শক্তির বিজ্ঞাপন দিয়ে যাচ্ছে বসুন্ধরা

প্রথমেই গোল করে দলকে এগিয়ে দেন রাউল বেসেরা।ছবি : শামসুল হক

নিজেদের সাধ্যমতো চেষ্টা করেছিল শেখ জামাল ধানমন্ডি ক্লাব। শেষমেশ ফেডারেশন কাপে বাকি দলগুলোর যে পরিণতি হয়েছে, সেটা হলো জামালেরও। বসুন্ধরা কিংসের খেলোয়াড়দের মানের কাছেই পরাস্ত হয়েছে ক্লাবটি। ওদিকে হেসেখেলে সেমিতে উঠেছে ফেডারেশন কাপের বর্তমান চ্যাম্পিয়নরা।

সাধারণত অধিক শক্তিশালী দলের বিপক্ষে 'আন্ডারডগ'দের অন্যতম কৌশল হলো, নিজেদের যথাসম্ভব অননুমেয় হিসেবে প্রতিপক্ষের সামনে উপস্থাপন করা। শেখ জামাল সে চেষ্টা করেছে শতভাগ। জামালের ছক কখনো মনে হয়েছে জার্মান ক্লাব লাইপজিগের মতো ৪-২-২-২, যেখানে দুই ফুলব্যাক মোজাম্মেল হোসেন (রাইটব্যাক) ও মনসুর আমিন (লেফটব্যাক) সেভাবে সাইডলাইন ধরে ওঠানামা করছিলেন না, বরং হাফব্যাক হিসেবে দলের সেন্ট্রাল মিডফিল্ডার বা সেন্টারব্যাকদের সাহায্য করাই মূল লক্ষ্য ছিল তাঁদের।

অবশ্য চাইলেও জামালের ফুলব্যাক দুজন অত ওপরে উঠতে পারতেন না। বসুন্ধরার তিন বিদেশি রবসন দা সিলভা, রাউল বেসেরা আর জোনাথান ফার্নান্দেস তো ছিলেনই, সঙ্গে দেশের অন্যতম সেরা দুই উইঙ্গার মতিন মিয়া আর মাহবুবুর রহমানকে আটকানোর ব্যাপারও ছিল। মাঝে মাঝে মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হয়ে উঠে আসছিলেন বসুন্ধরার দুই ফুলব্যাক রিমন হোসেন ও বিশ্বনাথ ঘোষ। সব মিলিয়ে কীভাবে নিজেদের ঘর না সামলে ওপরে উঠতে পারতেন মোজাম্মেল আর মনসুর?

বাঁ দিক থেকে ওতাবেক বেশ ভালোই জ্বালিয়েছেন বসুন্ধরাকে।
ছবি : প্রথম আলো

তবে একেবারেই যে উঠতে পারেননি, তা নয়। সে ক্ষেত্রে জামালের ছক পরিবর্তিত হয়ে ৪-২-৩-১ হয়ে যাচ্ছিল। তখন দুই সেন্ট্রাল মিডফিল্ডার ফয়সাল আর রফিকুর রহমান নেমে এসে দুই সেন্টারব্যাক রেজাউল করিম আর মাজহারুল ইসলামকে সাহায্য করছিলেন, আর দুই ফুলব্যাক তুলনামূলকভাবে ওপরে উঠে দুই উইঙ্গার জাহিদ ও ওতাবেককে সাহায্য করছিলেন। সে ক্ষেত্রে ডান দিকে থাকা মোজাম্মেল-জাহিদ জুটির চেয়ে বাঁ দিকের মনসুর-ওতাবেক জুটি নজর কেড়েছে বেশি।

এই মনসুর-ওতাবেক জুটি শুরুর দিকে বসুন্ধরার রাইটব্যাক বিশ্বনাথ ও ডান দিকের সেন্টারব্যাক ইয়াসিন খানকে ভালোই যন্ত্রণা দিয়েছে। কিন্তু সময় যত গড়িয়েছে, বিশ্বনাথ বুঝিয়েছেন কেন জাতীয় দলের অন্যতম অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে মানা হয় তাঁকে। বসুন্ধরা এদিনও ৪-৩-৩ ছকে খেলেছে, যা আক্রমণে ৪-১-৪-১ হয়ে যাচ্ছিল। সেই ছকে বিশ্বনাথ যে অতি আক্রমণাত্মক ছিলেন, বারবার ওপরে উঠে বক্সে আর্জেন্টাইন স্ট্রাইকার রাউল বেসেরাকে ক্রস দিচ্ছিলেন, সেটা বলা যাবে না। বিশ্বনাথের খেলায় বরং রাইট উইংয়ে থাকা মতিন মিয়ার সঙ্গে বোঝাপড়া করে আক্রমণে ওঠার প্রবণতা দেখা গেল বেশি। মতিন মিয়াও সময়-সুযোগমতো নিচে নেমে রক্ষণে সাহায্য করছিলেন।

বসুন্ধরার ডান দিকে অপেক্ষাকৃত এই মতিন-বিশ্বনাথ জুটিটাই বেশি কার্যকরী মনে হয়েছে, বাঁ দিকের লেফট উইঙ্গার মাহবুবুর রহমান ও লেফটব্যাক রিমন হোসেনের জুটির তুলনায়। তবে তিন বিদেশি জোনাথান, বেসেরা আর রবসন; সঙ্গে ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার মাসুক মিয়া এদের সঙ্গে নিয়েই জামালের ওপর ছড়ি ঘুরিয়ে গেছেন বেশ। যার জবাব জানা ছিল না জামালের কাছে।

আক্রমণভাগে শুরুর দিকে লেফট উইঙ্গার ওতাবেক বেশ আলো ছড়ালেও মতিন-বিশ্বনাথের সামনে ক্রমেই নিষ্প্রভ হয়ে গেছেন। আক্রমণাত্মক মিডফিল্ডার সলোমন কিং ও স্ট্রাইকার পা ওমর জোবের মধ্যকার রসায়ন মাঝে মাঝে চোখ কাড়লেও বসুন্ধরার দুই সেন্টারব্যাক খালেদ শাফি ও ইয়াসিন খান (পরে দলে ফেরা তপু বর্মণ)–ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার মাসুক মিয়াকে সঙ্গে নিয়ে বিপদ কাটিয়েছেন বারবার। মাঝে মাঝে তা-ও যে ওমর জোবে কিংবা সলোমোন চেষ্টা করছিলেন না, তা নয়। কিন্তু অল্প সুযোগগুলো কাজে লাগাতে পারেনি জামাল।

দুর্দান্ত ফ্রি-কিকে দ্বিতীয় গোল করেছেন রবসন।
ছবি : শামসুল হক

বসুন্ধরা কিংসের তিন বিদেশি নিয়ে নতুন করে কিছু বলার নেই। তবে একটি বিষয় নিশ্চিত, মাঝমাঠে ইমন বা ইব্রাহিমের চেয়ে মাসুক ও মতিনের সঙ্গেই এই বিদেশিদের বোঝাপড়াটা ভালো হয়। রবসন যথারীতি ফ্রি রোলে খেলেছেন, বাঁ দিকে রিমন ও মাহবুবুরের সঙ্গে রসায়ন গড়ার দিকে তাঁর মনোযোগ ছিল বেশি। ওদিকে মাঝে মাসুককে রেখে জোনাথান প্রায়ই ডানে চলে যাচ্ছিলেন। প্রথম গোলটাও এসেছে ডান দিকে চলে যাওয়া তাঁর ক্রস থেকেই। আর বক্সে রাউল বেসেরা কতটা ক্ষুরধার, সেটার প্রমাণ দিয়েছেন ফেডারেশন কাপে নিজেদের তৃতীয় ম্যাচে তিন নম্বর গোলটা করে।

শেষমেশ তাই আবারও বসুন্ধরা কিংস স্কোয়াডের সামগ্রিক মানই মোটাদাগে তাঁদের আলাদা করে দিল শেখ জামাল থেকে।