তাই বলে এই ম্যাচের আবেদন কি একটুও কমেছে? অবশ্যই নয়! শিরোপার গুরুত্ব যার কাছে যেমনই হোক না কেন, একে তো এটি মহাদেশীয় শ্রেষ্ঠত্বের চূড়ান্ত লড়াই, তার ওপর দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীর প্রতিদ্বন্দ্বিতা; যুদ্ধের আমেজ তো এখানে থাকবেই। নেইমাররা মাঠে নামবেন শিরোপা রক্ষা করতেই।

ওদিকে মেসি মাঠে নামবেন নিজের ক্যারিয়ারের একমাত্র অপূর্ণতা ঘোচানোর দায় নিয়ে। এর মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বেশ অনেক ব্রাজিলিয়ানকে দেখা গেছে, যাঁরা দলগত রেষারেষি আর জাতীয়তাবোধের ঊর্ধ্বে উঠে চাইছেন আর্জেন্টিনার হাতে যেন শিরোপা শোভা পায়। কিন্তু কেন? অনুসন্ধানী এক প্রতিবেদনে এর কিছু কারণ বের করেছে আর্জেন্টিনার সংবাদমাধ্যম টিওয়াইসি স্পোর্তস।

অতিরিক্ত মেসিভক্তি

ফুটবলার হিসেবে মেসি নিজেকে যে পর্যায়ে নিয়ে গেছেন, সে কারণে বহুদিন আগে থেকেই মেসিপ্রীতি আর্জেন্টিনা কিংবা স্পেন ছাড়িয়ে ছড়িয়ে গেছে বহু-বহুদূর। মেসির প্রতি ভালোবাসাকে যেন কোনো দেশীয় সীমানা দিয়ে আটকে রাখা যায় না।

গত সপ্তাহেও টিওয়াইসি স্পোর্তসের এক ভিডিওতে দেখা গেছে, অনেক ব্রাজিলিয়ান রাস্তায় নেমেছেন শুধু মেসির প্রতি গলা ফাটানোর জন্য। মেসির প্রতি সমর্থন প্রকাশ করার জন্য। অনেকের হাতে পা পিঠে শোভা পেয়েছে মেসি ছবি আঁকা ট্যাটু। যেহেতু মেসির ক্যারিয়ারে এই একটাই অপ্রাপ্তি, তাই মেসিভক্ত অনেক ব্রাজিলিয়ানই চাইছেন ক্যারিয়ারের এই পর্যায়ে এসে যেন অবশেষে মেসি কিছু একটা জেতেন। তাঁরা মনে করেন, মেসি অন্তত একটা শিরোপা জিতলে তাঁর প্রতি সুবিচার হবে।

ব্রাজিলের কাছে কোপার এখন অত মূল্য নেই

১৯৯৩ সালের পর ব্রাজিল বেশ কয়েকবারই আন্তর্জাতিক শিরোপা জিতেছে। বিশ্বকাপই জিতেছে দুবার। কোপা জিতেছে পাঁচবার। কনফেডারেশনস কাপ জিতেছে চারবার। গত ২৮ বছরে যেখানে ব্রাজিলের ট্রফিকেসে ১১টা শিরোপা জ্বলজ্বল করছে, আর্জেন্টিনার ট্রফিকেসে সেখানে মাকড়সার জাল আর ধুলাবালু ছাড়া কিছুই নেই। শিরোপা জিততে কেমন লাগে, সেটা ব্রাজিলের সমর্থকদের কাছে অজানা কিছু না।

বরং মেসির আর্জেন্টিনাই জানে না, শিরোপা জিততে কেমন লাগে। অনুভূতিটা কী হতে পারে। তাই অনেক ব্রাজিলিয়ান এবার চাইছেন, ২৮ বছরের অধরা শিরোপাটা মেসির হাত ধরে এবারই যাক আর্জেন্টিনার মাটিতে।

করোনাভাইরাস

বিশ্বের যে কয়টি দেশ করোনাভাইরাসের কারণে সবচেয়ে বেশি ধুঁকছে, তাদের মধ্যে ব্রাজিল অন্যতম। রয়টার্সের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৯ লাখের বেশি মানুষ করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন দেশটিতে, মারা গেছেন ৫ লাখ ৩২ হাজার মানুষ। এই তথ্য জানিয়েছে খোদ ব্রাজিলের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়।

যেখানে দেশের অবস্থা এত খারাপ, সেখানে কোপা আমেরিকার মতো টুর্নামেন্ট আয়োজন কেন করা হলো, সেটি নিয়ে প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন ব্রাজিলের অনেক মানুষ। লাভ হয়নি। বহু সমালোচনার মধ্যেও টুর্নামেন্ট আয়োজন হচ্ছে সেখানে। ফলে ব্রাজিলের অনেক মানুষ ব্যাপারটা নিয়ে ক্ষুব্ধ। যে কারণে অনেকেই চাইছেন, নিজের দেশ নয়, বরং আর্জেন্টিনার হাতেই শোভা পাক কোপার শিরোপা।

রাজনৈতিক কারণ

ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট জইর বলসোনারো নিজের দেশে তেমন জনপ্রিয় নন। তাঁর বিরুদ্ধে এর মধ্যেই রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ করেছেন দেশটির কয়েক হাজার মানুষ। করোনাভাইরাসের টিকা নিয়ে দুর্নীতির অভিযোগে বলসোনারোর বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে। করোনাভাইরাসের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে বলসোনারোর ব্যর্থতা নিয়ে পার্লামেন্টারি তদন্তের দাবি জানানো হয়েছে। বলসোনারোর সরকারের বিরুদ্ধে করোনার টিকা নিয়ে ভুল সিদ্ধান্ত, ভুয়া ও মিথ্যা সংবাদ প্রচারের অভিযোগ উঠেছে। করোনার প্রাদুর্ভাবের সময় এটি সামাল দেওয়ার ব্যাপারে ব্যর্থতার অভিযোগও উঠেছে।

সাধারণ মানুষ মনে করে, সরকারের অবহেলা ও হেলাফেলার কারণেই ব্রাজিলে করোনায় এত মানুষ মারা গেছে। এ নিয়ে সাও পাওলো, বেলেম, রেসিফাই, মাসিও শহরে বিক্ষোভ মিছিল হয়েছে। বিক্ষোভকারীরা ‘বলসোনারোর গণহত্যা’, ‘অভিশংসিত বলসোনারো’ এবং ‘টিকাকে হ্যাঁ বলুন’ প্ল্যাকার্ড নিয়ে বিক্ষোভ করেছেন। স্বাস্থ্য খাতে নানা অনিয়মের বিষয়ে ব্যবস্থা না নিয়ে বলসোনারো কোনো অপরাধ করেছেন কি না, সে বিষয়ে আগামী শুক্রবার রাষ্ট্রীয় আইনজীবীরা তদন্ত করবেন বলে ঘোষণা দিয়েছেন।

সব মিলিয়ে ব্রাজিলের মানুষ চাইছেন কোপার শিরোপা যেন দেশে না আসে। কারণটা অনুমান করা কষ্টকর নয়। কোপার শিরোপা দেশে এলেই ফুটবলপ্রিয় ব্রাজিলীয়রা এসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ভুলে গিয়ে ফুটবলের সাফল্যে মেতে থাকবেন। তখন হয়তো বলসোনারোর এসব দুর্নীতি ও অনাচার আড়ালে পড়ে যাবে। ব্যাপারটা চাইছেন না ব্রাজিলের অনেকেই। ফলে তাঁদের আশা, শিরোপা যেন মেসির আর্জেন্টিনা নিয়ে যায়।