সাম্প্রতিক সময়ে দেশের ফুটবলে আলোচিত বিষয় হয়ে উঠেছে ‘ট্রান্সফার ব্যান’। একের পর এক ক্লাব ফিফার নিষেধাজ্ঞায় পড়ছে, জরিমানা দিচ্ছে, আবার কেউ কেউ নতুন খেলোয়াড় নিবন্ধন করতে পারছে না। মাঠের খেলার চেয়ে এখন আইনি জটিলতা আর আর্থিক অনিয়মই যেন তাদের বড় প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ক্লাব কর্মকর্তাদের বক্তব্য শুনলে বোঝা যায়—সমস্যাটা কেবল নিয়ম না মানার নয়, পেশাদার সংস্কৃতির ঘাটতিরও।
নিষেধাজ্ঞায় পাঁচ ক্লাব
ফিফার ওয়েবসাইটে থাকা তালিকায় বর্তমানে খেলোয়াড় নিবন্ধনে নিষেধাজ্ঞার মধ্যে আছে বাংলাদেশের পাঁচটি ক্লাব। এর মধ্যে ২০২৫ সালের আগস্ট থেকে এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ নয়বার নিষেধাজ্ঞা পেয়েছে বাংলাদেশ ফুটবল লিগে পাঁচবারের চ্যাম্পিয়ন বসুন্ধরা কিংস। সর্বশেষ গত ২০ জানুয়ারিতে তাদের ওপর নবমবারের মতো নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে ফিফা। তালিকায় আছে দুই ঐতিহ্যবাহী ক্লাব আবাহনী লিমিটেড আর মোহামেডানও। আবাহনী নিষেধাজ্ঞা পেয়েছে তিনবার, মোহামেডান একবার। এ ছাড়া শেখ জামাল ধানমন্ডি ক্লাব তিনবার, এসসি ফেনী একবার নিষেধাজ্ঞা পেয়েছে।
কেন এমন নিষেধাজ্ঞা
বাংলাদেশের অধিকাংশ ক্লাব শাস্তিতে পড়ে তিনটি প্রধান কারণে—বেতন বকেয়া রাখা, চুক্তি ভেঙে খেলোয়াড় ছেড়ে দেওয়া এবং সঠিক ডকুমেন্টেশন না থাকা। অনেক ক্ষেত্রে মৌখিক সমঝোতার ভিত্তিতে খেলোয়াড় নেওয়া হয়, পরে মতবিরোধ হলে তারা ফিফায় অভিযোগ করে। আবার বিদেশি খেলোয়াড়ের সঙ্গে চুক্তি করে হঠাৎ বাতিল করলেও ক্ষতিপূরণ দিতে হয়। ফুটবলারদের এজেন্টের পাওনা না মেটানোও একটা বড় কারণ।
এই নিষেধাজ্ঞার মানে কী
ফিফার নিয়মানুযায়ী, এই ক্লাবগুলো পরপর তিনটি দলবদলে কোনো খেলোয়াড় নিবন্ধন করতে পারবে না। এর মধ্যে বসুন্ধরা, আবাহনী ও মোহামেডান একটি ট্রান্সফার উইন্ডো পার করেছে, আরও দুটি এভাবেই কাটাতে হবে। শেখ জামাল ধানমন্ডি ক্লাব ও এসসি ফেনী যেহেতু এখন ফুটবলেই সক্রিয় নয়, তাদের এই নিষেধাজ্ঞা পালনের দরকার হচ্ছে না।
নতুন খেলোয়াড় নিবন্ধন বন্ধ হলে ক্লাব চাইলেও দল শক্তিশালী করতে পারে না। কেউ চোটে পড়লে বা ফর্ম হারালে ক্লাবগুলোর হাতে বিকল্প থাকে না, তখন ক্লাবগুলোর পারফরম্যান্সে ধস নামে। কোচের পরিকল্পনাও ভেঙে পড়ে। দীর্ঘ মেয়াদে ক্লাবই দুর্বল হয়ে যায়।
ফিফার নিয়ম কী বলে
ফিফার দলবদল বিধিমালা অনুযায়ী, খেলোয়াড়ের সঙ্গে চুক্তি হতে হবে লিখিত, স্বচ্ছ ও আন্তর্জাতিক মানের। চুক্তিতে বেতন-ভাতা, মেয়াদ, বোনাস, চুক্তি বাতিলের ধারা—সবকিছু স্পষ্ট থাকতে হয়। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পারিশ্রমিক পরিশোধ, একতরফা চুক্তি ভাঙা থেকে বিরত থাকা এবং খেলোয়াড় নিবন্ধনের সঠিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করা বাধ্যতামূলক। কোনো ক্লাব এসব শর্ত ভঙ্গ করলে ফিফার শৃঙ্খলা কমিটি ‘ট্রান্সফার ব্যান’–এর মতো শাস্তি দেয়। সঙ্গে থাকে বড় অঙ্কের জরিমানা ও ক্ষতিপূরণ। বকেয়া না মেটালে নিষেধাজ্ঞা আরও কঠোর হয়, এমনকি পয়েন্ট কাটা বা অবনমনও হতে পারে।
শাস্তি থেকে মুক্তির উপায়
ফিফার শাস্তি থেকে বের হওয়ার একমাত্র পথ—অভিযোগকারী খেলোয়াড় বা এজেন্টের সঙ্গে পূর্ণ সমঝোতা করে পাওনা পরিশোধ। জরিমানা থাকলে তা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দিতে হয় এবং প্রমাণপত্র ফিফার পোর্টালে জমা দিতে হয়। অনেক সময় কিস্তিতে পরিশোধেরও সুযোগ মেলে, তবে তার জন্য লিখিত চুক্তি দরকার। অর্থ পরিশোধের পর প্রমাণপত্র দেখে সন্তুষ্ট হলে ফিফার ডিসিপ্লিনারি বিভাগ নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয়।
ক্লাবগুলো কী বলছে
গত অক্টোবরে মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের খেলোয়াড় নিবন্ধনের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয় ফিফা। ২০২২-২৩ মৌসুমে মোহামেডানে খেলে যাওয়া ইরানি ফুটবলার মিসাম শাহ জাদেহের অভিযোগের ভিত্তিতে ফিফা এ নিষেধাজ্ঞা দেয়। চুক্তি অনুযায়ী অর্থ না পাওয়ায় মিসাম ফিফায় অভিযোগ করেন। ফিফা তাঁর অভিযোগ আমলে নিয়ে পরপর তিনটি ট্রান্সফার উইন্ডোতে মোহামেডানের খেলোয়াড় নিবন্ধনে নিষেধাজ্ঞা জারি করে।
এ নিষেধাজ্ঞার কারণে গত ৩১ জানুয়ারি শেষ হওয়া শীতকালীন দলবদলে কোনো খেলোয়াড় নিবন্ধন করতে পারেনি ঐতিহ্যবাহী ক্লাবটি। মোহামেডানের টেকনিক্যাল কমিটির সদস্য হাসানুজ্জামান খান বলেন, ‘নিয়মটা সবাই জানি, কিন্তু আমাদের সমস্যা অন্য জায়গায়, আমরা এখনো পেশাদার পদ্ধতি মেনে চুক্তি করি না। কেউ কেউ মৌখিকভাবেও খেলোয়াড় চূড়ান্ত করে ফেলে৷ পরে দেখা যায় ওই খেলোয়াড় ক্লাব ছেড়ে ফিফায় নালিশ করে।’
আবাহনীর ম্যানেজার সত্যজিৎ দাস বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগে ক্লাবটির দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তারা কয়েকজন বিদেশির সঙ্গে চুক্তি করে আবার বাতিল করে দেন। যে শাস্তি এখন তাঁরা ভোগ করছেন, ‘আমরা তো এ বিষয়টা (দলবদলের নিয়মকানুন) ভালোভাবে অবগত। আগে কখনো কিন্তু এমন নিষেধাজ্ঞায় পড়েনি আবাহনী। ৫ আগস্টের আগে ক্লাবের দায়িত্বে যাঁরা ছিলেন, তাঁরা কয়েকজন বিদেশি খেলোয়াড়ের সঙ্গে চুক্তি করে আবার বাতিল করে ফেলেন।’
ফিফার নিষেধাজ্ঞার তালিকায় নেই ব্রাদার্স ইউনিয়ন। তবে বিষয়টি নিয়ে সচেতন তারা। ক্লাবের ম্যানেজার আমের খান বলেন, ‘বসুন্ধরার মতো সবচেয়ে সচ্ছল এবং পেশাদার ক্লাবই যদি নয়টা ব্যান খায়, তাহলে আরামবাগ, ফকিরেরপুল, ব্রাদার্সের অবস্থা কী হবে।’
রহমতগঞ্জের সভাপতি টিপু সুলতান জানিয়েছেন, বিদেশি খেলোয়াড়ের টাকা বকেয়া রেখে নিষেধাজ্ঞায় পড়াটা শুধু ওই ক্লাব নয়, দেশের ফুটবলের জন্যও অসম্মানের, ‘আমরা কারও পাওনা বকেয়া রাখার পক্ষে নই। কারণ, ব্যান শুধু ওই ক্লাব নয়, বাংলাদেশের ফুটবলের সুনামও ক্ষুণ্ন করে। পরবর্তী সময়ে বিদেশি অনেক ফুটবলার আমাদের এখানে আসতে চায় না। এটা আমাদের জন্য অশনিসংকেত।’
প্রয়োজন বাফুফের সহায়তা
যেসব ক্লাব এখনো এ রকম নিষেধাজ্ঞার জালে জড়ায়নি, তারা এ সম্পর্কে ভালোভাবে জানতে চায়। সে জন্য বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের (বাফুফে) সহায়তা দরকার বলে মনে করছেন কেউ কেউ।
ফর্টিস এফসির ম্যানেজার রাশেদুল ইসলাম বলেন, ‘ক্লাবগুলোকে নিয়ে বাফুফের ওয়ার্কশপ করা দরকার। যারা শাস্তি ভোগ করেছে বা জরিমানা দিয়েছে, তারা কেন, কী কারণে শাস্তি পেল, এটা অন্যদেরও জানা উচিত।’
পিডব্লিউডি ম্যানেজার ইফতেখার সাদও একই রকম মত দিয়েছেন, ‘নিয়মটা সম্পর্কে মোটামুটি জানি, একেবারে বিশেষজ্ঞ নই। তবে ফেডারেশন যদি ক্লাবগুলোকে নিয়ে সেমিনার করতে পারে, তাহলে আমরা যারা এখনো নিষেধাজ্ঞায় পড়িনি, তারা সাবধান হতে পারব।’
এ ধরনের ঘটনা কমাতে বাফুফের নেতৃত্বে শক্তিশালী মনিটরিং সেলও জরুরি বলে মনে করেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। ক্লাবগুলোকে পেশাদার হিসাবরক্ষণে যেতে হবে, এজেন্ট ব্যবস্থাপনাও স্বচ্ছ করতে হবে। আইন জানার পাশাপাশি তা মানার সংস্কৃতিও গড়ে উঠতে হবে।
বাফুফের ভাবনা
বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের (বাফুফে) টেকনিক্যাল কমিটির চেয়ারম্যান কামরুল হাসান বলেন, ‘আমরা বিষয়গুলো অবশ্যই গুরুত্বসহকারে দেখব। ট্রান্সফার নিষেধাজ্ঞায় যাতে অন্য ক্লাবগুলো না পড়ে, সে জন্য চেষ্টা করব তাদের যথাযথ কাউন্সেলিং করার। এরই মধ্যে রেফারিংয়ের বিভিন্ন নিয়মকানুন নিয়ে কাজ শুরু হয়েছে। কারণ, অনেক ক্লাব ও খেলোয়াড়ের রেফারিং নিয়ম সম্পর্কেও স্বচ্ছ ধারণা নেই।’