তারকারা রাতে শুধু জ্বলে না, মরেও যায়

এসি মিলানের আলেসান্দ্রো পাতো। আক্ষেপ হয়েই রয়ে গেলেন।
এসি মিলানের আলেসান্দ্রো পাতো। আক্ষেপ হয়েই রয়ে গেলেন। ছবি: টুইটার
বিজ্ঞাপন

২০১০ সাল। দক্ষিণ আফ্রিকায় আর কিছুদিন পরেই পর্দা উঠবে বিশ্বকাপের। ‘বাফানা বাফানা’দের দেশে আট বছর পর জেতা হবে পরম আরাধ্য ‘হেক্সা’ (ষষ্ঠ বিশ্বকাপ)—স্বপ্নে তা দিচ্ছিলেন ব্রাজিল সমর্থকেরা।


এমন সময় ব্রাজিলের বিখ্যাত ক্রীড়া সাময়িকী ‘প্লাকার’ একটা বিশেষ সংখ্যা বের করল। প্রচ্ছদ প্রতিবেদনে ব্রাজিলের স্ট্রাইকাররা। কোচ দুঙ্গা স্ট্রাইকার হিসেবে কাকে নিয়ে যাবেন দক্ষিণ আফ্রিকায়? ক্যারিয়ারের শেষ বিশ্বকাপটা কী খেলতে পারবেন ‘বুড়ো’ হয়ে যাওয়া রোনালদো নাজারিও ডা লিমা? নাকি ইন্টার মিলানের হয়ে প্রতিভার স্ফুরণ ঘটানো আদ্রিয়ানোয় ভরসা রাখবেন দুঙ্গা? সেভিয়াতেও বেশ নজর কাড়ছেন লুইস ফাবিয়ানো, ভিয়ারিয়ালে নিলমার, ভলফসবুর্গে চমকে দেওয়া গ্রাফিতে।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
default-image

অথচ, ব্রাজিলিয়ানরা সবচেয়ে আশাবাদী ছিল আলেসান্দ্রো পাতোকে নিয়ে। ২০০৭ সালে ব্যালন ডি'অর অনুষ্ঠানে সম্ভাব্য বিজয়ী কাকাকে নিয়ে আসা মুখপাত্র লিওনার্দো বুক ফুলিয়ে সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ‘পরের বছর নতুন একজনকে নিয়ে আসব।’ তখন কথাটা শুনে বাড়াবাড়ি বলে মনে হলেও, পরবর্তী দুই বছরে মোটেও অতিকথন বলে মনে হয়নি। প্লাকারের সে সংখ্যায় স্ট্রাইকারদের ছবির পুরোভাগে ছিলেন পাতো। ইঙ্গিতটা পরিষ্কার। পাতোর ওপরেই সবার চেয়ে বেশি ভরসা করেছে ব্রাজিলিয়ানরা। আদ্রিয়ানো, ফাবিয়ানো এমনকি রোনালদোর ওপরেও তাঁদের এত ভরসা নেই!


পাতো এতটাই প্রতিভাবান ছিলেন।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
default-image

২০০৬ সালে মাত্র ১৬ বছর বয়সের পাতোকে অনূর্ধ্ব-২০ টুর্নামেন্টে নামিয়ে দেয় ইন্টারন্যাসিওনাল। বয়সে চার বছরের বড় খেলোয়াড়দের নাচিয়ে ছেড়েছিলেন পাতো। হয়েছিলেন টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ গোলদাতা। তা দেখেই ইউরোপে কানাঘুষা শুরু হয়ে গিয়েছিল। পেলে-কারেকা-রোমারিও-রোনালদোদের পথ ধরে আসছেন একজন!


ইন্টারন্যাসিওনালের কোচ আবেল ব্রাগা ও সভাপতি ফার্নান্দো কারভালহো বেশ ভালোই জানতেন, এই প্রতিভাকে ধরে রাখা সম্ভব না। এর চেয়ে সম্ভাব্য সর্বোচ্চ দামের বিনিময়ে বিক্রি করে দেওয়াই শ্রেয়। কিন্তু দাম কীভাবে ওঠানো যায়? জাপানে অনুষ্ঠিত ক্লাব বিশ্বকাপে পাতোকে নিয়ে যাওয়ার জন্য কোচকে অনুরোধ করলেন কারভালহো। উদ্দেশ্য, কিছুক্ষণ খেলিয়ে যদি ফুটবলবিশ্বের দৃষ্টি আকর্ষণ করা যায়!

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
default-image

পাতো নিজেও বুঝেছিলেন, লুইজ আদ্রিয়ানো, ইয়ারলি ও আদ্রিয়ানো গাবিরুর মতো অভিজ্ঞ স্ট্রাইকারদের ভিড়ে মূল একাদশে সুযোগ পাবেন না। অনুরোধ করলেন কোচকে, অনুশীলন ম্যাচে যেন খেলতে দেওয়া হয়। সে ম্যাচে হ্যাটট্রিক করলেন বাচ্চা বাচ্চা চেহারার ছেলেটা।


ফলাফল, সেমিফাইনালে আল আহলির বিপক্ষে মাঠে নামলেন। কোচের আস্থার প্রতিদান দিলেন গোল করে। মাত্র ১৭ বছর ১০২ দিন বয়সে গোল করে ফিফা আয়োজিত কোনো টুর্নামেন্টে কনিষ্ঠতম গোলদাতা হলেন পাতো, ভাঙলেন ৪৮ বছর আগে গড়া পেলের রেকর্ড। ফাইনালেও খেলানো হলো তাঁকে। সে ম্যাচে গোল করতে না পারলেও রোনালদিনহোরা বুঝলেন, ব্রাজিলের পতাকা নিয়ে এগিয়ে চলার উত্তরসূরি চলে এসেছে। কবিগুরুর সেই বিখ্যাত গানটা রোনালদিনহো কখনো শুনেছেন বলে মনে হয় না। শুনে থাকলে হয়তো সেই সময়ে তাঁর মনে বেজে উঠত, ‘তোমার হলো শুরু, আমার হলো সারা!' ম্যাচ শেষে ‘আদর্শ’ রোনালদিনহোর জার্সি আর ট্রফিটা নিয়ে বাড়ি ফিরলেন পাতো।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

তত দিনে ইউরোপে ‘পাতো’, ‘পাতো’ রব উঠেছে। পাকা জহুরির মতো প্রতিভা চেনার কারিগর আর্সেনালের ম্যানেজার আর্সেন ওয়েঙ্গার পাতোর ব্যাপারে খোঁজখবর নেওয়া শুরু করলেন। কিন্তু এসি মিলানের সিলভিও বার্লুসকোনির সঙ্গে পেরে উঠলেন না ফরাসি ‘প্রফেসর’। মিলানে তখন এমনিতেই ব্রাজিলিয়ান তারকাদের হাট। দিদা, কাফু থেকে শুরু করে এমারসন, কাকা, কাকার ভাই দিগাও, রোনালদো—সবাই তখন মিলানে। স্বদেশি তারকাদের সঙ্গে থাকার সুবিধা করে দেওয়ার কারণে পাতোকে পাওয়ার দৌড়ে এগিয়ে গেল মিলান। প্রায় আড়াই কোটি ইউরোর বিনিময়ে পাতোকে নিয়ে এল মিলান।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
default-image

অন্য দেশে খেলতে গেলে কত খেলোয়াড়ই তো মানিয়ে নিতে সময় নেন। চেলসির ক্ষেত্রে দিদিয়ের দ্রগবা, আর্সেনালের রবিন ফন পার্সি—কেউই প্রথম মৌসুম থেকে ঝলক দেখাতে পারেননি। পাতো সে কাতারে কোনকালেই ছিলেন না। জীবনে যত ক্লাবে খেলেছেন, অধিকাংশ ক্লাবের হয়েই প্রথম ম্যাচে গোল করে জাত চিনিয়েছেন নিজের। নতুন ক্লাবে যোগ দিয়েই সদ্য কেনা ফেরারি গাড়ির মতো দুর্দমনীয় গতিতে ছুটেছেন শ্রেষ্ঠত্বের আশায়।


আর তাতেই ক্ষতিটা হয়েছে সবচেয়ে বেশি। পায়ের ‘কোয়াড্রাপল’ পেশি শক্তিশালী করার জন্য যত মনোযোগ দিয়েছিলেন, হ্যামস্ট্রিংয়ের প্রতি তত গুরুত্ব ছিল না। এ ব্যাপারটা তাঁকে ভুগিয়েছে ক্যারিয়ারজুড়ে। একের পর এক চোটে পড়েছেন। খেলোয়াড়দের বিভিন্ন তথ্য নিয়ে কাজ করা ওয়েবসাইট ট্রান্সফার মার্কেট জানাচ্ছে, গোটা ক্যারিয়ারে ১৯বার চোটে পড়েছেন পাতো। মাঠের বাইরে থেকেছেন প্রায় সাড়ে চার শ দিন। চোট থেকে ফিরে এসে ফর্মহীনতায় ভুগেছেন নিয়মিত।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

এই চোটের কারণেই ব্রাজিলের কোচ দুঙ্গা শেষমেশ তাঁকে ২০১০ বিশ্বকাপের দলে রাখার সাহস পাননি। কপাল খুলে গিয়েছিল ফাবিয়ানো, গ্রাফিতে আর নিলমারের। সেই যে পাতোর ক্যারিয়ারে আক্ষেপের সূচনা হলো, দিনে দিনে তাতে পর্বের সংখ্যাই বেড়েছে নিয়মিত। সাফল্য সে অনুপাতে প্রায় শূন্য।


কিন্তু পাতোর ক্যারিয়ারে শুধু চোট-ই কী সবচেয়ে বড় অভিশাপ ছিল? অনেকেই মানবেন না সেটা।


এসি মিলানে তখন অঘোষিতভাবে দুটো গ্রুপ হয়ে গিয়েছিল খেলোয়াড়দের। না, এমন কোনো শত্রুতামূলক গ্রুপ নয়, যে কারণে মাঠের ভেতর খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্স ও পারস্পরিক সম্পর্কের ওপর প্রভাব পড়ে। গ্রুপ ভাগ হয়েছিল খেলোয়াড়দের আদর্শগত দিক থেকে। এক গ্রুপের নেতা ছিলেন রোনালদো-রোনালদিনহোরা। উদ্দাম জীবনযাপন, নারী আসক্তি ছিল এ দলের পছন্দ। আরেক গ্রুপের নেতৃত্ব দিতেন কাকা। ধর্মীয় দিকে তাঁর ঝোঁক ছিল বেশি। তরুণ পাতো ঝুঁকে পড়েন প্রথম দলে—এর মাশুল দিয়েছেন বাকি ক্যারিয়ারজুড়ে।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

২০০৭ সালে মাত্র ১৮ বছর বয়সে ব্রাজিলিয়ান অভিনেত্রী স্টেফানি ব্রিটোর সঙ্গে সম্পর্কে জড়ান, বিয়েও করেন দুজন। কিন্তু বিয়ের পরে পাতোর সঙ্গে অন্যান্য মেয়েদের সম্পর্ক আর রোনালদিনহোর সঙ্গে অতিরিক্ত নৈশ প্রীতি পছন্দ হয়নি ব্রিটোর। দশ মাসেই ভেঙে যায় সংসার।


এরপর ডেবোরা লরার কাছে ঘুরে পাতো মন দেন মিলান-মালিক ও ইতালির প্রধানমন্ত্রী সিলভিও বার্লুসকোনির মেয়ে বারবারাকে। তিনি নিজেও ক্লাবের একজন প্রভাব বিস্তারকারী পরিচালক ছিলেন। পাঁচ বছরের বড় বারবারার প্রেমে মজে খেলাটাই যেন ভুলে গেলেন পাতো। নতুন কোচ ম্যাসিমিলিয়ানো আলেগ্রি, সতীর্থদের সঙ্গে দূরত্ব সৃষ্টি হলো। মালিকের মেয়ের সঙ্গে প্রেম, স্বাভাবিকভাবেই সবাই পাতোকে একটু অন্য চোখে দেখা শুরু করলেন। দলের অনুশীলন আর জিম সেশনেও অনিয়মিত হতে থাকেন এই প্রতিভাবান স্ট্রাইকার। শেষমেশ এই প্রেমও টেকেনি। প্রেম না টেকায় বারবারাও পাতোকে মিলানে রাখেননি। পাতো পাড়ি জমান করিন্থিয়ানসে।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

তবে পাতো নিজে ক্যারিয়ারে প্রত্যাশিত সাফল্য না পাওয়ার জন্য দায়ী করেন মিলান মালিক বার্লুসকোনির এক সিদ্ধান্তকে। সব সময় হালকা-পাতলা ছিলেন, ছিলেন দুর্দান্ত গতিশীল। ক্যারিয়ারের শুরুতে উইঙ্গার হিসেবে খেলতেন এ কারণে। গতি দিয়ে নিয়মিত ছিটকে দিতেন ডিফেন্ডারদের, হুট করে ভেতরে ঢুকে শট নিয়ে গোল করে বসতেন। মিলানে আসার পর বার্লুসকোনির আগ্রহে পাতোকে স্ট্রাইকার হিসেবে খেলানো শুরু করা হয়। ফলে নিয়মিত বল ধরে রাখা, প্রতিপক্ষ সেন্টারব্যাকদের গতির খেলা দেখানোর পাশাপাশি শারীরিক সামর্থ্যও দেখানো লাগত— পাতো এ কাজটা অত ভালো পারতেন না।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

কারণ যাই হোক না কেন, ক্ষতি হয়েছে পাতোর নিজেরই। ব্রাজিলেরও কী হয়নি? এখনো একজন কার্যকরী ‘নম্বর নাইন’ হন্য হয়ে খুঁজছে সেলেসাওরা।


ওদিকে সাও পাওলো, চেলসি, ভিয়ারিয়াল, তিয়ানজিন তিয়ানহাই ঘোরা পাতোও চুক্তিহীন হয়ে আজ নিজের জন্মদিনে হয়তো ভাবছেন, যে প্রত্যাশাটা তাঁর পূরণ করার কথা ছিল, তা আদৌ আর কেউ পূরণ করতে পারেন কি না!

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন