আলেহান্দ্রো গারনাচো: বিশ্বকাপে কি খেলা হবে আর্জেন্টাইন উইঙ্গারের
‘গারনাচোর অবশ্যই রোজনিয়রের সঙ্গে ক্লাব ছেড়ে যাওয়া উচিত’—গত শনিবার রাতে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের কাছে চেলসির হারের পর এভাবেই নিজের বিরক্তি প্রকাশ করেন এক সমর্থক।
আলোড়ন তুলে ২০২২ সালের এপ্রিলে ফুটবল মঞ্চে আবির্ভাব হয়েছিল আলেহান্দ্রো গারনাচোর। ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের জার্সিতে অভিষেকের সময় তাঁর বয়স ছিল মাত্র ১৭। শুরুতে অবশ্য ফুটবলীয় প্রতিভার পাশাপাশি ভিন্ন এক কারণেও আলোচনায় এসেছিলেন এই আর্জেন্টাইন।
বাড়ি আর্জেন্টিনা হলেও তাঁর পছন্দের ফুটবলার লিওনেল মেসি নন, ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো। যদিও আর্জেন্টিনা দলের সুযোগ পাওয়ার পথে তাঁর এই ব্যক্তিগত পছন্দ বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। আর্জেন্টিনার হয়ে এর মধ্যে ৮ ম্যাচ খেলেও ফেলেছেন তিনি। ছিলেন ২০২৪ সালে কোপা আমেরিকা দলের সদস্যও। আর ইউনাইটেড থেকে ২০২৫ সালে চলে আসেন চেলসিতে। কিন্তু অভিষেকের ঠিক চার বছর পর গারনাচো যদি পেছনে ফিরে তাকান, তবে দুয়োধ্বনি আর ক্লাব ছেড়ে যেতে বলার অপমানবাক্যগুলো ছাড়া আর বেশি কিছু খুঁজে পাবেন কি?
শুরুর গল্পটা অবশ্য এমন ছিল না। তাঁর মধ্যে তরুণ রোনালদোর ছায়া দেখতে পেয়েছিলেন অনেকে। ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের কিংবদন্তি ফুটবলার পল স্কোলস তাঁকে মনে করেন ‘শিল্পী’। প্রতিভার জোরে ২০২২ বিশ্বকাপে খেলার সম্ভাবনাও জাগিয়েছিলেন এই উইঙ্গার। শেষ পর্যন্ত অবশ্য লিওনেল স্কালোনির দলে জায়গা হয়নি তাঁর। তবে আর্জেন্টিনার ভবিষ্যৎ তারকাদের একজন হিসেবে দেখা হচ্ছিল তাঁকে। ক্যারিয়ারের গতিপথটা অবশ্য যেভাবে এগোনোর কথা ছিল, সেভাবে এগোয়নি। ২০২২ বিশ্বকাপে যে গারনাচো অভিজ্ঞতার অভাবে খেলতে পারেননি, তিনি এবার পারফরম্যান্সের কারণে বাদ পড়ার শঙ্কায় আছেন।
চলতি মৌসুমের পারফরম্যান্সের কথাই ধরা যাক। সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে ৩৯ ম্যাচে মাত্র ৮ গোল ও ৪টি অ্যাসিস্ট করেছেন গারনাচো। প্রিমিয়ার লিগে ২২ ম্যাচে মাত্র ১ গোল ও ৪ অ্যাসিস্ট। তাঁর বাজে পারফরম্যান্স প্রভাব ফেলেছে চেলসির সামগ্রিক ফলেও। নিজের সাবেক ক্লাব ইউনাইটেডের বিপক্ষেও সুবিধা করতে না পারায় বদলি হয়ে মাঠ ছাড়তে হয় তাঁকে। ইউনাইটেডের সাবেক কোচ রুবেন আমোরিমের সঙ্গে বিরোধের জেরে মূলত ক্লাব ছাড়তে হয়েছিল তাঁকে। গতকাল ওল্ড ট্রাফোর্ডেও বেশ বাজে পরিস্থিতিতে পড়তে হয়েছে তাঁকে।
স্ট্যামফোর্ড ব্রিজে ধারণ করা সমর্থকদের এক ভিডিওতে দেখা যায়, মাঠে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছিলেন গারনাচো, আর তখন ইউনাইটেডের খেলোয়াড়েরা টানেলের দিকে চলে যাচ্ছিলেন। ভিডিওতে দেখা যায়, ২১ বছর বয়সী এই ফুটবলারের সঙ্গে প্রতিপক্ষ দলের কোনো খেলোয়াড়ই কথা বলেননি।
পরে ইউনাইটেডের অভিজ্ঞ ডিফেন্ডার লুক শ ইনস্টাগ্রামে একটি ছবি পোস্ট করেন, যেখানে গারনাচোকে মাটিতে ফেলে দিতে দেখা যায় তাঁকে। ছবির ক্যাপশনে তিনি লেখেন, ‘গুরুত্বপূর্ণ জয়’।
এই পোস্টে ইউনাইটেড সমর্থকদের পাশাপাশি মন্তব্য করেন তাঁর সতীর্থরাও। তাঁদের মধ্যে ছিলেন স্টিভেন বার্টলেট, যিনি লিখেছেন, ‘আহাহাহাহ’। ইউনাইটেড অধিনায়ক ব্রুনো ফার্নান্দেজ জিআইএফ শেয়ার করেন, যেখানে লেখা ছিল, ‘এটা তো একেবারে অপমান!’ আর সাবেক সতীর্থ অ্যালেক্স টেলেস দুটি আগুনের ইমোজি ও একটি ভালোবাসার চিহ্ন দেন।
প্রিমিয়ার লিগ প্রোডাকশনসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ইউনাইটেড ছাড়ার বিষয়ে অনুশোচনা আছে কি না—এমন প্রশ্নে খোলামেলা কথা বলেন গারনাচো। তিনি বলেন, ‘হয়তো কিছুটা আছে। কারণ, আমি ক্লাবটিকে ভালোবাসতাম। শুরু থেকেই তারা আমার ওপর আস্থা রেখেছে—স্পেন থেকে আমাকে একাডেমিতে নিয়ে এসেছে, পরে প্রথম দলে সুযোগ দিয়েছে। চার-পাঁচ বছর সেখানে কাটিয়েছি, সবার কাছ থেকে দারুণ ভালোবাসা পেয়েছি—সমর্থক, স্টেডিয়াম, সবকিছুই খুব ভালো ছিল। তবে জীবনের ভালোর জন্য কিংবা পরবর্তী ধাপে যাওয়ার জন্য কখনো কখনো পরিবর্তন দরকার হয়। ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডকে নিয়ে আমার শুধু ভালো স্মৃতিই আছে।’
আমোরিমের অধীনে শুরুটা কঠিন হলেও পরে দলে জায়গা ফিরে পেতে গারনাচোর পরিশ্রমের প্রশংসা করেছিলেন এই পর্তুগিজ কোচ। যদিও তাঁর ছকে গারনাচোর জন্য স্বাভাবিক কোনো পজিশন ছিল না। প্রকৃতপক্ষে উইঙ্গার হলেও তাঁকে খেলানো হয় ‘নম্বর ১০’ ভূমিকায়। কিন্তু পরিস্থিতি আবার খারাপের দিকে যায় এবং দলের পরিকল্পনা থেকে ছিটকে পড়েন। গারনাচোর ভাষ্য অনুযায়ী, এটিই ছিল ক্লাব ছাড়ার অন্যতম কারণ। দলের বাইরে থাকার সময় তিনি কিছু ‘ভুল সিদ্ধান্ত’ নিয়েছিলেন বলেও স্বীকার করেছেন।
এই মুহূর্তে পেছনে ফিরে তাকালে অনেক ভুলই হয়তো দেখতে পাবেন গারনাচো। যদিও স্পেনের বদলে আর্জেন্টিনাকে বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে তিনি কোনো ভুল দেখেন কি না, তা নিশ্চিত নয়। তবে কদিন আগে আর্জেন্টিনাকে বেছে নেওয়া সম্পর্কে জানতে চাইলে গারনাচো বলেছেন, ‘এর কারণ হলো, তারা শুরু থেকেই আমার ওপর আস্থা রেখেছে—ভবিষ্যতে আমি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখব বলে বিশ্বাস করেছে। এখানে লিওনেল মেসিও বড় একটা ভূমিকা রেখেছেন। তাঁর সঙ্গে খেলার সুযোগ—এটা এমন কিছু, যেটা সহজে না বলা যায় না। আমি জানি, আমি তাঁদের জন্য বড় কিছু করব—এটা শুধু সময়ের ব্যাপার।’
দূর ভবিষ্যতে আর্জেন্টিনা দলের জন্য কী করবেন, এখনই বলার সুযোগ নেই। তবে মেসির শেষ বিশ্বকাপটাতে হয়তো খেলা হবে না গারনাচোর। ২০২৪ সালের নভেম্বরের পর অবশ্য আকাশি-সাদা জার্সিতে আর খেলা হয়নি তাঁর। সর্বশেষ খবর অনুযায়ী, লিওনেল স্কালোনির সম্ভাব্য বিশ্বকাপ দলে নাকি গারনাচোর নাম নেই। এই তথ্য যদি সত্যি হয়, তবে ক্লাবের পাশাপাশি জাতীয় দল বাছাইয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েও কি আফসোস করবেন এই তরুণ উইঙ্গার!
উত্তরটা সময়ের হাতেই তোলা রইল।