নেইমার কি খেলবেন, নাকি আবারও ‘মরীচিকা’
নেইমার যেন এক মরীচিকা! দূর থেকে দেখা যায়, কাছে গেলে মিলিয়ে যায়। খেলবেন কী খেলবেন না, খেলবেন কী খেলবেন না...শেষ পর্যন্ত খেলবেন না। তাঁকে নিয়ে বিশ্বকাপে চাঞ্চল্য আছে, কৌতূহল আছে; কিন্তু নেইমার আছেন কেবলই ডাগআউটে।
আজ রাতে আরও একটি ম্যাচ ব্রাজিলের। শেষ ১৬–তে প্রতিপক্ষ নরওয়ে। এমন মহাগুরুত্বপূর্ণ ম্যাচের আগে কী হওয়া উচিত ছিল? হওয়া উচিত ছিল ‘নেইমার জিতবেন না হলান্ড জিতবেন’ আলোচনা। অথচ আলোচনায় হলান্ড থাকলেও নেইমার নেই, তাঁর জায়গায় আছেন ভিনিসিয়ুস জুনিয়র। প্রকৃতি শূন্যস্থান পছন্দ করে না। তাই নেইমার জুনিয়রের জায়গায় ভিনি।
কিন্তু প্রকৃতি কি নেইমারকে পছন্দ করে? করারই কথা। অনিশ্চয়তা প্রকৃতির পাতায় পাতায়। সে কারণেই প্রকৃতিকে নিয়ে পূর্বানুমান, পূর্বাভাস হয়। তার খানিক মেলে তো বেশ খানিক মেলে না। এই বিশ্বকাপে নেইমারও প্রকৃতির কাছে সমর্পিত এক তারকা। সেই প্রকৃতি যেন ব্রাজিলের ডাগআউটের ওপর ডালপালার ছায়া ফেলেছে, যেখানে বসে বেঞ্চের শোভা বাড়াচ্ছেন নেইমার।
তবে বেঞ্চ থেকে তিনি আজ মাঠে পা রাখলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। নেইমার ৯০ মিনিট খেলার মতো ফিট, সম্প্রতি ব্রাজিলের সংবাদমাধ্যম ‘ফোলিয়া দে সাও পাওলো’কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এই ঘোষণা দিয়েছেন খোদ দলের কোচ কার্লো আনচেলত্তি। যদিও নিজের কথার পিঠেই আবার তিনি বলে দিয়েছেন, ‘তবে ও কতক্ষণ খেলবে, সেটা আগে থেকে বলার সুযোগ নেই। যখনই মনে করব দলের ওকে প্রয়োজন, তখনই ও মাঠে নামবে।’
তার মানে নেইমার আজ বেঞ্চ থেকে মাঠে পা না রাখলেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। হতে পারেন তিনি ফিট, কিন্তু খেলার প্রশ্ন যে বিন্দুতে ছিলেন, এখনো হয়তো সেই বিন্দুতেই আছেন, মানে ‘মরীচিকা’। কৌতূহল তাই বেঁচে থাকবে নেইমারকে ঘিরে।
পায়ের চোট নিয়ে নেইমার বিশ্বকাপে এসেছেনই বেশির ভাগ ম্যাচ না খেলার অঘোষিত ঘোষণা নিয়ে। গ্রুপ পর্বে খেললেও শেষ ম্যাচের আগে সম্ভাবনা নেই। স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে সেই শেষ ম্যাচে নেইমার খেললেন মাত্র ১৪ মিনিট। তা নিয়েই হুলুস্থুল। খেলা শেষে নেইমার কাঁদলেন। সন্তানকে কোলে নিয়ে আদর করলেন। সেই ছবি খবরের কাগজে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বড় করে ছাপা হলো। মনে হলো ওই ১৪ মিনিট খেলেই নেইমার এই বিশ্বকাপকে সার্থক করে দিয়েছেন, তাঁর নিজের চাওয়া–পাওয়াও বুঝি মিলে গেছে এক বিন্দুতে! শেষ ৩২–এ জাপানের বিপক্ষেও অপেক্ষায় অপেক্ষায় সময় গেল নেইমারের। তাঁকে নামানোর দরকার হয়নি, তাই খেলাও হয়নি। ব্রাজিলের চার ম্যাচে মাঠে নেইমারের উপস্থিতি তাই ওই ১৪ মিনিটই।
বিশ্বকাপপূর্ব আলোচনায় মেসি–রোনালদো–নেইমার–এমবাপ্পে নামগুলো এসেছে ঘুরেফিরে। এটাই নিয়ম, প্রতি বিশ্বকাপের আগে সুপারস্টারদের নিয়ে আলোচনা বাজার গরম করাটা রেওয়াজ। তারপর সময় যত যায়, তারারা উজ্জ্বল হন, অনুজ্জ্বল হন অথবা খসে যান। এই বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত সব তারাই জ্বলজ্বল করছে। কে কাকে কীভাবে পেছনে ফেলবেন, সেই দৌড় দৌড়াচ্ছেন। শুধু নেইমার ছাড়া।
ব্রাজিল যদি ফাইনাল পর্যন্তও খেলে, খেলবে আর চারটি ম্যাচ। ভক্ত–সমর্থকদের নেইমারকে দেখার আশা থাকবে প্রতিটি ম্যাচেই, প্রতিটি ম্যাচেই তা পূরণ হতে পারে, আবার অতৃপ্ত থেকে যেতে হতে পারে প্রতিটি ম্যাচেই।
সবচেয়ে বেশি অতৃপ্তিটা অবশ্য নেইমারের নিজের। ২০২৩ সালের অক্টোবরের পর দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে এবারের স্কটল্যান্ড ম্যাচেই আবার জাতীয় দলের জার্সি গায়ে চাপাতে পেরেছেন। এক বুক ক্ষুধা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ঘুরে ঘুরে এখন পর্যন্ত আনচেলত্তির প্রশংসাপত্রই তাঁর একমাত্র প্রাপ্তি। ‘ফোলিয়া দে সাও পাওলো’কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে প্রশ্নমালার মূল প্রতিপাদ্য ছিলেন আনচেলত্তি নিজে। সেখানে প্রসঙ্গক্রমে নেইমারও এসেছেন, যখন তাঁকে নিয়ে অলংকারের মতো করে ‘অমায়িক’, ‘বিনয়’, ‘জনপ্রিয়’, ‘পেশাদার’ শব্দগুলো উচ্চারণ করেছেন ব্রাজিল কোচ। শুনে মনে হলো, যেন মেলায় বেড়াতে নিয়ে যেতে না পারা সন্তানকে সান্ত্বনা দিচ্ছেন বাবা, ‘ও তো ভালো ছেলে, কথা শোনে। মন খারাপ করবে না।’
নেইমারের দুর্ভাগ্যই বলতে হয়। বিশ্বকাপে কোথায় তাঁর গোলের প্রশংসা হবে, ‘গোল্ডেন বুটের’ সম্ভাবনা পায়ে গলিয়ে কোথায় তিনি ‘গোল্ডেন বল’ নিয়ে দৌড়াবেন তা না, সন্তুষ্ট থাকতে হচ্ছে কোচের ‘চারিত্রিক সনদ’ নিয়ে। বিশ্বকাপও যেন নেইমারের কাছে কেবলই এক মরীচিকা!
