মেসির সিদ্ধান্ত প্রভাব ফেলতে পারে রিয়ালের ভবিষ্যতে।
মেসির সিদ্ধান্ত প্রভাব ফেলতে পারে রিয়ালের ভবিষ্যতে।ছবি: রয়টার্স

ইউরোপিয়ান ফুটবল এমন কিছু দেখেনি কখনো। করোনাভাইরাসের সংক্রমণে তিন মাস মাঠে ফুটবল দেখা যায়নি। সে সময়টা ছয় মাস আগেই পেরিয়ে এসেছে, কিন্তু ধাক্কাটা এখনো সামলে ওঠা হয়নি কারও। তথাকথিত পরাশক্তিদেরও হঠাৎ করেই এখন আর্থিকভাবে ক্ষীণশক্তির দল বলে মনে হচ্ছে। আর ফুটবলের এই অস্থিরতা সবচেয়ে ভালোভাবে টের পাওয়া যাচ্ছে কিলিয়ান এমবাপ্পের ক্ষেত্রে।

খেলা বদলে দেওয়ার ক্ষমতার দিক বিবেচনা করলে নেইমার বিশ্বের সেরাদের একজন। ব্রাজিলিয়ান ফরোয়ার্ডকে পাওয়ার জন্য কিছুদিন পরপর এখনো বায়না ওঠে বার্সেলোনায়। কিন্তু বাকি বিশ্বে এখন সবচেয়ে আকাঙ্ক্ষিত তারকা কিলিয়ান এমবাপ্পে। আগামী ১০ বছরের জন্য ইউরোপে নিজেদের পরাশক্তি পরিচয় ধরে রাখতে চাওয়া যেকোনো দলই ফ্রেঞ্চ ফরোয়ার্ডকে পেতে চাইবে। রিয়াল মাদ্রিদ তো তাঁকে চাইছে ৪ বছর ধরেই।

কিন্তু এমবাপ্পে কি পিএসজি ছাড়তে চাইবেন? করোনাকালে আর্থিকভাবে খুব একটা ক্ষতিগ্রস্ত না হওয়া দলগুলোর একটি পিএসজি। এমন অবস্থায় উচ্চ বেতন পেতে চান, এমন ফুটবলারদের জন্য আকাঙ্ক্ষিত স্থান তো এমন কোনো ক্লাবই। তাই পিএসজি ছেড়ে এমবাপ্পের রিয়ালে যাওয়ার ব্যাপারটা অনেক যদি-কিন্তুর ওপর নির্ভর করছে। এর মধ্যে একটি ‘যদি’র নাম লিওনেল মেসি!

বিজ্ঞাপন
default-image

এমবাপ্পেকে নেওয়ার ক্ষেত্রে রিয়াল মাদ্রিদ ও লিভারপুলের নামই বেশি শোনা গেছে। তবে ইউরোপের অন্য পরাশক্তিগুলোও এমবাপ্পের দিকে কড়া নজর রেখেছে এত দিন। পিএসজির কাছ থেকে তাঁকে টেনে আনার জন্য অপেক্ষা করছিল সবাই। কিন্তু যখন টেনে আনার উপযুক্ত সময় এসেছে, তখনই হঠাৎ চুপচাপ সবাই। করোনার কারণে স্টেডিয়ামে দর্শক নেই। সে সুবাদে টিকিটের অর্থ বা গেটমানি-সংক্রান্ত আয় হচ্ছে না। ম্যাচ দেখা উপলক্ষে দর্শকের স্মারক কেনাও বন্ধ হয়ে গেছে। বড় ক্লাবগুলোর নিজস্ব শো-রুম থেকে প্রাপ্ত আয় কমে গেছে। আর স্পনসরদের কাছ থেকে পাওয়া অর্থেও পড়েছে টান।

রিয়াল মাদ্রিদের মতো ক্লাব দুটি দলবদল মৌসুমে কোনো খেলোয়াড় কেনেনি। গত জুলাই-আগস্টের দলবদলে তাদের চুপ থাকার পেছনে এমবাপ্পের জন্য অর্থ জোগাড়কেই কারণ মনে করা হচ্ছিল। সে সঙ্গে আশরাফ হাকিমি, সের্হিও রেগিলন, অস্কার রদ্রিগেজ ও একাডেমির বেশ কিছু খেলোয়াড় বিক্রি করে ও ধারে পাঠিয়ে ১০ কোটি ২০ লাখ ইউরো সংগ্রহ করেছিল রিয়াল। কিন্তু করোনা এখনো স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে দিচ্ছে না ফুটবলকে।

বড় ক্লাবগুলো আগের মতো আর নিশ্চিত আয় ধরে নিতে পারছে না। শুধু এই বছরেই রিয়ালের বাজেট ৩০ শতাংশ কমিয়ে আনা হয়েছে। এ অবস্থায় এমবাপ্পের মতো খেলোয়াড়কে আনতে যে বড় অঙ্কের দরকার, সেটা রিয়ালের পক্ষে সম্ভব কি না, সে প্রশ্ন জাগছেই।

default-image

ওদিকে অস্থির হয়ে উঠেছেন এমবাপ্পে। এত দিন ইউরোপের বাজারে মোটামুটি ধরেই নেওয়া হয়েছিল, ২০১৭ সালে না গেলেও একদিন না একদিন রিয়ালেই যাবেন এমবাপ্পে। ২০১৭ সালে স্পেনের রাজধানীতে এমবাপ্পে যেতে চাননি ফুটবলীয় কারণে। রিয়ালে তখন রোনালদো-বেল-বেনজেমার যুগ। সে অবস্থায় ১৮ বছরের এমবাপ্পে নিয়মিত একাদশে সুযোগ পেতেন না। স্বপ্নের ক্লাবে খেলার চেয়ে নিজের উন্নতিই তখন প্রাধান্য পেয়েছিল তাঁর কাছে। মোনাকোর সাবেক সভাপতি দাবি করেছেন, এমবাপ্পে তখন বলেছিলেন, ‘ওরা (রিয়াল) আমার জন্য অপেক্ষা করবে।’

অপেক্ষার প্রহর ২০২১ সালে শেষ হবে বলে মনে হয়েছিল। ২০২২ পর্যন্ত পিএসজির সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ এমবাপ্পে। ফলে ২০২১-এর জুনে যখন চুক্তির আর এক বছর বাকি থাকবে, তখন এমবাপ্পেকে বিক্রি করতে বাধ্য হতো পিএসজি, না হলে যে ২০২২ সালে তাঁকে মুফতেই ছাড়তে হবে। এডেন হ্যাজার্ডের ক্ষেত্রে একই পথে হেঁটেছিল চেলসি। রিয়ালও তাদের ‘ব্যালান্সশিট’ সেভাবেই সামলাচ্ছিল। কিন্তু করোনার ধাক্কা অন্য অনেকে ক্লাবের তুলনায় কম লাগলেও রিয়ালের পরিকল্পনা কিছুটা হলেও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তার ওপর নিজেদের স্টেডিয়াম সান্তিয়াগো বার্নাব্যুর নবায়নের কাজে হাত দিয়েও এই সময়ে আর্থিকভাবে বেশ জটিলতার মধ্যে পড়েছে রিয়াল।

ওদিকে পিএসজির সঙ্গে চুক্তি নবায়ন পেছাতে পেছাতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন এমবাপ্পে। কদিন আগে মঁপলিয়ের সঙ্গে ম্যাচ শেষ এ প্রসঙ্গে এমবাপ্পে একটা ইঙ্গিত কিন্তু দিয়েই দিয়েছেন, ‘এখন আমার সবকিছু নিয়ে ভাবার সময়। আমি বুঝতে চাচ্ছি আগামী কয়েক বছরে কী চাই—কোথায় নিজেকে দেখতে চাই। আমি এখানে সুখে আছি। কিন্তু আমি চাই না চুক্তি করে এক বছর পরেই চলে যেতে।’

বিজ্ঞাপন
default-image

এমবাপ্পের এমন মন্তব্যে দুটি দিক খুঁজে পাওয়া যায়। এক, তাঁর সবার সেরা হওয়ার স্বপ্নটা যে পিএসজিতে থেকে পূরণ করা সম্ভব নয়, সেটা এমবাপ্পে বুঝে গেছেন। তাই দীর্ঘ মেয়াদে এমন কোথাও যেতে চান, যে ক্লাব তাঁকে ইউরোপ-সেরার স্বাদ এনে দিতে পারবে। গত পাঁচ বছরে চ্যাম্পিয়নস লিগ জয়ের স্বাদ পেয়েছে মাত্র তিন দল। এর মধ্যে বায়ার্ন মিউনিখ আগেই বলে দিয়েছে, এমবাপ্পের জন্য এত অর্থ খরচ সম্ভব নয়। বাকি দুই দলই কিন্তু এমবাপ্পেকে পেতে আগ্রহী।

দুই, রিয়াল মাদ্রিদ বা লিভারপুলে যেতে আগ্রহী হলেও দুই ক্লাবকেই উপযুক্ত প্রস্তাব নিয়ে হাজির হতে হবে এবং সেটা এবারের জুলাইয়ের দলবদলের আগেই। যদি উপযুক্ত প্রস্তাব না পাওয়া যায়, সে ক্ষেত্রে পিএসজিতেই দীর্ঘ মেয়াদের চুক্তিতে চলে যাবেন এমবাপ্পে। আর তাই আগ্রহী ক্লাবগুলোকে সতর্ক বার্তা পাঠিয়েছেন, এবার যদি তাঁকে না নেওয়া হয়, তবে অদূর ভবিষ্যতে আর সে সুযোগ আসবে না।

করোনায় ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের দলগুলোই সবচেয়ে কম ভুগেছে। এমন অবস্থায় রিয়াল মাদ্রিদের চেয়ে লিভারপুলের আর্থিক ক্ষমতাই এখন হয়তো বেশি। কিন্তু রিয়ালের পক্ষে কাজ করছে ডাগআউটে জিনেদিন জিদানের উপস্থিতি এবং লিওনেল মেসি।

default-image

কিছুদিন আগেই নেইমার ঘোষণা দিয়েছেন, আগামী মৌসুমেই মেসির সঙ্গে এক দলে খেলতে চান। গত বছর পর্যন্ত এ কথার মানে ছিল, নেইমার বার্সেলোনায় ফেরার ইচ্ছার কথা বলছেন। কিন্তু মৌসুমের শুরুতেই মেসির বার্সেলোনা ছাড়ার ইচ্ছা জানিয়ে বসা এবং বার্সেলোনার প্রায় দেউলিয়া হওয়ার দশা; এখন অন্য মানে দাঁড় করাচ্ছে। পিএসজিও মেসিকে পাওয়ার চেষ্টা শুরু করে দিয়েছে। তাদের ক্রীড়াচালক লিওনার্দো অবশেষে লজ্জা ভুলে ‘মেসিকে পেলে কত ভালো হয়’ ধরনের কথা বলা শুরু করেছেন। আর এটাই রিয়ালকে আশা দেখাচ্ছে।

নেইমারের বেতনের জন্য পিএসজির কর বাদে প্রায় ৪ কোটি ইউরো ব্যয় হয়। ওদিকে এমবাপ্পেকে নতুন চুক্তিতে নেইমারের কাছাকাছি বেতন দিতে চায় পিএসজি। এদিকে মেসিকেও যদি দলে টানতে চায় তারা, তবে আর্থিক সামঞ্জস্য ধরে রাখা সম্ভব নয়। বার্সেলোনায় মেসি কর বাদে ৫ কোটি ইউরো পান। নতুন ক্লাবে গেলে মেসি বর্তমানের বেশি না হোক, অন্তত সমান অর্থ চাইবেন ক্লাব থেকে। করসহ তিন খেলোয়াড়ের পেছনে শুধু বেতন বাবদ ২০ কোটির বেশি ইউরো খরচ এমনকি পিএসজির পক্ষেও সম্ভব নয়। লিওনার্দো এরই মধ্যে ইঙ্গিত দিয়েছেন, আগের মতো আর যেকোনো মূল্যেই খেলোয়াড় আটকে রাখতে রাজি নন তিনি। সহজ ভাষায়, মেসিকে পাওয়া সম্ভব হলে নেইমার ও এমবাপ্পের বেতন আকাশছোঁয়া করার পক্ষপাতী নয় পিএসজি।

এমবাপ্পে যদি জুন পর্যন্ত চুক্তি নবায়ন না করেন এবং মেসিকে প্যারিসে যাওয়ার টোপ গেলাতে পারেন নেইমার, তবে কাজটা সহজ হয়ে যাবে রিয়ালের জন্য। পিএসজি চাইলেও আর লোভনীয় প্রস্তাব দিতে পারবে না এমবাপ্পেকে। ওদিকে চুক্তির আর মাত্র এক বছর মেয়াদ থাকায় এমনিতেও এমবাপ্পেকে বিক্রি করে দেওয়াটা লাভজনক ঠেকবে পিএসজির জন্য। ওদিকে রিয়ালও এমবাপ্পের বেতনের ক্ষেত্রে একটু হলেও সুবিধাজনক অবস্থায় পাবে নিজেদের।

রিয়াল-এমবাপ্পের গল্পে মেসি এখন তাই আচমকা প্রভাবক হয়ে উঠেছেন!

ফুটবল থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন