default-image

ভাবুন তো, লিওনেল মেসি আপনার পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন। কিংবা ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো অথবা নেইমার। পাওলো দিবালা, সের্হিও আগুয়েরো, ফিলিপে কুতিনিও, রবার্ট লেভানডফস্কি, আর্লিং হরলান্ড কিংবা কিলিয়ান এমবাপ্পের মতো কোনো তারকাও হতে পারেন। কী করবেন?

যুগ যেভাবে এগোচ্ছে, তাতে মোবাইলটা বের করে একটা সেলফিতে মুহূর্তটা ফ্রেমবন্দী করে রাখার আবদার নিয়েই নিশ্চিত এমন তারকার পেছনে ছুটবেন যে কেউ। সুযোগ তো আর প্রতিদিন আসে না!

কিন্তু দানি অলমো এদিক থেকে ব্যতিক্রম। বার্সেলোনার একাডেমিতে বেড়ে ওঠা ২২ বছর বয়সী স্প্যানিশ ফরোয়ার্ড এখন খেলছেন জার্মানির ক্লাব আর বি লাইপজিগে। স্পেন জাতীয় দলেও নিয়মিত। তাঁর অতীত অভিজ্ঞতা—মেসির সঙ্গে ছবি তোলার সুযোগ পেয়েও তা তিনি চাননি। বরং তাঁর ইচ্ছার বিরুদ্ধে জোর করেই নাকি মেসির পাশে ছবি তুলতে দাঁড় করিয়ে দেওয়া হয়েছিল!

বিজ্ঞাপন

দানি অলমোর সেদিনের অম্ল অভিজ্ঞতাই এখন অনেক দামি! মেসির সঙ্গে নিতান্ত অনিচ্ছায় তোলা সেই ছবিই যে এখন অনেক যতনে ঠাঁই পায় অলমোর বাড়িতে।
কিন্তু অভিজ্ঞতাটা কী? অনেক বছর আগের কথা সেটি, অলমোর তখন কাঁচা বয়স।

২০০৭ সালে বার্সেলোনার লা মাসিয়া একাডেমিতে অলমোর যোগ দেওয়ার সময় তখনো আসেনি। মেসি তত দিনে বার্সার মূল একাদশে নিয়মিত হয়ে গেছেন, তখনই রোনালদিনিও-ইতোর পাশে দারুণ আক্রমণত্রয়ীর অংশ সে সময়ের লম্বা চুলের আর্জেন্টাইন ফরোয়ার্ড। এমন সময়ে বার্সেলোনার অঞ্চল কাস্তেদেফেলে প্রথম মেসি-দর্শন অলমোর।

default-image

কীভাবে? দ্য প্লেয়ার্স ট্রিবিউনে ঘটনাটার বর্ণনা অলমো দিয়েছেন এভাবে, ‘আমি লা মাসিয়ায় যোগ দেওয়ার আগের কথা। আমার বয়স তখন ৮ বছর। আমার বাবা তখন কাস্তেদেফেলের কোচ, একদিন এক ম্যাচে তাঁর সঙ্গে মাঠে গিয়েছিলাম আমি।’

দৃশ্যপটে মেসির আগমন, ‘আমি বল পায়ে নিজের মতো করে খেলছিলাম, এমন সময়ে কেউ একজন—যতটুকু মনে পড়ে সম্ভবত আমার বাবার কোনো বন্ধু ছিলেন তিনি—এসে আমাকে বললেন, “এই, দানি! এদিকে এসো। বিশ্বাস করতে পারবে না কী হতে যাচ্ছে!” লিওনেল মেসির সঙ্গে ছবি তুলতে যাচ্ছ তুমি।’

কাস্তেদেফেল বার্সেলোনা শহরের ক্লাব হতে পারে, কিন্তু বার্সেলোনা শহরে তো আরও ক্লাবও আছে। এখন স্প্যানিশ ফুটবলের তৃতীয় স্তরে খেলা কাস্তেদেফেলের ম্যাচে মেসি হঠাৎ যাওয়ার কারণ কী? ঘটনার পূর্বাপর ব্যাখ্যা করলেন অলমো, ‘ধারণা করা হচ্ছিল, কাস্তেদেফেলের ম্যাচে মেসির একজন বন্ধু খেলছিলেন, তিনি সেই বন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলেন।’

কিন্তু এমন বিরল সুযোগেও আট বছরের অলমোকে যেন সন্ন্যাসীসুলভ নির্লিপ্ততা পেয়ে বসেছিল, ‘ওয়াও, মেসি! তা-ও কাস্তেদেফেলে! এ রকমই মনে হওয়ার কথা না? কোনো শিশু তাঁর সঙ্গে ছবি তুলতে চাইত না! কিন্তু আমার মনে হচ্ছিল, ‘না থাক, ধন্যবাদ। আমি যেভাবে আছি ঠিকই আছি। আমি ফুটবল পায়ে খেলে যেতে চাই। একটা ছবিই তো তুলব, এ আর এমন কী, তা–ই না?’

অলমোর শিশুমনে এমন ভাবনা আসতে পারে, কিন্তু তাঁর আশপাশের মানুষ সেই ভাবনায় তাল মেলাননি। ‘যন্ত্রণাদায়ক’ অভিজ্ঞতাটার কথা বর্ণনা করছিলেন অলমো, ‘কিন্তু আমার ইচ্ছার বিরুদ্ধে তাঁরা আমাকে মেসির পাশে দাঁড় করিয়ে দিলেন, ছবি তুললেন। আমি তাঁকে (মেসি) কিছু বলিইনি! আমি শুধু ছবি তোলা শেষ হওয়ার অপেক্ষায় ছিলাম। (ছবি তোলা শেষে) আমার বলের দিকে ছুটে গেলাম। মনে হচ্ছিল যেন ছবি তুলে বরং আমি তাঁকে কৃতার্থ করেছি!’

বিজ্ঞাপন

সময়ের বিবর্তনে আট বছরের সেই শিশু অলমো এখন মধ্য বিশের দিকে ছুটতে থাকা যুবক। কালে কালে কত কিছু ঘটে গেছে! বার্সেলোনার লা মাসিয়ায় সুযোগ হয়েছে অলমোর, ২০১৪ সাল পর্যন্ত সাত বছর ছিলেন মেসি-জাভি-ইনিয়েস্তাদের তুলে আনা একাডেমিতে। অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার, উইঙ্গার, সেকেন্ড স্ট্রাইকার, এমনকি মূল স্ট্রাইকার হিসেবে কীভাবে খেলতে হয়, সে বিদ্যায় হাতেখড়ি হয়েছে সেখানে।

কিন্তু অতটুকু বিদ্যার জোরেও বার্সার মূল দলে সুযোগ হবে না ভেবেই কি না, ২০১৪ সালে বার্সা ছেড়ে চলে যান ক্রোয়েশিয়ার দিনামো জাগরেবের একাডেমিতে। জানতেন, সেখানে পেশাদার ফুটবলার হওয়ার স্বপ্নটা শিগগিরই সত্যি হবে। হয়েছেও। এক বছর সেখানে একাডেমিতে কাটানোর পরই দিনামো জাগরেবের মূল দলে অভিষেক অলমোর।

সেখানে পাঁচ বছর কাটালেন, ৮০ ম্যাচে ২০ গোল করলেন। ইউরোপের বড় বড় ক্লাবের নজরে পড়লেন। গত মৌসুমে তাঁর বার্সায় ফেরার গুঞ্জনও বেশ বাজার পেয়েছিল। কিন্তু এখনই ফিরলে নিয়মিত সুযোগ পাবেন না ভেবেই হয়তো বার্সায় নয়, অলমো গেলেন লাইপজিগে।

এত বছরে বয়সের পাশাপাশি অভিজ্ঞতা বেড়েছে। ফুটবল পায়ে শিশুমনের আনন্দে খেলে বেড়ানোর পাশাপাশি মেসির মতো কারও সঙ্গে স্মৃতি ধরে রাখাও যে গুরুত্বপূর্ণ, তা বুঝতে শিখেছেন অলমো।

সেদিন মেসির সঙ্গে ছবি তুলে মেসিকে ‘কৃতার্থ করার’ অনুভূতি এখন ১৮০ ডিগ্রি পাল্টে গেছে, ‘এখন এসে মনে হচ্ছে, তাঁরা আমাকে জোর করে ছবি তুলেছে বলেই আমি খুশি। কারণ ওই ছবিটা এখনো আমার বাড়িতে ফ্রেমে সাজিয়ে রেখেছি।’ মজা করে বললেন, ‘সে সময় অবশ্য আমার খেলার মহাগুরুত্বপূর্ণ কিছু মুহূর্তে বাধা পড়ছে দেখে মোটেও খুশি ছিলাম না। সেটা এমন একজন আইকনের পাশে ছবি তোলার জন্য হলেও!’

ফুটবল থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন