কাভানি করেছেন জোড়া গোল।
কাভানি করেছেন জোড়া গোল। ছবি: রয়টার্স

গত দুই মৌসুমে চারবার চারটি ফাইনালে ওঠার খুব কাছে গিয়েও থেমে যেতে হয়েছে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডকে। উলে গুনার সুলশারের অধীনে দলটা যে ধীরে ধীরে বেশ গুছিয়ে উঠছে, সেটার প্রমাণ পারফরম্যান্সে মাঝেমধ্যে এলেও শিরোপামঞ্চের লড়াইয়ে যাওয়া হচ্ছিল না রেড ডেভিলদের।

অবশেষে কাল সে আক্ষেপ ঘোচানোর পথে অনেকটা এগিয়ে গেছে ইউনাইটেড। ‘অনেকটা’ শব্দটা আসলে কাগজে-কলমের হিসাব আর অনিশ্চয়তার প্রতি সম্মান দেখিয়েই বলা, না হলে কাল ইউরোপা লিগের সেমিফাইনালে রোমাকে যেভাবে হারিয়েছে ইউনাইটেড, তাতে সুলশারের অধীনে তাদের প্রথম কোনো ফাইনালে ওঠা নিয়ে সংশয় কার্যত নেই-ই!

সেমিফাইনাল-জুজু ইউনাইটেড কাটিয়েছে যে ৫৭ বছর পুরোনো রেকর্ড ছুঁয়ে! নিজেদের মাঠে বিরতিতে পিছিয়ে থাকা ইউনাইটেড ৬-২ গোলে উড়িয়ে দিয়েছে রোমাকে। জোড়া গোল করেছেন ব্রুনো ফার্নান্দেজ ও এদিনসন কাভানি। গোল পেয়েছেন পল পগবা ও গত কদিনে দারুণ ছন্দে থাকা তরুণ ম্যাসন গ্রিনউডও।

৬-২ গোলের জয়ে রেকর্ডটা কী? ইউরোপিয়ান কোনো টুর্নামেন্টের সেমিফাইনালের মঞ্চে কোনো দল ছয় গোল দিয়েছে, এমনটা সর্বশেষ দেখা গেছে ১৯৬৪ চ্যাম্পিয়নস লিগের (তখন টুর্নামেন্টের নাম ছিল ইউরোপিয়ান কাপ) সেমিফাইনালে, আধা ডজন গোলের উল্লাসে সেদিন ভেসেছিল রিয়াল মাদ্রিদ।

বিজ্ঞাপন

ইউরোপা লিগের অন্য সেমিফাইনালের প্রথম লেগে অবশ্য ইংল্যান্ডের আরেক দল আর্সেনাল পেয়েছে দুঃসংবাদ। নিজেদের সাবেক কোচ উনাই এমেরির বর্তমান দল ভিয়ারিয়ালের মাঠে গিয়ে লন্ডনের ক্লাবটি হেরে এসেছে ২-১ গোলে।

ওল্ড ট্রাফোর্ডে ম্যাচের বিরতিতে ইউনাইটেডও কি এমন কিছুর শঙ্কায় ছিল? সে সময় ইউনাইটেডও তো ২-১ গোলেই পিছিয়ে ছিল। ৯ মিনিটে ব্রুনো ফার্নান্দেজের গোলে এগিয়ে যায় ইউনাইটেড, কিন্তু তেঁড়েফুড়ে এরপর উঠে আসে রোমা। ইতালিয়ান লিগে এই মুহূর্ত সপ্তম রোমার আগামী মৌসুমে চ্যাম্পিয়নস লিগে খেলার একমাত্র পথ এবারের ইউরোপা লিগ জেতা, গোল খাওয়ার পর কাল রোমা খেলেছেও তেমনই প্রেরণা নিয়ে।

default-image

১৫ মিনিটে বক্সে পগবার হাতে বল লাগায় পেনাল্টি পায় রোমা, তা থেকে লরেঞ্জো পেল্লেগ্রিনির গোলে সমতা। ৩৩ মিনিটে এদিন জেকো কড়লেন অন্য রকম কীর্তি গড়া গোল। ৩৫ বছর বয়সী সার্বিয়ান স্ট্রাইকার ২০০০, ২০১০ এর পর ২০২০—তিন দশকেই ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের বিপক্ষে গোল করলেন তিনটি ভিন্ন দলের হয়ে, তিনটি ভিন্ন টুর্নামেন্টে।

কিন্তু এগিয়ে থাকলেও রোমের অবস্থা তখন নড়বড়ে। চোটের কারণে প্রথমার্ধেই তিন খেলোয়াড় বদল করতে হয় পাওলো ফনসেকার দলকে। গোলকিপার পাউ লোপেস ও মিডফিল্ডার জর্ডান ভেরতুকে আগেই উঠিয়ে নিতে হয়েছিল, জেকোর গোলের পর উঠিয়ে নিতে হয় লেফটব্যাক স্পিনাসসোলাকেও। ৩-৪-২-১ ছকে খেলা রোমার জন্য স্পিনাসসোলার মতো একজন উইংব্যাককে হারানো বড় ধাক্কাই।

তা আর কাটিয়ে ওঠা হয়নি রোমার। ইউনাইটেড দ্বিতীয়ার্ধে দারুণভাবে ফিরে এসে রীতিমতো ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে। পল পগবা ও ফার্নান্দেজের সৃষ্টিশীল মাঝমাঠের সামনে কাভানির মতো শিকারি স্ট্রাইকারকে খেলালে, আর তাঁরা ছন্দ খুঁজে পেলে কী হয়, তা-ই বোঝাল ইউনাইটেড।

৪৮ ও ৬৪ মিনিটে কাভানির দুই গোলে ম্যাচ ঘুরে গেল, ৭১ মিনিটে পেনাল্টি থেকে ফার্নান্দেজের গোলে ততক্ষণে এই ম্যাচে জয় নিয়ে শঙ্কা-টঙ্কা উড়িয়ে দিয়েছে ইউনাইটেড। যদিও ইউনাইটেডেরই সাবেক ডিফেন্ডার ক্রিস স্মলিংকে যে ফাউলের কারণে পেনাল্টিটা দেওয়া হয়েছে, তাতে এই পেনাল্টি দেওয়া নিয়ে বিতর্ক আছে।

তা যা-ই হোক, ইউনাইটেডের তখন বাকি ছিল প্রথম লেগেই ফাইনালে খেলার নিশ্চয়তা অনেকটা ঠিক করে ফেলা, ৭৫ মিনিটে পগবা আর ৮৬ মিনিটে গ্রিনউডের গোলে সেটাও নিশ্চিত করে ফেলল সুলশারের দল।

বিজ্ঞাপন
default-image

ইউরোপিয়ান টুর্নামেন্টে এক ম্যাচে ছয় বা তার বেশি গোল ইউনাইটেড সর্বশেষ দিয়েছে ২০০৬–০৭ চ্যাম্পিয়নস লিগের কোয়ার্টার ফাইনালে। সেটিও রোমার বিপক্ষেই, ২০০৭ সালের এপ্রিলে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর ঝলসে ওঠার সেই ম্যাচে ৭-১ গোলে জিতেছিল ইউনাইটেড।

কালও অত গোল তো প্রায় করেই ফেলেছিল! অত গোল না হলেও যা হয়েছে, তাতেই ইউনাইটেড কোচ সুলশারের মুখে চওড়া হাসি, ‘(প্রথমার্ধে পিছিয়ে থাকার পর) দল যেভাবে জবাব দিয়েছে, সেটাতে আমি অনেক সন্তুষ্ট। দ্বিতীয়ার্ধটা অনেক ভালো ছিল।’

২০১৬ সালে ইউরোপা লিগ জেতাই ইউনাইটেডের সর্বশেষ কোনো ট্রফি জয়ের সুখস্মৃতি। সুলশারের অধীনে সে ট্রফিখরা ঘোচানোর লক্ষ্যে ছুটছে ইউনাইটেড। লিগ নিয়ে এখন আর তেমন চিন্তা নেই রেড ডেভিলদের; শিরোপা জিতবে না—তা যেমন অনেকটা নিশ্চিত, তেমনি বলতে গেলে নিশ্চিত লিগের সেরা চারে থেকে আগামী মৌসুমের চ্যাম্পিয়নস লিগে খেলাও।

সে কারণেই কি না, রোববার লিগে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী লিভারপুলের বিপক্ষে ম্যাচ সামনে রেখেও সুলশার কাল নামিয়েছেন পূর্ণ শক্তির দল। ফল? ৬ গোল তো করেছেই, ম্যাচে ৬৪ শতাংশ বলের দখল রাখা ইউনাইটেড শট নিয়েছে ২০টি, যেখানে রোমা শট নিয়েছে ৫টি।

দল এভাবে ঝলসে উঠেছে দেখে সুলশার অবশ্য খুব একটা চমকে যাননি, ‘আমরা জানি আমাদের সৃষ্টিশীল খেলোয়াড় আছে। এমন খেলোয়াড় যারা বড় সুযোগ তৈরি করতে পারে, গোল করতে পারে। এখানে মূল ব্যাপারটা হচ্ছে ওদেরকে নিজেদের জায়গামতো খেলানো। মার্কাস (রাশফোর্ড), ব্রুনো, পল, এদিনসন সবাই-ই পার্থক্য গড়ে দিতে জানে। আজকে পার্থক্যটা হলো আমরা যেসব সুযোগ তৈরি করেছি, তার বেশিরভাগই কাজে লাগিয়েছি।’

default-image

অন্য ম্যাচে ভিয়ারিয়ালের মাঠে ৫ মিনিটেই গোল খেয়েছে আর্সেনাল। মানু ত্রিগেরোস এগিয়ে দেন আর্সেনালেরই সাবেক কোচ এমেরির দলকে। ২৯ মিনিটে রাউল আলবিওলের গোলে আরও বড় ধাক্কা খায় আর্সেনাল। কিন্তু ৭৩ মিনিটে পেনাল্টি থেকে নিকোলাস পেপের গোলটা যেন আর্সেনালের জন্য এসেছে তীব্র গরমে ‘পেপের জুস’ হয়ে। একটা ‘অ্যাওয়ে গোল’ যে পাওয়া হয়ে গেছে! আরেকটা গোল হলে জুসটা আরেকটু ঠান্ডা মনে হতো আর্সেনালের, এই যা!

পেপের ওই গোলের আগে-পরে ৫৭ মিনিটে আর্সেনালের দানি সেবায়োস ও ৮০ মিনিটে ভিয়ারিয়ালের এতিয়েন কাপু লাল কার্ড দেখেন।

ফুটবল থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন