রোনালদো দেখিয়ে দিলেন, তিনি কেন রোনালদো

রোনালদোর গোল এখন ৮০৭ছবি : রয়টার্স

৮০৭ গোল!


বিশ্বের অধিকাংশ ফরোয়ার্ডই যেখানে ক্যারিয়ারে ২০০ থেকে ৩০০ গোল করতে পারলে বর্তে যান, সেখানে গত রাতে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো ক্যারিয়ারে গোলসংখ্যাকে নিয়ে গেছেন প্রায় অনতিক্রম্য এক উচ্চতায়। সব মিলিয়ে পেশাদার ক্যারিয়ারে এই পর্তুগিজ তারকার গোল এখন ৮০৭। কিন্তু তিনি থেমে যাবেন, এমনটা মনে হচ্ছে না।

এখনো রোনালদো সেই স্পোর্তিং লিসবনে খেলা উঠতি তরুণের মতোই ফিট, জয়ের বাসনা এখনো ঠিক একই রকম উদগ্র। হয়তো রোনালদো বলেই এমনটা সম্ভব! তা না হলে পেশাদার ক্যারিয়ার শুরু করার প্রায় দুই দশক পরও কয়জন খেলোয়াড়েরই-বা প্রতিনিয়ত নিজেকে ছাড়িয়ে যাওয়ার এমন ইচ্ছা থাকে!


শুধু একটা গোল করেই রোনালদো ক্ষান্ত হননি। ২০০৮ সালের পর ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের জার্সি গায়ে আবারও পেয়েছেন হ্যাটট্রিকের দেখা। আগের মতো খেলতে পারেন না, দলের কৌশল বাস্তবায়নে সহায়তা করেন না, বয়সী রোনালদো উল্টো দলের জন্য বোঝা—কত কিছু বলা হয়েছে তাঁকে নিয়ে। কিন্তু রোনালদো আবারও দেখিয়ে দিয়েছেন, সমালোচকদের মুখ বন্ধ করতে তাঁর মতো কিংবদন্তির ৯০ মিনিটের একটা ম্যাচই যথেষ্ট। রোনালদো যেদিন ছন্দে থাকেন, সেদিন দলের কৌশল বাস্তবায়ন হলো কি না, সেদিকে নজর দেওয়া বৃথা। সেদিন কোচের কৌশল বাস্তবায়ন হোক আর না হোক, রোনালদো গোল করবেনই।

২০০৮ সালের পর ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের জার্সি গায়ে রোনালদো আবারও পেয়েছেন হ্যাটট্রিকের দেখা
ছবি : রয়টার্স

ইউনাইটেডের ফরাসি মিডফিল্ডার পল পগবার কথাতেই যা স্পষ্ট। বিশ্বকাপজয়ী এই মিডফিল্ডার ম্যাচ শেষে যেন বিশ্বজোড়া কোটি কোটি রোনালদো-ভক্তের মনের কথারই প্রতিফলন ঘটিয়েছেন নিজের বক্তব্যে, ‘আমাদের দলের জন্য ও কখনোই সমস্যা সৃষ্টি করেনি। আপনার দলে যদি ইতিহাসের সেরা স্ট্রাইকার থাকে, তাহলে সমস্যা সৃষ্টি হওয়ার কথাও নয়। আজ সে দেখিয়ে দিল, সে কেন ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো। ওর পারফরম্যান্স ও বাকি দলের পারফরম্যান্স দুর্দান্ত ছিল আজ।’


আসলে সেটিই। রোনালদোর সঙ্গে আর দশটা ফরোয়ার্ডকে মেলালে চলবে না মোটেও! রোনালদো এমনই এক ফরোয়ার্ড, যার জন্য কোচরা তাঁদের পরিকল্পনার ‘নোটবুক’টাও ছিঁড়ে ফেলতে বাধ্য হন, আবারও নতুন করে রোনালদোকে ঘিরে পরিকল্পনা করতে বসেন, যাতে এই পর্তুগিজ রাজার কাছ থেকে সর্বোচ্চটা পাওয়া যায়। ম্যানচেস্টার ডার্বিতে স্কোয়াডে ছিলেন না, প্রথমে শোনা গেল, চোটে পড়েছেন।

পরে জানা গেল, হুট করে নিজের দেশে চলে গিয়েছেন তিনি। দেশ থেকে ফিরেই নিজের কাজে মন দিয়েছেন শতভাগ। যে খেলোয়াড় গোটা সপ্তাহের মধ্যে মাত্র এক দিন অনুশীলন করে টটেনহামের মতো শক্ত প্রতিপক্ষের সঙ্গে একাই দলকে জেতাতে পারেন, তাঁর জন্য কৌশলগত দিক দিয়ে একটু ছাড় তো দেওয়াই যায়!


সেটিই বোঝা গেল কোচ রাংনিকের কথায়, ‘ও যেভাবে খেলল, তা দেখে আমরা আরও ঠাট্টা করছিলাম যে প্রতি ম্যাচের আগে ওকে দুই-তিন দিনের জন্য পর্তুগালে পাঠিয়ে দেওয়া উচিত। ওই তিন দিন ওকে অনুশীলন করতে হবে না, একেবারে বৃহস্পতিবার এসে অনুশীলন করবে। তাতে যদি প্রতি ম্যাচে ওর পারফরম্যান্স এমন হয়! যা-ই হোক, ও বৃহস্পতিবার যেমন উদ্দীপ্ত হয়ে অনুশীলন করেছে, সেটিই বোঝা গেছে ম্যাচের পারফরম্যান্সে। ওই অনুশীলনের পর আমি সিদ্ধান্ত নিই, এক সপ্তাহের মতো সময় ধরে ও অনুশীলন করেনি তো কী হয়েছে, ওকে খেলাতেই হবে। হয়তো মৌসুমের বাকি ম্যাচগুলোর আগেও এ কাজই করতে হবে আমাদের!’

রোনালদো নিজে কী ভাবছেন অনন্যসাধারণ এ অর্জনের পর? অনুভূতি প্রকাশের ক্ষেত্রেও সেই চিরপরিচিত দল-অন্তঃপ্রাণ রোনালদোরই দেখা মিলল। যেখানে নিজের অর্জন নিয়ে আবেগের বাগাড়ম্বর নেই, দলগত সাফল্যই যার কাছে সবচেয়ে উঁচুতে, ‘ওল্ড ট্রাফোর্ডে ফেরার পর প্রথম হ্যাটট্রিক পেয়ে অসম্ভব আনন্দিত আমি। মাঠে ফেরার পর দলকে জেতাতে পারার যে অনুভূতি, তার সঙ্গে কোনো কিছুর তুলনা চলে না। আমরা প্রমাণ করেছি, যতক্ষণ পর্যন্ত আমরা কঠোর পরিশ্রম করব ও একতাবদ্ধ থাকব, আমরা যেকোনো দিন যে কাউকে হারাতে পারি। ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের মতো ক্লাবের কোনো সীমা নেই, যত যা-ই হোক না কেন!’