রক্ষণ আর ভাগ্য দুই–ই কাল মোহামেডানের

ফেডারেশন কাপের কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে বাদ পড়ে গেছে মোহামেডান।ছবি: শামসুল হক

দুর্দান্ত আক্রমণ ও প্রতি-আক্রমণনির্ভর ম্যাচ কে না পছন্দ করে?

ম্যাচ শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই এক দল গোল দিয়ে দিল। সেই গোলের রেশ কাটতে না কাটতেই আরেক দল গোল শোধ করল। এভাবে চলতেই থাকল। সঙ্গে ক্লিয়ার-কাট সুযোগ সৃষ্টি, গোল মিসের মহড়া—এসব তো চলছেই।

বলার অপেক্ষা রাখে না, নিরপেক্ষ দর্শকদের জন্য লোভনীয় এক ম্যাচের রেসিপি। কিন্তু দল–সংশ্লিষ্ট লোকজন ও সমর্থকদের জন্য? কলিজাটা হাতে নিয়ে বসে থাকা যেন! গতকাল মোহামেডান আর সাইফের খেলাটা ঠিক সেই আমেজই দিয়েছে ভক্ত-সমর্থকদের। একই সঙ্গে দেখিয়েছে, দুই দলের রক্ষণভাগই ঠিক কতটা দুর্বল!

প্রথমবারের মতো সেমিতে খেলবে সাইফ।
ছবি: প্রথম আলো

ম্যাচে সাইফ গোল খেয়েছে আগে, তাই সাইফের রক্ষণ নিয়ে কথা বলা শুরু করা যাক।

রক্ষণে ছিলেন অধিনায়ক রিয়াদুল হাসান, সেন্টারব্যাক পজিশনে তাঁর সঙ্গী নাইজেরিয়ার ইমানুয়েল আরিওয়াচুকু। রাইটব্যাক রহমত, লেফটব্যাক ইয়াসিন আরাফাত। পেছনে গোলরক্ষক পাপ্পু। দুটো গোলই সাইফ হজম করেছে দুটি নিরীহদর্শন কর্নার থেকে। এর মধ্যে প্রথমটায় তো মোহামেডানের দুজন টানা দুবার হেড করার সুযোগ পেয়ে বল জালে ঢুকিয়ে ফেলল। শিরোপার আশা করতে চাইলে সাইফের রক্ষণের সেটপিসে দক্ষতা বাড়ানো কতটা জরুরি, এটাই তার প্রমাণ।

শুধু তাই-ই নয়, এই ম্যাচে মোহামেডানের মাঝমাঠের অন্যতম প্রাণভোমরা নাইজেরিয়ার আবিওলা নুরাত খেলেননি কার্ডসমস্যায় পড়ে। তাঁর জায়গায় নামানো হয়েছিল মিডফিল্ডার ফরহাত মনাকে। মনার সঙ্গে আরেক মিডফিল্ডার শাহেদের যুগলবন্দী, সঙ্গে স্ট্রাইকার হিসেবে এই ফেডারেশন কাপে দ্বিতীয়বারের মতো মাঠে নামা সোলেমানে দিয়াবাতের ক্রমাগত সেন্টার ফরোয়ার্ড থেকে লেফট উইং জোনে চলে যাওয়া ভুগিয়েছে সাইফের রক্ষণকে। প্রতিপক্ষ আক্রমণভাগের খেলোয়াড়দের এমন মুভমেন্টে ডিফেন্ডাররা জায়গাচ্যুত হয়ে গেলে গোলের সুযোগ সৃষ্টি হবেই। আর সে সুযোগে মোহামেডানের শাহেদ বা মনারা গোল করতে না পারলেও অন্য দলের কেউ যে পারবেন না, বলা যায় না।

নিজের রক্ষণ কাল মোহামেডান গোলরক্ষক আহসানকে সাহায্য করেনি কোনো।
ছবি: প্রথম আলো

এবার আসা যাক মোহামেডানের রক্ষণে। নড়বড়ে রক্ষণের সমস্যাটা মোহামেডানের আজকের নয়। গতকালও সেটা দেখা গেছে পুরোদমে। লেফটব্যাকে গত দুই ম্যাচে কামরুলকে খেলানো হলেও এই ম্যাচে মিডফিল্ডার রাকিবকে ওই পজিশনে খেলিয়েছেন কোচ শন লেন। আগের ম্যাচগুলোতেও ছক কিংবা খেলোয়াড়দের পজিশন নিয়ে অননুমেয় পথে চলা লেন এই ম্যাচে রাকিবের পজিশন নিয়ে আবারও যেন একটু অননুমেয়তার আশ্রয় নিলেন। রাকিবের মুভমেন্ট, সময়-সময় লেফট সেন্টারব্যাক হাবিবুরের লেফটব্যাক পজিশনে চলে আসাটা যথারীতি মোহামেডানের ছককে ক্রমাগত ৪-১-৩-২ থেকে ৩-১-৪-২ বানিয়েছে।

তবে ডিফেন্ডাররা যদি নিজেদের আসল কাজটাই করতে ভুলে যান, তাহলে ছক নিয়ে কোচের পরীক্ষা-নিরীক্ষা কতটুকুই–বা কাজে আসে? রাকিবের সঙ্গে এই ম্যাচে মোহামেডানের রক্ষণভাগ সামলেছেন মুনাজির কুলদিয়াতি, আতিকুজ্জামান ও হাবিবুর। রক্ষণভাগের নেতা অনায়াসে বলা যায় কুলদিয়াতিকেই। গ্রুপ পর্বে আবাহনী ও মুক্তিযোদ্ধার বিরুদ্ধে ম্যাচ দুটোতে তাঁর ট্যাকল-ইন্টারসেপশন কিংবা পেছন থেকে পাস দিয়ে খেলা গড়ে দেওয়ার সামর্থ্য নজর কাড়লেও একটা গুরুত্বপূর্ণ দিকে তাঁর দুর্বলতা চোখে পড়েছে। সেটা হলো তাঁর পজিশনিং ও মার্কিং করার ক্ষমতা।

প্রতিপক্ষের যে তারকাকে চোখে চোখে রাখার দায়িত্ব দেওয়া হয় তাঁকে, বুরকিনা ফাসোর এই ডিফেন্ডার প্রায় সময় ব্যাপারটা ভুলে যান যেন। আবাহনীর বিপক্ষে ম্যাচটায় জুয়েল রানার দ্বিতীয় গোলটাই যেমন। বুঝতেই পারেননি কীভাবে বল জুয়েলের কাছে চলে গিয়েছিল।

মোহামেডানের রক্ষণের ভুলেই দুই গোল পেয়েছে সাইফ।
ছবি: প্রথম আলো

একই ব্যাপার দেখা গেল গতকালও। ফাহিমের কর্নার থেকে বল কোনো ধরনের বাধা ছাড়াই আলতো করে পড়ল সাইফের আগুয়ান ডিফেন্ডার ইমানুয়েল আরিওয়াচুকুর পায়ে। সেখান থেকে দুর্দান্ত প্লেসিংয়ে গোল। আরিওয়াচুকুর মার্কার? কুলদিয়াতি!

দ্বিতীয় গোলেও একই কাহিনি। অবশ্য এখানে দায় ভাগাভাগি করে নেওয়ার জন্য রক্ষণ-সতীর্থ হাবিবুরকেও পাবেন এই ডিফেন্ডার। মাঝমাঠ থেকে উড়ে আসা এক বল ঠিকঠাক ক্লিয়ার করতে পারেননি কুলদিয়াতি। বল একবার ড্রপ খাওয়ার পরেও তার ফ্লাইট বুঝতে পারেননি আরেক ডিফেন্ডার হাবিবুর। ফলাফল? ফাঁকা দাঁড়িয়ে থাকা স্ট্রাইকার কেনেথ এনগোকে ডান পায়ের নিখুঁত শটে এগিয়ে দেন দলকে। হাস্যকর ভুলগুলো না হলে কিংবা অপর প্রান্তে শাহেদ, মনারা নিজেদের সুযোগ ঠিকঠাক কাজে লাগালে প্রথমার্ধেই ম্যাচ শেষ করে ফেলতে পারত মোহামেডান। অন্তত পাঁচ গোলের ব্যবধানে এগিয়ে থাকত।

বাঁ দিকে কামরুলের জায়গায় রাকিবের অন্তর্ভুক্তি মোহামেডানকে অননুমেয় করেছে। তবে প্রথমার্ধের ঝড়ঝাপটা সামলানোর পর সেদিকে বেশ ভালোই নজর দিয়েছে সাইফ। ফলে ম্যাচ যত গড়িয়েছে, মোহামেডান ডান দিকনির্ভর আক্রমণ করতে চেয়েছে। ডান দিক থেকে শাহেদ, আতিক, মনারা বারবার আক্রমণে উঠতে চেয়েছেন দ্বিতীয়ার্ধে।

সেট পিসে দুর্বলতা ছিল দুই দলেরই।
ছবি: প্রথম আলো

বিদেশি স্ট্রাইকারের পেছনে ৯০ মিনিট ধরে ক্রমাগত দৌড়াতে থাকা, গতির খেলায় প্রতিপক্ষ ডিফেন্ডারদের নিয়ত পরাস্ত করা একজন আক্রমণাত্মক মিডফিল্ডার যে কতটা জরুরি, সেটা বোঝা গেছে আবিওলা নুরাতের না থাকা ও সাইফের জার্সিতে জন ওকোলির ঝলক দেখে। সাইফ যথারীতি ৪-৩-৩ ছকে মাঝমাঠে তিনজন রেখে খেলেছে। ১০ নম্বর জার্সিধারী শাহেদ দুই সেন্টারব্যাকের একটু ওপরে ডিপ লেয়িং প্লেমেকারের ভূমিকায়, তাঁর এক পাশে আদর্শ ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডারের ভূমিকায় জামাল ভূঁইয়ার জায়গায় দলে আসা সিরোজিউদ্দিন রাখমাতুল্লেভ ও আরেক পাশে বক্স-টু-বক্স মিডফিল্ডার হিসেবে জন ওকোলি। বিশেষ করে ওকোলি তিন মিডফিল্ডারের একজন হয়ে খেললেও প্রায় তিন ফরোয়ার্ডের (এনগোকে, ফাহিম ও আরিফুল) পেছনে আরেকজন ছদ্ম ফরোয়ার্ড হিসেবে উঠে যাচ্ছিলেন, যা সাইফের ছকটাকে আক্রমণে ৪-২-৪ করে ফেলছিল।

ওকোলির এই ভূমিকা দেখেই হতাশ হওয়ার কথা মোহামেডান–সমর্থকদের। তাঁদেরও যে একজন নুরাত নামের ওকোলি ছিলেন! কার্ডের খাঁড়ায় পড়ে যে ম্যাচটা খেলা হয়নি তাঁর। নুরাতের জায়গায় মূল স্ট্রাইকার সোলেমানে দিয়াবাতের পাশে খেলিয়েছেন দেশীয় স্ট্রাইকার আমিনুল ইসলাম সজীবকে। যে সজীবের মুভমেন্ট, জায়গা সৃষ্টির ক্ষমতা, সতীর্থদের খেলানো, গোলে শট নেওয়া—কোনোটাই নজর কাড়েনি। শেষমেশ টাইব্রেকেও গোল না করতে পেরে ব্যর্থতার ষোলোকলা পূর্ণ করেছেন। কে জানে, তাঁর জায়গায় নুরাত থাকলে হয়তো এত কিছু হতো না!

টাইব্রেকের ব্যর্থতাও ডুবিয়েছে মোহামেডানকে।
ছবি: প্রথম আলো

শেষ দিকে ফাহিম, ওকোলি, কেনেথদের একের পর এক মিস ও মোহামেডানের গোলরক্ষক আহসান হাবিবের বীরত্বেই ম্যাচ গড়িয়েছে অতিরিক্ত সময়ে। পরে টাইব্রেকে। সেখানে সাইফের একজন বাড়তি বিদেশির বাড়তি দমই যেন পার্থক্য গড়ে দিল ম্যাচটায়। শেষে মোহামেডানের খেলোয়াড়েরা একদম হাঁপিয়ে গিয়েছিলেন, মানসিক চাপও যেন ওভাবে নিতে পারছিলেন না। না হয় যে আতিকুজ্জামান ম্যাচের শুরুতেই দুর্দান্ত এক হেডে দলকে এগিয়ে দিলেন, সেই আতিকুজ্জামান অমন দুর্বল এক শটে টাইব্রেকের পেনাল্টি মিস করবেন কেন?

শেষমেশ ম্যাচটা তাই গোল মিস আর দুর্বল রক্ষণেরই বিজ্ঞাপন; দিন শেষে যা নিখাদ বিনোদন দিয়েছে গোলের খেলা ফুটবলের প্রেমিকদের।