সোয়ানসি সিটিতে খেলা ভারতীয় বংশোদ্ভূত খেলোয়াড় ইয়ান ধান্দা।
সোয়ানসি সিটিতে খেলা ভারতীয় বংশোদ্ভূত খেলোয়াড় ইয়ান ধান্দা।ছবি: ইনস্টাগ্রাম

ভুলে যাওয়ার মতো একটা রাতই ছিল ভারতের ফুটবল দলের জন্য। আগের ম্যাচেই ওমানের সঙ্গে ১-১ গোলে ড্র করার আত্মবিশ্বাস নিয়ে পরশু প্রীতি ম্যাচে সংযুক্ত আরব আমিরাতের মুখোমুখি হয়েছিল ভারতীয় দল।

কিন্তু এ বেলায় আর লড়াই-টড়াই দেখা গেল না। দুবাইয়ের জাবিল স্টেডিয়ামে আধা ডজন গোল খেয়েছে ভারত! ৬-০ গোলের হার। এক ম্যাচে ছয় গোল বা তার বেশি খাওয়ার অভিজ্ঞতা ভারতের সর্বশেষ হয়েছিল ২০১০ সালের নভেম্বরে, কুয়েতের কাছে হেরেছিল ৯-১ গোলে। এর চার দিন পর অবশ্য সংযুক্ত আরব আমিরাতের কাছেই সেবার ৫-০ গোলে হেরেছিল ভারত।

গত কয়েক বছরে র‍্যাঙ্কিং আর উন্নতির সিঁড়ি বেয়ে তরতর করে এগিয়ে চলতে থাকা ভারতের ফুটবলের জন্য বড় ধাক্কা হয়ে এসেছে এই হার, এমনটাই মনে হতে পারে। তবে এর মধ্যে যুক্তরাজ্য থেকে ভারতীয় দলের জন্য ভেসে এল অনুপ্রেরণার বাণী।

সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিপক্ষে বেশ কজন নতুন খেলোয়াড়কে বাজিয়ে দেখেছেন ভারতের কোচ ইগর স্টিমাচ। ইংলিশ ক্লাব লিভারপুলের যুব একাডেমির সাবেক ফরোয়ার্ড, বর্তমানে ওয়েলসের ক্লাব সোয়ানসি সিটিতে খেলা ভারতীয় বংশোদ্ভূত খেলোয়াড় ইয়ান ধান্দার দিকটি বেশ পছন্দ হয়েছে। ভারতীয় দলের প্রতি তাঁর আহ্বান, এভাবেই কঠোর পরিশ্রম করে এগিয়ে যেতে হবে।

বিজ্ঞাপন

ধান্দার নামটা যেমন বাংলাভাষী মানুষের জন্য একটু অন্য রকম ঠেকতে পারে, তেমনি তাঁর ক্যারিয়ারের গতিপথ আর হঠাৎ করে ভারতীয় দল নিয়ে তাঁর উচ্ছ্বাস দেখে মনে হতে পারে, এ বুঝি ভারতীয় দলে সুযোগ পাওয়ার ‘ধান্দা’ তাঁর!

বয়স ২২ বছর। সিভিতে লিভারপুলের নাম আছে। এখন খেলছেন ইংল্যান্ড ফুটবলের দ্বিতীয় বিভাগ চ্যাম্পিয়নশিপের ক্লাব সোয়ানসিতে। এসবের সঙ্গে ‘ভারতীয় বংশোদ্ভূত’ পরিচয়টা মিলিয়ে নিন, মনে হবে, ভারতের ফুটবলের জন্য বড় এক আশীর্বাদই হতে পারেন ধান্দা। যদিও কয়েক বছর আগেও যে প্রতিশ্রুতি ছিল ধান্দার ক্যারিয়ার ঘিরে, এখন আর তেমনটা নেই।

default-image

বার্মিংহামে জন্ম ধান্দার। মা ইংলিশ, বাবার জন্মও ইংল্যান্ডেই হয়েছিল। তাঁর পিতামহ ভারত থেকে গিয়ে ইংল্যান্ডে অভিবাসী হয়েছিলেন। ওয়েস্ট ব্রমউইচ অ্যালবিয়নের একাডেমিতে শুরু ধান্দার, ২০১৩ সালে যোগ দেন ইংল্যান্ডের সফলতম ক্লাব ও সফলতম একাডেমিগুলোর একটি লিভারপুলে।

লিভারপুলে ধান্দার সময়টা উত্থান-পতনেই কেটেছে। অবশ্য তিনি হতে পারতেন চেলসিরও। ২০১০ সালে তাঁকে ট্রায়ালে ডেকেছিল চেলসি, কিন্তু ওয়েস্ট ব্রম ছেড়ে তখন চেলসিতে যেতে চাননি ধান্দা। কিন্তু ২০১৩ সালে লিভারপুলে কেন গেলেন? তাঁর সিদ্ধান্তের পেছনে বড় প্রভাবক হিসেবে সে সময়ের লিভারপুল কোচ ব্রেন্ডন রজার্সের কথা বলেছেন ধান্দা, ‘ব্রেন্ডন রজার্স ক্লাবের কোচ বলেই আমি এখানে আসার ব্যাপারে বেশি রোমাঞ্চিত ছিলাম। কারণ, তিনি এমন একজন কোচ, যিনি তরুণদের ওপর ভরসা রাখেন।’

সে সময় লিভারপুলে আলো ছড়াতে থাকা ব্রাজিলিয়ান প্লেমেকার ফিলিপে কুতিনিওকে আদর্শ মানতেন ধান্দা, ভালো লাগত ম্যানচেস্টার সিটি ছেড়ে এই মৌসুমে রিয়াল সোসিয়েদাদে যাওয়া স্প্যানিশ প্লেমেকার দাভিদ সিলভাকেও।

ধান্দার নিজের খেলার ধরনও প্লেমেকারের মতোই। ডান কিংবা বাঁ—আক্রমণে দুই প্রান্তেই খেলতে পারেন, পারেন স্ট্রাইকারের পেছনে ‘সেকেন্ড স্ট্রাইকার’ কিংবা সেন্ট্রাল অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার হিসেবে খেলতেও।

তবে ফিটনেস, গায়ের জোরে পিছিয়ে ছিলেন বলে লিভারপুলে ধান্দার গুছিয়ে নিতে একটু সময় লেগেছে। অনূর্ধ্ব-১৫ থেকে উঠেছেন অনূর্ধ্ব-১৮ দলে। ২০১৬ সালে ইংল্যান্ডের ক্লাবগুলোর অনূর্ধ্ব-১৮ দলের জন্য আয়োজিত লিগ ‘প্রিমিয়ার লিগ অ-১৮’-এ লিভারপুলের হয়ে ১৯ ম্যাচ খেলেছেন, এর মধ্যে লিভারপুলের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের মাঠে দুই গোল আর লিভারপুলের মাঠে ম্যান ইউনাইটেডের বিপক্ষে এক গোলসহ করেছেন ৭ গোল। গোল করেছিলেন নগরপ্রতিদ্বন্দ্বী এভারটনের বিপক্ষে দুই মার্সিসাইড ডার্বিতেও।

রজার্সের পর তত দিনে লিভারপুলের কোচ ইয়ুর্গেন ক্লপ। এ সময়ে অনূর্ধ্ব-২৩ দলে নিয়মিত হয়ে ওঠেন ধান্দা। ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে মৌসুমের মাঝে হঠাৎ ফাঁকা সময় পেয়ে ক্লপ দলকে নিয়ে স্পেনের লা মাঙ্গায় অনুশীলন ক্যাম্পের আয়োজন করেন, সে ক্যাম্পে একাডেমির খেলোয়াড়দের মধ্যে যাঁদের নিয়েছিলেন, তাঁদের একজন ছিলেন ধান্দা। কিন্তু এরপর সেভাবে আর এগোতে পারেননি ধান্দা।

বিজ্ঞাপন

২০১৮ সালে আর তাঁর চুক্তি নবায়ন করেনি লিভারপুল, ধান্দা যোগ দেন সোয়ানসিতে। দ্বিতীয় বিভাগের ক্লাবটির হয়ে এখন পর্যন্ত ৪১ ম্যাচে ৫ গোল ধান্দার। এই মৌসুমে ২০ ম্যাচে করেছেন ১ গোল।

সেই ধান্দাই হঠাৎ ভারতের গত পরশুর ম্যাচের পর আলোচনায় ভারতীয় দলের পারফরম্যান্স নিয়ে কথা বলে। ওমান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিপক্ষে দুই ম্যাচে ১১ জন নতুন খেলোয়াড়কে নামিয়েছেন ভারতের কোচ স্টিমাচ।

সেটি দেখেই উজ্জীবিত ধান্দা গতকাল টুইট করেছেন, ‘সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিপক্ষে গতকালের (গত পরশুর) ম্যাচের ফল দেখে হতাশ হয়েছি। ভারতীয় ফুটবল দলকে বলি, সবাই কঠোর পরিশ্রম করে গেলে ইতিবাচক ফল আসবেই। ইগর স্টিমাচ নতুন খেলোয়াড়দের সুযোগ দিচ্ছেন দেখে ভালো লাগছে।’

কিন্তু একে তো তাঁর ক্লাব ক্যারিয়ার সেভাবে এগোয়নি, ইংল্যান্ডের হয়ে খেলা ধান্দার পক্ষে সম্ভব নয় বলেই মনে করছেন অনেকে। এর মধ্যে ভারতের দল নিয়ে ধান্দার এমন উচ্ছ্বাস অনেকের মনে প্রশ্ন তুলে দিচ্ছে, ধান্দার কি তবে ভারতের হয়ে খেলার ইচ্ছা আছে?

ভারতীয় বংশোদ্ভূত তিনি, ইংল্যান্ডের সিনিয়র দলের হয়ে কখনো খেলেননি, সে কারণে ভারতের জাতীয় দলে খেলতে বড় বাধা তেমন নেই ধান্দার। তাঁর টুইটের নিচে ভারতীয় ফুটবলপ্রেমীদের মন্তব্য বলে, ভারতীয়রাও চান ধান্দা ভারতের নীল জার্সিতেই খেলুন।

ফুটবল থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন