বসুন্ধরা কিংসের অনুশীলনে আর্জেন্টাইন স্ট্রাইকার রাউল বেসেরা।
বসুন্ধরা কিংসের অনুশীলনে আর্জেন্টাইন স্ট্রাইকার রাউল বেসেরা।ছবি: শামসুল হক

ফেডারেশন কাপে ৫ ম্যাচে ৫ গোল। যৌথভাবে সর্বোচ্চ গোলদাতা। প্রিমিয়ার লিগের প্রথম পর্বে করেছেন ১২ ম্যাচে ১১ গোল। বসুন্ধরা কিংসের জার্সিতে মৌসুমে ১৭ ম্যাচে মোট গোল ১৬টি।

বাংলাদেশের ক্লাব ফুটবলে সাম্প্রতিক সময়ে কোনো স্ট্রাইকারকে এতটা ধারাবাহিক খুব কমই দেখা গেছে। সেদিক থেকে এখন পর্যন্ত দারুণ সফল বসুন্ধরার ‘নাম্বার নাইন’ রাউল বেসেরা।

ফেডারেশন কাপ ও লিগে ভালো খেলার পর দলকে স্বপ্ন দেখাচ্ছেন এএফসি কাপেও। এসব নিয়েই প্রথম আলোর সঙ্গে কথা বলেছেন ৬ ফুট ২ ইঞ্চি উচ্চতার ৩৩ বছর বয়সী আর্জেন্টাইন স্ট্রাইকার—

বিজ্ঞাপন

প্রশ্ন: বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগে ১২ গোল নিয়ে সবার ওপরে আছেন বসুন্ধরা কিংসের ব্রাজিলিয়ান প্লেমেকার রবসন ও শেখ জামালের গাম্বিয়ান স্ট্রাইকার ওমর জোবে। আপনার ১১টি। তাঁদের টপকে লিগে সেরা গোলদাতা হতে পারবেন?

রাউল বেসেরা: ইনশা আল্লাহ...ইনশা আল্লাহ...(পরিষ্কার উচ্চারণে)। জানি না কত গোল করব। সামনে নির্দিষ্ট কোনো সংখ্যা নেই। যত বেশি সম্ভব গোল করে যেতে চাই। তবে এই মুহূর্তে মনটা একটু খারাপ।

প্রশ্ন: মন খারাপ কেন?

default-image

রাউল: দেশে মা-বাবা করোনা পজিটিভ। তাঁরা আইসোলেশনে আছেন। তবে এখন দুজনের শরীরই ভালো। দুজনের সঙ্গেই ভিডিও কলে নিয়মিত কথা হয়।

প্রশ্ন: আপনি মনে হচ্ছে টুকটাক বাংলা শিখছেন...

রাউল: তেমন কিছু নয়। ‌‌‌‌আমি পছন্দ করি রিকশা। কী অবস্থা...ভালো আছি, হা হা হা।

প্রশ্ন: পরিবারে কে কে আছেন?

default-image

রাউল: স্ত্রী, সন্তান, মা-বাবা, দুই ভাই ও এক বোন। দুই ভাই ও বোন আর্জেন্টিনা পুলিশে কাজ করে। বাবাও পুলিশ ছিলেন। আমিই শুধু ফুটবলে এসেছি।

প্রশ্ন: ফেডারেশন কাপ জয়ের পর লিগের প্রথম পর্বেও বসুন্ধরাকে শীর্ষে রাখতে ভূমিকা আছে আপনার। সামগ্রিকভাবে নিজের খেলায় কি সন্তুষ্ট?

রাউল: অবশ্যই অনেক সন্তুষ্ট। তবে আরও বেশি কিছু করার সামর্থ্য আছে আমার। আমি গত বছর সেপ্টেম্বরে কাতারের উম সালাল ক্লাবে খেলা শেষ করে নভেম্বরেই ঢাকায় চলে আসি। মাত্র তিন সপ্তাহে নিজেকে তৈরি করি। যত দিন যাচ্ছে, আমার আত্মবিশ্বাস বাড়ছে।

default-image

প্রশ্ন: আগামী ১৪-২০ মে মালেতে এএফসি কাপ খেলবে বসুন্ধরা কিংস। দলকে পরের রাউন্ডে নিতে পারবেন?

রাউল: কাজটা কঠিন নয়। টুর্নামেন্টে কলকাতা মোহনবাগান ও মালদ্বীপের মাজিয়া ক্লাব খেলছে। বাংলাদেশের আবাহনীরও সম্ভাবনা আছে। এই দলগুলোর মধ্যে বসুন্ধরা কোনোভাবেই পিছিয়ে নেই। আমি গোল করে দলকে জেতাতে চাই। দলও আমার কাছে গোল চায়।


প্রশ্ন: বসুন্ধরা কিংসের আক্রমণে কিন্তু ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা সমন্বয়টা বেশ ভালো...

রাউল: রহস্য কিছুই নয়। দুই ব্রাজিলিয়ান রবসন ও জোনাথন প্রচুর বল তৈরি করে দেয় আমাকে। বক্সে আমার চলাফেরা, গতিবিধি ওরা বোঝে। রবসন বোঝে কোথায় ক্রসটা করতে হবে। আমি জায়গামতো থেকে হেড করি। যদিও ব্রাজিল ও আর্জেন্টাইন ফুটবলারদের খেলার ধরন একটু আলাদা। ব্রাজিলিয়ান হিসেবে রবসন চায় ভালো খেলা। আর্জেন্টাইনদের খেলা অনেক বেশি ট্যাকটিক্যাল ও গভীর। শুধু রবসন-জোনাথন নয়; ইব্রাহিম, মতিন, সবুজ, সুফিল, বিশ্বনাথ, তপু, ইয়াসিন, রিমনদেরও সহায়তা পাই মাঠে।

প্রশ্ন: বাংলাদেশে আসার আগে এ দেশের ফুটবল সম্পর্কে কোনো ধারণা ছিল?

রাউল: বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের কথা জেনেছি। সবচেয়ে বেশি জেনেছি বিশ্বকাপ ফুটবলের সময় এ দেশে আর্জেন্টিনার হাজার হাজার পতাকা ওড়ার কথা। এটা আমাকে অবাক করেছে। এখানেও ফুটবলের প্রতি মানুষের ভালোবাসা দেখছি।

default-image

প্রশ্ন: আর বাংলাদেশের ফুটবলটাকে কেমন দেখছেন?

রাউল: বাংলাদেশের ফুটবল উন্নতির পথেই রয়েছে। অনেক তরুণ খেলোয়াড় খেলছে। তবে বাংলাদেশের ফুটবল উন্নতির জন্য অনেক ভালো মাঠ দরকার। ভালো মাঠ ছাড়া ভালো ফুটবল হয় না। কুমিল্লা স্টেডিয়ামের মাঠ তুলনামূলক ভালো। বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামে অনেক বেশি ম্যাচ হওয়ায় মাঠ শক্ত, অসমতল। এমন মাঠে ভালো ফুটবল হয় না। বাংলাদেশের ফুটবলে মাঠ সমস্যাটা বুঝেছি জাতীয় দল দোহায় কাতারের কাছে ৫-০ গোলে হারা ম্যাচে। কাতারে খুব ভালো এবং দ্রুতগতির মাঠে খেলতে সমস্যা হয়েছে বাংলাদেশের ফুটবলারদের।

প্রশ্ন: আপনি পেশাদার ফুটবলার। যেকোনো দেশেই খেলতে পারেন। তারপরও বাংলাদেশে খেলতে আসার বিশেষ কোনো কারণ কি আছে?

রাউল: এখানে আসার আগে ভিয়েতনাম, অস্ট্রেলিয়া ও ভারতে খেলার প্রস্তাব ছিল আমার। কিন্তু বাংলাদেশে এসেছি দেশটাকে জানা ও বোঝার আগ্রহ নিয়ে। বসুন্ধরার প্রস্তাবটাও ভালো। আমি ইকুয়েডরে দুটি ও কাতারে একটি এবং আর্জেন্টিনায় ৭-৮টি ক্লাবে খেলেছি। অনেক অভিজ্ঞতা হয়েছে। বাংলাদেশে এসে নতুন অভিজ্ঞতা হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

প্রশ্ন: বাংলাদেশের ফুটবলারদের মধ্যে কার খেলা ভালো লাগে?

রাউল: বসুন্ধরার গোলকিপার জিকো খুব ভালো গোলকিপার। আমার মতে, বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগে সেরা গোলকিপার সে। তপু এবং আবাহনীর এক ডিফেন্ডারও বেশ ভালো। মতিন, জাতীয় দলের অধিনায়ক জামাল ভূঁইয়াসহ বেশ কয়েকজন ভালো মানের খেলোয়াড় আছে। তাদের উন্নতির জন্য ভালো মানের টুর্নামেন্ট দরকার। যত বেশি টুর্নামেন্ট খেলবে তত উন্নতি করবে।

default-image

প্রশ্ন: কিন্তু তাঁরা তো দেশের বাইরে খেলার সুযোগ তেমন পান না...

রাউল: খেলোয়াড়দের দেশের বাইরে খেলার চেষ্টা করতে হবে। যত বেশি খেলবে, তত বেশি অভিজ্ঞ হবে। এর ফল পাবে জাতীয় দল। দেখুন, নেপালের খেলোয়াড়েরাও ভিনদেশে লিগে খেলে। বাংলাদেশের জামাল ভূঁইয়া খেলে এসেছে কলকাতা মোহামেডানে। আমি মনে করি, জিকো, তপুসহ আরও কয়েকজন খেলোয়াড়ের সামর্থ্য আছে দেশের বাইরে খেলার। আবাহনীর নাম্বার সেভেনের (সোহেল রানা) কথাও বলতে পারি, সে–ও দেশের বাইরে খেলার যোগ্যতা রাখে। যখন একজন দেশের বাইরে খেলতে যাবে, তখন অন্যদের জন্যও দরজা খুলবে।

প্রশ্ন: আর্জেন্টিনা দলে খেলা হয়নি বলে নিশ্চয়ই আফসোস আছে...

রাউল: না না। আর্জেন্টিনার জাতীয় দলে ডাক পাওয়া অনেক কঠিন, অনেক লড়াই। আমার সময় হিগুয়েইন জাতীয় দলে ডাক পেয়েছে। অবশ্য চিলির হয়ে খেলার সুযোগ ছিল আমার। সেটা হয়নি। আমার মা চিলির। বাবা আর্জেন্টাইন। সেই সূত্রে চিলিরও নাগরিক আমি।

প্রশ্ন: ক্যারিয়ারে এখন পর্যন্ত কতগুলো গোল করেছেন?

রাউল: কখনো গুনিনি। কেন গুনিনি জানি না (হাসি)। ১২০-১৩০টা তো হবেই। হতে পারে এর চেয়েও বেশি (উইকিপিডিয়ার তথ্যমতে ৯২ গোল)।

প্রশ্ন: কখনো কোনো ক্লাবের হয়ে সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়েছেন?

default-image

রাউল: ইকুয়েডর লিগে সর্বোচ্চ গোলদাতা ছিলাম দুই সপ্তাহ। কিন্তু শেষ পর্যন্ত দ্বিতীয় হয়েছিলাম। এটা ২০১৯ সালের কথা। সে মৌসুমে দেপোর্তিভোর হয়ে ২৮ ম্যাচে ১৮ গোল করি।

প্রশ্ন: ফুটবলার হিসেবে আপনার আদর্শ কে?

রাউল: শুরুতে ছিল রিকেলমে। এখন মেসি। আমি ওর সমর্থক। ও অন্য স্তরে খেলে। স্ট্রাইকার হিসেবে ভালো লাগত ব্রাজিলের রোনালদোকে। একসময় বাতিস্তুতার ভক্ত ছিলাম। তবে সবাইকে ছাপিয়ে আমি ডিয়েগোর (ম্যারোডানা) বেশি ভক্ত। ডিয়েগোর মৃত্যু আমাদের জন্য গভীর বেদনার।

প্রশ্ন: মেসি না রোনালদো—কে সেরা, এই নিয়ে তো অনেক বিতর্ক। আর্জেন্টাইন হিসেবে আপনি নিশ্চয়ই মেসির কথাই বলবেন...

রাউল: অবশ্যই মেসি। ওর খেলাই অন্য রকম। আমার তো দারুণ লাগে। মেসি আমার স্বদেশি—এটা ভেবেই গর্বিত আমি। অবশ্য ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোকেও ভালো লাগে ওর অ্যাথলেটিসিজমের জন্য।

ফুটবল থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন