default-image

মাঝমাঠ থেকে বল পেয়েই গোলমুখে দিলেন দৌড়। পেছনে পেছনে দৌড়াচ্ছেন প্রতিপক্ষের একাধিক ডিফেন্ডার। কিন্তু কেউই আটকাতে পারলেন না ওই স্ট্রাইকারকে। শেষ পর্যন্ত গোলটা করলেন। মেতে উঠলেন উল্লাসে।

এমন গোল প্রতিটি ফুটবলারেরই আরাধ্য স্বপ্ন। আর সেই স্বপ্নই সম্প্রতি ধরা দিয়েছে সাইফ স্পোর্টিং ক্লাবের স্ট্রাইকার সাজ্জাদ হোসেনের। প্রিমিয়ার ফুটবল লিগে পরশু মুন্সিগঞ্জ স্টেডিয়ামে আরামবাগের বিপক্ষে ৩-২ গোলের জয়ে সাইফের তৃতীয় গোলটি ছিল সাজ্জাদের ওই অনবদ্য গোল।

ঢাকার ফুটবলে এমন অসাধারণ গোল, তাও আবার একজন দেশি স্ট্রাইকারের কাছ থেকে! খেলাটি কোনো টেলিভিশনে সেদিন সরাসরি সম্প্রচার করা হয়নি। কিন্তু তারপরও ওই গোলের একটি ভিডিও এরই মধ্যে ভাইরাল হয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। একজন তো ওই গোলের ভিডিও দেখে এমন মন্তব্যও করেছেন, গোলটা দেখে এক প্রচেষ্টায় করা ফুটবল ইতিহাসের বেশ কিছু বিখ্যাত গোলের কথাই মনে করিয়ে দিয়েছে।

default-image
বিজ্ঞাপন

এমনিতেই বিদেশি ফুটবলারদের ভিড়ে একাদশে জায়গা পাওয়াটা কঠিন। দেশি স্ট্রাইকারদের তাই সময় কাটে সাইড বেঞ্চ গরম করেই। কালেভদ্রে বদলি হিসেবে নামার সুযোগ পান। কিন্তু নিয়মিত সুযোগ না পেলে প্রতিভার ঝলক দেখানোটা কঠিনই হয়ে পড়ে তাঁদের জন্য। কিন্তু সাজ্জাদ যেন ব্যতিক্রম। ওই ম্যাচেও সাইফ স্পোর্টিংয়ের বেলজিয়ান কোচ পল পুট সাজ্জাদকে বদলি হিসেবে মাঠে নামান। নেমেই অসাধারণ ওই গোল করে সবাইকে অবাক করে দেন।

গোলের পর প্রচুর প্রশংসা পাচ্ছেন চট্টগ্রামের এই ফুটবলার। ফেসবুকে অভিনন্দনে ভাসছেন। কিন্তু একটা গোল পেয়েই আত্মতৃপ্তিতে মেতে উঠতে চান না, ‘মাঠে নেমে সব সময় চেষ্টা করি গোল পেতে। কারণ, প্রিমিয়ার লিগে সব সময় ক্লাবগুলো বিদেশি স্ট্রাইকারদের সুযোগ দেয়। এখানে দেশি স্ট্রাইকারদের সুযোগ পাওয়া কঠিন। এদের সঙ্গেই আমাকে লড়াই করতে হবে। আমরা যত ভালো অনুশীলনই করি না কেন, তারপরও সুযোগ পাওয়া কঠিন। এবার সুযোগ পেয়ে গোল করেছি। এখানেই শেষ না, এভাবে দলকে আরও অনেক গোল এনে দিতে চাই।’

বদলি বা একাদশ যেখানেই হোক, কোচের আস্থার প্রতিদান দিতে পেরেই খুশি সাজ্জাদ, ‘বদলি খেলছি, না শুরু থেকেই খেলছি, তা মাথায় থাকে না। ১০-১৫ মিনিট যতটুকুই সুযোগ পাই কাজে লাগাতে চাই। কোচ যখন বদলি হিসেবে আমাকে নামালেন, চেয়েছিলাম ভালো কিছু করতে; যদিও এভাবে হুট করে নেমে গোল করা কঠিন। তবে আত্মবিশ্বাস ছিল, ওরা গতিতে আমার সঙ্গে পারবে না। সেটাই হয়েছে। গোল করতে পেরে খুশি আমি।’

default-image

সাইফের রক্ষণভাগ থেকে বলটা বাড়িয়ে দিয়েছিলেন তাদের উজবেক মিডফিল্ডার সিরোজুদ্দিন রাকমাতুল্লায়েভ। বলটা পেয়ে গোল করতে সাজ্জাদ সময় নেন মাত্র আট সেকেন্ড! প্রচণ্ড গতি ছিল সাজ্জাদের। গোলমুখে গিয়ে অসাধারণ ফিনিশিংয়ের আগে ২০ বার পা ফেলেছেন তিনি। কিন্তু তাঁর পেছনে দৌড়ানো চার ডিফেন্ডারের সবাই ১৭ বার পা ফেলেই হাল ছেড়ে দেন।

সাজ্জাদের জন্ম চট্টগ্রামের পটিয়ায়। ছোটবেলা থেকেই ফুটবলের প্রতি প্রচণ্ড নেশা। স্কুল–কলেজে নিয়মিত ফুটবল খেলতেন। অনুশীলন করতেন পটিয়া ব্রাদার্স ইউনিয়নের মাঠে। পটিয়া ব্রাদার্স ইউনিয়নের সভাপতি প্রয়াত মহিবুল্লাহ চৌধুরী সাজ্জাদের প্রতিভা দেখে সুযোগ দেন খেলার। চট্টগ্রামের দ্বিতীয় বিভাগ ও প্রথম বিভাগে খেলেছেন পটিয়া উপজেলা দলের হয়ে। ২০১৬ সালে একবার চট্টগ্রাম আবাহনীর সঙ্গে প্রীতি ম্যাচ খেলেছিল পটিয়া উপজেলা ফুটবল ক্লাব। ওই ম্যাচে ঠিক এভাবেই দুবার বক্সে ঢুকেছিলেন সাজ্জাদ। কিন্তু সেদিন গোল না পেলেও ওই সময় জাতীয় দলের সাবেক ফুটবলার আরমান আজিজ মুগ্ধ হন সাজ্জাদের খেলা দেখে। এরপরই সাজ্জাদকে সাইফ স্পোর্টিংয়ে খেলার সুযোগ করে দেন তিনি।

অথচ ২০১৭ সালে সাইফের জার্সিতে একটা ম্যাচও খেলতে পারেননি সাজ্জাদ। বাবা কবির আহমেদ তখন ক্যানসারে ভুগছেন। টানাটানির সংসারে সাজ্জাদের ফুটবল খেলার উপার্জনের ওপরই সবাই নির্ভর করত। বাবার চিকিৎসার জন্যই তখন মাঠে নামার খুব প্রয়োজন ছিল সাজ্জাদের। কিন্তু কোচ তাঁকে একটি ম্যাচও সুযোগ দেননি। শেষ পর্যন্ত সাজ্জাদের বাবা ২০১৭ সালের ২১ এপ্রিল মারা যান। সেদিনের কথা মনে পড়লে ভীষণ কষ্ট হয়, ‘খেলতে পারতাম না বলে খুব খারাপ লাগত। ভাবতাম, কোচ যদি আমাকে একটিবার সুযোগ দিতেন, তাহলে হয়তো আমার খেলা দেখে বড় কোনো ক্লাব নিতেও পারত। বাবার চিকিৎসার টাকাটা জোগাড় হয়ে যেত। কিন্তু আমি কখনো আশা ছাড়িনি। চেষ্টা চালিয়ে গেছি।’

বিজ্ঞাপন
ফুটবল থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন