আজ প্রত্যাবর্তনের গল্প লিখতে না পারলে ২০০৪–০৫ মৌসুমের পর এই 
প্রথমবার চ্যাম্পিয়নস লিগের কোয়ার্টার ফাইনালে মেসি বা রোনালদোর কেউই থাকবেন না
আজ প্রত্যাবর্তনের গল্প লিখতে না পারলে ২০০৪–০৫ মৌসুমের পর এই প্রথমবার চ্যাম্পিয়নস লিগের কোয়ার্টার ফাইনালে মেসি বা রোনালদোর কেউই থাকবেন নাছবি : রয়টার্স

ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো পারেননি। লিওনেল মেসি পারবেন, সে সম্ভাবনাও শূন্যের কাছাকাছি। চ্যাম্পিয়নস লিগে তাহলে তেতো একটা বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে গত এক যুগের বেশি সময় বিশ্ব ফুটবলকে মাতিয়ে রাখা ‘মেসি-রোনালদো’ দ্বৈরথকে?

গতকাল রাতে পোর্তোর বিপক্ষে চ্যাম্পিয়নস লিগের শেষ ষোলোর দ্বিতীয় লেগে নিজেদের মাঠে ৩-২ গোলে জিতেছে বটে জুভেন্টাস। কিন্তু প্রথম লেগে পোর্তোর মাঠে ২-১ গোলে হেরে আসা জুভেন্টাস দুই লেগ মিলিয়ে সম্মিলিত ফলে ‘অ্যাওয়ে গোলে’র হিসাবে বাদ পড়েছে।

বিজ্ঞাপন

মেসির বার্সেলোনারও কি আজ বাদ পড়ার দিন? শেষ ষোলোর প্রথম লেগে নিজেদের মাঠেই মেসির বার্সেলোনা ৪-১ গোলে উড়ে গেছে কিলিয়ান এমবাপ্পের পিএসজির কাছে। আজ বাংলাদেশ সময় রাত দুইটায় পিএসজির মাঠে দ্বিতীয় লেগে অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তনের গল্পই লিখতে হবে মেসিদের। চোট কাটিয়ে অনুশীলনে ফিরলেও এখনো পুরোপুরি ফিট না হওয়ায় নেইমারকে পাচ্ছে না পিএসজি, তাতেও মেসিদের কাজটা খুব একটা সহজ হচ্ছে কি? প্রথম লেগেও নেইমারকে ছাড়াই তো বার্সাকে উড়িয়ে দিয়েছে পিএসজি, আরও নির্দিষ্ট করে বললে চোখধাঁধানো হ্যাটট্রিক করা এমবাপ্পে।

default-image

মেসিও বাদ পড়লে ‘মেসি বনাম রোনালদো’ দ্বৈরথটা ১৬ বছরে প্রথমবার একটা তেতো স্মৃতি ফিরিয়ে আনবে। ২০০৪–০৫ মৌসুমের পর এই প্রথমবার চ্যাম্পিয়নস লিগের কোয়ার্টার ফাইনালে মেসি বা রোনালদোর কেউই থাকবেন না!

পোর্তোর বিপক্ষে প্রথম লেগের মতো দ্বিতীয় লেগেও অচেনা ছিলেন রোনালদো। বলতে গেলে ১৮০ মিনিটে খুঁজেই পাওয়া যায়নি তাঁকে। অথচ কাল দ্বিতীয় লেগের আগে এই রোনালদোকে ঘিরেই প্রত্যাবর্তনের গল্প লেখার স্বপ্ন বুনেছিল জুভেন্টাস। বুনবে না-ই বা কেন? চ্যাম্পিয়নস লিগকে ‘রোনালদোর টুর্নামেন্ট’ বানিয়ে ফেলা এত বছরে রিয়াল মাদ্রিদ কিংবা জুভেন্টাসের জার্সিতে ফিরে আসার উপাখ্যানে পর্তুগিজ যুবরাজের নায়ক বনে যাওয়ার স্মৃতি তো কম নয়!

রোনালদো পারেননি। পিএসজির বিপক্ষে প্রথম লেগে একেবারে অচেনা না হলেও আলো ছড়াতে না পারা মেসি আজ দ্বিতীয় লেগে পারবেন, এমন বাজি ধরার লোক এখন কম। চ্যালেঞ্জটা তো কম নয়, অন্তত ৪ গোলের ব্যবধানে জিততে হবে বার্সাকে!

বিজ্ঞাপন

মেসিরা তা না পারলেই দেখা হয়ে যাবে তেতো রেকর্ডটা। ২০০৪–০৫ মৌসুমে মেসির বার্সেলোনা ও রোনালদোর সে সময়ের দল ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড বাদ পড়ে শেষ ষোলোতে। বার্সা দুই লেগ মিলিয়ে ৫-৪ গোলে হেরেছিল জোসে মরিনিওর চেলসির কাছে, রোনালদোর ম্যান ইউনাইটেড ২-০ গোলে হারে এসি মিলানের কাছে। চ্যাম্পিয়নস লিগে সেই মৌসুমেই অভিষেক হয়েছিল মেসির, প্রথম ম্যাচটা খেলেছিলেন সেবারের গ্রুপ পর্বে শাখতার দোনেৎস্কের বিপক্ষে। রোনালদোর অভিষেক হয় তারও এক মৌসুম আগে, ২০০৩–০৪ মৌসুমের গ্রুপ পর্বে, ম্যান ইউনাইটেডের হয়ে জার্মানির স্টুটগার্টের বিপক্ষে।

default-image

এরপর থেকে এত বছরে মেসি চ্যাম্পিয়নস লিগ জিতেছেন চারবার, রোনালদো পাঁচবার। ফাইনাল মেসি চারবারই খেলেছেন, রোনালদো খেলেছেন সাতবার।

২০০৫-০৬ মৌসুমে মেসির বার্সা চ্যাম্পিয়নস লিগ জেতে। আর রোনালদো ম্যান ইউনাইটেড বাদ পড়ে গ্রুপ পর্বে। তার পরের মৌসুমে মেসি বাদ পড়লেন আগেভাগে। মেসির বার্সা শেষ ষোলোতে হেরে যায় লিভারপুলের কাছে, রোনালদোর ম্যান ইউনাইটেড সেমিফাইনালে বাদ পড়ে মিলানের কাছে।

তার পরের মৌসুমে (২০০৭-০৮) প্রথমবার চ্যাম্পিয়নস লিগ জেতার স্বাদ পান রোনালদো। সে পথে সেমিফাইনালে প্রথম দেখা হয় মেসি-রোনালদোর। দুই লেগে মেসি চোখধাঁধানো ফুটবল খেলেছেন, কিন্তু পল স্কোলসের বুলেট গতির এক শট দুই লেগে ব্যবধান গড়ে দেয়। দুই লেগ মিলিয়ে ১-০ গোলে জেতে ম্যান ইউনাইটেড।

পরের বার মেসির বদলা নেওয়ার পালা। এবার ফাইনালে দেখা হলো মেসি-রোনালদোর। ম্যান ইউনাইটেডে সেটিই শেষ পর্যন্ত হয়ে যায় রোনালদোর শেষ মৌসুম, তাতে লিগ জেতা হয়ে গেছে রোনালদোর। ওদিকে পেপ গার্দিওলার অধীনে স্পেন জয় করে সর্বজয়ের পথে ছুটছে বার্সা। ‘মেসি না রোনালদো—কে বিশ্বসেরা’ বিতর্কটা সেবারই প্রথম বিশ্বজুড়ে সাড়া ফেলে। সে মৌসুমের জন্য বিতর্কটাতে বড় উত্তর চ্যাম্পিয়নস লিগ ফাইনালের চেয়ে বড় মঞ্চ আর কী হতে পারত! রোমের ফাইনালে রোনালদোর ম্যান ইউনাইটেডকে বিবশ করে রেখে ২-০ গোলে জেতে বার্সা, দারুণ হেডে দ্বিতীয় গোলটি ছিল মেসির।

২০০৯-১০ মৌসুম। ম্যান ইউনাইটেড ছেড়ে রোনালদোর ঠিকানা তত দিনে রিয়াল মাদ্রিদ। তা-ও কী! গ্যালাকটিকোস বটে রিয়াল! রোনালদো তো ছিলেনই, কাকা-বেনজেমা-আলোনসোদের এনে রিয়াল মাদ্রিদ তারকার হাট। কিন্তু বড় চ্যালেঞ্জ ছিল ২০০৩ সালের পর প্রথমবার চ্যাম্পিয়নস লিগে শেষ ষোলো পেরোনো। সামনে প্রতিপক্ষ হয়ে এল লিওঁ। কিন্তু রোনালদোরা পারলেন না। বাদ পড়লেন দুই লেগ মিলিয়ে ২-১ গোলে হেরে। আর বার্সা অনেক আশা জাগিয়েও মরিনিওর ইন্টার মিলানের দেয়ালে আটকা পড়ল সেমিফাইনালে।

বিজ্ঞাপন

পরের মৌসুম আবার দেখল মেসি-রোনালদো দ্বৈরথ। এবার তো আরও জৌলুশপূর্ণ উপলক্ষ। চ্যাম্পিয়নস লিগের সেমিফাইনালে, রিয়াল বনাম বার্সা, রোনালদো বনাম মেসি! প্রথম লেগে রিয়ালের মাঠে মেসির জোড়া গোলে ২-০ গোলে জিতে লড়াইয়ের নিষ্পত্তি বলতে গেলে তখনই করে দিয়েছিলেন মেসি। এর মধ্যে রিয়ালের পাঁচ খেলোয়াড়কে কাটিয়ে দ্বিতীয় গোলটি যেভাবে করেছেন, চ্যাম্পিয়নস লিগ ইতিহাসের সেরা গোলগুলোর একটি হয়ে থাকবে সেটা। দুই লেগ মিলিয়ে ৩-১ গোলে জিতে ফাইনালে যাওয়া বার্সা ওয়েম্বলির সেই ফাইনালে বিবশ করে রাখে ম্যান ইউনাইটেডকে, জেতে ৩-১ গোলে। মেসির তৃতীয় চ্যাম্পিয়নস লিগ, বার্সার চতুর্থ।

২০১১-১২ মৌসুম আরও বড় উপলক্ষের আশা জাগিয়ে বেশ হতাশ করল। সেমিফাইনালে মেসির বার্সা খেলেছিল চেলসির বিপক্ষে, রোনালদোর রিয়ালের প্রতিপক্ষ বায়ার্ন মিউনিখ। দুই দল জিতলেই ফাইনালটা হয়ে যেত সর্বকালের সেরা ফাইনালের দাবিদার! কিন্তু হলো উল্টো। দুই দলই হারল। মেসির পেনাল্টি মিসের ব্যর্থতায় চেলসির কাছে বার্সা হারল (দুই লেগ মিলিয়ে) ৩-২ গোলে। আর টাইব্রেকারে রোনালদো শেষ শট নেওয়ার অপেক্ষায় থেকে করলেন ভুল, তার আগেই বায়ার্নের কাছে টাইব্রেকারে ৩-১ ব্যবধানে (দুই লেগ মিলিয়ে ছিল ৩-৩ সমতা) হেরে যায়।

২০১২-১৩ মৌসুম। সেমিফাইনাল। আরেকবার বার্সা-রিয়াল, মেসি-রোনালদো স্বপ্নের ফাইনালের হাতছানি। দুই স্প্যানিশ বনাম দুই জার্মান দলের সেমিফাইনাল। কিন্তু ফাইনালটা বার্সা-রিয়াল না হয়ে হলো বায়ার্ন-ডর্টমুন্ড ‘অল জার্মান!’ মূল কোচ তিতো ভিলানোভার ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার ধাক্কা সামলাতে থাকা বার্সাকে ৭-০ গোলে বিধ্বস্ত করে সর্বজয়ী বায়ার্ন, ইয়ুর্গেন ক্লপের দুর্দমনীয় ডর্টমুন্ড আর সব লন্ডভন্ড করে ফেলা লেভানডফস্কির কাছে ৪-৩ গোলে হারে রিয়াল।

default-image

এরপর থেকে গল্পে বদল। চ্যাম্পিয়নস লিগ হয়ে গেল রোনালদোর টুর্নামেন্ট। ভূমিকা বদলে স্ট্রাইকার হয়ে যাওয়া রোনালদোর পেছনে দারুণ রসায়নে গড়া রক্ষণ আর মাঝমাঠ সাজাল রিয়াল, সেটির ফল দুহাতে (বা দুপায়ে আর মাথায়) তুলে নিয়েছেন রোনালদো। বার্সা কোয়ার্টার ফাইনালে আটকা পড়ে দিয়েগো সিমিওনের অতিরক্ষণাত্মক আতলেতিকো মাদ্রিদের কাছে (২-০)। সেই আতলেতিকোকেই ফাইনালে হারিয়ে ‘লা দেসিমা’ বা দশম চ্যাম্পিয়নস লিগ জেতে রিয়াল। সের্হিও রামোস জন্ম দেন বিখ্যাত ৯২.৪৮-এর। ৯০ মিনিটে হারের পথে থাকা রিয়ালকে অতিরিক্ত সময়ে টেনে নেন যোগ করা তিন মিনিট সময়ের শেষ মুহূর্তের গোলে। নির্ধারিত সময়ে সমতার পর অতিরিক্ত সময়ে তিন গোল করে রিয়াল। ৪-১ গোলের জয়ে পেনাল্টি থেকে শেষ গোলটা রোনালদোর।

পরের মৌসুমে আবার বার্সার জয়গান। মেসি-নেইমার-সুয়ারেজ ত্রিরত্নের জয়গান। সৃষ্টিশীলতার অনুপম প্রদর্শনী রেখে বার্সা জেতে চ্যাম্পিয়নস লিগ, ৬৬ ফাইনালে ৩-১ গোলে হারায় জুভেন্টাসকে। সেই জুভের কাছেই ৩-২ গোলে সেমিফাইনালে হারে রিয়াল।

এরপরের গল্পটা রিয়াল আর রোনালদোর। আর জিনেদিন জিদান নামের এক ‘মিডাসে’র। ২০১৬ সালের জানুয়ারিতে রিয়ালের ডাগআউটে এসে আড়াই বছরে টানা তিনটি চ্যাম্পিয়নস লিগ জেতালেন রিয়ালকে। চ্যাম্পিয়নস লিগ যুগে যেখানে টানা দুটি চ্যাম্পিয়নস লিগও এর আগে কেউ জেতেনি। কেউ বললেন জিদান ভাগ্যবান বলেই সেটা হয়েছে। কেউ তিনটি চ্যাম্পিয়নস লিগ জয়ের পথে প্রতিবারই রিয়ালের পক্ষে যাওয়া অনেক সিদ্ধান্ত টেনে বিতর্ক তুললেন। কিন্তু জিদান হাসলেন। তাঁর মূল অস্ত্রটা কী ছিল, সেটা তো জিদান জানতেন—রোনালদো!

default-image

অন্যদিকে জোসেপ মারিয়া বার্তোমেউর অধীনে মাঠে-মাঠের বাইরে ধুঁকতে থাকা বার্সা একের পর এক প্রশ্নবিদ্ধ দলবদলের ফল পেল হাতেনাতে। মাঠে ভারসাম্যহীন হয়ে পড়া বার্সা তিন মৌসুমেই চূড়ান্ত লজ্জায় বিদায় নেয় চ্যাম্পিয়নস লিগ থেকে। ২০১৫-১৬ মৌসুমে তা-ও কোয়ার্টার ফাইনালে আতলেতিকোর কাছে হারটা ৩-২ গোলে। পরের মৌসুমে কোয়ার্টার ফাইনালেই জুভেন্টাসের কাছে হারে ৩-০ গোলে। এর পরের মৌসুম? আরও লজ্জা! শেষ আটে প্রথম লেগে নিজেদের মাঠে রোমাকে ৪-১ গোলে হারালেও রোমার মাঠে গিয়ে ৩-০ গোলে হারে বার্সা!

২০১৮-১৯ মৌসুম। রিয়াল ছেড়ে রোনালদো জুভেতে। কিন্তু এবার আর চ্যাম্পিয়নস লিগ রোনালদোর পক্ষে কথা বলল না! সে মৌসুমে আয়াক্সের কাছে শেষ আটে বাদ পড়ে রোনালদোর জুভ, পরের মৌসুমে শেষ ষোলোতে লিওঁর কাছে। আর মেসির বার্সা? লজ্জার কিস্তিতে দুই মৌসুমে যোগ হলো আরও দুই অধ্যায়। ২০১৮-১৯ মৌসুমে চোখধাঁধানো ফুটবল খেলার মেসির ঝলকে সেমিফাইনালে লিভারপুলকে প্রথম লেগে নিজেদের মাঠে বার্সা ৩-০ গোলে হারায়, কিন্তু দ্বিতীয় লেগে অ্যানফিল্ডে গিয়ে হারে ৪-০ গোলে! আর গত মৌসুমে তো এক লেগের কোয়ার্টার ফাইনালে বায়ার্ন মিউনিখের কাছে ৮-২ গোলের লজ্জাই পেল।

এবারও বার্সা পিএসজির কাছে লজ্জা পেয়েছে প্রথম লেগে। আর জুভেকে চ্যাম্পিয়নস লিগ জেতানোর ‘চ্যালেঞ্জ’ নিয়ে ইতালি যাওয়া রোনালদো টানা তৃতীয় মৌসুমে ব্যর্থ। অনুচ্চারে যা হয়তো জানিয়ে দিতে চাইছে, মেসি-রোনালদোর দ্বৈরথের দিন শেষ হয়ে আসছে। ফুটবলপ্রেমীদের দীর্ঘশ্বাস ফেলার সময় হলো!

ফুটবল থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন