সেট পিস আর অভিজ্ঞতা—এ দুইয়েই উড়ে গেল মোহামেডান

আবাহনীর বিপক্ষে সেট পিসে দুর্বলতা দেখিয়েছে মোহামেডান।ছবি: শামসুল হক

ম্যাচের আগে আনুষ্ঠানিক টিম শিট একটা পাওয়া যায় প্রেসবক্সে। মূল একাদশে কে কে খেলছেন, বদলি তালিকায় কে কে আছেন, কাকে নেওয়া হয়নি ম্যাচ স্কোয়াডে, ম্যাচ পরিচালনা করবেন কারা, মুখোমুখি হতে যাওয়া দুই দলের কর্মকর্তা কে কে—মোটামুটি সবকিছুর ধারণা পাওয়া যায় সেই টিম শিট থেকে। ঐতিহ্যবাহী ঢাকা ডার্বি শুরুর আগে সেই টিম শিটেই বড় এক চমক দেখাল মোহামেডান।

দেখা গেল, মোহামেডান কাগজে-কলমে মাত্র দুজন ডিফেন্ডার নিয়ে মাঠে নামছে। বুরকিনা ফাসোর সেন্টারব্যাক মুনাজির কুলদিয়াতে, আর দেশীয় লেফটব্যাক মোহাম্মদ কামরুল ইসলাম। মিডফিল্ডার নামছেন ছয়জন, আর দুজন ফরোয়ার্ড। বছর দুয়েক আগে ২-৭-২ ফরমেশন আবিষ্কার করে ফুটবল দুনিয়ায় বেশ বড়সড় শোরগোল ফেলে দিয়েছিলেন বার্সেলোনা, পিএসজি ও ইন্টার মিলানের সাবেক ইতালিয়ান মিডফিল্ডার থিয়াগো মোত্তা। সেই ছকেরও মূলসুর অনেকটাই এমন—দুজন ডিফেন্ডার থাকবেন, দুজন ফরোয়ার্ডের পেছনে থাকবেন ছয়জন মিডফিল্ডার। অনেক সময় গোলরক্ষকও উঠে চলে আসবেন মিডফিল্ডারের ভূমিকায়, যা ছকটাকে ২-৭-২ হতে সাহায্য করবে। মোহামেডানের কোচ শন লেনের ঘোষিত দল দেখে মাথায় তেমন চিন্তা মাথাচাড়া দিয়ে উঠলেও এটা নিশ্চিত ছিল, অবশ্যই মাত্র দুজন ডিফেন্ডারের ভরসায় রক্ষণভাগকে ছেড়ে দেবেন না এই ইংলিশ কোচ। অবশ্যই মিডফিল্ডারদের মধ্যে কোনো দুজন রক্ষণভাগের দায়িত্ব পালন করবেন।

অভিজ্ঞতাতে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী আবাহনীর চেয়ে পেছিয়ে ছিল মোহামেডান।
ছবি: শামসুল হক

কে কে করবেন, সেটা ম্যাচ শুরুর আগপর্যন্ত জানার উপায়ই ছিল না। কে জানে, চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীদের তুলনায় নিজেদের দলটা একটু খর্বশক্তির দেখেই হয়তোবা এতটুকু অননুমেয়তার আশ্রয় নিয়েছিলেন লেন। শত্রুশিবিরের কোচ মারিও লেমোসকে ধন্দে ফেলে দেওয়ার জন্য।

কিন্তু যার দলে খোদ জাতীয় দলেরই পাঁচজন খেলোয়াড়, আছেন আফগানিস্তানের মাসিহ সাইগানি, ব্রাজিলের ফ্রান্সিসকো তোরেস ও আর হাইতির কেরভেন্স বেলফোর্টের মতো তিন কার্যকরী বিদেশি, সেই আবাহনী কোচ মারিও লেমোস ম্যাচ জেতার জন্য প্রতিপক্ষ কোচের অননুমেয়তাকে কীভাবে পরাস্ত করা যায়, সে অপেক্ষা করবেন কেন? নিজেদের শক্তিমত্তায় ভর করেই আবাহনী জিতেছে ৩-০ গোলের সুস্পষ্ট ব্যবধানে।

আবাহনীর তুলনায় মোহামেডানের বেশিরভাগ খেলোয়াড়ই ছিলেন একেবারে আনকোরা।
ছবি: শামসুল হক

মোহামেডানে জাতীয় দলের খেলোয়াড় বলতে গেলে কেউই নেই। বিদেশিরাও যে আবাহনীর তুলনায় খুব বেশি মানসম্পন্ন, সেটা বলা যাবে না। আছেন জাপানের ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার উরু নাগাতা, মালির স্ট্রাইকার সোলেমানে দিয়াবাতে, বুরকিনা ফাসোর সেন্টারব্যাক মুনাজির কুলদিয়াতি ও নাইজেরিয়ার মিডফিল্ডার মোহাম্মেদ নুরাত। প্রথম দুজন আগেও খেলেছেন মোহামেডানের হয়ে, পরের দুজন এবার নতুন এসেছেন। নতুন দেখেই কি না, কুলদিয়াতি আর নুরাতের মধ্যে কিছু করে দেখানোর চেষ্টা ছিল। অধিনায়ক উরু নাগাতার গোটা সময় কেটেছে আবাহনীর নতুন বিদেশি স্ট্রাইকার ফ্রান্সিসকো তোরেসের পেছনে ছুটতে ছুটতে। আবাহনীর আরেক স্ট্রাইকার, অধিনায়ক নাবীব নেওয়াজ জীবনও নিচে নেমে খেলতে পছন্দ করেন অনেক। ফলে দুজনের মধ্যে কাকে মার্ক করবেন, সেটা নিয়েও মাঝেমধ্যে ধন্দে পড়ে যেতে দেখা গেল নাগাতাকে। ফলে মাঝমাঠ থেকে আক্রমণ গড়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে নাগাতার কাছ থেকে কোনো সাহায্যই পায়নি মোহামেডান।

মোহামেডানের খেলায় অভিজ্ঞতার অভাব ছিল স্পষ্ট। ছিল রসায়নের অভাবও। দলের অধিকাংশ খেলোয়াড়ই যে আনকোরা, সেটা বোঝা গেছে বেশ। আক্রমণভাগে প্রথমে সোলেমানে দিয়াবাতের সঙ্গে জাফর ইকবাল, আমির হাকিম বাপ্পী ছিলেন। দ্বিতীয়ার্ধে দিয়াবাতের জায়গায় মোহাম্মদ সোহানুর রহমান ও জাফর ইকবালের জায়গায় আমিনুর রহমান সজীব নেমেও আবাহনীর রক্ষণভাগে একটু চিড় ধরাতে পারেননি। দূর থেকে বিচ্ছিন্নভাবে কয়েকটা শট মেরেছেন বটে, ব্যস, ওটুকুই। প্রথমার্ধে শ্যামলের হেড, দিয়াবাতের শট, দ্বিতীয়ার্ধে বাপ্পীর শট, আবাহনীর এক ডিফেন্ডারের ভুলে বিপজ্জনক জায়গায় বল পেয়ে যাওয়া আমিনুরের শট—সব লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়েছে।

আগেই বলা হয়েছে, কাগজে-কলমে দুই ডিফেন্ডার ছিলেন কুলদিয়াতি ও কামরুল। প্রথমজন সেন্টারব্যাক, পরেরজন লেফটব্যাক। রাইটব্যাকে ছিলেন প্রথমার্ধে রাকিব খান, ও দ্বিতীয়ার্ধে মাসুদ রানা। ওদিকে সাত নম্বর জার্সি পরা হাবিবুর সোহাগকে মিডফিল্ডার বলা হলেও খেলেছেন দিয়াবাতের সঙ্গে জুটি বেঁধে। তা যে-ই খেলুক না কেন, উড়ন্ত বল হেড করে বিপদমুক্ত করা, সেট পিস সামলানো—এগুলো একজন ডিফেন্ডারের স্বাভাবিক কার্যতালিকার মধ্যেই পড়ে। যে কাজটা মোহামেডানের ডিফেন্ডাররা স্রেফ ভুলে গেলেন যেন। প্রথম চল্লিশ মিনিটে ম্যাচে গোল হয়নি কোনো। কিন্তু আবাহনীর অভিজ্ঞ লেফটব্যাক রায়হান হাসানের গোলমুখী বিষ মেশানো দুটি থ্রোয়ে মোহামেডান রক্ষণভাগের থরহরিকম্পমান অবস্থা দেখে আকাশি-হলুদদের বুদ্ধিমান কোচ মারিও লেমোসের বুঝতে সমস্যা হয়নি, ঠিক কোন জায়গায় আঘাত করলে মোহামেডানের ব্যথা লাগবে সবচেয়ে বেশি।

আবাহনীর রায়হানের লম্বা থ্রো’তে বারবারই এমন এলোমেলো হয়েছে মোহামেডানের রক্ষণ।
ছবি: শামসুল হক

ফলাফল? পরের পাঁচ মিনিটেই আবাহনীর দুই গোল। ৪১ মিনিটে বাঁ দিক থেকে রায়হানের প্রায় ৩০ গজি লম্বা থ্রোটা বক্সের ভেতর উড়ে এল। দিয়াবাতে, রাকিব, নাগাতা, কুলদিয়াতি—সবাইকে ফাঁকি দিয়ে বলটা মাসিহ সাইগানির মাথায় লেগে চলে গেল জালে। ৪৫ মিনিটে আবারও সেই রায়হান-ঝলক। এবার তাঁর লম্বা থ্রোটা অবশ্য সামলাতে পেরেছিলেন কুলদিয়াতি, কিন্তু সেখান থেকেও বল বিপদমুক্ত হয়নি। আবাহনীর অধিনায়ক নাবীব দুর্দান্তভাবে বলটা আবারও ডি-বক্সে ফেলেন, সেখান থেকে বাইসাইকেল কিক নিয়েছিলেন মাসিহ সাইগানি। গোলরক্ষকের সামনে থাকা জুয়েল রানা তাতে শুধু মাথা ছোঁয়ানোর কাজটি করেছেন। থ্রো-ইনেই যদি এভাবে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করা যায়, তাহলে খামোকা পরিশ্রম করে মাঝমাঠের দখল রেখে আক্রমণ রচনা করার দরকার কি? মারিও লেমোস হয়তো এটাই ভেবেছিলেন!

ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে কিছুদিন আগেও স্টোক সিটি বলে এক দল খেলত। যাদের হয়ে ররি ডিল্যাপ বলে একজন ইংলিশ মিডফিল্ডার খেলতেন। ভদ্রলোক আগে জ্যাভেলিন থ্রোয়ার ছিলেন দেখে ইয়া বড় বড় থ্রো-ইন নিতে পারতেন। কোচ টনি পিউলিসের গোল করার অন্যতম অস্ত্র ছিল এই লম্বা থ্রো। রায়হান হাসান আগে জ্যাভেলিন থ্রোয়ার ছিলেন কি না, সেটা জানা যায়নি, তবে কার্যকারিতায় রায়হানের থ্রো-ইন গুলোকেও এই ম্যাচে ডিল্যাপের চেয়ে কম কিছু মনে হলো না। ঢাকা ডার্বিতে লেমোস যেন তাই খানিকক্ষণের জন্য হয়ে গেলেন পিউলিস, আর রায়হান হলেন তাঁর ডিল্যাপ!

দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই আবার এক গোল, পরিচিত রেসিপি মেনেই। ৫৩ মিনিটে ডান দিক থেকে আবারও থ্রো-ইন করেন রায়হান। জটলায় দুজনের পা ছুঁয়ে বল আসে জুয়েলের কাছে। জুয়েল বলটা আলতোভাবে জালে ঠেলে ম্যাচে নিজের দ্বিতীয় ও দলের তৃতীয় গোল এনে দেন আবাহনীকে। বেশ কিছুদিন ধরে জাতীয় দলে সুযোগ না পাওয়া জুয়েল এই জোড়া গোলে আবারও কোচ জেমি ডে’র নেক নজরে এবার এসেই যাবেন!

বয়সের সঙ্গে ঝাঁজ কমে আসায় নাইজেরিয়ান স্ট্রাইকার সানডে সিজোবার ওপর ভরসা রাখেনি এবার আবাহনী। জানা গিয়েছিল, সানডে স্বার্থপর। তাই খেলোয়াড়-সতীর্থদের এই কথায় এবার তাঁকে আনেনি আবাহনী। তাঁর জায়গায় যাকে আনা হয়েছে, তাঁকে ঠিক প্রথাগত স্ট্রাইকার বলে মনে হলো না। ডি-বক্সে না থেকে বরং উইং বদল করে, কিংবা একটু মিডফিল্ডে নেমে এসে খেলা গড়ে দেওয়ার ব্যাপারেই নজর ছিল ব্রাজিলিয়ান স্ট্রাইকার ফ্রান্সিসকো তোরেসের। জুয়েল রানার সঙ্গে নিয়মিত উইং বদল করে মোহামেডানকে বিভ্রান্তিতে ফেলেছেন। মাঝমাঠে নেমে এসে মোহামেডানের অধিনায়ক, ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার উরু নাগাতাকে ব্যস্ত রেখেছেন। ফলে অনেক সময়ই রায়হান কিংবা সাদ উদ্দিন ডি-বক্সে ক্রস দেওয়ার মতো কোনো স্ট্রাইকারকে খুঁজে পাচ্ছিলেন না। তবে সে স্ট্রাইকারহীনতা অনেকটাই মিটিয়েছেন মাসিহ সাইগানি। যে দলে সাইগানির মতো একজন ডিফেন্ডার থাকেন, যিনি রক্ষণ সামলানোর পাশাপাশি সেট পিসে একজন পুরোদস্তুর স্ট্রাইকারের ভূমিকা নিয়ে প্রতিপক্ষ ডিফেন্সকে তটস্থ রাখেন, সে দলে আর প্রথাগত স্ট্রাইকারের দরকারই বা কী!

তবে আবাহনীর অধিনায়ক, জাতীয় দলের স্ট্রাইকার নাবীব নেওয়াজ জীবনও অনেক নিচে নেমে খেলতে পছন্দ করেন। এই ম্যাচের অনেক সময় তাঁকে ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডারের জায়গায় এসেও খেলতে দেখা গেল। মোহামেডানের চেয়ে শক্তিশালী প্রতিপক্ষের সামনে পড়লে, তোরেস আর নাবিবের মধ্যে কে ডিবক্সে থাকবেন, আর কে একটু নিচে নামবেন, সে ভূমিকাটা নির্দিষ্ট হওয়া খুবই জরুরি। নাহয় এই যোগাযোগহীনতার সুযোগ নিতে পারে মোহামেডানের চেয়ে শক্তিশালী যেকোনো ক্লাব।

বল পায়ে শাহেদ, বাপ্পীদের খেলা কিছুক্ষণের জন্য আশা জাগালেও শেষমেশ নাবীবদের অভিজ্ঞতার সামনেই হেরে বসেছে মোহামেডান। আর হেরেছে রায়হান হাসান নামের এক ‘থ্রোয়ার’–এর জাদুতে।