ন্যাপকিনে শুরু, বুরোফ্যাক্সে শেষ—দুই দশকের প্রেম

লিওনেল মেসি বার্সেলোনা ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন
লিওনেল মেসি বার্সেলোনা ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেনছবি: এএফপি
বিজ্ঞাপন

লাল কষ্ট। নীল কষ্ট। ক্যাম্প ন্যু-র সবুজ ঘাসে আর না হাঁটার কষ্ট। হেলাল হাফিজ বার্সেলোনা সমর্থক হলে হয়তো কবিতাটা এভাবে লিখতেন। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ হয়তো লিখে দিতেন, যখন পড়বে না আর পায়ের চিহ্ন ক্যাম্প ন্যু-তে। লিওনেল মেসি কবিতা লেখেন না, আপাতত একটা ফ্যাক্সেই কাজ সেরে নিয়েছেন।


হেলাল হাফিজের কবিতায় ঘাসগুলো পাথরের নিচে চাপা পড়ে কষ্ট পাচ্ছিল, মেসির কষ্ট চাপা পড়ে ছিল চ্যাম্পিয়নস লিগে ক্লাবের একের পর এক ব্যর্থতায় তাঁর শূন্য দৃষ্টির নিচে। দুবছর আগে রোমা কিংবা গত বছর অ্যানফিল্ড দুঃস্বপ্নের মতো এবার লিসবনে বায়ার্ন মিউনিখের কাছে ৮-২ গোলে হারের দিনগুলোতে কোমরে হাত দিয়ে মেসির দাঁড়িয়ে থাকার দৃশ্যগুলো কে ভুলেছে? ওভাবে ন্যুব্জ হয়ে দাঁড়ানোর নেপথ্যে হতাশা-ক্লান্তির পাশাপাশি বুকে জমাট বাঁধা কষ্টেরও ভার নয়, তা কে বলবে?

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

কষ্টটা তাঁর অস্তিত্বে মিশে থাকা বার্সেলোনাকে অতলে তলিয়ে যেতে দেখার। ফি-বছর তাঁর আরেকটা চ্যাম্পিয়নস লিগ জয়ের স্বপ্নের জলাঞ্জলি দেখার। ক্যারিয়ারের শেষ বছরগুলোতে প্রাপ্তি আর আক্ষেপের খতিয়ানে দীর্ঘশ্বাসের পাল্লা ভারী হতে দেখার।
মাঝে মাঝে কষ্টগুলো আওয়াজ যে পায়নি, তা নয়! তবে তা যতটা নিজের প্রয়োজনে, তার চেয়ে বেশি বাহুতে বাধা বন্ধনীর দায়ে। জানুয়ারিতে মেসির ‘প্রিয়’ কোচ আর্নেস্তো ভালভার্দেকে বরখাস্ত করার পেছনে খেলোয়াড়দের দায় আছে জানিয়ে যখন সংবাদমাধ্যমে সাক্ষাৎকার দিয়েছিলেন বার্সার সে সময়ের ক্রীড়া পরিচালক এরিক আবিদাল, মেসি ইনস্টাগ্রামে আওয়াজ তুলেছিলেন। মার্চে আবার, করোনাভাইরাসের সময়। খেলোয়াড়েরা বেতন কমাতে গড়িমসি করছেন, খেলোয়াড়েরা ‘লোভী’—এমন একটা ইঙ্গিত বার্সা বোর্ডের অনেকের কথায় খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল। সেই খেলোয়াড়েরা ক্লাবের প্রয়োজনে ৭০ ভাগ বেতন তো কমিয়েছেনই, আরও কিছু অর্থও দিয়েছেন, যাতে ক্লাবের কর্মীদের বেতন বন্ধ না হয়।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
default-image

মৃদু আওয়াজেই সই, এর আগে একবার বার্সেলোনা ছাড়ার সম্ভাবনার কথাও কি জানিয়েছিলেন মেসি? তাঁর চুক্তিতে যে প্রতি মৌসুম শেষে চাইলে ‘ফ্রি ট্রান্সফারে’ ক্লাব ছেড়ে যেতে পারার শর্ত রাখা আছে, বছরের শুরুর দিকেই তা ফাঁস হয়ে গিয়েছিল। আর্জেন্টাইন সংবাদমাধ্যমে সাক্ষাৎকারে তখন এ নিয়ে প্রশ্নে মেসি বার্সেলোনায়ই অবসর নিতে চাওয়ার চিরায়ত ইচ্ছাটার কথা জানিয়েও মেসি বলেছিলেন, ক্লাবে নিয়মিত শিরোপা জিতে যাওয়ার মতো ‘স্পোর্টিং প্রজেক্ট’ না থাকলে তিনিও আর থাকবেন না।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

‘স্পোর্টিং প্রজেক্ট’ বার্সেলোনার আছে বটে। কোন ক্লাবের থাকে না! রোমা, অ্যানফিল্ড কিংবা এবারের লিসবন দুঃস্বপ্ন বলে, বার্সার প্রকল্পটায় প্রাণ ছিল না। বার্সার বার্ধক্যে ঠাসা দলটার মতো বার্সার প্রকল্পেরও জোর ছিল না। আর প্রসঙ্গ যখন মেসি, তখন গুরুত্বপূর্ণ তথ্য এটি যে, এই প্রকল্পে মেসির বিশ্বাস ছিল না।


ফেব্রুয়ারিতেই বার্সেলোনা অধিনায়ক বলে রেখেছিলেন, এই বার্সেলোনার চ্যাম্পিয়নস লিগ জেতা সম্ভব নয়। দলের ওপর অধিনায়কেরই ভরসা না-ই থাকতে পারে, কিন্তু কোন অবস্থায় কোনো অধিনায়ক দলের খামতির কথা সংবাদমাধ্যমে বলেন? বার্সেলোনা বোর্ড হয়তো ইঙ্গিতটা বোঝেনি। কিংবা বুঝলেও গা করেনি। দলের প্রয়োজন না বুঝে তারকার পেছনে ছুটে গর্বে বুক ফোলানোর মাঝে এসব বোঝার যেন ফুরসতই ছিল না তাঁদের!

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

ক্লাবের ব্যালেন্সশিটে কোনোরকমে লাভ দেখিয়ে নিজেদের গদি আর সুনাম রক্ষায় ব্যস্ত জোসেপ মারিয়া বার্তোমেউর বোর্ডের হয়তো ক্ষমতাই ছিল না নিজেদের তৈরি ফাটলটায় প্লাস্টার দেওয়ার। মেসি নামের ‘কাগজে’ ফাটলটা ঢাকার চেষ্টা করে গেছে। কিন্তু কত দিন? দলে একের পর এক ব্যর্থ দলবদল চলছে, ডাগআউটে আসছেন দ্বিতীয় সারির কোচেরা। ফাটল সারানোর দৃশ্যত কোনো চেষ্টা নেই। বিরক্ত মেসি তাই জানিয়ে দিলেন, এবার বিদায় দাও!


যেন ১৯ বছরের দাম্পত্য জীবনে বিচ্ছেদের আবেদন।


দাম্পত্যের শুরুর গল্পটা এখন সবার জানা। কিন্তু এখনো বিশেষ। দাম্পত্যের ‘কাবিননামা’ যে একটা ছোট্ট ন্যাপকিন! ১৪ ডিসেম্বর ২০০০ ছিল তারিখটা। মেসির পরিবারকে নিশ্চয়তা দেওয়ার তাড়া ছিল, তড়িঘড়ি সই করাতে হতো মেসিকে। হাতের কাছে পাওয়া ন্যাপকিনই সই! ‘আমি, চার্লি রেক্সাস, এফসি বার্সেলোনার টেকনিক্যাল সেক্রেটারির ক্ষমতাবলে—এবং অনেকের মতের ভিন্নতা থাকা সত্ত্বেও—লিওনেল মেসিকে দলে নেওয়ার ব্যাপারে কথা দিচ্ছি, যদি সব শর্ত পূরণ হয়’—তড়িঘড়ি করে ন্যাপকিনে লিখেছিলেন বার্সেলোনার সে সময়ের টেকনিক্যাল সেক্রেটারি চার্লস রেক্সাস। ফুটবল ইতিহাস রাঙানো এক সম্পর্কের শুরু।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

নিজেকে প্রমাণের দায় তখন মেসির ছিল, তাঁর দায়িত্ব ছিল বার্সেলোনার। তাঁর গ্রোথ হরমোনের ঘাটতি ছিল, চিকিৎসার খরচ বইতে কোনো আর্জেন্টাইন ক্লাব রাজি ছিল না। সুযোগটা বার্সেলোনা নিয়েছিল। মেসির ইনজেকশনের জন্য মাসে ১ হাজার পাউন্ড লাগত, খরচটা বার্সা দিয়ে গেছে। ১৩ বছর বয়সে বাড়ি তো বটেই, দেশ-মহাদেশ ছেড়ে আসা মেসির দেখভালের জন্য সঙ্গেও তো কেউ থাকতে হবে, তাই না? মেসির বাবা হোর্হে মেসি বার্সেলোনায় থেকে গিয়েছিলেন। তাঁকে বছরে ৪০ হাজার পাউন্ড দিয়ে গেছে বার্সেলোনা। অনেক টাকা! বার্সার বিনিয়োগ সেটি। এর চেয়ে লাভজনক বিনিয়োগ হয়তো হয় না আর।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
default-image

বার্সার ঋণ কী দারুণভাবেই না শোধ করেছেন মেসি! ‘ছেলেটা নতুন ম্যারাডোনা হবে’ ভেবে তাঁকে এনেছিল বার্সা, তিনি বার্সার মেসিই হয়েছেন। ক্লাবটার পাঁচ চ্যাম্পিয়নস লিগের চারটিই তাঁর সময়ে। মূল দলে ১৬ বছরে আর্জেন্টাইন ফরোয়ার্ডের ছোঁয়া পেয়েছে বার্সার ইতিহাসের ২৬ লিগ শিরোপার ১০টি। সব মিলিয়ে ৩৪ শিরোপা। বার্সার ইতিহাস রাঙানো ৬৩৪টি গোল। ৫১৩ জয়। দুই মৌসুমে ত্রিমুকুট, এক মৌসুমে সম্ভাব্য ছয় শিরোপার ছয়টিই জিতে শিরোপাষষ্ঠক। ২০১২ সালে এক মৌসুমে সর্বোচ্চ ৭৩ গোল, বছরটাতে ৯১ গোলের রেকর্ড। ছয়টি ব্যালন ডি’অর। রিয়াল মাদ্রিদের বিপক্ষে এল ক্লাসিকোতে রেকর্ড ২৬ গোল। মেসি-জাদু ১৬টি বছর মুগ্ধ করে রেখেছে বার্সেলোনাকে।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

জাদু ফুরিয়ে যায়নি পুরোটা। মেসিতে বার্সার মুগ্ধতা কমেনি। শুধু মেসির মুগ্ধতা রূপ নিয়েছে বিরক্তিতে। বার্সেলোনাকে আগের মতোই ভালোবাসেন, হয়তো অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশিই। কাউকে খুব বেশি ভালোবাসলেই না কখনো কখনো দূরে সরে যাওয়া যায়! রাগটা তাঁর বার্সার এই বোর্ডের ওপর। বার্সেলোনার অফিসে কাল যখন মেসির ক্লাব ছাড়ার ইচ্ছে জানানো বুরোফ্যাক্সটা এসে পৌঁছেছে, সম্পর্কটার শেষ তো সেখানেই হয়ে গেছে!


কারও বিশ্লেষণে এটি বার্সার বোর্ডের বিরুদ্ধে তাঁর ক্ষমতার খেলা। তাঁর ভাবমূর্তি, তাঁর নাম কাজে লাগিয়ে মেসি নাকি বার্তোমেউকে পদত্যাগে বাধ্য করতে চান। হয়তো। আবার হয়তো নয়! কাল মেসির দলবদলের ইচ্ছেপত্র আসার পর থেকে গুঞ্জন ছিল, বার্তোমেউ পদত্যাগ করে মেসিকে থাকতে অনুরোধ করবেন। তেমন কিছুর সম্ভাবনা কম ছিল, বার্তোমেউও পরে আরও শতবারের মতো ‘পদত্যাগ করব না’ জানিয়ে দিয়েছেন বলে স্পেনে গুঞ্জন। কিন্তু মেসির সঙ্গে যে অল্প কজন সাংবাদিকের ভালো সম্পর্ক শোনা যায়, তাঁদের একজন আলফ্রেদো মার্তিনেজ টুইটে জানিয়ে দিয়েছেন, এটা ক্ষমতার খেলা নয়। বার্তোমেউ পদত্যাগ করুন আর না-ই করুন, মেসি বার্সা ছাড়ছেন। বিরক্তি-কষ্ট দীর্ঘস্থায়ী হলে হয়তো অনুভূতিটা ভোঁতা হয়ে যায়!

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
default-image

আবার হয়তো আরেকটা চ্যাম্পিয়নস লিগ জেতার ইচ্ছাও তাঁর বিচ্ছেদ-প্রার্থনার কারণ। হয়তো এ কারণেই বার্সেলোনা ছেড়ে ম্যানচেস্টার সিটিতে যাওয়ার ইচ্ছা তাঁর। সেখানে পেপ গার্দিওলা আছেন, সেখানে একটা জেতার মতো প্রকল্প আছে। কোনো হৃদয়ভেদী ছোঁয়ায় প্রেম না ফিরলে বার্সা থেকে তাঁর বিদায়ই লেখা সমাপ্তিতে। শুধু বিদায়ের ধরন জানার অপেক্ষা।
তাঁর চুক্তির ব্যতিক্রমী ধারাটা কাজে লাগানো গেলে মুফতেই মেসি নামের রত্ন পাবে সিটি। কাজে লাগানো না গেলে? বার্সেলোনা তাঁকে ছাড়তে চায় না বলে মুখে জানিয়েছে, মনে মনে ঠিক করে রেখেছে, যেতে দিলে চড়া দামই নেবে মেসির জন্য। মেসি গেলে যে বার্তোমেউর বোর্ডের আর্থিক লাভ! বছরে মেসির ১০ কোটি বেতনের ভার বইতে হবে না। আর মেসির দলবদলে চড়া দাম পেলে...সেটি না হয় বিচ্ছেদের পর বার্সেলোনার জন্য মেসির দেওয়া ‘অ্যালিমনি।’ যে বার্সা আরও দুই তিন বছর পর মেসিকে ছেড়ে নতুন প্রকল্পে হাত দিতে পারত, সেটি তাদের শুরু করতে হচ্ছে এখনই।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

অপেক্ষা এখন বিচ্ছেদের ধরনের। সমঝোতায় হবে, নাকি আদালতে? যেভাবেই হোক, ন্যাপকিনে শুরু ১৯ বছরের প্রেমময় ‘জীবনে’র এপিটাফ হয়তো লেখা হয়েই গেছে। যমদূত হয়ে আসা বুরোফ্যাক্সে!

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন