রিয়ালের ব্রাজিলিয়ানকে না পাওয়ার আফসোস নতুন করে পোড়াবে লিভারপুলকে?

রিয়ালে আলো ছড়াচ্ছেন দুই তরুণ ব্রাজিলিয়ান—রদ্রিগো ও ভিনিসিয়ুসছবি: টুইটার

রিয়াল মাদ্রিদের এই মৌসুমের চ্যাম্পিয়নস লিগে ফাইনালে ওঠার পেছনে বড় অবদান কার?

উত্তরে করিম বেনজেমার সবার আগে যে আসবে, তা নিয়ে সংশয় নেই। এরপর? মাঝমাঠে ৩৬ বছর বয়সী ‘তরুণ’ লুকা মদরিচের সবটুকু দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়া, চোখে লেগে থাকার মতো সব পাসে ব্যবধান গড়ে দেওয়ার মুহূর্তগুলোও মনে ভেসে আসবে। বাঁ উইং ধরে ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের ব্রাজিলিয়ান ঝলকের কথাও আসবেই!

কিন্তু এতকিছুর মধ্যে আরেকজন ব্রাজিলিয়ানের নাম হয়তো একটু আড়ালেই থেকে যায়—রদ্রিগো! ২১ বছর বয়সী ব্রাজিলিয়ান ফরোয়ার্ড নিয়মিত একাদশে সুযোগ পাননি, সে কারণে তাঁর কথা প্রথমেই মনে না পড়া হয়তো স্বাভাবিকই। কিন্তু যখনই সুযোগ পেয়েছেন, রদ্রিগো যে নিজের প্রতিভার জানান দিয়েছেন দারুণভাবে। সেমিফাইনালে ম্যানচেস্টার সিটির বিপক্ষে রিয়ালের অবিশ্বাস্য রূপকথাও তো তাঁর সৌজন্যেই লেখা।

অথচ একটু এদিক-ওদিক হলে সেই রদ্রিগোই হতে পারতেন লিভারপুলের! তখন অল্পের জন্য তাঁকে না পাওয়ার আফসোসে পুড়েছে লিভারপুল, রিয়াল তাঁকে অনেক বড় অঙ্কে দলে টেনেছে। প্যারিসে আজ চ্যাম্পিয়নস লিগের ফাইনালেও ইয়ুর্গেন ক্লপের দলকে আবার পোড়াবেন ব্রাজিলিয়ান তরুণ?

রদ্রিগো আজ আলো ছড়াবেন প্যারিসে?
ছবি: রয়টার্স

রদ্রিগোর নামটা লিভারপুল কোচ ক্লপের চোখে পড়ার গল্পটাও একটু চমকজাগানিয়া। চ্যাম্পিয়নস লিগ ফাইনালের আগে আজ দুই দলের অনেক তারকার কথাই তো আলাদা করে উঠে আসছে, ম্যানচেস্টার সিটির বিপক্ষে সেমিফাইনালে অবিশ্বাস্য গল্প লেখা রদ্রিগোর নাম আর বাদ থাকে কী করে! তাঁর সেই গল্পেই জানা গেল, ইউটিউবে খুঁজতে গিয়েই রদ্রিগোর দেখা পান ক্লপ। সে সময়ে ১৬ বছর বয়সী ব্রাজিলিয়ান তরুণকে খুব করেই দলে চেয়েছিলেন লিভারপুল কোচ, কিন্তু পাওয়া হয়নি রিয়ালের আগ্রাসী দলবদল আর ম্যানচেস্টার সিটির সাবেক এক খেলোয়াড়ের কারণে।

পাঁচ বছর আগে ক্লপের রদ্রিগোকে ইউটিউবে খুঁজে পাওয়ার ঘটনাটা জানা গেছে ব্রাজিলিয়ান ফরোয়ার্ডের মুখপাত্র নিক আরকারির সৌজন্যে। সাও পাওলো-ভিত্তিক সাংবাদিক জর্জ নিকোলার ইউটিউব চ্যানেল ‘কানাল দে নিকোলা’তে আরকারি বললেন, ‘১৬ বছর বয়সে রদ্রিগো যখন সান্তোসের সঙ্গে ওর প্রথম পেশাদার চুক্তি সই করতে যাবে, লিভারপুলের এক পরিচালক আমাকে ফোন করে বললেন যে ক্লপ এরই মধ্যে এই খেলোয়াড়ের ব্যাপারে সবকিছু জানেন। রদ্রিগোর সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে দেখা করতে চান তিনি।’

ক্লপ প্রথম কীভাবে জানতে পেরেছেন রদ্রিগোর কথা? আরকারির বর্ণনা, ‘তিনি (ক্লপ) ইউটিউবে ‘ট্যালেন্টস ফ্রম ব্রাজিল’ লিখে সার্চ দিয়েছিলেন, রদ্রিগোর ভিডিও আসে সেখানে। তখনো ওর বয়স অনেক কম। তিনি ব্রাজিলে এলেন, ওকে তাঁদের খুব পছন্দ হলো। আমার সঙ্গে যোগাযোগ করলেন। লিভারপুলের ওই পরিচালক চেয়েছিলেন, তাঁর দলে টানা প্রথম খেলোয়াড়ই হোক রদ্রিগো।’

কিন্তু হয়নি ম্যানচেস্টার সিটির সাবেক ব্রাজিলিয়ান মিডফিল্ডার এলানোর বাধায়। ২০১৭ সালের শুরুর দিকের সে সময়টাতে সান্তোসের সহকারী কোচ হিসেবে কাজ করছিলেন এলানো। রদ্রিগোর জন্য লিভারপুলের প্রস্তাব শুনে দাম নিয়ে আপত্তি ছিল তাঁর। ‘আমি বোর্ডের কাছে গিয়ে বললাম, ‘‘না! না! এত কম দামে ওকে আমরা ছাড়তে পারি না।’’ প্রস্তাবটা ছিল মাত্র ৩০ লাখ ইউরোর, কথাবার্তা অনেকদূর এগিয়েও গিয়েছিল। বলতে গেলে চুক্তি হয়েই গিয়েছিল। মৌখিক সম্মতি হয়ে গিয়েছিল দুই পক্ষের। কিন্তু আমি বলেছিলাম, ‘‘এটা হতে দেওয়া ঠিক হবে না।’’’

সাদা চোখে ১৬ বছর বয়সী একজন, যাঁর পেশাদার চুক্তিই হয়নি, তাঁর জন্য ৩০ লাখ ইউরো একেবারে কম অঙ্ক নয়। যুব প্রকল্পে থাকা খেলোয়াড়দের দাম সাধারণত এরকমই হয়। কিন্তু এলানো রদ্রিগোর প্রতিভা চিনতে পেরেছিলেন। ভবিষ্যতে রদ্রিগোর দাম আরও বেশি হবে ভেবেই তাঁকে তখন বিক্রি করতে দিতে রাজি ছিলেন না এলানো। বিবিসিতে বলেছেন, ‘ওর বয়স তখন মাত্র ১৬ বছর। ওকে ঘিরে অনেক বড় আশা ছিল। যদিও ও মূল দলে কখন খেলতে পারবে, সেটি তো আর নিশ্চিত ছিল না। সে কারণে আমি রদ্রিগোর কাছে গিয়ে নিশ্চয়তা দিলাম, ‘‘আমরা তোমাকে শিগগিরই মূল দলে নিয়ে নেব। কথা দিচ্ছি তোমাকে।’’’

এর কিছুদিন পরই সান্তোসের মূল কোচ বরখাস্ত হওয়ায় দলের অন্তর্বর্তীকালীন কোচের দায়িত্ব পান এলানো। ব্যস, রদ্রিগোর মূল দলে দরজা খুলে গেল! ‘কিছুদিন পরই আমি অন্তর্বর্তীকালীন কোচের দায়িত্ব পেলাম। তাতে ভাবনার চেয়েও দ্রুত সময়ে আমি ওকে (রদ্রিগো) দেওয়া প্রতিশ্রুতি পালনের সুযোগ পেলাম। ওকে মূল দলের অনুশীলনে নিয়ে এলাম, পেশাদার ফুটবলার হিসেবে অভিষেকও হয়ে গেল।’

লিভারপুলের তাঁকে পাওয়া হয়নি। এক বছর সান্তোসেই খেলার পর ২০১৮ সালে রিয়াল মাদ্রিদ রদ্রিগোর দিকে হাত বাড়ায়। এলানো যেমনটা ভেবেছিলেন, এক বছরের মধ্যেই লিভারপুলের প্রস্তাবিত অঙ্কের ১৫ গুণ দামে তাঁকে বিক্রি করে সান্তোস! আগেই চড়া দামে ভিনিসিয়ুস জুনিয়রকে কেনা রিয়াল মাদ্রিদ ১৭ বছর বয়সী রদ্রিগোকে পেতে খরচ করে ৪ কোটি ৫০ লাখ ইউরো!

ম্যান সিটির বিপক্ষে রদ্রিগোর হেডেই সমতায় ফেরে রিয়াল
ছবি: রয়টার্স

বিনিয়োগটা নিয়ে মাদ্রিদের কূলীনদের মোটেও আর অতৃপ্তি থাকার কথা নয়। বেনজেমা, ভিনিসিয়ুসদের কারণে হয়তো নিয়মিত সুযোগ মেলে না। যা-ও মেলে, সেটিও আক্রমণের ডান পাশে। রদ্রিগো মূলত বাঁ উইং আর মাঝে প্লেমেকারের ভূমিকায় বেশি স্বচ্ছন্দ হলেও ডান উইংয়েও বেশ মানিয়ে নিয়েছেন। যত দিন যাচ্ছে, গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে জ্বলে ওঠার ক্ষমতার প্রমাণও আরও বেশি করে দিচ্ছেন রদ্রিগো। এমনই যে, রিয়ালে তাঁর ডাকনামই হয়ে গেছে ‘মি. চ্যাম্পিয়নস!’

গত মৌসুমে লিগ ও চ্যাম্পিয়নস লিগ মিলিয়ে মাঠে নেমেছিলেন মোট ৩৩ ম্যাচে, যদিও এর ২০টিতেই বদলি হিসেবে নেমেছেন। গোল করেছেন তিনটি। এই মৌসুমে মাঠে নেমেছেন ৪৩ ম্যাচে, এর মধ্যে শুরুর একাদশে ছিলেন ২১ ম্যাচে। গোল করেছেন ৯টি, মজার ব্যাপার এর মধ্যে চ্যাম্পিয়নস লিগেই ৫টি (১০ ম্যাচে)! চ্যাম্পিয়নস লিগে গোল করিয়েছেন আরও দুটি। তাঁর পাঁচ গোলের মাহাত্ম্যও দেখুন, তাঁর সর্বশেষ তিনটি গোলই রিয়ালের মহাকাব্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শব্দগুলো লিখেছে।

চেলসির বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালে পিছিয়ে পড়া রিয়ালকে সমতায় ফিরিয়েছেন মদরিচের চোখধাঁধানো পাসে গোল করে। সেমিফাইনালে দ্বিতীয় লেগের ৮৯ মিনিটেও ২-০ গোলে পিছিয়ে থাকা রিয়ালকে সমতায় ফিরিয়েছেন ৯০ ও ৯১ মিনিটে দুই গোলে। ‘মি. চ্যাম্পিয়নস’ ডাকা হবে না-ই বা কেন!

প্রথাগত স্ট্রাইকার না হয়েও তাঁর গোল করার মতো জায়গায় চলে যাওয়ার ক্ষমতা, গোল খুঁজে নেওয়ার চোখ, নিয়মিত একাদশে না থেকেও দলে প্রভাব ফেলতে পারার ক্ষমতা আজ প্যারিসের ফাইনালে রদ্রিগোর দিকে নজর রাখতে বাধ্য করবেই! রিয়ালের দলের ভারসাম্যের প্রয়োজনে হয়তো একাদশে তাঁর বদলে মিডফিল্ডার ভালভার্দেকে খেলানোর সম্ভাবনা বেশি, কিন্তু একাদশে থেকে বা বদলি হিসেবে—মাঠে নামতে পারলে রদ্রিগো কিছু করে দেখাবেন, এমন বিশ্বাস সম্ভবত রিয়ালের বেশিরভাগ সমর্থকেরই আছে।

লিভারপুলকে সে ক্ষেত্রে আজ আবার আফসোসে পোড়াবেন রদ্রিগো?