বাংলাদেশে আক্ষেপ হয়ে রইবেন এ আর্জেন্টাইন

মেসির সতীর্থ হার্নান বার্কোসের খেলা করোনার কারণে সেভাবে দেখতেই পেলেন না বাংলাদেশের ফুটবলপ্রেমীরা।ছবি: তানভীর আহম্মেদ

হার্নান বার্কোসের নামটি শুনলেই ১১ মার্চ বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে ফিরে তাকান অনেকেই। স্মৃতি থেকে বের হয়ে আসে একের পর উদ্‌যাপনের ছবি। এএফসি কাপে মালদ্বীপের টিসি স্পোর্টসের বিপক্ষে ৫-১ গোলে জিতেছিল বসুন্ধরা কিংস। বড় জয়ের ম্যাচে এক হালি গোলে বাংলাদেশের ফুটবলে অভিষেক হয়েছিল এই আর্জেন্টাইনের। গোলের মেলা দেখিয়ে দেশের ফুটবলপ্রেমীদের লোভ বাড়িয়ে দিয়েছিলেন বার্কোস।

শুধু কি বার্কোস? ওদিন ২০১৮ বিশ্বকাপে কোস্টারিকার হয়ে খেলা আরেক বিদেশি দানিয়েল কলিন্দ্রেস কী দুর্দান্তই না খেলেছিলেন! নজর কেড়েছিল দুজনের জুটি, যেন জনম-জনম ধরে দুজন খেলছেন একই সঙ্গে। চোখ বন্ধ করে খেললেও একজন খুঁজে পাবেন আরেকজনকে। ম্যাচপরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে কোচ অস্কার ব্রুজোনের হালকা রসিকতায়ও বোঝা গিয়েছিল এই জুটির রসায়নের কথা। তাদের রসায়নকে ‘স্বামী–স্ত্রী’র সঙ্গে তুলনা করে এই স্প্যানিশ কোচ বলেছিলেন, ‘তাদের বোঝাপড়া দেখে মনে হচ্ছিল তারা স্বামী-স্ত্রী। এত দিন কলিনদ্রেস একাকী জীবন কাটিয়েছে। বার্কোস আসার পর শুরু হয়েছে বিবাহিত জীবন।’ রসিকতা করে বলা এ কথাটার অর্থ বুঝতে কারওই সমস্যা হওয়ার কথা না, বার্কোস আসার পর কলিনদ্রেস যেন কোচের দৃষ্টিতে যোগ্য সঙ্গই লাভ করেছেন।

এএফসি কাপে বসুন্ধরার হয়ে একটি ম্যাচ খেলেই বার্কােস বুঝিয়ে দিয়েছেন তিনি কত উঁচুমানের খেলোয়াড়।
ছবি: প্রথম আলো

সে ‘স্বামী-স্ত্রী’র রসায়ন দেশীয় ফুটবলভক্তরা আর দেখতে পারলেন কোথায়? একদিকে বার্কোস-কলিন্দ্রেসরা এক ম্যাচেই গোলের মেলা দেখিয়ে দেশের ফুটবলপ্রেমীদের লোভ বাড়িয়ে দিলেন, অন্যদিকে সে সময়ই করোনার কারণে ফুটবল বন্ধ। সে বন্ধ এমনই হলো, শেষমেশ না খেলতে পেরে হতাশা প্রকাশ করতে বার্কোস বেছে নিয়েছিলেন অনলাইনকে, মাধ্যম হিসেবে।

ছুটি কাটিয়ে ঢাকায় পা রেখে দলের সঙ্গে টানা অনুশীলন করতে করতে হাঁপিয়ে উঠেছিলেন লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনা দলের সাবেক সতীর্থ। যে খেলা খেলে বেঁচে থাকা, সমর্থকদের চিৎকার যাঁদের জীবনীশক্তি, তারা খেলা ছাড়া থাকেন কী করে? ফেসবুকে তাই অসহায় ক্ষোভ জানিয়েছিলেন বার্কোস, ‘আদৌ কি একদিন বাংলাদেশে ফুটবল ফিরবে? নাকি আমরা শুধু অনুশীলনই করে যাব?’

শেষমেশ ফুটবল ফিরেছে ফেডারেশন কাপের মাধ্যমে। কিন্তু নেই বার্কোস। দেশীয় ভক্তদের অতৃপ্ত রেখে ছেড়েছেন বাংলাদেশ। কারওই জানা হয়নি, বার্কোস-কলিনদ্রেস জুটি দেশের ফুটবলে ঠিক কতটা ঝড় তুলতে পারতেন। লিগে ঠিক কতটা গোল করতেন বার্কোস, তাঁকে কয়টা গোলে সহায়তা করতেন কলিনদ্রেস—জানা হয়নি কিচ্ছু। কলিনদ্রেস তো তাও লিগে খেলেছেন, বার্কোস তা–ও খেলেননি, ফলে তাঁদের পরম আরাধ্য জুটির ঝলক দেখা যায়নি মোটেও।

এই আর্জেন্টাইন চিরদিনই আক্ষেপ হয়ে রইবেন বাংলাদেশে।
ছবি: প্রথম আলো

করোনার কারণে স্থগিত হয়ে যাওয়া এএফসি কাপের আবারও শুরু হওয়ার কথা ছিল এই অক্টোবরে। সে জন্য নতুন দুই ব্রাজিলিয়ান ফরোয়ার্ড রবসন রবিনিও ও জোনাথন ফার্নান্দেজের সঙ্গে গত ১০ সেপ্টেম্বর ঢাকায় ফিরেছিলেন বার্কোস। কিন্তু ভেন্যু জটিলতায় শেষ পর্যন্ত বাতিল করা হয় টুর্নামেন্টটি। দুই ব্রাজিলিয়ানের সঙ্গে আগামী মৌসুম পর্যন্ত চুক্তি থাকলেও বার্কোসের সঙ্গে বর্তমান চুক্তি শেষ হয়ে যায় ডিসেম্বরে। প্রথমে জানা যায় চুক্তি নবায়ন করে ২০২১ সাল পর্যন্ত বসুন্ধরায় থাকার সম্মতি দিয়েছেন বার্কোস। কিন্তু বার্কোসের ব্রাজিলিয়ান স্ত্রী জিউলি সন্তানসম্ভবা হওয়ায় তিনি আর বাংলাদেশে থাকেননি। পরে যোগ দিয়েছিলেন ইতালির চতুর্থ বিভাগের দল এফসি মেসিনাতে। বাংলাদেশ ছেড়ে গেছেন, আর দেশীয় ফুটবলভক্তদের জন্য রেখে গেছেন একরাশ আক্ষেপ।

যে আক্ষেপটা হয়তো শুধু বিগত বছরেরই নয়, বাংলাদেশের ফুটবল ইতিহাসেরই অন্যতম ‘কী হলে কী হতে পারত’ ঘটনা হিসেবে পরিচিতি পাবে!