এ দুজনকে কি আজকের পর এল ক্লাসিকোতে দেখা যাবে?
এ দুজনকে কি আজকের পর এল ক্লাসিকোতে দেখা যাবে?ফাইল ছবি

মৌসুমের হাওয়াবদল কী দুর্দান্তভাবেই না হয়ে গেল স্প্যানিশ লিগে!

এক মাস আগে লিগে যে আতলেতিকোকে অপ্রতিরোধ্য মনে হচ্ছিল, দিয়েগো সিমিওনের সেই দলটাকেই এখন মনে হচ্ছে অচেনা-অজানা। হোঁচট খাচ্ছে প্রতিনিয়ত, যার সুবিধা পুরোদমে নিয়েছে লিগের সফলতম দুই দল রিয়াল মাদ্রিদ ও বার্সেলোনা। লিগ শিরোপা দিয়ে আতলেতিকোয় নিজের এক দশক উদযাপন করবেন সিমিওনে, এমনটা মনে হলেও সাম্প্রতিক সময়ে রিয়াল-বার্সার ছন্দে ফিরে আসা সব হিসাব বদলে দিয়েছে।

হিসাবটা আরও বদলে যেতে পারে আজ রাতের এল ক্লাসিকোর পর। ঘুরেফিরে আবারও সেই রিয়াল আর বার্সেলোনার ম্যাচের ওপরই নির্ভর করছে লিগের ভাগ্য। যদিও ম্যাচের সময়ে পর্দায় আড়ালে সিমিওনে তাঁর শিষ্যদের নিয়ে ড্রয়ের প্রত্যাশায় প্রার্থনায় বসে গেলেও দোষ দেওয়া যায় না—কারণ এই ম্যাচের সম্ভাব্য এই ফলই আতলেতিকোকে দিতে পারে স্বস্তি।

রিয়াল বা বার্সা, কোনো দলই এ ফল চাইবে না নিশ্চিতভাবে। দুই দলের প্রত্যাশাই জয়। সে জেতার জন্য দুই দলের কৌশলটা কেমন হতে পারে? দেখা যাক।

বিজ্ঞাপন
default-image

রিয়ালের কোচ জিনেদিন জিদান কখনোই খুব বেশি কৌশলী কোচ হিসেবে পরিচিত ছিলেন না। ম্যাচের প্রয়োজনে যখন যেভাবে দলকে খেলানো উচিত, সেভাবেই খেলিয়েছেন দলকে। গার্দিওলা বা ক্লপের মতো কোনো নির্দিষ্ট দর্শনে দলকে খেলিয়েছেন, এটা জিদানের পাঁড়ভক্ত কখনো বলবেন না। নিজের দুর্দান্ত ‘ম্যান ম্যানেজমেন্ট’–এর সঙ্গে খেলোয়াড়দের সামর্থ্য, এই দুইয়ের মেলবন্ধনই জিদানের সাফল্যের মূল রেসিপি। অবশ্য যাঁর হাতে মদরিচ, ক্রুস, রোনালদো ও বেনজেমার মতো প্রতিভাবান খেলোয়াড় আছে, খোলা চোখে তাঁর অবশ্য অত বেশি দর্শননির্ভর না হলেও তো চলে!

কিন্তু গত এক-দেড় বছরে যেন এক ভিন্ন জিদানকে দেখছে বিশ্ব। রোনালদো ক্লাব ছেড়েছেন, বিকল্প হিসেবে দলে আসা এডেন হ্যাজার্ডও নতুন দলের হয়ে যত দিন অনুশীলন করেছেন, তার চেয়ে বেশি দিন থেকেছেন হাসপাতালে। বেল তো থেকেও ছিলেন না, এ মৌসুমে তিনিও ধারে চলে গেছেন। এই মৌসুমে ফারলাঁ মেন্দি আর থিবো কোর্তোয়া ছাড়া আর প্রায় সবাই কোনো না কোনো সময়ে মাঠের বাইরে ছিলেন।

চাইলেও জিদান নির্দিষ্ট কোনো একাদশে স্থির থাকতে পারেননি। স্থির থাকতে পারেননি নির্দিষ্ট কোনো ছকের গণ্ডিতে। চিরপরিচিত ৪-৩-৩ ছক ছেড়ে প্রায়ই আশ্রয় নিয়েছেন ৪-৪-২, ৪-২-৩-১ এমনকি ৩-৫-২/৩-৪-৩ ছকেও। ম্যাচের মধ্যে পরিস্থিতি অনুযায়ী জিদানের কৌশলগত পরিবর্তন নজর কেড়েছে বেশ ভালোভাবেই। যে ব্যাপারটা লক্ষ করেছেন বার্সেলোনার কোচ রোনাল্ড কোমান নিজেও। ম্যাচপূর্ব সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন, ‘রিয়াল কৌশল ঘন ঘন বদলায়, আমাদের তাই (রিয়ালের কৌশল বোঝার জন্য) অপেক্ষা করতে হবে।’

default-image

জিদানের এখনকার কৌশলের দিকে লক্ষ করলে বিশেষভাবে চোখে পড়ে দুটি বিষয়। জিদান আগের চেয়ে আরও বেশি সোজাসাপটা খেলাতে চাইছেন দলকে, ফুটবলীয় ভাষায় যাকে ‘ডিরেক্ট ফুটবল’ বলা যায়। দলের অধিনায়ক সের্হিও রামোস থাকলে ছোট ছোট পাসে দলের আক্রমণ গড়ে তোলার কাজটা করতে পারেন। কারণ, বল পায়ে রামোসের দক্ষতা রিয়ালের যেকোনো ডিফেন্ডারের চেয়ে অনেক অনেক বেশি। রামোস ফিট থাকলে রিয়াল মাদ্রিদ বাঁ দিক থেকে অপেক্ষাকৃত বেশি আক্রমণ করে।

রামোসের পাশাপাশি ক্রুস, মেন্দি আর ভিনিসিয়ুস যে কাজে রিয়ালকে সাহায্য করেন। চোটের কারণে রামোস এখন দলের বাইরে, জিদান তবু ‘বামপন্থী’ আচরণ থামাচ্ছেন না। রামোসের অনুপস্থিতি বরং রিয়ালকে ছোট ছোট পাসে নয়, বরং ‘লং বল’ বা লম্বা পাসে খেলতে উদ্বুদ্ধ করছে, সেটা সোজা হোক বা আড়াআড়ি।

চ্যাম্পিয়নস লিগে লিভারপুলের বিপক্ষে যে কৌশলের সফল প্রয়োগ ঘটিয়েছে রিয়াল মাদ্রিদ। লিভারপুলও বাজে খেলেছে অনেক, প্রতিপক্ষকে ‘প্রেস’ করতে পারেনি ঠিকভাবে। ফলে নিজেদের এই ‘লং বল’ ও ‘ডিরেক্ট ফুটবল’–এর প্রয়োগ হেসেখেলেই করেছে রিয়াল। রামোস ছিলেন না, ফলে ক্রুস নিচে নেমে আক্রমণভাগে লম্বা লম্বা বল পাঠাচ্ছিলেন। একই কাজ করছিলেন এদের মিলিতাও কিংবা মার্কো আসেনসিও। লিভারপুলের দুই ফুলব্যাকের (ট্রেন্ট আলেক্সান্ডার-আরনল্ড ও অ্যান্ডি রবার্টসন) পেছনের জায়গায় বারবার আক্রমণ করতে চেয়েছে রিয়াল। বার্সেলোনাকে সতর্ক থাকতে হবে, নিজেদের দুই ফুলব্যাক সের্হিনিও দেস্ত কিংবা জর্দি আলবা যেন ওই সমস্যায় না পড়েন।

বিজ্ঞাপন
default-image

জিদানের বর্তমান কৌশলের আরেকটা দুর্দান্ত দিক হলো মাঠে তিন মিডফিল্ডারের অবস্থান। ক্রুসের ব্যাপারে তো আগে একটু বলা হলোই, বাকি দুই মিডফিল্ডার মদরিচ ও কাসেমিরোর অবস্থানেও এসেছে পরিবর্তন। রিয়ালের যে দলটা হ্যাটট্রিক চ্যাম্পিয়নস লিগ জিতেছিল, সে দলের অন্যতম কৌশল ছিল আদর্শ রক্ষণাত্মক মিডফিল্ডার হিসেবে রক্ষণভাগের সামনে থাকবেন কাসেমিরো, ক্রুস আর মদরিচ খেলবেন জোড়া ‘নম্বর এইট’ হিসেবে, যাঁদের ভূমিকা থাকবে উইঙ্গারদের সঙ্গে বোঝাপড়া বাড়িয়ে হাফস্পেসগুলো (প্রতিপক্ষের ফুলব্যাক ও সেন্টার ব্যাকের মাঝের জায়গাটা) থেকে আক্রমণের ধার বাড়ানো।

কিন্তু জিদানের এই রিয়াল মিডফিল্ডারদের ভূমিকার দিক দিয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন। এখন দেখা যাচ্ছে ক্রুস খেলছেন একদম নিচে, নিচ থেকে লম্বা বল দিয়ে আক্রমণ গড়ছেন, ওদিকে কাসেমিরো বা মদরিচের মধ্যে যেকোনো একজন (কাসেমিরোই বেশির ভাগ) বেনজেমার সঙ্গে দ্বিতীয় বা ছদ্ম স্ট্রাইকারের ভূমিকায় খেলছেন। আতালান্তা, লিভারপুলের ম্যাচগুলোতে রিয়ালের খেলার ধরন দেখে এই ব্যাপারটা আরও বেশি চোখে পড়েছে।

এ কারণে এই মৌসুমে বেনজেমার পরে রিয়ালের যে খেলোয়াড় প্রতিপক্ষের বক্সে গিয়ে গোল করার ও করানোর চেষ্টায় থাকেন, তিনি হলেন কাসেমিরো। এমনকি রিয়ালের উইঙ্গার বা ফুলব্যাকরা যখন বক্সে ক্রস দেন, তখন বেনজেমা ছাড়া সে ক্রসগুলো থেকে গোল করার চেষ্টায় এই কাসেমিরোই থাকেন। কারণ, আক্রমণভাগের অন্য দুই নিয়মিত খেলোয়াড় আসেনসিও আর ভিনিসিয়ুস, কেউই হেড করে গোল দেওয়ার ব্যাপারে অতটা দক্ষ নন।

ফলে সাম্প্রতিককালের অন্য এল ক্লাসিকোগুলোর মতো এই ক্লাসিকোর ফলাফলও নির্ধারণ করবে মাঝমাঠের আধিপত্য।

default-image

এখন আসা যাক বার্সেলোনার প্রসঙ্গে। ৪-৩-৩, ৪-২-৩-১ ছক ঘুরে অবশেষে দলটার ডাচ কোচ রোনাল্ড কোমান বুঝেছেন, ৩-৪-৩ ছকেই আছে নিদান। তিনজন সেন্টার ব্যাক নিয়ে খেলেই সাম্প্রতিক সময়ে সাফল্য পাচ্ছে বার্সেলোনা। লিগে টানা ১৯ ম্যাচে অপরাজিত মেসিরা। আর বার্সেলোনার এই সফলতার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে দলের ডাচ মিডফিল্ডার ফ্রেঙ্কি ডি ইয়ংয়ের ভূমিকা। কোচ রোনাল্ড কোমান নিজে ছিলেন ডিফেন্ডার। হাতে গোনা সেসব ডিফেন্ডারদের মধ্যে একজন ছিলেন, যিনি রক্ষণে থেকেও মোটামুটি ছদ্ম মিডফিল্ডারের মতো ওপরে উঠে আসতে পারতেন, নিচ থেকে আক্রমণ গড়ে তোলার কাজটা করতেন। যাঁর একটা গালভরা নামও আছে—‘লিবেরো’।

সাধারণত তিন সেন্টার ব্যাকের মধ্যে মাঝের জনকে এই ভূমিকা দেওয়া হয়। আর এমন একজনকে দেওয়া হয়, বল পায়ে যাঁর দক্ষতা বিশ্বমানের। প্রতিপক্ষের ‘প্রেস’ বাঁচিয়ে দলের আক্রমণ গড়তে পারেন যিনি নিমেষে। এই ম্যাচেও ফ্রেঙ্কিকে এমন একটা ভূমিকাতেই দেখা যেতে পারে, যিনি একই সঙ্গে দুই সেন্টার ব্যাক অস্কার মিঙ্গেসা ও ক্লেমঁ লংলেকে রক্ষণভাগে সাহায্য করার পাশাপাশি আক্রমণের সময়ে একটু উঠে গিয়ে মাঝমাঠে সের্হি বুসকেতস ও পেদ্রিকে সাহায্য করতে পারেন। মেসি ছাড়াও এই ম্যাচে জিনেদিন জিদানের চিন্তার একটা বড় জায়গাজুড়ে থাকবেন ফ্রেঙ্কি ডি ইয়ং।

উইংব্যাক হিসেবে ডানে সের্হিনিও দেস্ত ও বাঁয়ে জর্দি আলবা প্রায় সময়ই রক্ষণ করতে গিয়ে দুজন রিয়াল খেলোয়াড়ের মুখোমুখি হতে পারেন। আক্রমণ করতে গিয়ে প্রায় সময় বাঁ দিকে মেন্দি-ভিনিসিয়ুস, আর ডান দিকে ভাসকেজ-আসেনসিও ওপরে চলে আসেন। ফলে দেস্ত কীভাবে মেন্দি-ভিনিসিয়ুস আর আলবা কীভাবে ভাসকেজ-আসেনসিওর যৌথ আক্রমণ আটকাতে পারেন, ওই পর্যায়ে এই দুই উইংব্যাককে বার্সার মিডফিল্ড সাহায্য করতে পারে কি না, সেটাও এই ম্যাচের ভাগ্য গড়ে দিতে পারে।
অপেক্ষা একটা দুর্দান্ত ক্লাসিকোর।

ফুটবল থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন