অবামেয়াংয়ের গোলে ১৪ বছর পর ইউনাইটেডের মাঠে জয় পেয়েছে আর্সেনাল।
অবামেয়াংয়ের গোলে ১৪ বছর পর ইউনাইটেডের মাঠে জয় পেয়েছে আর্সেনাল। ছবি: রয়টার্স

চ্যাম্পিয়নস লিগে লাইপজিগের বিপক্ষে পাওয়া বিশাল জয়টা ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড কোচ ওলে গুনার সুলশারের ‘স্বভাব’ খারাপ করে দিয়েছে, বলা হলে খুব বেশি ভুল বলা হবে কি? গতকাল আর্সেনালের কাছে ১-০ গোলে হেরে যাওয়ার পর এ প্রশ্ন উঠতেই পারে।

একটু ব্যাখ্যা করা যাক। ওলে গুনার সুলশার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে ইউনাইটেডের অবস্থা যেমনই হোক না কেন, গার্দিওলা-ক্লপ কিংবা নিদেনপক্ষে বিয়েলসা-আরতেতার মতো দলের কোনো নির্দিষ্ট স্টাইল গড়ে তুলতে পারেননি। ভালো ফল এসেছে বিক্ষিপ্তভাবে। সেই নির্দিষ্ট স্টাইলের খোঁজে সম্প্রতি সুলশার দলকে খেলানো শুরু করেছেন নতুন এক ছকে। ইউনাইটেড খেলছে ৪-৪-২ ছকে। মিডফিল্ডের চারজন অবস্থান করেন চারকোনায়। দুই সেন্ট্রাল ডিফেন্ডারের মাঝে একজন, একটু ওপরে দুপাশে দুজন, আর ওপরে থাকা দুই স্ট্রাইকারের মাঝে একজন—এভাবেই চার মিডফিল্ডারের অবস্থান থাকে। ফুটবলে এই ছকের একটা গালভরা নাম আছে। ফোরফোরটু ডায়মন্ড। অর্থাৎ ডায়মন্ডের কোনার মতো থাকবে মিডফিল্ডারদের অবস্থান।

বিজ্ঞাপন

এই ছকে খেলানোয় সবচেয়ে বেশি উপকার হয়েছে পল পগবা আর ব্রুনো ফার্নান্দেসের। ফার্নান্দেস এমনিতেও আক্রমণাত্মক মিডফিল্ডার বা নাম্বার টেন হিসেবে খেলতে পছন্দ করেন, অর্থাৎ স্ট্রাইকারের ঠিক পেছনে। পল পগবা ওদিকে আক্ষরিক অর্থে আক্রমণাত্মক মিডফিল্ডার না হলেও তাঁর সৃষ্টিশীলতা অনবদ্য। একটু পেছনে থেকে এমনভাবে খেলতে পছন্দ করেন, যাতে রক্ষণাত্মক ভূমিকা তেমন না পালন করা লাগে। সে ভূমিকাটা পালন করার জন্য আবার একজনকে খেলায় ইউনাইটেড। সেটা ফ্রেড, স্কট ম্যাকটমিনে কিংবা নেমানিয়া মাতিচের মধ্যে যেকোনো একজন।

এই ছকে সেদিন লাইপজিগের বিপক্ষে খেলেছে ইউনাইটেড। পেয়েছে বিশাল জয়। দুই সেন্টারব্যাকের মাঝে ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার হিসেবে মাতিচ, দুপাশে ফ্রেড আর পগবা, ওপরে দুই স্ট্রাইকারের ঠিক নিচে ফার্নান্দেস। ইউনাইটেডের এ ছকের সামনে ৫-০ গোলে পর্যুদস্ত হয়েছিল ইউলিয়ান নাগলসমানের অধীনে দুর্দান্ত আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলতে থাকা লাইপজিগ। ইউনাইটেড সমর্থকেরা আশায় বুক বেঁধেছিলেন, দলের সবচেয়ে প্রতিভাবান দুই মিডফিল্ডার পগবা আর ফার্নান্দেসকে একসঙ্গে খেলানোর উপায় বুঝি কোচ বের করেই ফেলেছেন। সুলশার নিজেও কি আশায় বুক বাঁধেননি?

বেঁধেছিলেন নিশ্চয়ই। না হয় আর্সেনালের বিপক্ষে গত রাতেও একই ছকে দলকে কেন নামাবেন?

default-image

এবার মিডফিল্ডে ছিলেন না মাতিচ। তাঁর জায়গায় ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার হিসেবে দুই সেন্টারব্যাক হ্যারি ম্যাগুয়ার আর ভিক্টর লিন্ডেলভের মাঝে খেলেছেন ফ্রেড। ফ্রেডের একটু পাশে, ডান দিকে খেলেছেন ম্যাকটমিনে। বাঁয়ে পগবা। ওপরে দুই স্ট্রাইকার রাশফোর্ড আর গ্রিনউডের ঠিক নিচে ফার্নান্দেস। আশা ছিল, লাইপজিগ যেভাবে পর্যুদস্ত হয়েছে, আর্সেনালও সেভাবে হবে। যেটা হয়নি।

এই ছকের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো, নাম্বার টেন বা সেন্ট্রাল অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার হিসেবে যিনি খেলেন, তাঁকে ঘিরে আবর্তিত হয় দলের সব আক্রমণ। মিডফিল্ড আর আক্রমণ একসূত্রে গাঁথার কাজটা করতে হয় তাঁকেই। এই ম্যাচে যে দায়িত্বটা ছিল ব্রুনো ফার্নান্দেসের। ঠিকমতো এই দায়িত্ব পালন না করতে পারলে দল মুখ থুবড়ে পড়ে। অর্থাৎ, ইউনাইটেডের এই ছকটা অতিমাত্রায় ‘নাম্বার টেন’ নির্ভর। ‘নাম্বার টেন’ হিসেবে যে খেলবেন, তিনি দুর্দান্ত খেললে দল ভালো খেলবে, না খেললে দলও হারিয়ে যাবে।

বিজ্ঞাপন

ওদিকে আর্সেনাল জানত, ইউনাইটেডের আক্রমণ ব্রুনোকেন্দ্রিক হবে, মাঝখান থেকে হবে সব আক্রমণ। আবার আর্সেনালও ‘নাম্বার টেন’ নির্ভর খেলা খেলে না। ৩-৪-২-১ ছকে দলগতভাবে গড়ে ওঠে গানারদের সব আক্রমণ। এই ছকে স্ট্রাইকারের একদম পিছে কেউ খেলেন না। ফলে দলের একমাত্র আদর্শ সেন্ট্রাল অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার মেসুত ওজিলও এখন আর জায়গা পান না দলে। ম্যাচটা আক্ষরিক অর্থেই হয়ে গিয়েছিল অনেকটা ব্যক্তিপ্রতিভা বনাম দলগত প্রচেষ্টার এক নিদর্শন। জয় হয়েছে দলগত প্রচেষ্টার। আর ওদিকে ব্রুনো ফার্নান্দেস অনেকটা খোলসবন্দী হয়ে ছিলেন থমাস পার্টে ও মোহাম্মদ এলনেনির দুর্দান্ত জুটির কারণে।

ফলাফল সবার চোখের সামনেই। ১-০ গোলে হেরেছে ইউনাইটেড। হয়তো গোল আরও হতো, কিন্তু সুযোগ সৃষ্টি করে শেষমেশ ঠিকমতো গোল না করতে পারার সমস্যাটা আর্সেনালকে বেশ কয়েক সপ্তাহ ধরেই ভোগাচ্ছে। যদি না ভোগাত, যদি আলেকসাঁদ্র লাকাজেতের মতো স্ট্রাইকার আরেকটু ফর্মে থাকতেন, ব্যবধান আরেকটু বাড়তেও পারত।

ইউনাইটেডের বিপক্ষে এ নিয়ে লিগে সর্বশেষ ৪ ম্যাচের ৩টিই জিতল আর্সেনাল, অন্যটি হয়েছে ড্র। আর ইউনাইটেডের আরও বড় হতাশা? নিজেদের মাঠে এবারের লিগে এখন পর্যন্ত চার ম্যাচের একটিও জিততে পারেনি সুলশারের দল। ড্র একটি, হেরেছে তিনটি!

মন্তব্য পড়ুন 0