মোহামেডানের ‘তিন রূপ’ দেখালেন ইংলিশ কোচ
দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম ‘ঢাকা ডার্বি’তে আবাহনীকে ৪-০ গোলে হারিয়ে হোক, একাধিক তরুণ তারকাদের পরিচর্যা করার কারণে হোক কিংবা মাঠে পরিস্থিতি অনুযায়ী নিয়মিত নিজের পরিকল্পনা বদলানোর কারণে হোক, মোহামেডান কোচ শন লেনের মস্তিষ্কের সুনাম কম নয়। আবাহনীর মারিও লেমোস, চট্টগ্রাম আবাহনীর দেশীয় কোচ মারুফুল হকের পাশাপাশি শন লেনকেও তাই লিগের অন্যতম প্রজ্ঞাবান কোচ হিসেবে মানা হয়। নিজের প্রজ্ঞারই আরেকটা উদাহরণ দিলেন এই ইংলিশ কোচ, গতকাল। আর সেটি এমন একটা সময়, যখন মোহামেডানের ঘুরে দাঁড়ানোটা খুব জরুরি ছিল।
আগের ম্যাচেই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী আবাহনীর কাছে ৩-০ গোলে হেরেছে মোহামেডান। হারে কোচের কৌশলের চেয়ে মোহামেডান-ফুটবলারদের শিশুতোষ ভুলগুলোই চোখে লেগেছিল বেশি। সাদা-কালোরা সেদিন তিনটা গোলই হজম করেছিল আবাহনীর লেফটব্যাক রায়হান হাসানের লম্বা লম্বা থ্রো-ইন থেকে। ডিফেন্ডাররা নিজেদের প্রাথমিক কাজটা করতেই যেন ভুলে গিয়েছিলেন। এ ছাড়া শন লেনের যে খুব কৌশলগত ভুল ছিল, সেটা কেউ বলবেন না। কাগজে-কলমে মাত্র দুজন ডিফেন্ডার নামিয়ে নিজের ‘অননুমেয়তা’ ঠিকই বজায় রেখেছিলেন। ওই ম্যাচেও ৩-৫-২ ছকে খেলাতে চেয়েছেন দলকে। পরে ম্যাচের পরিস্থিতি অনুযায়ী নিয়মিত সেই পরিকল্পনায় পরিবর্তন এনেছেন। লাভ হয়নি।
এই ম্যাচটা মোহামেডানের জন্য অনেকটা ‘ডু অর ডাই’ ধরনের ছিল। হারলেই ফেডারেশন কাপ থেকে বাদ, ড্র করলে ভাগ্য ঝুলে থাকত আবাহনীর হাতে। দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া মোহামেডানের জন্য ঘুরে দাঁড়াতে দরকার ছিল বিশেষ কিছুরই। সে ‘বিশেষ কিছু’ই করে দেখালেন মোহামেডানের দুজন। দুজনের একজন অবশ্যই শন লেন, আরেকজন তাঁর নতুন শিষ্য—নাইজেরিয়ার মিডফিল্ডার আবিওলা নুরাত।
মুক্তিযোদ্ধা যে এবারের মৌসুমে দল গঠন করে মাঠে নামতে পারবে, নিশ্চিত ছিল না সেটিই। শেষমেশ খেলতে পারলেও খেলায় সমন্বয়হীনতার ছাপ ছিল স্পষ্ট। সেটা শন লেন বুঝতে পেরেছিলেন বেশ। মুক্তিযোদ্ধার সমন্বয়হীনতার সঙ্গে মোহামেডান কোচের ‘অননুমেয়তা’—দুইয়ে মিলে যা হওয়ার কথা, সেটাই হয়েছে। মুক্তিযোদ্ধা বশ মেনেছে ৪-১ গোলে।
মোহামেডান কোচের কোচিং–বৈচিত্র্য এই ম্যাচেও পেখম মেলেছে। আগের দিন কাগজে-কলমে দুজন প্রথাগত ডিফেন্ডার নামানো শন লেন এ ম্যাচে নামিয়েছিলেন একজন বেশি। রাইটব্যাক হিসেবে প্রথম থেকেই ছিলেন মোহাম্মদ আতিকুজ্জামান। প্রথমে ৪-৩-৩ ছকে খেলা শুরু করলেও ম্যাচের প্রয়োজনে ৪-৪-২, ৩-৫-২/৫-৪-১; মোহামেডান মুহূর্তের মধ্যেই পরিকল্পনা বদলে ফেলছিল বারবার। গোলরক্ষক হিসেবে গত ম্যাচের সুজন নয়, নেমেছিলেন আহসান হাবিব বিপু। মূল সেন্টারব্যাক যথারীতি বুরকিনা ফাসোর মুনজির কুলিদিয়াতি।
কুলিদিয়াতির সঙ্গী হিসেবে মিডফিল্ডার হাবিবুর রহমান সোহাগ চূড়ান্ত হয়ে যাবেন, আপাতত এটাই মনে হচ্ছে। ৭ নম্বর জার্সিধারী মোহামেডানের সেট পিস নেওয়ার মূল খেলোয়াড়, এই ম্যাচেও খেলেছেন বাঁ দিকের সেন্ট্রাল ডিফেন্ডার হিসেবে। কে জানে, আধুনিক ফুটবলে বল পায়ে কুশলী সেন্টারব্যাকের ক্রমবর্ধমান গুরুত্ব দেখে হয়তো লেন সোহাগকে সেন্টারব্যাক বানানোর প্রকল্প হাতে নিয়েছেন! মিডফিল্ডাররা স্বাভাবিকভাবেই ডিফেন্ডারদের চেয়ে বল পায়ে বেশি স্বচ্ছন্দ হন। পেছন থেকে আক্রমণ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে তাঁদের ভূমিকাই থাকে সবচেয়ে বেশি। তারপর সোহাগ আবার বাঁ পায়ের সেন্টারব্যাক। আধুনিক যুগে বাঁ পায়ের সেন্টারব্যাকের মূল্য যে কতটা, সেটা ছয় মাস আগেও ম্যানচেস্টার সিটির কোচ পেপ গার্দিওলার হাহুতাশ দেখে বোঝা গেছে। দলে পর্যাপ্ত পরিমাণ বাঁ পায়ের সেন্টারব্যাক না থাকায় এই স্প্যানিশ কোচ পরে বোর্নমাথের মতো দুর্বল দল থেকে বাঁ পায়ের সেন্টারব্যাক নাথান আকেকে আনতে চার কোটি ইউরো খরচ করেছিলেন।
ডান দিকে আতিক, মাঝে কুলিদিয়াতি ও সোহাগের বাঁয়ে খেলা শুরু করেছিলেন গত ম্যাচে নজরকাড়া লেফটব্যাক কামরুল হাসান। সেন্ট্রাল ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডারের ভূমিকায় থাকা অধিনায়ক উরু নাগাতা এই ম্যাচেও দুপাশে রাকিব খান (ডানে) আর শাহেদ মিয়াকে (বাঁয়ে) নিয়ে মিডফিল্ড জমাট রাখছিলেন।
সামনে আমির হাকিম বাপ্পীর ভূমিকাটা ছিল রাইট উইঙ্গারের। এ ম্যাচে বাপ্পী প্রয়োজনমতো নিচে নেমেছেন, ওপরেও উঠেছেন। বিশেষ করে রাইটব্যাক আতিকের সঙ্গে তাঁর বোঝাপড়াটা চোখে লেগেছে। আতিক যখনই ওভারল্যাপ করে উঠতে গিয়েছেন, বাপ্পী নিচে নেমে রক্ষণ সামলেছেন। ওদিকে লেফট উইঙ্গার হিসেবে খেলা শুরু করা নাইজেরিয়ান মিডফিল্ডার আবিওলা নুরাত দৃশ্যত ফ্রি-রোলে খেলেছেন। আক্রমণভাগের যেখানে খুশি, সেখানে যাওয়ার লাইসেন্স ছিল তাঁর। ওপরে একক স্ট্রাইকার হিসেবে নির্ভরযোগ্য সোলেমানে দিয়াবাতের জায়গায় দেশি স্ট্রাইকার আমিনুর রহমান সজীবের ওপর ভরসা রেখেছেন লেন। শন লেনের ৪-৩-৩ ছকে খেলোয়াড়দের অবস্থান মূলত এটাই ছিল।
তবে ম্যাচের পরিস্থিতি অনুযায়ী প্রায় সময় আরও দুই রূপে দেখা গেছে মোহামেডানকে। ৪-৪-২ ছকে ও ৩-৫-২ (৫-৪-১) ছকে। ৪-৪-২ ছকে ডিফেন্ডার চারজন নিজ নিজ পজিশনে ঠিকই ছিলেন, শুধু মাঝেমধ্যে মূল স্ট্রাইকার আমিনুর রহমানের একটু নিচে অনেকটা সহকারী স্ট্রাইকারের ভূমিকায় দেখা গেছে নুরাতকে, লেফট উইঙ্গার হিসেবে নয়। তখন নিজ নিজ পাশের ফুলব্যাকদের সঙ্গে জুটি বেঁধে দুপাশ নিশ্ছিদ্র রাখতে দেখা গেছে মোহামেডানের দুই ওয়াইড মিডফিল্ডারকে। রাইটব্যাক আতিকের সঙ্গে ছিলেন রাকিব, লেফটব্যাক কামরুলের সঙ্গে শাহেদ। আর মাঝে নাগাতার সঙ্গে বাপ্পী।
তবে ম্যাচ চলাকালে শন লেন সবচেয়ে বড় চমক দেখাচ্ছিলেন মাঝেমধ্যেই দলকে ৩-৫-২ (৫-৪-১) ছকে পরিবর্তিত করে। তখন রাইটব্যাক নয়, কুলিদিয়াতি ও কামরুলের সঙ্গে তৃতীয় সেন্টারব্যাক হয়ে যাচ্ছিলেন আতিক। ওদিকে লেফটব্যাক কামরুল লেফট উইংব্যাকে পরিণত হয়ে লাইসেন্স পাচ্ছিলেন ক্রমে ওপরে ওঠার। ডান দিকে একই কাজ করছিলেন কখনো বাপ্পী, কখনো রাকিব। নিজেদের পায়ে বল থাকলে এ ক্ষেত্রে মোহামেডানের গঠন হচ্ছিল ৩-৫-২, আর মুক্তিযোদ্ধার পায়ে বল থাকলে কামরুল ও রাকিম নেমে গিয়ে গঠনটাকে ৫-৪-১ বানিয়ে দিচ্ছিলেন। ওপরে আমিনুরকে রেখে একটু নিচে নুরাতের মুভমেন্ট যন্ত্রণা দিচ্ছিল মুক্তিযোদ্ধাকে।
দ্বিতীয়ার্ধে বেশ কিছু পরিবর্তন এনে নিজেদের ছক আরও অননুমেয় করে তোলেন শন লেন। মাঠে নামেন মোহাম্মদ মিঠু, জাফর ইকবাল, মোহাম্মদ সোহানুর রহমানের মতো খেলোয়াড়েরা। তবে যে-ই নামুক না কেন, সবার ওপরেই দায়িত্ব ছিল ‘তিনরূপী’ মোহামেডানের নিয়ত পরিবর্তনশীল পরিকল্পনাকে বাস্তবায়ন করা। সেটা হয়েছে ষোলো আনা।
আবিওলা নুরাতের কথা না বললেই নয়। স্ট্রাইকার আমিনুরের পেছনে যেভাবে খেলছিলেন, অনায়াসে মোহামেডান আরও কয়েকটা গোল পেতে পারত। মূল স্ট্রাইকার সোলেমানে দিয়াবাতে খেলেননি এই ম্যাচে। তিনি ফেরার পর দিয়াবাতে-নুরাত জুটি একবার জমে উঠলে মোহামেডান সমর্থকদের আশাবাদী হওয়ার যথেষ্ট কারণ আছে বৈকি!