রাংনিকের ব্যাপারে একটা কথা না বললেই নয়। এই ৬৩ বছর বয়সীই প্রথম ম্যানেজার যিনি জার্মান বুন্দেসলিগায় নিয়মিত চারজনের রক্ষণভাগ নিয়ে খেলানো শুরু করেছিলেন। তাঁর অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করেছিলেন এসি মিলানের সাবেক কিংবদন্তি ম্যানেজার আরিগো সাচ্চি ও দিনামো কিয়েভের কিংবদন্তি ম্যানেজার ভ্যালেরি লোবানোভস্কি। যেভাবে রাংনিক এই দুই কিংবদন্তির ভক্ত হলেন, ঘটনাগুলো বেশ চমকপ্রদ।

১৯৮৩ সালে জার্মানির ষষ্ঠ বিভাগের দল এফকে ভিক্টোরিয়া ব্যাকনাংয়ের খেলোয়াড়-ম্যানেজারের দ্বৈত দায়িত্ব পালন করতেন রাংনিক। ফেব্রুয়ারিতে বিশ্বের অন্যতম সফল দল ইউক্রেনের দিনামো কিয়েভ সেবার এসেছিল জার্মানিতে কিছু ম্যাচ খেলার জন্য। গা-গরম করার জন্য স্থানীয় দুর্বল কিছু দলের বিপক্ষে ম্যাচ খেলার ইচ্ছে প্রকাশ করে দলটা। কিয়েভের প্রস্তাবে একবাক্যেই রাজি হয়ে যায় ব্যাকন্যাং। পাশের অনুশীলন সেন্টারে কিয়েভের সঙ্গে খেলতে গিয়ে হতবিহ্বল হয়ে পড়েন রাংনিক।

বাকিটা তাঁর মুখ থেকেই শুনে নেওয়া যাক, ‘কয়েক মিনিট খেলতে খেলতেই হাঁপিয়ে গেলাম। আমার বিপক্ষে ওদের মাঝমাঠে কয়জন যে খেলছিল, বুঝতেই পারছিলাম না। বারবার মনে হচ্ছিল, ওরা ১৩ বা ১৪ জন খেলছে। একবার থ্রো-ইনের জন্য বল বাইরে গেল, তখন আমি ওদের খেলোয়াড় গোনা শুরু করলাম। এর আগেও বিশ্বমানের ক্লাবের বিপক্ষে খেলেছি, হেরেছি। ওদের বিপক্ষে খেলতে গেলে অন্তত দম নেওয়ার সময়টা পেতাম। এখানে সেটাও পাচ্ছিলাম না। কিয়েভই প্রথম দল, যাদের নিয়মমাফিক প্রেস করতে দেখি আমি।’

সেই যে প্রেসের ভূত ঢুকল রাংনিকের মাথায়, আজ অব্দি বের হয়নি।

অনুপ্রেরণা ছিলেন রোমা, লাৎসিও, নাপোলি, কালিয়ারি ও পেসকারার সাবেক ম্যানেজার জেদেনেক জেমানও। উদ্ভাবনী কৌশলের জন্য বিখ্যাত জেমান তখন কোচ ছিলেন ইতালির ক্লাব ফগিয়ার। একবার তো এমন হলো, পারিবারিক ছুটিতে ঘুরতে গিয়েও রাংনিক পুরো ছুটিটা কাটালেন জেমানের ভিডিও দেখতে দেখতে!

রাংনিকের কিছু ইতালিয়ান বন্ধু ছিলেন, যারা নিয়মিত সাচ্চির মিলানের ভিসিআর ক্যাসেট পাঠাতেন এই জার্মান কোচকে। সে ভিডিওগুলো দেখে দেখে নিজেকে আরও শাণিত করতেন রাংনিক। আশি বা নব্বইয়ের দশকে ৩-৫-২ ছকে একজন বাড়তি সেন্টারব্যাক (সুইপার) নিয়ে খেলার চল ছিল অনেক বেশি। বিশেষ করে এক বরুসিয়া মনশেনগ্লাডবাখ ছাড়া জার্মানির প্রথম বিভাগের সব ক্লাব রক্ষণে তিনজন নিয়ে খেলত। সাচ্চিই প্রথম ইতালিতে সেই পরিকল্পনা থেকে বেরিয়ে তিনজনের জায়গায় দুই সেন্টারব্যাক ফ্রাঙ্কো বারেসি আর আলেসসান্দ্রো কোস্তাকুর্তাকে নিয়ে সফলভাবে মিলানকে খেলানো শুরু করেন। রাংনিক সেখান থেকেই শিখেছেন অনেক কিছু। মিলানের সেই নির্যাস এনেছেন বুন্দেসলিগায়।

তবে এই নির্যাস আনতে কম কাঠখড় পোড়াতে হয়নি তাঁকে। নব্বইয়ের দশকে ক্রীড়াবিষয়ক এক জনপ্রিয় অনুষ্ঠান হতো জার্মান টিভিতে - ‘ডাস একটুয়েলে স্পোর্টসস্টুডিও।’ সেখানেই ফুটবলীয় কৌশল নিয়ে আলোচনা করার জন্য একদিন আমন্ত্রণ জানানো হয় এসএসভি উলমের দায়িত্বে থাকা তরুণ রাংনিককে। যে দলটা তখন জার্মান দ্বিতীয় বিভাগের শীর্ষে ছিল, খেলছিল দৃষ্টিনন্দন ফুটবল। অনুষ্ঠানে রাংনিক বলেছিলেন, সেন্টারব্যাক হিসেবে তিনজন রাখার দিন যে আর নেই, দুজন সেন্টারব্যাক (সব মিলিয়ে চারজন ডিফেন্ডার) খেলানোর সময় এখন, সময় ম্যান মার্কিং (আলাদা আলাদাভাবে প্রতিপক্ষের প্রত্যেক খেলোয়াড়কে দেখে রাখার জন্য নিজের দলের আলাদা আলাদা একেকজনকে দায়িত্ব দেওয়া) থেকে সরে এসে জোনাল মার্কিংয়ের (প্রত্যেক খেলোয়াড়কে আলাদাভাবে প্রেস না করে মাঠের জায়গা ভাগ করে করে প্রেস করা) দিকে যাওয়ার।

কোথাকার কোন এক ছোকরা এসে এত দিনের পরীক্ষিত কৌশলকে সেকেলে বলছে, ব্যর্থ বলছে - বয়সী জার্মান ম্যানেজাররা সেটা মানবেন কেন? সবাই এককাট্টা হলেন রাংনিকের বিপক্ষে। ঠাট্টা করে তাঁকে ‘প্রফেসর’ ডাকা শুরু হলো। জার্মান পত্রপত্রিকাগুলো সবাই তাঁর পেছনে লাগল। এই দলে ছিলেন কিংবদন্তি জার্মান তারকা ফ্রাঞ্জ বেকেনবাওয়ার থেকে শুরু করে তৎকালীন জার্মানি জাতীয় দলের কোচ এরিক রিবেক। সহকর্মী বন্ধুদের কৌশলকে ব্যর্থ বলায় সেদিন খেপেছিলেন রিবেক, ‘কৌশল নিয়ে এই অনুষ্ঠানের বাড়তি আলোচনা দেখে আমি হতাশ। যেন বুন্দেসলিগায় থাকা আমার বন্ধুরা কৌশল নিয়ে কিছু জানেনই না!’ রিবেকের সঙ্গে সম্মতি দিয়েছিলেন বেকেনবাওয়ারও, ‘চারজনের রক্ষণভাগ নিয়ে ছেলেটা যা বলে গেল সবটুকুই হাস্যকর। চারজনের রক্ষণভাগ বিপদ ডেকে আনতে পারে।’ পরে স্টুটগার্ট আর হ্যানোভারের হয়েও যখন তেমন কিছু করতে পারলেন না, সমালোচনার মাত্রা বাড়ল আরও। এ পর্যায়ে তৃতীয় বিভাগের ক্লাব হফেনহাইম এল রাংনিকের ত্রাতা হয়ে। নাকি রাংনিকই হলেন তাঁদের ত্রাতা?

টানা দুই বছর দুটি প্রোমোশন জোগাড় করে হফেনহাইমকে ওঠালেন বুন্দেসলিগায়। মৌসুমের অর্ধেক শেষ হওয়ার পর দেখা গেল, তারুণ্যে ভরপুর দলটা বায়ার্নের মতো দলকে হটিয়ে লিগের শীর্ষে আছে। যদিও শেষমেশ সপ্তম স্থানে থেকে মৌসুম শেষ করে হফেনহাইম, তাও রাংনিককে নিয়ে মাতামাতির কমতি হলো না। এবার ‘ডাস একটুয়েলে স্পোর্টসস্টুডিও’ অনুষ্ঠানে যখন ডাক পেলেন, তখন আর নিন্দুকেরা তাঁকে টিটকারি মারার সুযোগ পেলেন না। জার্মান ফুটবলে আক্ষরিক অর্থেই রাংনিক-যুগ শুরু হয়ে গিয়েছিল তখন।

হফেনহাইমের সে দলে সবচেয়ে বয়সী খেলোয়াড় ছিলেন ২৫ বছরের ডিফেন্ডার পার নিলসন, এতেই বোঝা যায় নিজের কৌশল বাস্তবায়ন করার জন্য রাংনিক তরুণদের ওপর কত বেশি নির্ভর করেন। শুধু হফেনহাইম বলেই নয়, গোটা ক্যারিয়ারজুড়েই তরুণ প্রতিভা খুঁজে বের করে পরিচর্যা করার ব্যাপারে বিশেষ নামডাক আছে এই কোচের। হ্যানোভারে পার মার্টেসাকার থেকে শুরু করে হফেনহাইমে কার্লোস এদুয়ার্দো, দেম্বা বা, ভেদাদ ইবিসেভিচ, লুইজ গুস্তাভো, গিলফি সিগুর্ডসন ও রবার্তো ফিরমিনো; লাইপজিগে ইয়োশুয়া কিমিখ, টিমো ভেরনার, দায়োত উপামেকানো, মার্সেল সাবিৎসার, নাবি কেইতা - সবার শুরুটা হয়েছিল রাংনিকের হাত ধরেই।

নতুন খেলোয়াড়দের অনুশীলন করানোর ব্যাপারেও রাংনিকের দর্শনটা একটু ভিন্ন। রেড বুলেটিনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে একবার জানিয়েছিলেন, ‘ফুটবলের ভবিষ্যৎ লুকিয়ে আছে কীভাবে, কত ভালোভাবে আপনি খেলোয়াড়দের মগজকে অনুশীলন করাতে পারছেন, তার মধ্যে। একজন খেলোয়াড়ের সবচেয়ে বড় সম্ভাবনার জায়গা হলো তাঁর মস্তিষ্ক। অনুশীলনের মাধ্যমে অল্প সময়ে চাপের মধ্যে কীভাবে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়, সেটাও শিক্ষার এক অংশ।’

ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের সমর্থকেরা রাংনিকের অধীনে মেসন গ্রিনউড, আমাদ দিয়ালো, জেডন সানচোদের নিয়ে আশাবাদী হতেই পারেন!

প্রতিপক্ষের খেলার ধরন ও নিজের হাতে থাকা খেলোয়াড়দের মান অনুযায়ী কৌশল ও খেলানোর ধরন নির্ধারণ করেন রাংনিক। তবে যে কৌশলই নেন না কেন, তার কেন্দ্রে থাকে ‘প্রেসিং।’ খেলোয়াড়দের অতিরিক্ত প্রেস করান রাংনিক, যে কারণে প্রায় সময়ই খেলোয়াড়দের মাঠের যেখানে থাকা উচিত, তার চেয়ে আরও অনেক ওপরে দেখা যায়। একই সঙ্গে প্রতিপক্ষের ছক ও কৌশল মাথায় রেখে ওই অনুযায়ী নিজেদের সাজিয়ে নেন।

কাগজে-কলমে ৩-৫-২ থেকে শুরু করে ৪-২-৩-১, ৪-৪-২ (ডায়মন্ড মাঝমাঠ) ; অনেক ছকেই দেখা যায় রাংনিকের দলকে। তবে তুলনামূলকভাবে ৪-৪-২ বা ৪-২-২-২ ছকেই বেশি খেলিয়েছেন এই জার্মান কোচ। হফেনহাইম, স্টুটগার্ট, লাইপজিগ, হ্যানোভার, শালকাসহ একাধিক জার্মান ক্লাবকে কোচিং করানো রাংনিক সবচেয়ে বেশি সময় থেকেছেন হফেনহাইম আর লাইপজিগে। হফেনহাইমে আবার ৪-৩-৩ ছকে বেশি খেলাতে দেখা গেছে তাঁকে। ওদিকে লাইপজিগে এসে ৪-২-২-২ আর ৩-৫-২ ছকের ওপর বেশি কাজ করেছেন তিনি।

তবে যে ছকেই খেলান না কেন, মাঝমাঠে একজন বাড়তি মিডফিল্ডার খেলানোর একটা অভ্যাস আছে তাঁর। যাতে ৪-২-২-২ কিংবা ৩-৫-২ ছকে খেলা দুই ফরোয়ার্ড ইচ্ছেমতো ওপরে উঠে প্রেস করতে পারেন। বল হারানোর সঙ্গে সঙ্গে প্রতিপক্ষকে প্রেস করে বল কেড়ে নেওয়ার ব্যাপারে আগ্রহ দেখা যায় রাংনিকের দলগুলোর মধ্যে। এই বাড়তি মিডফিল্ডার সে কাজে সাহায্য করে থাকেন। বাড়তি মিডফিল্ডারের কারণে মাঠের মধ্যখানে প্রেসের ফাঁদ সৃষ্টি করেন রাংনিক, যে কারণে প্রতিপক্ষ বল পেলেও মাঠের মাঝখান দিয়ে পাস করতে পারে না।

৩-৪-৩ বা ৩-৫-২/৩-৪-১-২ ছকের ক্ষেত্রে অনেক সময় দেখা যায়, প্রতিপক্ষের দুই সেন্টারব্যাকের একজন আরেকজনের দিকে সোজাসুজি পাস দিলে যিনি পাস পেলেন, তাঁকে প্রেস করতে এগিয়ে যান রাংনিকের একজন আক্রমণাত্মক মিডফিল্ডার বা উইঙ্গার। প্রেসের কারণে সে সেন্টারব্যাককে তখন দূরবর্তী কোনো সতীর্থের উদ্দেশ্যে পাস পাঠাতে হয়, যা অধিকাংশ সময়েই ব্যর্থ হয়, কারণ ততক্ষণে মাঝখানের একজন বাড়তি মিডফিল্ডার অন্যান্য মিডফিল্ডারের সঙ্গে মাঝখানে প্রেসের ফাঁদ সৃষ্টি করে ফেলেছেন। মাঝমাঠে প্রেসের এই ফাঁদ সৃষ্টি করার ব্যাপারটা বেশ দেখা যেত হফেনহাইমের ক্ষেত্রে।

ওদিকে লাইপজিগে রাংনিকের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল, প্রতিপক্ষকের খেলোয়াড়দের মাঠের সাইডলাইন/বাইলাইন বরাবর চলে আসতে বাধ্য করা। যাতে মাঠের সাইডলাইনকে একজন বাড়তি ডিফেন্ডার হিসেবে ব্যবহার করা যায়। বল কোনোভাবে একজন ফুলব্যাকের পায়ে পাঠিয়ে সে দিকের সকল খেলোয়াড় সাইডলাইন বরাবর চলে গিয়ে প্রতিপক্ষকে সাইডলাইনে আসার জন্য আকৃষ্ট করতেন। যতক্ষণে প্রতিপক্ষের খেলোয়াড়েরা বলের আশায় সাইডলাইনে চলে আসতেন ততক্ষণে প্রত্যেক খেলোয়াড়কে আলাদা আলাদাভাবে মার্ক করা হয়ে যেত রাংনিক-শিষ্যদের। ফলে ওই পরিস্থিতিতে বলের দখল পেলেও সরাসরি কোনো সতীর্থকে পাস দিতে পারতেন না প্রতিপক্ষ দলের কোনো খেলোয়াড়। এভাবেই লাইপজিগে প্রতিপক্ষের খেলার পরিকল্পনা নষ্ট করে দিতেন রাংনিক।

এ ব্যাপারটা ইউনাইটেডের খেলার ধরনেও দেখা যাবে অনেক, এটা নিশ্চিত বলা যায়। ফুলব্যাকদের সঙ্গে তাঁদের পেছনে থাকা ওয়াইড মিডফিল্ডার/উইঙ্গারদের প্রতিনিয়ত যোগাযোগ থাকে, অনেকটা ইয়ুর্গেন ক্লপের লিভারপুলে ট্রেন্ট আলেক্সান্ডার আরনল্ড-মোহাম্মদ সালাহ আর অ্যান্ডি রবার্টসন-সাদিও মানের মধ্যে যে যোগাযোগটা থাকে ‘প্রেস’ করার ক্ষেত্রে।

নিজেদের কাছে বলের দখল আসার সঙ্গে সঙ্গে আক্রমণ করার ক্ষেত্রে মোটেও সময় নষ্ট করত না রাংনিকের দল। রাংনিকের একটা নিয়মই আছে, বলের দখল পাওয়ার দশ সেকেন্ডের মাথায় প্রতিপক্ষের গোলপোস্ট বরাবর শট করতে হবে যেকোনো ভাবে। বলের দখল পাওয়ার পর দলের যে খেলোয়াড় আক্রমণের ক্ষেত্রে সবচেয়ে এগিয়ে আছেন, তাঁর পায়ে বল পাঠানো হয়। সে খেলোয়াড় যাতে আশেপাশে পাস দিতে পারেন, সেটা নিশ্চিত করার জন্য আরও একজন বা দুজন প্রতিপক্ষের ডি-বক্স বরাবর দৌড়ানো শুরু করেন। রাংনিকের মতে, বলের দখল হারানোর পর প্রথম দশ সেকেন্ড একটা দল সবচেয়ে বেশি ভঙ্গুর অবস্থায় থাকে, তাঁদের দলীয় গঠনের কোনো ঠিক থাকে না। তাই ওই দশ সেকেন্ডের মধ্যেই আক্রমণ করে কাজ রফা করতে চাইতেন রাংনিক। চার-পাঁচটা পাসের মাধ্যমে। খেলোয়াড়দের মধ্যে ব্যাপারটাকে একদম ভালোভাবে ঢুকিয়ে দেওয়ার জন্য অনুশীলনেই এই দশ সেকেন্ড নিয়মটার নিয়মিত চর্চা করান রাংনিক। ইয়ুর্গেন ক্লপের ‘জেজেনপ্রেসিং’ বা ‘কাউন্টারপ্রেসিং’ এর সঙ্গে এই নিয়মটার মিল আছে বেশ। এমনকি জোসে মরিনিও যখন প্রথম দফায় চেলসির ম্যানেজার হয়েছিলেন, তখনো ল্যাম্পার্ড-দ্রগবাদের দিয়ে এভাবে আক্রমণ করাতেন।

আক্রমণভাগে দুজন থাকুক বা তিনজন, দুজনকে জুটি বাঁধতে দেখা যায়। বাকি থাকা একজনের কাজ থাকে প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগের ফাঁকফোকর বের করে প্রেস শুরু করা। পাশের দুই উইঙ্গার প্রথাগত উইঙ্গারদের মতো একদম সাইডলাইন বরাবর থাকেন না, অনেকটা সেন্ট্রাল অ্যাটাকিং মিডফিল্ডারের মতো মাঠের মাঝখানে চলে আসেন। দুজন উইঙ্গার যেহেতু মাঝে চলেই আসেন, পেছনে থাকা দুই সেন্ট্রাল মিডফিল্ডার তখন তাঁদের পেছনে থাকা দুই ফুলব্যাক যেন ওপরে উঠে আক্রমণ করেন, সেটা নিশ্চিত করার জন্য দুপাশে চলে যান। সেন্ট্রাল মিডফিল্ডাররা যেহেতু মাঠের মাঝেই থাকেন না অনেক সময়, সে কারণে প্রতিপক্ষ বুঝতে পারে না আক্রমণে রাংনিকের দলের ছকটা ঠিক কেমন হবে।

শুধু আক্রমণ করার বাহানায় কোনো খেলোয়াড় প্রেস করছেন না, বা রক্ষণে সাহায্য করছেন না, ব্যাপারটা মানতেই পারেন না রাংনিক। যে কারণে স্টুটগার্টের ম্যানেজার থাকার সময় বুলগেরিয়ান আক্রমণাত্মক মিডফিল্ডার ক্রাসিমির বালাকোভের সঙ্গে সম্পর্কই খারাপ হয়ে গিয়েছিল তাঁর। আরেকটা জিনিস রাংনিকের প্রচণ্ড অপছন্দের। শুধু বলের দখল রাখার জন্য রাখতে চান না এই জার্মান কোচ। যে কারণে একদম দরকার না হলে খেলোয়াড়দের পাশাপাশি পাস দিতে দেন না। নিয়মিত সোজাসুজি বা আড়াআড়ি পাস দিয়ে দ্রুত আক্রমণে উঠে যেতে বলেন শিষ্যদের।

রাংনিকের ফুলব্যাক প্রেস করতে যখনই ওপরে চলে যান ও প্রতিপক্ষকে সাইডলাইনের দিকে আকৃষ্ট করেন, তখন আরেকটা সমস্যা সৃষ্টি হয়। মাঠের মাঝখানের জায়গাটা সামাল দেওয়ার জন্য তখন সে দিকের ওয়াইড মিডফিল্ডার/উইঙ্গারকে বাড়তি দৌড়াদৌড়ি করতে হয়। যে কারণে ওই ওয়াইড মিডফিল্ডার প্রতিপক্ষের যে ফুলব্যাককে মার্ক করার দায়িত্বে থাকেন, সে ফুলব্যাক বল নিয়ে অনেক সময় পান আক্রমণ করার জন্য, অনেক সময় মাঝমাঠেও চলে আসেন। কার্যকরী প্রেস করতে পারেন - এমন ওয়াইড মিডফিল্ডার না থাকলে এ ব্যাপারটা সমস্যার সৃষ্টি করতে পারে।

আক্রমণের মতো রক্ষণেও রাংনিকের প্রায় একই ধরনের পরিকল্পনা আছে। পার্থক্য হলো, বলের দখল পাওয়ার পর দশ সেকেন্ডের মধ্যে যেখানে আক্রমণ করতে হয়, বলের দখল হারানোর পর সে সময়টা কমে দাঁড়ায় আট সেকেন্ডে। অর্থাৎ, বলের দখল হারানোর আট সেকেন্ডের মধ্যে রক্ষণের জন্য প্রস্তুত হয়ে যেতে হবে রাংনিকের খেলোয়াড়দের। যে কারণে খেলোয়াড়দের বেশি দূরে দূরে রাখতে পছন্দ করেন না এই জার্মান কোচ। বলের দখল হারানোর সঙ্গে সঙ্গে যাতে খেলোয়াড়েরা কাছাকাছি থেকে বলের দখল আবারও নিজেদের কাছে নিতে পারেন, সে চেষ্টাই দেখা যায়।

বলা বাহুল্য, এই কৌশলে খেলার জন্য খেলোয়াড়দের অতিমাত্রায় ফিট থাকতে হয়, যে কারণে কমবয়সী খেলোয়াড় খেলাতেই স্বচ্ছন্দ রাংনিক। দ্য কোচে’স ভয়েসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে নিজের এই দর্শনের কথাই স্পষ্ট করে ফুটিয়ে তুলেছেন রাংনিক, ‘কৌশল, ফিটনেস, নিয়ম - সবকিছু অনেক গুরুত্বপূর্ণ। আমার কাজ হলো খেলোয়াড়দের মানোন্নয়ন করা। খেলোয়াড়েরা যদি মনে করে আপনি তাদের মান বাড়াচ্ছেন, তাহলে তারা আপনাকে অনুসরণ করবেই। একজন কোচের জন্য সেটাই সবচেয়ে বড় কাজ করার অনুপ্রেরণা।’ আর্সেনাল ও জার্মানির সাবেক সেন্টারব্যাক পার মার্টেস্যাকার একবার বলেছিলেন, হ্যানোভারে থাকার সময় একবার বড় সাধ করে কাবাব খেতে গিয়েছিলেন। সেটা দেখে হ্যানোভারের তৎকালীন কোচ রাংনিক মার্টেস্যাকারকে যেভাবে বকেছিলেন, তা আজীবন মনে আছে লম্বা এই ডিফেন্ডারের!

গত দশ বছরে কোচ হিসেবে যত সময় কাটিয়েছেন, ক্রীড়া পরিচালক হিসেবে সময় কাটিয়েছেন তার চেয়ে ঢের বেশি। দশ বছরে মাত্র দুই মৌসুম লাইপজিগের ভারপ্রাপ্ত ম্যানেজারের দায়িত্বে ছিলেন। প্রিমিয়ার লিগে প্রতি সপ্তাহে ক্লপ, গার্দিওলা, টুখেল, কন্তে, বেনিতেজ, পটার, আরতেতা, হাসনহাটলদের মুখোমুখি করার জন্য তাঁর ৬৩ বছরের মস্তিষ্ক কতটুকু প্রস্তুত, সে প্রশ্ন তোলাই যায়। আবার কোচ হিসেবে রাংনিকের যত সাফল্য, সব অপেক্ষাকৃত ছোট দলের হয়েই এসেছে। কখনো তেমন বড় দলের কোচ হওয়ার সুযোগ পাননি। ছোট দলের অপরিচিত খেলোয়াড়দের পরিচর্যা করেই বানিয়েছেন তারকা। কিন্তু তারকায় ভরা ড্রেসিংরুম কীভাবে সামলাতে হয়, কীভাবে একঝাঁক বিজয়ী খেলোয়াড়দের মনে আরও বেশি জয়ের মন্ত্র ঢুকিয়ে দেওয়া যায় - সে চ্যালেঞ্জ এর আগে কখনো নিতে হয়নি রাংনিককে। রোনালদো, ব্রুনো ফার্নান্দেজ, ভারান, পগবা, কাভানিদের মতো একঝাঁক অভিজ্ঞ খেলোয়াড়দের ‘ইগো’ কীভাবে সামলান, সেটাই দেখার বিষয়।

তবে এমন দায়িত্ব ঘাড়ে পড়লে রাংনিক যে ঘাবড়ানোর পাত্র নন, সেটা বোঝা গিয়েছিল কয়েক বছর আগে স্প্যানিশ সংবাদমাধ্যম এল পাইসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে। লিভারপুলের ম্যানেজার ইয়ুর্গেন ক্লপও তাঁর মতোই আগে মাঝারি সারির দলের ম্যানেজার ছিলেন। ক্লপ সফল হতে পারলে, তিনি হবেন না কেন? ‘২০০৮ সালে ক্লপ মাইঞ্জ ছেড়ে ডর্টমুন্ডে গেল। জার্মানির অন্যতম ঐতিহ্যবাহী ও সমর্থনপুষ্ট দল এই ডর্টমুন্ড। সেখানে গিয়েও ক্লপ দেখিয়েছে, মাইঞ্জে যা যা করা সম্ভব, সেটা ডর্টমুন্ডের মতো বড় ক্লাবেও করা সম্ভব। এখন লিভারপুলে গিয়ে তো ও আরও ভালো করছে। দলের মানই শুধু বাড়ায়নি, শহরের সার্বিক উন্নয়নেও ভূমিকা রাখছে সে’, অকপটভাবেই আশাবাদ ব্যক্ত করেছিলেন রাংনিক।

তবে খেলোয়াড়দের সামলাতে পারার ব্যাপারে রাংনিক আশাবাদী হলেও, বোর্ডকর্তাদের সামলাতে পারবেন কি না, সেটা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। এর আগে যতগুলো দলেরই ম্যানেজার হয়েছেন, স্টুটগার্ট থেকে শুরু করে হ্যানোভার, শালকা, হফেনহাইম - প্রতি ক্ষেত্রে বোর্ডকর্তাদের সঙ্গে ঝামেলা বাঁধিয়ে ক্লাব ছেড়েছেন। তাঁর অনুমতি না নিয়ে ব্রাজিলিয়ান রক্ষণাত্মক মিডফিল্ডার লুইস গুস্তাভোকে দুই কোটি ইউরোর বিনিময়ে বায়ার্নের কাছে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছিল দেখে হফেনহাইম থেকে বিদায় নিয়েছিলেন। ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের বোর্ডে যারা আছেন, তাঁরা আগে থেকেই বিতর্কিত-সমালোচিত। তাঁদের সঙ্গে রাংনিকের ব্যক্তিত্বের সংঘাত যে হবে না, তার নিশ্চয়তা কোথায়?

সে নিয়ে আপাতত নিশ্চিত হওয়া না গেলেও, প্রিমিয়ার লিগে আরও একটা ক্লাব যে উঁচু মানের খেলা দেখানো শুরু করছে, সেটা নিশ্চিত। যার প্রথম নিদর্শন হয়তো আজই দেখা যাবে, রাত আটটায়, ক্রিস্টাল প্যালেসের বিপক্ষে।