বিজ্ঞাপন

এই একাডেমির মেয়েদের বিনা মূল্যে অনুশীলন করান তিনি। উল্টো মেয়েদের খাবার খরচসহ যাতায়াত খরচও মাঝেমধ্যে দিতে হয় সুরভিকেই, ‘এই মেয়েরা খুব গরিব পরিবার থেকে এসেছে। শুধু ফুটবল ভালোবেসেই ওরা এই একাডেমিতে খেলতে আসে। অনেক সময় যাওয়ার ভাড়া থাকে না ওদের। তখন আমিই ওদের গাড়িভাড়া দিয়ে দিই।’

default-image

নারায়ণগঞ্জ প্রমীলা ফুটবল একাডেমি থেকে এবার লিগে খেলছেন আট ফুটবলার। সুরভি জামালপুর কাচারিপাড়া একাদশের অধিনায়ক। এই দলের ডিফেন্ডার কামরুন নাহার, রুপা আক্তার, রাত্রি মনি, মিডফিল্ডার সোহেলী শারমিন শ্রাবণী, ফরোয়ার্ড কানন রানীও নারায়ণগঞ্জ প্রমীলা ফুটবল একাডেমি থেকে উঠে এসেছেন। কুমিল্লা ইউনাইটেডে খেলেছেন ফরোয়ার্ড লিপি আক্তার ও ডিফেন্ডার সুমী আক্তার।

নারায়ণগঞ্জের প্রয়াত কোচ মোসলেহ উদ্দিন খন্দকারের হাতে গড়া এই প্রমীলা ফুটবল একাডেমি। নারায়ণগঞ্জে সবার পরিচিত এই ‘বিদ্যুৎ চাচা’ ২০০৫ সাল থেকে একাডেমিটা চালাতেন। কিন্তু ২০১৭ সালে মোসলেহ উদ্দিনের মৃত্যুর পর একাডেমির কোচের দায়িত্ব পান সুরভি।

বিভিন্ন স্কুলে ও গার্মেন্টসে গিয়ে গিয়ে মেয়েদের ফুটবল মাঠে আনতে চেষ্টা করতেন সুরভি। কিন্তু কাজটা মোটেও সহজ ছিল না সুরভির জন্য, ‘মেয়ে হয়ে একাডেমি চালাই বলে অনেকে বাজে কথা বলত। রাস্তা দিয়ে অনুশীলনে যাওয়ার সময় পাড়ার ছেলেরা বলত মেয়ে মানুষ কী খেলবে? আর নারায়ণগঞ্জে যেভাবে গার্মেন্টস বাড়ছিল, কেউ মেয়েদের ফুটবল মাঠে পাঠাতেই চাইত না। কারণ ওরা গার্মেন্টসে ঢুকলেই ৮-১০ হাজার টাকা বেতন পেত। এর ওপর মাঝে কয়েক বছর মেয়েদের ঘরোয়া কোনো লিগ ছিল না। শেষ পর্যন্ত অভিভাবকদের বুঝিয়ে–সুজিয়ে ওদের মাঠে এনেছি।’

একাডেমি চালাতে খরচ অনেক। এই একাডেমির কিছু পরিমাণ আর্থিক সহযোগিতা করেন নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভী। বিভিন্ন সময়ে জেলায় গিয়ে খ্যাপ খেলার টাকা একাডেমির পেছনে খরচ করেন সুরভি। লিগে প্রথম পর্বে বসুন্ধরা কিংসের হয়ে খেলার পারিশ্রমিক ও একাডেমির জন্য খরচ করছেন সুরভি।

default-image

সুরভি গত বছর সেরেছেন এএফসির ‘সি’ লাইসেন্স কোর্স। সেই অভিজ্ঞতা এবং ফুটবল ক্যারিয়ারে বিভিন্ন সময়ে আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে খেলার অভিজ্ঞতা থেকে মেয়েদের ফুটবল শেখান তিনি। কোচ হিসেবে নিজেকে আগের চেয়ে একটু বেশি সমৃদ্ধ করতে পেরে খুশি সুরভি, ‘সি লাইসেন্স করাতে আমার জন্য সুবিধাই হয়েছে। মেয়েদের আরও ভালোভাবে খেলা শেখাতে পারছি।’

সুরভির সঙ্গে সহকারী হিসেবে একাডেমিতে কোচের দায়িত্ব পালন করছেন আরেক সাবেক ফুটবলার আছিয়া খাতুন।

ফুটবলটা যেন সুরভির ধ্যানজ্ঞান। কোনো কিছু পেতে নয়, ভালোবেসেই ফুটবলের সঙ্গে থাকতে চান তিনি, ‘খেলাধুলা আমার রক্তের সঙ্গে মিশে আছে। আমি খেলাধুলা ছাড়তে চাই না।’

মেয়েদের একাডেমিতে পুরুষ কোচ নয়, বরং নারী কোচ বাড়তি সুবিধা হিসেবেই দেখেন সুরভি, ‘মেয়েরা মেয়েদের দায়িত্বটা নিলেই আমি মনে করি সেটা ভালো। কারণ একজন পুরুষ কোচের কাছে একজন অভিভাবক মেয়ে দিতে সাহস করেন না অনেক সময়। কী হবে না হবে সেই সংশয়ে ভোগেন। নারায়ণগঞ্জে সবাই আমাকে সমর্থন দেয়। মেয়ে বলেই এই সহযোগিতাটা পাই। ছেলেদের কাছে ওরা অনেক কিছু বলতে পারে না অনেক সময়, আমার কাছে যা নির্দ্বিধায় বলতে পারে।’

default-image

নিজে জাতীয় দলে খেলার স্বপ্ন না দেখলেও একাডেমির মেয়েদের মাঝে সেই স্বপ্নের বীজ বুনে দিয়েছেন সুরভি। কমলাপুর স্টেডিয়ামে দাঁড়িয়ে বলছিলেন, ‘আমি নিজে চাইলেও জাতীয় দলে খেলতে পারব না। সেই বয়সও নেই। তবে ওদের নিয়ে সেই স্বপ্নটা দেখি। বয়সভিত্তিক জাতীয় দলে এরই মধ্যে ডাক পেয়েছে আমার একাডেমির ফুটবলার নাহার, কানন ও রাত্রি। আমি অনুশীলনে সবাইকে বলি, আমি পারলে তোমরা কেন জাতীয় দলে খেলতে পারবে না?’

জাতীয় দলের একাদশে থাকবে নারায়ণগঞ্জের প্রমীলা একাডেমির সব মেয়ে, সেই স্বপ্নই দেখে চলেছেন সুরভি।

ফুটবল থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন