কে জিতবে ইউরো? প্রশ্নটা আসলেই প্রায় ১০০ কোটি টাকার। ইউরোর চ্যাম্পিয়ন দল ১ কোটি ইউরো পাবে, বাংলাদেশি মুদ্রায় সেটা তো প্রায় ১০০ কোটি টাকাই। সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা শুরু হবে ১১ জুন, শেষ ১১ জুলাই। ইউরোতে অংশ নিতে যাওয়া ২৪টি দলের খুঁটিনাটি জেনে নিলে এ প্রশ্নের উত্তর খোঁজা সহজ হতে পারে আপনার জন্য।
বিংশ শতাব্দীর প্রথম দশকের শেষভাগ থেকে শুরু করে দ্বিতীয় দশকের শুরুর দিকের সময়টায় বিশ্ব ফুটবলের চেহারাই পাল্টে দিয়েছিল স্পেন। দুটি ইউরো ও একটি বিশ্বকাপ জয়ের মাধ্যমে বিশ্বকে শিখিয়েছিল ফুটবলে কর্তৃত্ব করার নতুন মন্ত্র।
সেদিন আর নেই। ২০১৪ থেকে নিজেদের হারিয়ে খুঁজছে দলটা। হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে এবার ইউরো খেলতে এসেছে লুইস এনরিকের দল। স্পেন কি পারবে আগের সেই দাপট ফিরিয়ে আনতে?
দল: স্পেন
ফিফা র্যাঙ্কিং: ৬
দলে আছেন যাঁরা
গোলকিপার
দাভিদ দা হেয়া (ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড), উনাই সিমোন (অ্যাথলেটিক বিলবাও), রবের্ত সানচেজ (ব্রাইটন অ্যান্ড হোভ আলবিওন)
সেন্টারব্যাক
এমেরিক লাপোর্ত (ম্যানচেস্টার সিটি), এরিক গার্সিয়া (বার্সেলোনা), পাও তোরেস (ভিয়ারিয়াল), দিয়েগো ইয়োরেন্তে (লিডস ইউনাইটেড)
রাইটব্যাক/রাইট উইংব্যাক
সেজার আজপিলিকুয়েতা (চেলসি)
লেফটব্যাক/লেফট উইংব্যাক
জর্দি আলবা (বার্সেলোনা), হোসে গায়া (ভ্যালেন্সিয়া)
সেন্ট্রাল মিডফিল্ডার/ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার
সের্হিও বুসকেতস (বার্সেলোনা), মার্কোস ইয়োরেন্তে (আতলেতিকো মাদ্রিদ), কোকে (আতলেতিকো মাদ্রিদ), থিয়াগো আলকানতারা (লিভারপুল), ফাবিয়ান রুইজ (নাপোলি), রদ্রি (ম্যানচেস্টার সিটি), পেদ্রি (বার্সেলোনা)
উইঙ্গার/ওয়াইড মিডফিল্ডার
দানি অলমো (আরবি লাইপজিগ), ফেরান তোরেস (ম্যানচেস্টার সিটি), আদামা ত্রায়োরে (উলভারহ্যাম্পটন ওয়ান্ডারার্স), মিকেল ওয়ারজাবাল (রিয়াল সোসিয়েদাদ), পাবলো সারাবিয়া (পিএসজি)
স্ট্রাইকার
আলভারো মোরাতা (জুভেন্টাস), জেরার্দ মোরেনো (ভিয়ারিয়াল)
কোচ
লুইস এনরিকে
অধিনায়ক
সের্হিও বুসকেতস
ইউরোয় সেরা সাফল্য
চ্যাম্পিয়ন (১৯৬৪, ২০০৮, ২০১২)
গ্রুপে প্রতিপক্ষ
সুইডেন (১৪ জুন)
পোল্যান্ড (১৮ জুন)
স্লোভাকিয়া (২৩ জুন)
শক্তি
ব্যক্তিগত নৈপুণ্যের বিচারে দলের প্রত্যেক খেলোয়াড়ই অসাধারণ। অভিজ্ঞতা ও তারুণ্যের সুন্দর মিশেল আছে দলটায়। প্রত্যেক পজিশনেই কাগজে-কলমে দুর্দান্ত বিকল্প খেলোয়াড় আছে দলটায়। গ্রুপ পর্বের প্রতিটি ম্যাচই নিজেদের মাঠে খেলবে স্পেন, এটাও অনেক বড় একটা সুবিধা।
দুর্বলতা
রক্ষণভাগ বেশ ভালোই ভোগাতে পারে স্পেনকে। সের্হিও রামোসের মতো ক্ষুরধার ডিফেন্ডার নেই এবার, এই একটা কারণই তাদের রক্ষণকে পিছিয়ে দেবে অনেকটুকু। রামোসের অনুপস্থিতি স্পেনের এই দলটাকে অনেকটা নেতৃত্বশূন্য করে তুলেছে।
ফ্রান্সের হয়ে কখনো আন্তর্জাতিক ফুটবল না খেলা ম্যানচেস্টার সিটির এমেরিক লাপোর্ত এবার জায়গা পেয়েছেন স্পেন দলে, হয়তো মূল একাদশেও খেলবেন। প্রথমেই ইউরোর মতো একটা বড় টুর্নামেন্টে সম্পূর্ণ নতুন দেশের হয়ে কতটুকু ভালো খেলতে পারেন, সেটাও দেখার বিষয়। এবার সিটির হয়েও নিয়মিত ছিলেন না তিনি। এক ভিয়ারিয়ালের পাও তোরেস ছাড়া বার্সেলোনার এরিক গার্সিয়া কিংবা লিডসের দিয়েগো ইয়োরেন্তে—কেউই ক্লাব ফুটবলে নিয়মিত ছিলেন না।
রাইটব্যাক হিসেবে সেজার আজপিলিকুয়েতা চেলসির সাম্প্রতিক সাফল্যের অন্যতম কারিগর হলেও তাঁকে হয়তো মূল একাদশে খেলানো না-ও হতে পারে। শেষ কয়েকটা ম্যাচে রাইটব্যাক হিসেবে খেলানো হয়েছে আতলেতিকোর মার্কোস ইয়োরেন্তেকে। উইঙ্গার এমনকি সহকারী স্ট্রাইকার হিসেবে দুর্দান্ত মৌসুম কাটানো ইয়োরেন্তেকে রাইটব্যাকে খেলিয়ে স্পেন কী সুবিধা পাবে, এনরিকেই ভালো বলতে পারবেন।
সর্বশেষ ইউরোতে দাভিদ দা হেয়া যেমন দুর্দান্ত ছিলেন, এখন যদি সে দা হেয়াকে স্পেন পেত, গোলবারের নিচে এনরিকের চিন্তা অনেকাংশেই কমে যেত। কিন্তু সে দা হেয়া এখন ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের মূল একাদশে জায়গা পেতেই খাবি খান। তাঁর জায়গায় খেলা অ্যাথলেটিক বিলবাওয়ের উনাই সিমোন বল পায়ে দক্ষ, পেছন থেকে আক্রমণ গড়ে তোলার ব্যাপারে কুশলী হলেও শট আটকানো বা রিফ্লেক্সের ব্যাপারে অতটা পটু নন।
এককালে যে দলে ফার্নান্দো তোরেস বা ডেভিড ভিয়ার মতো স্ট্রাইকাররা মূল একাদশে জায়গা পাওয়ার জন্য লড়াই করতেন, এই স্পেনে তেমন গোলশিকারি স্ট্রাইকারের বড্ড অভাব। আলভারো মোরাতা কয়েক বছর ধরেই ধারাবাহিক নন, ভিয়ারিয়ালের জেরার্দ মোরেনোও বড় মঞ্চে এখনো পরীক্ষিত নন। শেষমেশ জার্মানির বিপক্ষে হ্যাটট্রিক করা উইঙ্গার ফেরান তোরেসকে এনরিকে স্ট্রাইকার হিসেবে নামিয়ে দিলেও আশ্চর্যের কিছু থাকবে না।
যেসব প্রতিপক্ষ জানপ্রাণ দিয়ে রক্ষণ করে যেতে পছন্দ করে, তাদের রক্ষণ ভাঙতে স্পেনের কয়েক বছর ধরেই সমস্যা হয়। এবার গ্রুপসঙ্গী হিসেবে স্পেন যাদের পেয়েছে তাদের অধিকাংশেরই ওই স্বভাব আছে। এমন রক্ষণ স্পেন কীভাবে ভাঙতে পারে, সেটাও দেখার বিষয়।
সম্ভাব্য একাদশ ও খেলার কৌশল (৪-৩-৩)
পেপ গার্দিওলা বার্সেলোনাকে যে ছন্দে খেলিয়ে বিশ্বজয়ী করেছিলেন, সে কৌশলেই স্পেন জাতীয় দলের স্বর্ণসময় এনেছিলেন ভিসেন্তে দেল বস্ক। লুইস এনরিকেও সেই কৌশল থেকে পুরোপুরি বেরিয়ে আসতে নারাজ। টিকিটাকার সঙ্গে এনরিকের এই দল মিশিয়েছে গতি ও সরাসরি আক্রমণ করার টোটকা। স্পেন এখন রক্ষণ থেকে আক্রমণে তাড়াতাড়ি উঠে যেতে পারে, প্রতিপক্ষের ডি–বক্সের সামনে অযথা ছোট ছোট পাস দিতে দিতে সময় নষ্ট করে না। ফেরান তোরেস, দানি অলমো, আদামা ত্রায়োরে ও পেদ্রির মতো খেলোয়াড়েরা দ্রুতগতিতে আক্রমণ করার মাধ্যমে এই স্পেন দলে নতুন মাত্রা যোগ করেছেন।
গোলকিপার হিসেবে উনাই সিমোনের খেলার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি। দুই ফুলব্যাক হিসেবে আলবা ও মার্কোস ইয়োরেন্তে, ওদিকে সেন্টারব্যাক হিসেবে পাও তোরেসের সঙ্গে দলে নতুন আসা এমেরিক লাপোর্তেকে খেলাবেন হয়তো এনরিকে।
বুসতেকস যত দিন ফিরছেন না মাঝমাঠ দখলে থাকবে ম্যানচেস্টার সিটির রদ্রি, লিভারপুলের থিয়াগো আলকানতাঁরা ও আতলেতিকোর কোকের। আক্রমণে রদ্রির সঙ্গে থিয়াগো নিচে নেমে দুই ফুলব্যাকের সঙ্গে সমান্তরালে চার খেলোয়াড়ের একটা লাইন গঠন করবেন। পিছে থাকবেন দুই সেন্টারব্যাক। বাকি মিডফিল্ডার কোকে ওপরে উঠে যাবেন আক্রমণভাগের তিন খেলোয়াড়ের সঙ্গে। ফলে সেখানেও চারজনের একটা লাইনের সৃষ্টি হবে। ফলে আক্রমণে স্পেনের কৌশল অনেকটা ২-৪-৪ হয়ে যাবে। আক্রমণে ফেরান তোরেস ও আলভারো মোরাতার সঙ্গে দানি অলমোর খেলার সম্ভাবনা বেশি। মিডফিল্ডে আরেকটু গতি চাইলে থিয়াগোর জায়গায় পেদ্রিকে খেলাতে পারেন এনরিকে।
স্পেনের সমর্থকেরা চাইলে এই দলটা নিয়ে রোমাঞ্চিত হতে পারেন, তাঁদের সে কারণ আছে। আমরা একটি দুর্দান্ত বাছাইপর্ব কাটিয়েছি। জয় আর হারের পারফরম্যান্সে তেমন কোনো পার্থক্য ছিল না। এটা যেহেতু ৩৮ ম্যাচের লিগ না, তাই ভাগ্য অনেক বড় ভূমিকা রাখবে, আমাদেরও টুর্নামেন্ট জেতার জন্য অনেক কিছুই করতে হবে
প্রত্যাশা ও বাস্তবতা
নিঃসন্দেহে স্পেনের লক্ষ্য হবে চ্যাম্পিয়ন হওয়া। কিন্তু রক্ষণভাগে সের্হিও রামোসের মতো নেতার অনুপস্থিতি ও নিয়মিত গোল করতে পারেন এমন কোনো স্ট্রাইকারের না থাকা দলটাকে ভোগাতে পারে যথেষ্ট। ফলে গত বিশ্বকাপের পুনরাবৃত্তি হলেও আশ্চর্যের কিছুই থাকবে না।