঁকে পরিবর্তিত হতে হয় কি না, সেটাও দেখার বিষয়।

default-image

প্রতিযোগিতার চাহিদা অনুযায়ী কন্তে যে নিজেকে পরিবর্তন করতে পারেন, সেটা এর আগে তাঁর ইতালি দল ও চেলসিতেই দেখা গেছে। চেলসির হয়ে প্রথমে ৪-২-৪ ছকে দলকে খেলানো শুরু করলেও পরে আর্সেনাল ও লিভারপুলের কাছে টানা দুই পরাজয়ে নিজের পছন্দের ৩-৫-২ ছকে ফিরে যান কন্তে। পরের ইতিহাস সবার জানা, প্রথম বছরেই ইংলিশ লিগ জেতেন কন্তে।


একই কথা বলা যায় ইতালির ক্ষেত্রেও। ২০১৬ ইউরোর দলে লরেঞ্জো ইনসিনিয়া, ফেদেরিকো বের্নার্দেসকি, আন্তোনিও কানদ্রেভা ও স্টেফান এল শারাউইর মতো বেশ কিছু কার্যকরী ফরোয়ার্ড থাকার কারণে কন্তে প্রথমে ভেবেছিলেন দলকে ৪-৩-৩ ছকে খেলাবেন। সে ছকে বহুদূর এগিয়েও গিয়েছিলেন। কিন্তু ক্লদিও মার্কিসিও ও মার্কো ভেরাত্তির মতো মিডফিল্ডারদের চোটের কারণে আবারও শেষ মুহূর্তে পরিকল্পনায় বদল আনেন কন্তে, দলকে খেলানো শুরু করেন ৩-৫-২ ছকে। তাই টটেনহাম ও রকম কোনো সমস্যায় পড়লে কন্তে যে দ্রুততার সঙ্গে একটা সমাধান বের করতে পারবেন, এটা বলা যেতেই পারে।

default-image

কৌশল যা-ই হোক না কেন, দলের প্রত্যেক খেলোয়াড়কে পুরো ৯০ মিনিট ধরে মাঠে নিজেকে নিংড়ে দিয়ে আসার মানসিকতা থাকতে হবে। আক্রমণভাগের খেলোয়াড়দের রক্ষণে নেমে আসার অভ্যাস করতে হবে, আক্রমণে নিয়মিত উঠতে হবে রক্ষণভাগের খেলোয়াড়দের। নিজের ফিটনেস ও প্রাণশক্তি নিয়ে আগের চেয়েও বেশি কাজ করতে হবে সন ও কেইনদের। জুভেন্টাসের সেন্টারব্যাক জর্জো কিয়েল্লিনি একবার চোট নিয়ে কন্তের কাছে গিয়েছিলেন। আশা করেছিলেন চোটের কারণে হয়ত অন্তত একদিন কঠোর অনুশীলন থেকে মুক্তি মিলবে। কিন্তু কীসের কী! 'বস, আজ অনুশীলন করলে আমার চোট বেড়ে যেতে পারে,' কিয়েল্লিনির মুখ থেকে কথাগুলো শোনার সঙ্গে সঙ্গে কোনো বাক্য ব্যয় না করে ইতালিয়ান ডিফেন্ডারের হাতে একটা অনুশীলন জার্সি (বিব) ধরিয়ে দেন কন্তে। ইঙ্গিত একটাই, অজুহাত না দেখিয়ে চুপচাপ অনুশীলন করতে যাও!

রোমেলু লুকাকুর উদাহরণও দেওয়া যেতে পারে। ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড থেকে এই দীর্ঘদেহী স্ট্রাইকারকে ইন্টার যখন কিনল, বল পায়ে রেখে খেলতেই পারতেন না এই বেলজিয়ান। শরীরে বাড়তি মেদ জমে গিয়েছিল। সেই লুকাকুকে দিয়ে কন্তে ঘন্টার পর ঘন্টা অনুশীলন করিয়েছেন যাতে ঠিকঠাক বল নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন লুকাকু। দলের পুষ্টিবিদকে দিয়ে বিশেষ খাদ্যতালিকা বানিয়েছিলেন লুয়াকুর জন্য। শিরাতাকি নামের এক ধরণের বিশেষ নুডুলস খেতেন লুকাকু, যে খাবারে ক্যালরি নেই একরত্তিও!

কোচের কথামতো অনুশীলনে নিজের শতভাগ না দিলে যে খেলোয়াড়কে কন্তে দল থেকে বের করে দিতে সময় নেন না। ইন্টারের বেলজিয়ান মিডফিল্ডার রাজ্জা নাইঙ্গোলান, জুভেন্টাসের ডিফেন্ডার রেতো জিগলার, স্ট্রাইকার মাউরো ইকার্দিরা এ ব্যাপারে ভালো বলতে পারবেন!

default-image

চেলসিতে থাকার সময় আর্সেনালের কিংবদন্তি স্ট্রাইকার থিয়েরি অঁরিকে একটা সাক্ষাৎকার দিয়েছিলেন কন্তে। সেখানেই স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছিলেন কোচ হিসেবে কেমন তিনি, ‘আমি সব সময় শিক্ষা ও সম্মান নিয়ে কথা বলতে ভালোবাসি। আমি আমার খেলোয়াড়দের কাছ থেকেও এ বিষয়গুলো চেয়ে থাকি। আমি নিজেও এগুলো দিয়ে থাকি। কিন্তু এ ব্যাপারগুলো আমি খেলোয়াড়দের কাছ থেকে অবশ্যই চাইব। অনুশীলনে কেউ যদি নিজের শতভাগ না দেয়, নিজেকে নিংড়ে না দেয়, বিভিন্ন পরিস্থিতিতে ভালো আচরণ না দেখায়, আমি বরং তাকে মেরেই ফেলব!’


তা কন্তের খেলোয়াড়দের অবস্থা এমনিতেও মরে যাওয়ার মতোই হয় অনুশীলন সেশনগুলোর পর। চেলসির সাবেক মিডফিল্ডার তিমুইয়ে বাকায়োকো একবার বলেছিলেন, 'মাঝে মাঝে মনে হয় ম্যাচের চেয়ে অনুশীলনেই বেশি খাটছি!' তবে অনুশীলন করতে করতে মরে গিয়েও যদি শেষমেশ একটা শিরোপার ছোঁয়া পাওয়া যায়, সন-কেইনরা হয়তো সেটাই করবেন!

ফুটবল থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন