default-image

লাজুক, মায়াবী একটা মুখ। পাঁচ তারকা হোটেলের সৌন্দর্য বাড়ানো গাছগুলোর দিকে কৌতূহল নিয়ে তাকান। গতকাল সকালে কাঠমান্ডুর হোটেল চত্বরে তাঁকে দেখে মনে হলো, প্রথম বিদেশ সফরের ঘোরে আছেন। তবে আগের দিন দশরথ রঙ্গশালায় ৪ নম্বর জার্সির রিমন হোসেনের সঙ্গে এই রিমনকে মেলানো গেল না। অভিষেকেই রক্ষণভাগে আস্থা নিয়ে খেলেছেন। পাসপোর্টের জন্মতারিখ অনুযায়ী বয়স মাত্র ১৫ বছর ৮ মাস ২২ দিন। তবে বাস্তবে আরও বেশি।

২০১৫ সালে নওগাঁ ছেড়ে যশোরের শামসুল হুদা একাডেমিতে ভর্তি হয়ে ছয় বছরের মধ্যেই জাতীয় দলের টিকিট পেয়েছেন। স্বাভাবিকভাবে প্রথম ম্যাচ খেলার আনন্দে রাতে ভালোভাবে ঘুমাতে পারেননি। দেশ থেকে শুভেচ্ছাবার্তা পেয়েছেন অনেক। সঙ্গে কোচের নির্দেশনা অনুযায়ী খেলতে পেরেছেন কি না, এই অঙ্ক মেলাতে গিয়ে পার হয়ে যায় রাত দুটো। রিমনের ভাষায়, ‘প্রথম খেলছি তো, সেই চিন্তায় ঘুম আসছিল না রাতে। তবে নিজের খেলায় আমি খুশি। একটি গোল করাতে বা করতে পারলে ভালো লাগত।’

২০১৯ সালে তৃতীয় বিভাগে সর্বোচ্চ ও দ্বিতীয় বিভাগে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়েছেন। গত বছর প্রথম বিভাগে সর্বোচ্চ গোলদাতা। গত বছরই বসুন্ধরা কিংসে যোগ দেন স্ট্রাইকার হিসেবে। তবে সেটিও বিদেশি কোচের অধীন অনুশীলন ও জাতীয় দলের খেলোয়াড়দের কাছ থেকে শেখার আশায়। এখন হয়ে গেলেন লেফটব্যাক। চলমান মৌসুমে বসুন্ধরার হয়ে খেলেছেন সব ম্যাচই।

default-image
বিজ্ঞাপন

জাতীয় দলকে বোর্ড পরীক্ষা হিসেবে ধরা গেলে ঘরোয়া ফুটবলের ম্যাচগুলো ক্লাস পরীক্ষা। ঘরোয়া খেলায় মেধার প্রমাণ দেওয়া অনেক সম্ভাবনাময় তরুণই জাতীয় দলের বোর্ড পরীক্ষায় ভেঙে পড়েন। রিমন জাতীয় দলে ডাক পেয়ে প্রথম ম্যাচেই ৭০ মিনিট পর্যন্ত লেফটব্যাকে খেলেন, বিশ্বনাথ মাঠ ছাড়লে রাইটব্যাকে আসেন। তাঁর খেলায় খুশি বাংলাদেশ কোচ জেমি ডে, ‘১৬ বছর বয়সেই একটা ছেলে জাতীয় দলে খেলে ফেলল, ওর যোগ্যতা নিয়ে আর কী বলব!’

১৬ বছর বয়সেই একটা ছেলে জাতীয় দলে খেলে ফেলল, ওর যোগ্যতা নিয়ে আর কী বলব!
জেমি ডে, কোচ, বাংলাদেশ দল

মূলত ডান পায়ের খেলোয়াড়। ভালো ট্যাকল করতে পারেন। ওপরে ওঠেন। সঙ্গে ভালো কভারিং। ডিফেন্ডারদের মৌলিক অন্যতম এই তিন গুণে রিমন চোখ কাড়ছেন। মঙ্গলবার অবশ্য কিরগিজস্তান অলিম্পিক দলের বিপক্ষে ওপরে না উঠে ঘর সামলোনোর দিকেই বেশি নজর দেন। বাস্তবেও এই তরুণের কাঁধে ঘর, অর্থাৎ সংসার চালানোর দায়িত্ব। মা সুফিলা বেগম ছাড়া তাঁকে ছেড়ে সবাই যে একে একে পাড়ি জমিয়েছেন পরপারে।

রিমনের গায়ে জাতীয় দলের জার্সি দেখে সবচেয়ে বেশি খুশি হতে পারতেন তাঁর বাবা। দীর্ঘদিন ডায়াবেটিসে ভুগে গত বছর করোনার শুরুতে না ফেরার দেশে চলে গেছেন তিনি। বাবা চলে যাওয়ার শোক কাটিয়ে ওঠার আগেই একই অসুখে চলে যান বড় বোন। নিজের ফুটবলের আয়েই এখন নওগাঁয় মামাদের সঙ্গে মাকে নিয়ে থাকেন রিমন। নিজের জীবন নিয়ে বলছিলেন, ‘বাবার জন্যই ফুটবল খেলতে পেরেছি। জাতীয় দলে খেলতে দেখলে তিনিই সবচেয়ে বেশি খুশি হতেন। এখন মাকে খুশি করা ছাড়া আর কেউ নেই।’

গৃহিণী মায়ের ফুটবলের ভালো–মন্দ বোঝার সামর্থ্য নেই। ছেলেকে টিভিতে ও বিদেশে ঘুরতে দেখলেই বুঝবেন, ভালো করছেন তাঁর একমাত্র ছেলে। রিমনের লক্ষ্য এখন জাতীয় দলে জায়গা পাকা করা। নিয়মিত হতে আপাতত তাঁকে পেছনে ফেলতে হবে করোনার কারণে নেপাল সফর থেকে ছিটকে পড়া রহমত মিয়াকে। রিমন আশাবাদী, জায়গাটা ধরে রাখতে পারবেন।

বিজ্ঞাপন
ফুটবল থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন