এমবাপ্পের পিছে পিছে এভাবেই ঘুরে মরেছেন পিকে।
এমবাপ্পের পিছে পিছে এভাবেই ঘুরে মরেছেন পিকে।ছবি : রয়টার্স

পিএসজির আক্রমণভাগের অন্যতম দুই প্রধান তারকা চোটের কারণে খেলেননি। সেটা দেখেই বার্সেলোনার কোচ রোনাল্ড কোমান বেশি সাহসী হয়ে গিয়েছিলেন কি?

প্রশ্নের উত্তর ‘হ্যাঁ’ ও ‘না’ দুটিই হতে পারে। ‘না’ হতে পারে এই কারণে, যে দলে ত্রিনকাও, পেদ্রি, অস্কার মিঙ্গেসার মতো তরুণ খেলোয়াড়েরা কয়েক সপ্তাহ ধরে লিগে দুর্দান্ত খেলছেন, পিএসজির মতো বড় দলের বিপক্ষে বেশি সাহসী হয়ে তাঁদের তারুণ্যের ওপর আস্থা রাখতে পারেননি কোমান। আস্থা রাখতে চেয়েছেন অভিজ্ঞতার ওপর, সাবধানী হতে চেয়েছেন। যে কারণে ক্যারিয়ার–সায়াহ্নে পৌঁছে যাওয়া সেই সের্হিও বুসকেতস কিংবা সদ্যই চোট কাটিয়ে ফেরা জেরার্ড পিকের ওপরেই ভরসা রেখেছেন বার্সা কোচ। গতবার বায়ার্ন মিউনিখের বিপক্ষে আট গোল খাওয়া সেই ম্যাচটায় এই দুজনের যথেষ্ট ভুল থাকা সত্ত্বেও আরেকটিবার সেই পুরোনো যোদ্ধাদের ওপরেই আস্থা রাখতে চেয়েছেন কোমান। অনভিজ্ঞদের মহারণের ময়দানে পাঠাতে চাননি শুরু থেকে।

আবার ‘হ্যাঁ’ হতে পারে এই কারণে, নেইমার বা দি মারিয়া না থাকা সত্ত্বেও যে দলে কিলিয়ান এমবাপ্পের মতো গতি তারকা আছেন, তাঁকে সামলানোর জন্য পিকে বা বুসকেতসের মতো গতিহীন তারকাকে মাঠে নামানোর অর্থ কোমান হয়তো সাহসী হয়েছিলেন এই ভেবে যে এক এমবাপ্পে বার্সার দুর্গে অত বড় ফাটল ধরাতে পারবেন না।

বিজ্ঞাপন
default-image

উত্তর যা-ই হোক না কেন, বার্সেলোনা–সমর্থকদের আরেকবার দুঃস্বপ্নের প্রহর খুব ভালোভাবেই এনেছে সেটা। এমবাপ্পের গতিতে ৯০ মিনিটজুড়ে খাবি খেয়েছেন বার্সা তারকারা। পিকে-বুসকেতসকে তো শেষমেশ ৭৮ মিনিটের দিকে উঠিয়েই নেওয়া হলো। কারণটা কারও অজানা নয়। যাদের জন্য বায়ার্নের বিপক্ষে বার্সেলোনার ৮-২ গোলের দুঃস্বপ্ন এসেছিল, সেই একই কারণে পিএসজিও শিক্ষা গিয়ে বার্সাকে, বার্সার ‘দুর্গ’ ন্যু ক্যাম্পে এসেই। এমবাপ্পে করলেন হ্যাটট্রিক, বাকি গোলটা আরেক তরুণ স্ট্রাইকার মইস কিনের।

ম্যাচপূর্ব প্রিভিউতে বলা হয়েছিল, বার্সা মাঠে নামবে চিরপরিচিত ৪-৩-৩ ছকে। ওদিকে পিএসজি আস্থা রাখবে ৪-২-৩-১ ছকে, যেখানে সেন্ট্রাল মিডফিল্ডার লিয়ান্দ্রো পারেদেসকে পেছনে জায়গা করে দেওয়ার জন্য আরেক সেন্ট্রাল মিডফিল্ডার মার্কো ভেরাত্তি একটু ওপরে আক্রমণাত্মক ভূমিকায় খেলতে পারেন। সেটিই হয়েছে। তবে চমক জাগিয়েছে পিএসজির এই কৌশলের বিপক্ষে বার্সেলোনার পরিকল্পনা।

default-image

৪-৩-৩ ছকে বার্সেলোনার তিন মিডফিল্ডার ছিলেন বুসকেতস, ফ্রেঙ্কি ডি ইয়ং ও পেদ্রি। বুসকেতসকে মাঝে রেখে ফ্রেঙ্কি নিয়েছিলেন একটু ডান দিকের জায়গাটা, ওদিকে পেদ্রি খেলছিলেন যথারীতি একটু বাঁয়ে সরে। তবে কোমান তাঁর মিডফিল্ডারদের নির্দিষ্ট কোনো ‘জোন’ বা ‘এলাকা’ কভার করে খেলার লাইসেন্স দেননি। বরং বলে দিয়েছিলেন, পিএসজির তিন মিডফিল্ডার পারেদেস, গেয়ে ও ভেরাত্তিকে চোখে চোখে রাখতে, অর্থাৎ ‘ম্যান মার্কিং’ করতে, ‘জোনাল মার্কিং’ না। আর এটিই কাল হয়েছে বার্সেলোনার জন্য।

default-image

পিএসজির ছক ৪-২-৩-১ হলেও, মাঝেমধ্যেই সেটা ৪-৩-৩–এ রূপ নিচ্ছিল। পিএসজির পায়ে যখনই বল থাকছিল, ভেরাত্তি-পারেদেসরা ৪-২-৩-১ ছকে চলে যাচ্ছিলেন, ভেরাত্তি খেলছিলেন ‘নাম্বার টেন’ না সেন্ট্রাল অ্যাটাকিং মিডফিল্ডারের ভূমিকায়। কিন্তু বিশেষ বিশেষ কিছু মুহূর্তে ভেরাত্তি একটু বাঁ দিকে নেমে ছকটাকে ৪-৩-৩ করে দিচ্ছিলেন। অর্থাৎ, তিন মিডফিল্ডারের মধ্যে অপেক্ষাকৃতভাবে এই ভেরাত্তিই সবচেয়ে বেশি জায়গা পরিবর্তন করছিলেন, ওপর–নিচে উঠছিলেন-নামছিলেন। আর এই মিডফিল্ডারকে ‘ম্যান মার্ক’ করার দায়িত্ব বার্সা কোচ মূলত দিয়েছিলেন সের্হিও বুসকেতস। সেই বুসকেতস, যিনি কিনা তাঁর ক্যারিয়ারের একদম বালুকাবেলায় চলে এসেছেন, যিনি কিনা দলের যেকোনো মিডফিল্ডারের তুলনায় সবচেয়ে বেশি শ্লথগতির।

ফলে খুব স্বাভাবিকভাবেই, ভেরাত্তির কর্মচাঞ্চল্যের কাছে পেরে উঠছিলেন না এই কিংবদন্তি মিডফিল্ডার। এমনও কিছু সময় দেখা গেছে, ভেরাত্তির পিছে পিছে ছুটতে গিয়ে দলের গঠনটাই নষ্ট করে দিচ্ছেন বুসকেতস। অনেক সময় দেখা যাচ্ছিল, সবার ওপরে ‘ফলস নাইন’ হিসেবে খেলা মেসির পাশে দাঁড়িয়ে আছেন বুসকেতস। মেসির পাশাপাশি প্রেসিং করার চেষ্টা করছেন পিএসজির রক্ষণভাগকে। অর্থাৎ ভেরাত্তির পেছন পেছন ছুটতে গিয়ে কখন সামনে চলে এসেছেন খেয়াল নেই, ওদিকে ভেরাত্তি সময়মতো নিচে নেমে গেলেও গতিহীনতার কারণে তিনি সময়মতো নিচে নামতে পারেননি। ফলে মেসির পাশে প্রেস করা শুরু করে দিয়েছিলেন। কিন্তু যার গতিই নেই, তার প্রেস আর কতটুকুই–বা কার্যকর হবে? ওদিকে মেসিও খুব দুর্দান্ত প্রেস করে খেলেন, এমনটা বলা যায় না। ফলে পিএসজির রক্ষণভাগ তেমন কোনো চাপেই পড়েনি। ওদিকে বুসকেতস ওপরে উঠে আসার কারণে বার্সার রক্ষণভাগ ও মিডফিল্ডের মধ্যে প্রায় সময়ই বড় একটা জায়গা ফাঁকা পড়ে থাকছিল। যে ফাঁকা জায়গায় তুলকালাম লাগিয়েছিলেন ভেরাত্তি, এমবাপ্পে, কিন ও ইকার্দি।

বিজ্ঞাপন
default-image

বাকি দুই মিডফিল্ডার কিন্তু তাদের ওপর দেওয়া দায়িত্ব ঠিকঠাক পালন করেছেন। ইদ্রিসা গেয়েকে বেশ ভালোই জ্বালিয়েছেন পেদ্রি, এতটাই যে প্রথমার্ধেই হলুদ কার্ড দেখেছেন এই সেনেগালিজ মিডফিল্ডার। যেকোনো মূহুর্তে লাল কার্ড দেখে বসতে পারেন, এমনটাও মনে হচ্ছিল। যে কারণে দ্বিতীয়ার্ধে কোনো ঝুঁকি নিতে চাননি পিএসজির কোচ মরিসিও পচেত্তিনো, গেয়ের জায়গায় নামিয়েছেন স্প্যানিশ মিডফিল্ডার আন্দের এরেরাকে। ওদিকে ডি ইয়ং তো পেনাল্টিই এনে দিয়েছিলেন দলকে। এক বুসকেতসের ব্যর্থতাই ঝামেলায় ফেলেছে বার্সেলোনাকে।

শুধু মিডফিল্ডারদেরই যে ‘ম্যান মার্ক’ করতে বলেছিলেন কোমান, তা কিন্তু নয়; প্রত্যেক খেলোয়াড়কেই বলে দিয়েছিলেন একজন করে খেলোয়াড়কে মার্ক করতে—অন্তত খেলা দেখে এটাই মনে হয়েছে। রাইটব্যাক সের্হিনিও দেস্তের দায়িত্ব ছিল পিএসজির লেফট উইঙ্গার এমবাপ্পেকে দেখে রাখার, লেফটব্যাক আলবাকে দেওয়া হয়েছিল রাইট উইঙ্গার কিনকে দেখে রাখার দায়িত্ব। ওদিকে দুই উইঙ্গার গ্রিজমান আর দেম্বেলেও নিজ নিজ দিকের পিএসজি ফুলব্যাককে নজরে রাখছিলেন—গ্রিজমান ফ্লোরেঞ্জিকে, দেম্বেলে কুরজাওয়াকে।

default-image

এমন কৌশল তখনই খাটে, যখন নিজের খেলোয়াড়েরা দলের রক্ষণ সম্পর্কে সবচেয়ে বেশি সতর্ক থাকেন। জোসে মরিনিও বা রাফা বেনিতেজের উইঙ্গাররা এসব কাজ খুব ভালোভাবে করতে পারেন। নিজের ঠিক সামনে প্রতিপক্ষের যে খেলোয়াড়টা থাকেন, তাকে চোখে চোখে রাখতে পারেন। তাদের দায়িত্বই থাকে, নিজের পেছনে থাকা ফুলব্যাকের সঙ্গে বোঝাপড়া বাড়িয়ে প্রতিপক্ষ দলের যে দুই খেলোয়াড় ওই পাশের খেলোয়াড় থাকেন, তাদের আগে সামলিয়ে রাখো, তারপর প্রয়োজনে আক্রমণে যাও। এ জন্য সবচেয়ে বেশি দরকার হয় রাইটব্যাকের সঙ্গে রাইট উইঙ্গারের এবং লেফটব্যাকের সঙ্গে লেফট উইঙ্গারের বোঝাপড়া।

ঝামেলাটা বেধেছে এখানেই। কোমান আর যা–ই হোক না কেন, মরিনিও বা বেনিতেজ তো আর নন। ওদিকে গ্রিজমান-দেম্বেলেও রক্ষণে মনোযোগী হওয়ার ক্ষেত্রে পরিচিত নন। পেছনে থাকা দেস্ত-আলবার সঙ্গে রসায়নের ঘাটতিও চোখে পড়েছে বেশ বাজেভাবে। বুসকেতসের ফেলে যাওয়া জায়গার কারণেই হোক বা তাঁর ব্যর্থতার কারণেই হোক, পিএসজির দুই উইঙ্গার এমবাপ্পে আর কিন প্রায় সময়েই মাঝে ঢুকে যাচ্ছিলেন। তাঁদের অনুসরণ করতে গিয়ে নিজেদের জায়গা ফেলে ভেতরে চলে আসছিলেন দেস্ত আর আলবাও। ফলে উইংয়ে যে জায়গাটা ফাঁকা হয়ে যাচ্ছিল, সে জায়গায় দৌড়ে চলে এসেছেন দুই ফুলব্যাক ফ্লোরেঞ্জি আর কুরজাওয়া। আর নিজেরা যেহেতু রক্ষণকাজে অতটা পটু নন, সেহেতু ফ্লোরেঞ্জি আর কুরজাওয়াকে অনুসরণ করে নিচে নামার কাজটা ভালোভাবে করেননি যথাক্রমে গ্রিজমান ও দেম্বেলে। এই ভুলের কারণেই বার্সা প্রথম দুই গোল খেয়েছে।

default-image

প্রথম গোলটা দেখুন। বাঁ দিক থেকে লেফটব্যাক কুরজাওয়া নিরুপদ্রবে বল পাঠিয়েছেন বক্সে থাকা ভেরাত্তির দিকে, যে কুরজাওয়ার পিছে পিছে আসার কথা ছিল দেম্বেলের। দেম্বেলে নিচে নেমেছিলেন ঠিকই, কিন্তু সেটা কুরজাওয়াকে মার্ক করার জন্য যথেষ্ট ছিল না। পরে বল পেয়ে ভেরাত্তি ছোট্ট একটা ফ্লিক করে বল পাঠিয়েছেন এমবাপ্পের কাছে। দুই সেন্টারব্যাক পিকে আর লংলেকে বোকা বানাতে পরে বেশি সমস্যা হয়নি এমবাপ্পের। ব্যস, সমতায় ফেরে বার্সেলোনা!

দ্বিতীয় গোলেও একই সমস্যা। এবার কুরজাওয়ার জায়গায় ফ্লোরেঞ্জি, দেম্বেলের জায়গায় গ্রিজমান। ডান পাশে ফাঁকা জায়গা পেয়ে ইতালিয়ান এই রাইটব্যাক যে ক্রসটা পাঠিয়েছিলেন বক্সে, সেটা সামলাতে রীতিমতো খাবি খেয়েছেন পিকে। আর পেছনে থাকা এমবাপ্পের মতো এক স্ট্রাইকারের সে ভুল কাজে লাগাতে সমস্যা হওয়ার কথা নয় একদমই!

default-image

তৃতীয় গোলটা সম্পূর্ণই পারেদেসের কৃতিত্বে এসেছে। ম্যাচপূর্ব প্রিভিউতেই বলা হয়েছিল, নেইমার-দি মারিয়ার মতো দুজন লাতিন আমেরিকান না থাকলেও পারেদেসের মতো আরেক লাতিন আমেরিকান সেন্ট্রাল মিডফিল্ডে থেকে খেলার বাঁক বদলে দিতে পারেন। সেটাই হয়েছে। পাশে থাকা ইদ্রিসা গেয়ে কিংবা আন্দের এরেরা যেহেতু ট্যাকল বা বল কেড়ে নেওয়া, দৌড়াদৌড়ি করায় পটু, ক্যারিয়ারের শুরুতে বল পায়ে আক্রমণ রচনা করার ক্ষেত্রে পারদর্শিতা দেখানো পারেদেসের ভূমিকা ছিল পেছন থেকে ওপরে থাকা এমবাপ্পেদের দিকে নিখুঁত বল পাঠানো। তৃতীয় গোলে ঠিক সে কাজটাই করেছেন পারেদেস। গত চ্যাম্পিয়নস লিগের সেমিফাইনালে লাইপজিগের বিরুদ্ধে এই আর্জেন্টাইন মিডফিল্ডার ঠিক এভাবেই খেলেছিলেন। এ ম্যাচেও সেই পারেদেসকেই দেখা গেল, যা দেখে আশায় বুক বেঁধেছেন পিএসজির পাশাপাশি আর্জেন্টাইন সমর্থকেরাও। পারেদেসের দুর্দান্ত এক ফ্রি-কিকে মাথা ছুঁইয়ে গোল পেয়েছেন মইস কিন।

default-image

শেষমেশ তাই বলা যায়, কোচ রোনাল্ড কোমানের প্রশ্নবিদ্ধ কৌশলটাই কাল হলো বার্সেলোনার জন্য। লিওনেল মেসি দলকে প্রথমে এগিয়ে দেওয়ার পরেও যে কারণে তাঁদের দেখতে হয়েছে এমবাপ্পের কীর্তি!

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য করুন