বিশ্বকাপ খেলতে গিয়ে নেকলেস চুরি, অতঃপর...

বিশ্বকাপ মানে তো শুধু মাঠের লড়াই নয়; এর আশপাশে জড়িয়ে থাকা অসংখ্য গল্পের কোলাজ। যে গল্পের কোনোটিতে ঐতিহাসিক বিতর্ক আছে, আছে রোমাঞ্চ কিংবা অজানা চমক। বিশ্বকাপের তেমন কিছু গল্প নিয়ে এ আয়োজন—

২০০২ বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচের আর মাত্র চার দিন বাকি।

দক্ষিণ কোরিয়াজুড়ে বিশ্বকাপ-উৎসব। প্রথমবার বিশ্বকাপ আয়োজন করছে এশিয়ার দেশটি। আর আফ্রিকার দেশ সেনেগালও খেলতে এসেছে নিজেদের প্রথম বিশ্বকাপ। চারদিকে যখন বিশ্বকাপ-জ্বর, তখনই এক কেলেঙ্কারিতে জড়িয়ে যায় সেনেগালের নাম।

সেনেগালের খেলোয়াড়েরা বের হয়েছিলেন শহর ঘুরতে। এর মধ্যে কয়েকজন দেগুর একটি গয়নার দোকানেও ঢোকেন। কিছুক্ষণ থেকে এরপর বেরিয়ে যান। তিন দিন পর দোকানমালিক খেয়াল করেন, একটি সোনার নেকলেস নেই। পুরো দোকান তন্ন তন্ন করে খুঁজেও পাওয়া গেল না প্রায় ২৫০ ডলার দামের নেকলেসটি। সন্দেহ হওয়ায় নিরাপত্তা ক্যামেরার ফুটেজ যাচাই করতে শুরু করেন দোকানমালিক। সেখানে দেখা যায়, সেনেগালের এক খেলোয়াড় নেকলেসটি হাতে নিচ্ছেন। এরপর যা হওয়ার, দোকানমালিক পুলিশের কাছে অভিযোগ দেন।

যাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ, তাঁর নাম খলিলু ফাদিগা। সেনেগালের ১০ নম্বর জার্সিধারী মিডফিল্ডার, দলের গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়দের একজন। পুলিশ ছুটে যায় সেনেগাল দলের টিম হোটেলে। এ দিকে সংবাদটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে।

বিশ্বকাপ খেলতে এসে নেকলেস চুরির অভিযোগ—ঘটনাটিতে অনেকেই ১৯৭০ বিশ্বকাপে ব্রাজিলের বিপক্ষে ম্যাচের আগে ববি মুরের সেই বিখ্যাত ‘ব্রেসলেট কেসের’ কথা টেনে আনতে শুরু করেন। যদিও সেনেগালের ঘটনায় নাটক ছিল ভিন্ন ধরনের।

ফাদিগা পুলিশের কাছে চুরির কথা স্বীকার করেন। কিন্তু কেন চুরি করেছেন, সেই ব্যাখ্যাটা অন্য রকম। স্রেফ কৌতূহল থেকেই নাকি এই চুরি। সেনেগাল ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি এল হাজ মালিক দাবি করেন, যেসব খেলোয়াড় গয়নার দোকানে ঢুকেছিলেন, তাঁদের মধ্যে বাজি হয়েছিল নেকলেস চুরি করা নিয়ে।

আলোচিত সেই খলিলু ফাদিগা
ইনস্টাগ্রাম/ফাদিগা

তবে ব্যাখ্যা যা-ই হোক, প্রথমবার বিশ্বকাপে খেলতে এসে সেনেগাল দল তখন মহা বিব্রত। বিশেষ করে সামনে প্রতিপক্ষ যখন ফ্রান্স। কোন ফ্রান্স? যে দল ঠিক আগের আসরেই, ১৯৯৮ সালে বিশ্বকাপ জিতেছে। ২০০০ সালে জিতেছে ইউরো। এমন দলের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচের আগে ‘নেকলেস চুরি’র ঘটনা সেনেগাল দলকে অস্বস্তিতে ফেলে দেয়।

কিন্তু সেনেগালের কোচ ব্রুনো মেতসুর ভাবনাটা ছিল ভিন্ন। তিনি খেলোয়াড়দের বলেন, এই কলঙ্ক থেকে মুক্তির একমাত্র উপায় হলো ফ্রান্সকে হারানো। শিষ্যদের উদ্বুদ্ধ করতে মেতসু বলেন, ‘যদি তোমরা তোমাদের বন্ধুকে বাঁচাতে চাও, তবে তোমাদের এই ম্যাচ জিততেই হবে। কারণ, আমরা জিতলে এটি পৃথিবীতে একটি ভূমিকম্পের মতো প্রভাব ফেলবে এবং মানুষ এই চুরির কথা ভুলে যাবে।’

আরও পড়ুন

৩১ মে সিউলে ২০০২ বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচে ফ্রান্সের বিপক্ষে খেলতে নামে সেনেগাল। অবিশ্বাস্যভাবে ম্যাচ শেষে স্কোরবোর্ডে লেখা ছিল—সেনেগাল ১, ফ্রান্স ০।
বুবা দিউপের গোলের পর পুরো দল যে উন্মাদনায় ছুটেছিল, সেটি বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম আইকনিক উদ্‌যাপন হয়ে আছে। মাঠের বাইরে কয়েক দিন ধরে নেকলেস–কাণ্ডে আলোচিত দলটি হঠাৎ করেই হয়ে উঠল বিশ্বের সবচেয়ে আলোচিত ফুটবল দল।

আরও আশ্চর্যের ব্যাপার, দক্ষিণ কোরিয়ার কর্তৃপক্ষও ধীরে ধীরে নরম হতে শুরু করল। ৪ জুন দেগুর প্রসিকিউটররা ফাদিগার বিরুদ্ধে অভিযোগ কার্যত স্থগিত করে দেয়। ব্যাখ্যা ছিল, খেলোয়াড় এবং তাঁর দল যেন পুরো মনোযোগ বিশ্বকাপে দিতে পারে। দোকানমালিকও আর কঠোর অবস্থানে থাকেননি; বরং ঘটনার শেষটা আরও নাটকীয় করে তোলেন। যে দোকান থেকে নেকলেস হারিয়েছিল, সেই দোকান থেকেই ফাদিগার কাছে পাঠানো হয় ছোট্ট একটি সোনালি রঙের শূকর। কোরিয়ান সংস্কৃতিতে এটি সৌভাগ্যের প্রতীক। সঙ্গে ছিল শুভকামনার বার্তা, ফাদিগা যেন বিশ্বকাপে ভালো করেন।

সেনেগালের এই দলটি বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ফ্রান্সকে হারিয়ে দিয়েছিল
ফিফা ওয়েবসাইট

বিশ্বকাপ ইতিহাসে খুব বেশি দল নেই, যারা কেলেঙ্কারি দিয়ে টুর্নামেন্ট শুরু করে পরে রূপকথা লিখেছে। সেনেগাল তা-ই লিখেছিল। গ্রুপ পর্বে ফ্রান্সকে হারানোর পর ডেনমার্ক ও উরুগুয়ের বিপক্ষে ড্র করে শেষ ষোলোয় উঠে যায় সেনেগাল। উরুগুয়ের বিপক্ষে ৩-৩ ড্রয়ের ম্যাচে ফাদিগা তো পেনাল্টি থেকে গোলও করেছিলেন। এরপর শেষ ষোলোয় সুইডেনকে হারিয়ে সেনেগাল কোয়ার্টার ফাইনালেও ওঠে। সেখানে তুরস্কের কাছে হেরে অবশ্য স্বপ্নযাত্রা থেমে যায় শেষ আটেই।

আরও পড়ুন