সব মিলিয়ে ম্যাচটা শেষ হলো ৪-৩ স্কোরলাইনে। ঘরের মাঠে ৪ গোল দিয়ে সিটি আপাতত লড়াইয়ে এগিয়ে থাকলেও দুই লেগের যুদ্ধ বিবেচনায় ৩ গোল দেওয়া রিয়ালও কি খুব বেশি পিছিয়ে থাকবে? হয়তো না।

ম্যাচের আগে আলোচনা হচ্ছিল দুই দলের চোটজর্জর ও ভঙ্গুর রক্ষণভাগ নিয়ে। সিটির মূল দুই ফুলব্যাক জোয়াও কানসেলো ও কাইল ওয়াকারের কেউই এই ম্যাচে ছিলেন না। কাজ চালানো রাইটব্যাক জন স্টোনসও দুই সপ্তাহ ধরে চোটের কারণে মাঠের বাইরে। তিনজনের মধ্যে তাঁর অবস্থাই অপেক্ষাকৃত ভালো দেখে তাঁকেই রাইটব্যাক হিসেবে নামানো হলো। ওদিকে লেফটব্যাক হিসেবে নামলেন মৌসুমের বেশির ভাগ সময় বেঞ্চে বসে থাকা আলেকসান্দর জিনচেঙ্কো।

default-image

রিয়ালের অবস্থাও যে খুব বেশি ভালো ছিল, বলা যাবে না। মূল সেন্টারব্যাক ডেভিড আলাবা থেকে শুরু করে লেফটব্যাক ফারলাঁ মেন্দি, ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার কাসেমিরো—সবাই চোটে। তাও কাসেমিরোর চেয়ে বাকি দুজনের অবস্থা মোটামুটি ভালো দেখেই কিনা রিয়াল কোচ আনচেলত্তি দুজনকেই নামিয়ে দিলেন। দুই দলের এই জোড়াতালি মারা রক্ষণ দর্শকদের উপহার দিল ৭ গোলের রোমাঞ্চ।

ম্যাচের দুই মিনিটেই এগিয়ে গেল সিটি। রিয়াল রক্ষণের বাঁ দিকে থাকা দুজন আলাবা ও মেন্দি কেউই পুরো ফিট নন, ওদিক থেকেই বল পায়ে আক্রমপণ রচনা করলেন রিয়াদ মাহরেজ। রিয়াল তারকারা মাহরেজের পায়ের কাজে মন্ত্রমুগ্ধের মতো চেয়েই রইলেন শুধু। মাহরেজের ক্রসে মাথা ছোঁয়ানো ছাড়া তেমন কোনো কাজই ছিল না বর্তমান বিশ্বের অন্যতম সেরা মিডফিল্ডার কেভিন ডি ব্রুইনার।

ম্যাচের ১২ মিনিটে আবারও এগিয়ে সিটি। এবারের গল্পটা অপাঙ্‌ক্তেয় এক খেলোয়াড়ের নিজ কোচকে বার্তা দেওয়ার। গ্যাব্রিয়েল জেসুস কখনোই ম্যানচেস্টার সিটি কোচ পেপ গার্দিওলার মূল অস্ত্র ছিলেন না, অন্তত গত এক-দেড় মৌসুমে তো বটেই। বেশির ভাগ সময় বেঞ্চই হতো জেসুসের ঠিকানা। কয়েক দিন আগে এমন খবরও এল, সিটি নাকি তাঁকে জানিয়ে দিয়েছে, চাইলে তিনি ক্লাব ছাড়তে পারেন। এর পর থেকেই যেন জেসুসের পুনর্জন্ম হলো!

ঠিক আগের ম্যাচে ওয়াটফোর্ডের বিপক্ষে ৪ গোল করে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন। এবার কোচকে দেখালেন, ওয়াটফোর্ডের মতো ছোট দল নয়, দরকার হলে রিয়ালের মতো বড় দলের বিপক্ষে গোল করারও সামর্থ্য আছে তাঁর। অবশ্য দুই দলের সর্বশেষ দুই মোকাবিলায় জেসুসের গোলই সিটিকে জিতিয়েছিল দেখেই কিনা এই ম্যাচে অপাঙ্‌ক্তেয় হয়ে পড়া জেসুসকে আরেকটা সুযোগ দিয়েছিলেন গার্দিওলা। সে সুযোগ কী দুর্দান্তভাবেই না কাজে লাগালেন তিনি!

default-image

তবে জেসুসের গোলে স্পষ্ট হয়ে উঠল, আলাবা পুরোপুরি ফিট নন; নয় জেসুসের মুভমেন্টে ওভাবে বোকা বনবেন কেন তিনি?

২ গোলে পিছিয়ে থাকার পর রিয়ালকে ম্যাচে ফিরে আসতেই হতো। আর রিয়ালকে ফিরিয়ে আনার জন্য করিম বেনজেমার চেয়ে বড় অস্ত্র আর কেই–বা হতে পারেন? মাঝমাঠ থেকে রিয়ালের লেফটব্যাক ফারলাঁ মেন্দির ক্রসটা ঠিকভাবে সামলাতে পারলেন না সিটির বিকল্প লেফটব্যাক জিনচেঙ্কো। সামনে থাকা বেনজেমা হুট করে বাঁ পায়ের শটে ব্যবধান কমিয়ে ফেললেন। প্রথমার্ধ শেষ হলো এই ৩ গোলেই।

দ্বিতীয়ার্ধে দুই মিনিটের ব্যবধানে দুই দলের দুই তরুণ প্রতিভা গোল দিয়ে জানিয়ে দিলেন, ‘যুদ্ধে’ তাঁরাও তাঁদের ভূমিকাটা পালন করছেন ঠিকঠাক। ততক্ষণে দুই দলের দুই ডিফেন্ডার স্টোনস আর আলাবা মাঠ থেকে উঠে গিয়েছেন। প্রথমার্ধজুড়ে যন্ত্রণা দিতে থাকা চোট তাঁদের ভালোভাবে খেলতেই দিচ্ছিল না। স্টোনসের জায়গায় রাইটব্যাক হিসেবে নামানো হলো বর্ষীয়ান ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার ফার্নান্দিনিওকে। কিন্তু ৫৩ মিনিটে ফিল ফোডেনের করা গোলে রাইটব্যাক পজিশন থেকে ফার্নান্দিনিও যেভাবে ক্রস দিলেন, তাতে বিশ্বের যেকোনো রাইটব্যাকেরই ঈর্ষা হবে।

ঠিক দুই মিনিট পর নায়ক থেকে খলনায়ক ফার্নান্দিনিও। তাঁর দিক থেকেই বল নিয়ে আধা মাঠ দৌড়ে ব্যবধান কমালেন ভিনিসিয়ুস জুনিয়র। স্কোরলাইন ৩-২!

default-image

৭৪ মিনিটে রিয়াল-রক্ষণের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে আবারও সিটিকে এগিয়ে দিলেন বের্নার্দো সিলভা। ম্যাচ হয়তো তখনই শেষ হয়ে যেত, কিন্তু প্রতিপক্ষ দলে যে একজন করিম বেনজেমা ছিলেন!

ওই স্নায়ুক্ষয়ী মুহূর্তেও পানেনকা পেনাল্টি মারার সাহস দেখালেন তিনি। মনে করিয়ে দিলেন ২০০৬ বিশ্বকাপ ফাইনালের জিনেদিন জিদান বা ২০১২ ইউরোর আন্দ্রেয়া পিরলোকে। রিয়ালও ব্যবধান কমিয়ে ৪-৩–এ নিয়ে এল। আর এটাই নিশ্চিত করল, এ ম্যাচে হারলেও নিজেদের মাঠে গোটা টাইয়ের ভাগ্য বদলে দেওয়ার ব্যাটনটা এখনো তাদের হাতেই আছে।

দ্বিতীয় লেগের আগপর্যন্ত নিরেট ফুটবলপ্রেমীদের কাছে এই ৭ গোলের রোমাঞ্চই সঙ্গী হয়ে থাক!

ফুটবল থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন