মামা সোহেলের সঙ্গে ভাগনে পাপ্পু
মামা সোহেলের সঙ্গে ভাগনে পাপ্পুছবি: প্রথম আলো

কাঠফাটা রোদে কঠোর অনুশীলন হলো। এবার একটু জিরিয়ে নেওয়া যাক। দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে শরীর ছেড়ে বসে আছেন সোহেল রানা। পাশে দাঁড়িয়ে ঘর্মাক্ত সোহেলের ঘাড়ে পানি ঢালছেন সতীর্থ পাপ্পু হোসেন। দিন কয়েক আগে কমলাপুর বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ মোস্তফা কামাল স্টেডিয়ামে অনুশীলনের ফাঁকে জাতীয় ফুটবল দলের প্রস্তুতি ক্যাম্পে দুই সতীর্থের ছবিটা ফ্রেমে বাঁধাই করে রাখার মতোই ছিল।

সতীর্থ তো বটেই, সোহেল-পাপ্পুর মধ্যে আছে আরও বড় একটা সম্পর্ক। সম্পর্কে যে তাঁরা মামা-ভাগনেও! কথায়ই তো আছে, ‘মামা-ভাগনে যেখানে, আপদ নাই সেখানে।’ মামা সোহেলের ক্লান্তি দূর করতে তাই এগিয়ে আসেন ভাগনে পাপ্পু।

বিজ্ঞাপন
দুজনে একই স্কুলে পড়ার সুবাদে স্কুল ফাঁকি দিতেও ভাগনের সাহায্য নিতেন মামা।

২০১৩ সাল থেকে জাতীয় দলের নিয়মিত মুখ আবাহনী লিমিটেডের মিডফিল্ডার সোহেল। অন্যদিকে সাইফ স্পোর্টিংয়ের গোলরক্ষক পাপ্পু জাতীয় দলে অভিষেকের অপেক্ষায়। গোলরক্ষক পাপ্পু এ নিয়ে জাতীয় দলে দ্বিতীয়বারের মতো ডাক পেলেন।

২০১৯ সালে বিশ্বকাপ ও এশিয়ান কাপের যৌথ বাছাইয়ে কাতার ও ভারতের বিপক্ষে ম্যাচের প্রাথমিক দলে প্রথমবারের মতো জেমি ডের দলে ডাক পান তিনি। কখনো একই ক্লাবে খেলা না হলেও জাতীয় দলের অনুশীলনে এসে ঠিকই হয়ে গেছে মামা-ভাগনে জুটি।

সোহেলের আপন খালাতো বোনের ছেলে পাপ্পু। তবে পাপ্পুর মা কুলসুম বেগম বলেন, ‘সোহেল আমার মায়ের পেটের আপন ভাইয়ের মতোই।’ একসময় আরামবাগের হাজি বিল্ডিংয়ে পাশাপাশি দুটি ফ্ল্যাটে থাকত সোহেলের মা-খালার পরিবার।

দুই ফ্ল্যাটের দরজা আলাদা হলেও সবাই ছিলেন একই পরিবারের সদস্যের মতো। খালাতো ভাই হলেও ছোটবেলা থেকে সোহেলকে কোলেপিঠে করে মানুষ করেন কুলসুম। ২০০৯ সালে সোহেল মা হারানোর পর সম্পর্কটা হয়েছে আরও মজবুত। কুলসুমের স্নেহ-মমতায়ই কৈশোর থেকে সোহেলের বেড়ে ওঠা।

বিজ্ঞাপন
default-image

নিজের ভাই ও ছেলেকে একসঙ্গে জাতীয় দলে খেলতে দেখে কুলসুমের উচ্ছ্বাসের শেষ নেই, ‘ওরা যখন একসঙ্গে প্র্যাকটিস করত, তখন থেকেই আমার স্বপ্ন আমার ভাই ও ছেলেরা একসঙ্গে জাতীয় দলে ফুটবল খেলবে।’

কুলসুমের বড় ছেলে মোহাম্মাদ সুজনও গোলরক্ষক। ২০১৪ সালে লোডভিক ডি ক্রুইফের সময়ে একবার জাতীয় দলের ক্যাম্পেও ডাক পেয়েছিলেন শেখ জামাল ধানমন্ডির এই গোলরক্ষক। ছোট ছেলে মেহেদী হাসানও আছেন ফুটবলের সঙ্গেই।

মামা সোহেলকে দেখেই তিন ভাগনের ফুটবল মাঠে পা রাখা, মামার বুট দিয়েই শুরু। তিন ভাগনের মধ্যে মেজ পাপ্পুই মামার বেশি আদরের। বিদেশে গেলে উপহার হিসেবে গ্লাভস নিয়ে আসেন পাপ্পুর জন্য। সম্পর্কটা মামা-ভাগনের হলেও এর রসায়নে মিশে বন্ধুত্ব। দুজনে একই স্কুলে পড়ার সুবাদে স্কুল ফাঁকি দিতেও ভাগনের সাহায্য নিতেন মামা। বাড়ি ফেরার সময় ভাগনেকে নিয়েই ফিরতেন সোহেল। অন্যথায় ধরা পড়ে যাওয়ার ভয়। ভাগনে সঙ্গে থাকলে মনে হতো দুজন একসঙ্গে স্কুল থেকে ফিরেছে।

এখন অবশ্য মামাই উল্টো চোখে চোখে রাখেন ভাগনেকে। তাঁকে ফাঁকি দিয়ে কিছুই করার জো নেই পাপ্পুর, ‘মামা তো সব সময়ই আমাকে চোখে চোখে রাখেন। উনি অনেক দিন ধরে জাতীয় দলে খেলায় জানেন কখন কী করতে হবে। কোচ জেমি কী পছন্দ করেন, কী করেন না। সব ব্যাপারে আমাকে পরামর্শ দেন।’

মামা সোহেল কাটাচ্ছেন জীবনের সেরা সময়। কিছুদিন আগেই তাঁর একটি গোল ঢুকে গিয়েছে এএফসি কাপের দশকসেরা গোলের তালিকায়। ভাগনেকেও বড় জায়গায় দেখার প্রত্যাশা তাঁর, ‘শুধু তো জাতীয় দলে ডাক পেলে হবে না, ওকে খেলতেও হবে। অনেক উন্নতি করতে হবে।’

সোহেলের স্বপ্নটা আসলে তাঁদের পুরো পরিবারেরই। জাতীয় দলের গোলপোস্ট সামলাচ্ছেন পাপ্পু আর মাঝমাঠে দাপটের সঙ্গে খেলছেন সোহেল—গর্বের সেই ছবিটা দেখার অপেক্ষায় পরিবারের সবাই।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0