মৌসুমের প্রথম বড় ম্যাচ, স্বাভাবিকভাবেই ফুটবলপ্রেমীদের আগ্রহ ছিল স্টামফোর্ড ব্রিজে, চেলসি-লিভারপুল ম্যাচ নিয়ে। গত মৌসুমে লিগে দুইবার লিভারপুলের কাছে হেরে যাওয়া ফ্র্যাঙ্ক ল্যাম্পার্ড এই মৌসুমে একাধিক নতুন খেলোয়াড় নিয়ে কীভাবে চ্যাম্পিয়ন লিভারপুলের বিপক্ষে রণপরিকল্পনা সাজান, আদৌ লিভারপুলকে হারাতে পারেন কি না, জানার ইচ্ছে ছিল সবার। সে লক্ষ্যে এবারও ব্যর্থ হয়েছেন চেলসি কোচ। তবে এর পেছনে দোষ যতটা না পরিকল্পনা ও কৌশলের, তার চেয়ে বেশি জীর্ণশীর্ণ রক্ষণভাগের।

দুই দলই মাঠে নেমেছিল ৪-৩-৩ ছকে। লিভারপুলের একাদশে চমক ছিল একটা, মূল সেন্টারব্যাক ভার্জিল ফন ডাইকের জায়গায় জো গোমেজ বা জোয়েল মাতিপের মতো কোনো প্রথাগত সেন্টারব্যাক নয়, বরং খেলানো হয়েছে ব্রাজিলের ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার ফাবিনিওকে। দলে সদ্য আসা মিডফিল্ডার থিয়াগো আলকানতারাকে বেঞ্চে রেখে কোচ ইয়ুর্গেন ক্লপ মিডফিল্ড সাজিয়েছিলেন জর্ডান হেন্ডারসন, জর্জিনিও ভাইনালডম ও নাবি কেইতাকে দিয়ে। মাঝে হেন্ডারসন, দুপাশে বাকি দুজন। সামনে যথারীতি মোহাম্মদ সালাহ, রবার্তো ফিরমিনো, সাদিও মানে।

এখন হলুদ কার্ড দেখানো হলেও, পরে ভিএআরের সাহায্যে সেটাই হয়েছে লাল।
ছবি : রয়টার্স

ওদিকে হাকিম জিয়েশ, ক্রিস্টিয়ান পুলিসিক, বেন চিলওয়েলদের মতো তারকাদের চোটের কারণে না পাওয়া ল্যাম্পার্ড ভরসা রেখেছিলেন জর্জিনিও, কুর্ট জুমা, আন্দ্রেয়া ক্রিস্টিয়ানসেন, মাতেও কোভাচিচ, মেসন মাউন্টদের মতো সাবেক সৈনিকদের ওপর। নতুন খেলোয়াড়দের মধ্যে ছিলেন শুধু দুই জার্মান, টিমো ভের্নার ও কাই হাভার্টজ। গোলরক্ষক কেপার সামনে জুমা-ক্রিস্টিয়ানসেনের জুটি, মিডফিল্ডে মাঝে জর্জিনিওকে রেখে দুপাশে এনগোলো কান্তে ও কোভাচিচ, ওপরে ভের্নারের সঙ্গে হাভার্টজ ও মাউন্ট।

৪৫ মিনিটেই নিজের জাত চিনিয়েছেন থিয়াগো।
ছবি : রয়টার্স

পায়ে যখন বল থাকবে, তখন ছকটা ৪-৩-৩ থেকে পরিবর্তিত হয়ে ২-৩-৫ হয়ে যাবে ; তখন দুই ফুলব্যাক (লিভারপুলের আরনল্ড ও রবার্টসন, চেলসির জেমস ও আলোনসো) ওপরে উঠে যাবে, দুই উইঙ্গার (লিভারপুলের সালাহ ও মানে, চেলসির মাউন্ট ও ভের্নার) ডিবক্সের কাছে এসে যাবে স্ট্রাইকারের কাছে, দরকার হয়ে স্ট্রাইকার (লিভারপুলের ফিরমিনো, চেলসির হাভার্টজ) একটু নেমে যাবে আক্রমণাত্মক মিডফিল্ডারের ভূমিকায়, ওদিকে তিন সেন্ট্রাল মিডফিল্ডারের একজন (লিভারপুলের ভাইনালডম, চেলসির কান্তে) সুযোগমতো ওপরে উঠে যাবেন। বল আয়ত্তে থাকার সময় অন্তত দুই দল একই পরিকল্পনায় খেলেছে।

তবে বল যখন পায়ে ছিল না, তখন চেলসি ও লিভারপুলের পরিকল্পনায় একটু পরিবর্তন এসেছে। লিভারপুলের পায়ে বল না থাকলে যথারীতি প্রেস করে গেছে, ওদিকে চেলসির পায়ে বল না থাকলে চেলসির প্রেস করায় অতটা আগ্রহ ছিল না, ৪-৩-৩ থেকে তখন তাদের ছক হয়ে গিয়েছে ৪-৫-১। দুই উইঙ্গার ভের্নার ও মাউন্টের দায়িত্ব ছিল লিভারপুলের দুই ফুলব্যাক আরনল্ড ও রবার্টসনকে দেখে দেখে রাখার।

বল পায়ে না থাকলে চেলসির খেলোয়াড়দের অবস্থান। এক স্ট্রাইকার ছাড়া সবাই নেমে গেছেন।
সংগৃহীত ছবি

কাজ চালানো সেন্টারব্যাক হিসেবে খেলা ফাবিনিওকে কীভাবে ভের্নারের সঙ্গে পেরে ওঠেন, সে বিষয়টা ছিল। ল্যাম্পার্ডও বেশ ভালোমতো বুঝেছিলেন ব্যাপারটা, হয়তো সে কারণেই ম্যাচের মধ্যে ভেরনার হাভার্টজকে বলেছিলেন নিয়মিত নিজেদের জায়গা পরিবর্তন করে নিতে। ভের্নার স্ট্রাইকার হলেও, সারা জীবন বাম উইং থেকে ডি-বক্সে উঠে আক্রমণ করার ব্যাপারে তাঁর আগ্রহ দেখা গেছে বেশি, যাতে তাঁর গতির পূর্ণ ব্যবহার করা যায়। ভের্নারকে বাম উইংয়ে জায়গা দিতে হাভার্টজ উঠে গিয়েছিলেন স্ট্রাইকার হিসেবে, সাবেক ক্লাব বায়ার লেভারকুসেনের হয়ে গত মৌসুমে যে পজিশনে তিনি বেশ ক‘বার খেলেছেন। ফলে কাগজে-কলমে চেলসির সুবিধা ছিল। ভের্নারের প্রান্তে লিভারপুলের ডিফেন্ডার হিসেবে ছিলেন রাইটব্যাক ট্রেন্ট আলেক্সান্ডার-আরনল্ড ও ফাবিনিও ; ট্রেন্ট আক্রমণের দিক দিয়ে দুর্দান্ত হলেও রক্ষণটা ঠিক আক্রমণের মতো করতে পারেন না। আর ছিলেন ফাবিনহো, যার মূল পজিশন মিডফিল্ডে। ফলে মনে হওয়াটাই স্বাভাবিক, গতির খেলা দেখিয়ে ভের্নার স্তব্ধ করে দেবেন চ্যাম্পিয়নদের।

ম্যাচে অমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছেও। চেলসির দুই ফুলব্যাক আলোনসো ও জেমসের পায়ে বল দেখলেই আরনল্ড ও রবার্টসন তাঁকে প্রেস করতে উঠে গেছেন নিজের জায়গা ছেড়ে, ফলে ফেলে আসা জায়গায় নিজের গতি ব্যবহার করে ওপরে উঠে গিয়েছেন দুই উইঙ্গার ভের্নার ও মাউন্ট। ফলে একা পড়ে গিয়েছিলেন হয় ফন ডাইক, নয় ফাবিনিও। বল পায়ে ভের্নারের দ্বিধাদ্বন্দ্বের সুযোগ নিয়ে সে বিপদ কাটাতে পেরেছেন ফাবিনিও। গতির ঝলক দেখালেও একজন আদর্শ স্ট্রাইকারের মতো ডি-বক্সে তেমন কার্যকরী ছিলেন না ভের্নার।

ভের্নারের সামনে ফাঁকা জায়গা, আটকাতে ছুটে আসছেন ফাবিনহো। রাইটব্যাক আরনল্ড ভের্নারকে ধরতে পারেননি তখনো।
সংগৃহীত ছবি

এর পেছনে একটা কারণ হতে পারে স্ট্রাইকার হিসেবে কাই হাভার্টাজের খেলাটা। সাবেক ক্লাব লাইপজিগে ভের্নার যখন বাম দিক থেকে উঠে এসে আক্রমণ করতেন, তাঁকে ডিবক্সে সে জায়গাটা করে দিতেন ড্যানিশ স্ট্রাইকার ইউসুফ পুলসেন। বল ধরে রাখা, শারীরিক সক্ষমতা দিয়ে এক-দুজন সেন্টারব্যাককে তটস্থ রাখা - এমন কাজ একজন প্রথাগত ‘নাম্বার নাইন’ই ভালো করতে পারেন, পুলসেনের মতো। কিন্তু আক্রমণাত্মক মিডফিল্ডার হওয়ার কারণে হাভের্তজের মধ্যে ওসব গুণ নেই আবার। ফলে হাভার্টজকে না খেলিয়ে অলিভিয়ের জিরু বা নিদেনপক্ষে ট্যামি অ্যাব্রাহামকে খেলালে ভের্নারের কাছ থেকে আরও উপযোগিতা পাওয়া যেত কি না, সে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।

একদম নিচু থেকে আক্রমণ শুরু করতে চেয়েছে চেলসি। নিজেদের ডিবক্সে গোলরক্ষক কেপা আরিজাবালাগা ছাড়াও দুই সেন্টারব্যাক ঢুকে যাচ্ছিলেন নিয়মিত, তাও আবার দুই পাশে। এ যেন প্রতিপক্ষকে প্রেস করার জন্য আমন্ত্রণ জানানো! সদা প্রেসে আগ্রহী লিভারপুলের তিন ফরোয়ার্ড মানে-সালাহ-ফিরমিনো সানন্দে সে আমন্ত্রণ গ্রহণ করেছেনও। ফলে প্রায়ই দেখা যাচ্ছিল, দুই সেন্টারব্যাকের মধ্যে ডানদিকে থাকা ক্রিস্টিয়ানসনকে বক্সের মধ্যেই প্রেস করছেন মানে, ওদিকে জুমাকে প্রেস করছেন সালাহ। এমনভাবে প্রেস করছেন, যাতে পেছনে থাকা দুই ফুলব্যাকের দিকেও (মানের পেছনে জেমস, সালাহর পেছনে আলোনসো) নজর দেওয়া যায়। ফলে দুই সেন্টারব্যাককে পাস দেওয়াটা কষ্টকর হয়ে যাচ্ছিল কেপার জন্য।

ডিবক্সে প্রেস করতে ঢুকে গেছেন ফিরমিনো-মানেরা, পাস দিতে সমস্যা হচ্ছে কেপার। এই দ্বিধাদ্বন্দ্বে থেকেই বল তুলে দেন মানের পায়ে।
সংগৃহীত ছবি :

কেপাকে সাহায্য করতে ওদিকে নেমে আসছিলেন ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার জর্জিনিও। জর্জিনিওর দিকে আবার প্রেস করছিলেন লিভারপুলের স্ট্রাইকার রবার্তো ফিরমিনো। এবার জর্জিনিওকে উদ্ধার করতে নেমে আসছিলেন ক্রোয়েশিয়ান তারকা মাত্তেও কোভাচিচ, জর্জিনিওর সঙ্গে জুটি গড়ার জন্য। কোভাচিচের পিছু পিছু প্রেস করতে আবার চলে আসছিলেন লিভারপুলের কেইতা। ফলে আক্রমণ গড়ার জন্য কেপার একটা কাজই করার ছিল, কোনোভাবে ঝুঁকি নিয়ে বল উড়িয়ে দুই ফুলব্যাক আলোনসো বা জেমসের দিকে মারা। আর কোনোভাবে সে কাজে সফল হলেই কেল্লাফতে, লিভারপুলের কোনো এক ফুলব্যাককে প্রেসে আমন্ত্রণ জানানো যাবে, ওই ফুলব্যাক যে জায়গা ফেলে আসবেন সে জায়গায় গতি দিয়ে উঠে যাবেন চেলসির দুই উইঙ্গারের একজন। বরাবরই উঁচু লাইনে থাকা লিভারপুলের রক্ষণভাগ তাতে ভেঙে পড়বে, অন্তত গত বেশ কয়েক ম্যাচে যা হয়েছে। ল্যাম্পার্ডের পরিকল্পনা ছিল অনেকটা এমন।

সালাহ, মানে, ফিরমিনো, ভাইনালডম সবাই আশেপাশে। কেপা তাই বল উড়িয়ে আলোনসোর দিকে মারার চেষ্টায়।
সংগৃহীত ছবি

ঝামেলা বাঁধে যখন সাদিও মানেকে অন্যায়ভাবে আটকাতে গিয়ে ফেলে দেন ক্রিস্টিয়ানসেন। প্রথমে হলুদ কার্ড দেখানো হলেও ভিএআরের সাহায্য নিয়ে তাকে লাল কার্ডে রূপান্তরিত করেন রেফারি, চেলসি হয়ে যায় দশজনের।

চেলসি বুঝতে পারে, দশজনের দল হয়ে এগারোজনের লিভারপুলের সঙ্গে টেক্কা দেওয়ার একটাই উপায় — দম বন্ধ করে সবাই মিলে লিভারপুলের আক্রমণ আটকাও, মাঝখানটা একদম খেলোয়াড় দিয়ে ভরাট করে ফেল যাতে সোজাসুজি লিভারপুলের কেউ শট নিতে না পারে। পরে নিজেদের পায়ে বল আসলেই দ্রুতগতির ভের্নার, মাউন্ট, জেমস কিংবা আলোনসোর সাহায্যে এক নিমেষে প্রতি আক্রমণে ওঠো। মাঝখানটা খেলোয়াড় দিয়ে ভরে ফেললে লিভারপুলের মাঝমাঠ দিয়ে আক্রমণ করতে কষ্ট হয়, কারণ গত দুই তিন বছর ধরে লিভারপুলের সৃষ্টিশীল এমন কেউ নেই যে মাঝমাঠ থেকে রক্ষণচেরা এক থ্রু বল, বা নিখুঁত লং বল দিয়ে প্রতিপক্ষের রক্ষণ খুলে দিতে পারেন।

দশজনের চেলসি যে এই কাজটা করবে, সেটা খুব ভালোই বুঝেছিলেন ক্লপ। এত দিন না হয় নিজের হাতে থাকা হেন্ডারসন, মিলনার, ভাইনালডম, ফাবিনিওরা মিডফিল্ড থেকে সৃষ্টিশীলতা দেখাতে পারেননি, তাই বলে এখন তো আর সেই সমস্যা নেই। কিছুদিন আগেই বিশ্বের অন্যতম সৃষ্টিশীল মিডফিল্ডার স্পেনের থিয়াগো আলকানতারাকে বায়ার্ন মিউনিখ থেকে উড়িয়ে এনেছে তাঁরা। ফলে হালকা চোটে ভুগতে থাকা হেন্ডারসনের জায়গায় থিয়াগোকে নামিয়ে দেন ক্লপ। নেমেই লিভারপুলের মাঝমাঠের চেহারাটা বদলে দেন সদ্যই বায়ার্নের হয়ে ট্রেবল জিতে আসা এই মিডফিল্ডার। মানে, সালাহ, ভাইনালডম, রবার্টসন, আরনল্ড - সবার সঙ্গে রসায়ন জমিয়ে নেন নিজের। ৪৫ মিনিট খেলেই ৭৫ টা সফল পাস দিয়েছেন এই তারকা। চেলসির হয়ে গোটা ম্যাচ খেলা একটা খেলোয়াড়ও অত পাস দিতে পারেননি। ২০০৩-০৪ সালের পর থেকে কোনো মিডফিল্ডার মাত্র ৪৫ মিনিট খেলে এভাবে নিয়ন্ত্রণ করেননি মিডফিল্ডকে।

ফলে দশজনের চেলসির কাছে লিভারপুলকে আটকানোর কোনো উপায় জানা ছিল না। চেলসির ওই জমাট রক্ষণ ও মিডফিল্ড ভেদ করেই প্রথম গোল হয়েছে, আর দ্বিতীয় গোলে লিভারপুল চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছে, ডিবক্সের মধ্যে লিভারপুলের ফরোয়ার্ডদের প্রেস করার জন্য আমন্ত্রণ জানিয়ে হুট করে প্রতি আক্রমণে ওঠার পরিকল্পনাটা বেশ ভালো হলেও, সে কাজে একটু ভুল করলেই শাস্তি দেবে তাঁরা। সাদিও মানে সে শাস্তিটাই দিয়েছেন, কেপার একটা ভুল পাস থেকে গোল করে।

ভুল পাসে প্রতিপক্ষকে গোল দিতে ‘সাহায্য’ করা কেপার সিদ্ধান্তহীনতাও চোখে পড়েছে। অনেক সময় বিপজ্জনকভাবে নিজের জায়গা থেকে বের হয়ে আসছিলেন, একবার যে কারণে আরেকটু হলে সালাহ-ফিরমিনো জুটি সুবিধা নিয়েই নিচ্ছিলেন।

আরেকটু হলেই এই জায়গা থেকে দলকে গোল খাওয়াতেন কেপা।
সংগৃহীত ছবি

শেষ মুহূর্তে ভের্নারের সঙ্গে আরেক স্ট্রাইকার ট্যামি আব্রাহামকে নামান ল্যাম্পার্ড, দুজনের মধ্যকার রসায়ন চোখে পড়েছে বেশ, যখন ভের্নারের একটা পাস থেকে বিপজ্জনক এক শট মেরেছিলেন আব্রাহাম, লিভারপুলের গোলরক্ষক আলিসনের দৃঢ়তায় সে যাত্রা উদ্ধার পায় লাল দলটা।

দিন শেষে ল্যাম্পার্ডের আক্ষেপের জায়গা হতো ওখানেই থাকবে, যদি লাল কার্ডটা না দেখতেন ক্রিস্টিয়ানসেন!