এ আলোচনায় লিভারপুলের সাবেক ডিফেন্ডার জেমি ক্যারাঘারের রায়—হ্যাঁ, সিটি-লিভারপুলই সেরা। বর্তমানে ফুটবল বিশেষজ্ঞ হিসেবে সংবাদমাধ্যমে কাজ করা ক্যারাঘারে ইংলিশ দৈনিক টাইমস-এ তাঁর কলামে যুক্তি হিসেবে তুলে ধরেছেন দুই দলের ইংল্যান্ডের পাশাপাশি ইউরোপে দাপটের কথা। কিছুটা আলোচনার দাবিও রাখে সে যুক্তি।

স্যার অ্যালেক্স ফার্গুসনের ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের সঙ্গে আর্সেন ওয়েঙ্গারের আর্সেনালের দ্বৈরথকেই (১৯৯৭-২০০৪) ইংলিশ ফুটবল ইতিহাসের সেরা মেনে এতদিন সেটির সঙ্গে তুলনা হয়েছে জোসে মরিনিওর চেলসির সঙ্গে ফার্গুসনের ইউনাইটেডের দ্বৈরথের (২০০৪-২০০৯)। ম্যানচেস্টার সিটি আবুধাবির অর্থধন্য হয়ে ইংল্যান্ডে দাপট দেখাতে শুরু করার পর কিছু ম্যান ইউনাইটেডের সঙ্গে তাঁর দ্বৈরথও জমেছে।

কিন্তু ক্যারাঘারের যুক্তি, সে দ্বৈরথগুলোর সময়ে কখনোই দুটি ক্লাবই একসঙ্গে ইউরোপের সেরাদের লড়াইয়ে ছিল না। ২০০৮ চ্যাম্পিয়নস লিগে ইউনাইটেড-চেলসি ফাইনালে খেলেছে বটে, কিন্তু ততদিনে চেলসি আর মরিনিওর নেই। ওই মৌসুমের শুরুর দিকেই বোর্ডের সঙ্গে দ্বন্দ্বে ‘স্পেশাল ওয়ান’ বিদায় নেওয়ার পর আভরাম গ্রান্টই চেলসিকে নিয়ে গিয়েছিলেন চ্যাম্পিয়নস লিগের ফাইনালে।

সে তুলনায় লিভারপুল আর সিটি নিয়মিতই চ্যাম্পিয়নস লিগের নকআউট পর্বে শেষের দিকে যাচ্ছে। লিভারপুল তো ২০১৯ চ্যাম্পিয়নস লিগই জিতেছে, সিটি খেলেছে গত মৌসুমের ফাইনালে। এই মৌসুমের অবস্থাই দেখুন না, এরই মধ্যে লিগ কাপ জিতে নেওয়া লিভারপুলের যেখানে চার শিরোপার চারটিই জেতার হাতছানি, সিটির সামনে সম্ভাবনা ত্রিমুকূট জেতার। আজ লিগে মহারণের পর আগামী শনিবার দুই দল আবার মুখোমুখি হবে এফএ কাপের সেমিফাইনালে।

সিটি-লিভারপুলের দ্বৈরথকে শ্রেষ্ঠত্বের আলোচনায় তুলে আনছে গত তিন-চার মৌসুমে দুই দলের একে অন্যকে ছাড়িয়ে যাওয়ার নিরন্তর চেষ্টাও। ক্লপের চোখে এই লড়াইটা ‘পাগলাটে’, গার্দিওলার চোখে ক্লপের লিভারপুল তাঁর ‘সবচেয়ে বড় মাথাব্যথা!’

এই ম্যাচ ঘিরে কদিন ধরেই তো টুইটারে অনেক পরিসংখ্যান তুলে ধরছে সংবাদমাধ্যমগুলো, সেখানে দেখা যাচ্ছে, গত চার মৌসুমে প্রিমিয়ার লিগে ম্যান সিটির সম্মিলিত পয়েন্ট ৩৩৮ (১৪৪ ম্যাচে), লিভারপুলের ৩৩৭! বলাবাহুল্য, তালিকায় এই দুই দলের ওপরে কেউ নেই। তিনে থাকা চেলসির পয়েন্ট ১৪৩ ম্যাচে ২৬৪! এ সময়ে সবচেয়ে বেশি গোল করেছে কোন দুই দল? সিটি (৩৫০) ও লিভারপুল (৩১৯)। সবচেয়ে কম গোল খেয়েছে কারা? সিটি ১০৮টি, লিভারপুল ১১৭টি।

তবে এ তো শুধুই দুটি দলের শ্রেষ্ঠত্বের বর্ণনা। ব্যাপ্তিটা আরও ছাপিয়ে লিগের খোলনলচেই বদলে দেওয়ায় দুই দলের অবদান? ইউনাইটেড, চেলসি, আর্সেনালের দাপটের সময়ে জয়ের বিপরীতে ৩ পয়েন্ট ধরেই যেখানে ৮৫-৮৭ পয়েন্ট মানেই ছিল শিরোপার নিশ্চয়তা, লিভারপুল-সিটির দাপটের যুগে ৯৭ পয়েন্টেও শিরোপা ধরা না দেওয়ার উদাহরণ আছে।

দুই দলকে পাশে রেখে দুই কোচের তুলনা করবেন? ক্যারাঘারের কথাটাই হয়তো সত্যি, এ যুগে বেশিরভাগ কোচই পেপ গার্দিওলার মতো বল দখলে রাখার কৌশলে নিজের দলকে খেলাতে চান বটে, তবে প্রতি লিগেই অন্তত এক-দুজন কোচ থাকেন যাদের ক্লপের মতো গতিময়, আগ্রাসী ফুটবল পছন্দ। দুই কোচের মুখোমুখি লড়াইয়ের পরিসংখ্যানও যে অবিশ্বাস্য! এখন পর্যন্ত ২২ বার দেখা হয়েছে দুজনের, তাতে গার্দিওলার জয় ৯টি, ক্লপেরও ৯টি! গার্দিওলার ক্যারিয়ারে ক্লপের চেয়ে বেশি ম্যাচে তাঁকে হারাতে পারেননি আর কোনো কোচ, ক্লপের ক্যারিয়ারে গার্দিওলার চেয়ে বেশি হারাতে পারেননি আর কেউ।

এ সব যদি লিভারপুল-সিটির দ্বৈরথের পক্ষে বলে, সে ক্ষেত্রে ইউনাইটেড, চেলসি, আর্সেনালের মতো ক্লাবগুলোর সমর্থকদের হাতেও তো নিজেদের দলের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা দ্বৈরথকে ওপরে রাখার একটা মোক্ষম অস্ত্র আছে—দুই কোচের কথার লড়াই, দুই ক্লাবের সম্পর্কের তিক্ততা। যে লড়াই মরিনিও-ফার্গুসনের জমেছে, ফার্গুসনের সঙ্গে জমেছে ওয়েঙ্গারের। যে দ্বৈরথের সময়ে ইউনাইটেডের নাম শুনলে হয়তো রাগ ঝরত আর্সেনাল সমর্থকদের কিংবা যে কোনো অবস্থায়ই চেলসির হার কামনা করে গেছেন ইউনাইটেড সমর্থকেরা। ম্যাচগুলোতেও সেটির ছাপ থেকেছে সব সময়। গোলশূন্য ম্যাচেও উত্তেজনার অভাব ছিল না।

সে তুলনায় সিটি-লিভারপুল? দুই কোচের কথার লড়াই তো নেই-ই, বরং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ এখানে স্পষ্ট। ক্লপের চোখে গার্দিওলা বিশ্বের সেরা, গার্দিওলার চোখে ক্লপ তাঁর ক্যারিয়ারে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা নেওয়া কোচ। দুই ক্লাবের তেমন ইতিহাসও নেই যা দ্বৈরথে বাড়তি মসলা জোগাবে। সিটির আবুধাবির পেট্রোডলারে ধন্য হওয়া হয়তো লিভারপুল সমর্থকদের গা-জ্বালার কারণ হতে পারে, তবে সে গায়ে জ্বলুনি তো সিটি আর পিএসজিকে ঘিরে ইউরোপের সব ক্লাবেরই আছে!

বাড়তি মসলা, একটু বেশি ঝাল না হলে চলে না! একটু ভেবেই দেখুন না, এখনো সিটি আর ইউনাইটেডের ম্যাচে কোনো লিভারপুল সমর্থক সিটির হার চাইবেন না ইউনাইটেডের? আর্সেনালের সঙ্গে ইউনাইটেডের বা ইউনাইটেডের সঙ্গে চেলসির দ্বৈরথের সময়ে হয়তো প্রশ্নটার অবকাশ ছিল না।