এই রোনালদো কোন রোনালদো, আর সেই চুলের ছাঁট কোন বিশ্বকাপে, নিশ্চয়ই ধরে ফেলেছেন। ২০০২ বিশ্বকাপে রোনালদোর সেই চুলের ছাঁট নকল করেছে গোটা বিশ্ব, কিন্তু ব্রাজিল তাঁর মতো কাউকে আর পায়নি। আর তাই ২০১১ সালে রোনালদো অবসর নেওয়ার পর ব্রাজিলের ৯ নম্বর জার্সিও অস্তগামী সূর্যের ন্যায় গোধূলিলগ্নে দাঁড়িয়ে নিবু নিবু করছিল। কথা ছিল, রোনালদোর পর এই জার্সিকে আবারও মধ্যগগনে নিয়ে যাবেন আদ্রিয়ানো। কিন্তু ‘সম্রাট’ নিজেই ডুবলেন পানপাত্র আর সুরার নেশায়। আর যাঁরা ভেসে রইলেন কিংবা আসি আসি করছিলেন, তাঁদের অবস্থা যেন কাজী নজরুল ইসলামের কবিতার সেই পঙ্‌ক্তির মতো, ‘কত এল, কত গেল ফিরে...দূরে কার দেখা গেল হাতছানি যেন!’

দূরে যাঁর হাতছানি দেখা যাচ্ছিল, তাঁর কথায় পরে আসা যাবে। তার আগে ‘কত এল, কত গেল’র হিসাবটা দেখে নেওয়া যাক। লুইস ফাবিয়ানো, ফ্রেদ, ভ্যাগনার লাভ, লিয়ান্দ্রো দামিয়াও, গ্রাফিতে, আলেক্সান্দার পাতো, ডিয়েগো তারদেল্লি, লুইজ আদ্রিয়ানো...তারপর রিচার্লিসন। দূরে যাঁর হাতছানি দেখা যাচ্ছিল!

২০০৬ বিশ্বকাপে মুটিয়ে যাওয়া রোনালদোও ৩ গোল করেছিলেন। পরের বিশ্বকাপে তাঁর জার্সিটা উঠল লুইস ফাবিয়ানোর গায়ে। ৩ গোল করা ফাবিয়ানো প্রত্যাশা পূরণ করতে পারলেন না। চার বছর পর ঘরের মাঠে বিশ্বকাপে সেই জার্সিই পরলেন ফ্রেদ, কিন্তু ওই পরা পর্যন্তই—ফ্রেদ করলেন ১ গোল আর সর্বশেষ বিশ্বকাপে গ্যাব্রিয়েল জেসুস তো গোলই পাননি! অথচ ব্রাজিলের এই জার্সিই ১৯৯৮ থেকে ২০০৬ বিশ্বকাপ পর্যন্ত ‘চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত’ করে নিয়েছিলেন রোনালদো। পার্থক্যটা বোঝা গেল?

রোনালদোর পর আর কেউ আসেননি। একটু ভুল হলো। কিংবা হতে পারে। এত দিন অপেক্ষার পর রিচার্লিসন সম্ভবত এসে গেছেন।

‘সেলেসাও’দের জার্সিতে ৩৮ ম্যাচ খেলা হয়ে গেছে। এর মধ্যে ২৪ ম্যাচে একাদশের হয়ে নেমে পেয়েছেন ১৭ গোল। আর শেষ ৬ ম্যাচে করেছেন ৭ গোল, বানিয়েছেন আরও ২টি। গত সেপ্টেম্বরে ঘানার বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচের পরই কথাটা বলেছিলেন রিচার্লিসন, ‘আশা করি, ব্রাজিলিয়ানরা আমার ওপর আস্থা রাখবে। আমি ৯ নম্বর জার্সি পরছি এবং এই জার্সি পরে নামলেই গোল করি। আশা করি, ধারাটা বজায় থাকবে।’

তাতে রোনালদোরই সবচেয়ে বেশি খুশি হওয়ার কথা। গত অলিম্পিকে জার্মানির বিপক্ষে হ্যাটট্রিকের পর রোনালদোর সেই কুশ্রী চুলের ছাঁট দিয়েছিলেন রিচার্লিসন। বোঝাই যায়, মনে মনে তাঁর মতো হতে চান। কিন্তু রোনালদোর মতো পায়ের কাজ যে নেই! তাতে অসুবিধাও নেই। নেইমার, ভিনিসিয়ুস, পাকেতা, রাফিনিয়ারা থাকায় তিতের দলে সৃষ্টিশীল খেলোয়াড়ের অভাব নেই। রিচার্লিসনের দায়িত্ব শুধু সবুজ ক্যানভাসে সেসব ‘সৃষ্টি’তে শেষ আঁচড়টি দিয়ে গোল করা।

বক্সে সে দায়িত্ব পালনে রিচার্লিসন অন্তত রোনালদোর মতোই—গত কোপা আমেরিকায় পেরুর বিপক্ষে নেইমারদের ২৯ পাসের ক্যানভাসে আঁকা তাঁর গোল কিংবা ঘানার বিপক্ষে ২৫ পাসের শেষটা করেছিলেন গোল দিয়েই। রোনালদোকে নিয়ে মারিও জাগালো, স্কলারিরা যা বলে এসেছেন, তিতেও সেটাই বলেছেন রিচার্লিসনকে নিয়ে, ‘সে গোলের গন্ধ পায়।’

২০ বছর আগে জাপান-কোরিয়ায় একজন ‘আর৯’ থাকায় ‘পেন্টা’ (পঞ্চম শিরোপা) জিতেছিল ব্রাজিল। এবার কাতারে ‘হেক্সা’ (ষষ্ঠ শিরোপা) মিশনে আজ মাঠে নামবে ব্রাজিল। রিচার্লিসনের গায়ে থাকবে ৯ নম্বর জার্সি। তাহলে তো মিলেই গেল—সেই তো ‘আর৯’!