বিশ্বকাপ ক্যারিয়ারে দুজনেরই সূর্যোদয় হয়েছিল ২০০৬ সালের বিশ্বকাপে। প্রথম আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট যেখানে একসঙ্গে খেলেছিলেন মেসি আর রোনালদো। সে বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্বে দুজনের দলই অপরাজিত থেকে পরের রাউন্ডে যায়। দ্বিতীয় রাউন্ডে আর্জেন্টিনা হারায় মেক্সিকোকে আর পর্তুগাল হারায় নেদারল্যান্ডসকে। কোয়ার্টার ফাইনালে আর্জেন্টিনার দৌড় শেষ হয় সেবার তৃতীয় স্থান পাওয়া জার্মানির কাছে। পর্তুগালের বিশ্বকাপ মিশন শেষ হয় সেমিফাইনালে। অর্থাৎ আগমনে আর বাজিমাত করা হয়নি।

২০১০ বিশ্বকাপ যখন আসে, তখন এই দুই ফুটবলারই ছিলেন পূর্বাহ্ণে। সে বিশ্বকাপে স্পেনের কাছে হেরে শেষ ষোলো থেকেই বিদায় নেয় পর্তুগাল। মেসি তো সেবার ম্যারাডোনার সঙ্গে এক হয়েও কিছুই করতে পারেনি। কোয়ার্টার ফাইনালে হেরেছে জার্মানির কাছে।

২০১৪ সালের ব্রাজিল বিশ্বকাপে মেসি–রোনালদো তাঁদের ক্যারিয়ারের মধ্যাহ্নে। বিশ্বকাপে যথারীতি ব্যর্থ রোনালদো ও পর্তুগাল। গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নিতে হয় তাদের। ২০১৪ বিশ্বকাপেই সব আফসোস মুছে ফেলতে পারতেন মেসি। তবে ফাইনালে সেই জার্মানির কাছে হেরে স্বপ্নভঙ্গ। টুর্নামেন্ট শেষে মেসি পেয়েছিলেন বিশ্বকাপের সেরা খেলোয়াড়ের মর্যাদা, হাতে উঠেছিল গোল্ডেন বল। কিন্তু খেলোয়াড় হিসেবে তাঁর অবদান আর্জেন্টিনাকে সেরা করতে পারেনি। অর্থাৎ আরও একবার ব্যর্থ মেসি। আগেই বলা হয়েছে, রাশিয়া বিশ্বকাপকেই ধরা হয়েছিল এই দুই ফুটবলারের শেষ বিশ্বকাপ। শেষের গুঞ্জনের বিশ্বকাপেরও ব্যর্থতা সঙ্গী হয়েছে তাঁদের। 

তবে অন্য বিশ্বকাপের চেয়ে এবারের কাতার বিশ্বকাপটা দুজনের জন্যই ভিন্ন। বিশ্বকাপের আগে মেসির কথাতেই স্পষ্ট, কাতার বিশ্বকাপই তাঁর শেষ বিশ্বকাপ। রোনালদোর মুখে তেমন কিছু শোনা না গেলেও ৪১ বছর বয়সে রোনালদো আগামী বিশ্বকাপ খেলবেন, সে ভাবনাকে দুঃসাহসীই বলতে হবে। আর একটা কারণেও এই বিশ্বকাপ তাঁদের জন্য বিশেষ।

মেসি-রোনালদো দুজনেরই ইতিমধ্যে শেষের শুরুর পথচলা শুরু হয়েছে। এর আগের কোনো বিশ্বকাপে এমন অনুভূতি তাঁদের সঙ্গী হয়নি। বলতে পারেন, মেসি তো এখনো দাপটের সঙ্গেই খেলছেন, খেলে বেড়াচ্ছেন। এখনো একের পর এক রেকর্ড গড়ে যাচ্ছেন। তবে কেন তাঁর শেষ দেখছেন অনেকেই? কারণটা খুবই সহজ।

মেসির পক্ষে ছন্দ আছে, তবে তাঁর পক্ষে নেই সময়, বয়স। রোনালদো তো বয়সের পাশাপাশি হারিয়েছেন ফর্মও। তাই প্রায় দুই দশক ধরে ফুটবল-বিশ্বকে শাসন করা দুই রাজার সূর্য এখন অনেকটাই অস্তগামী। কে সেরা, এমন প্রশ্নে আগের মতো এখনো সবাই চোখ বন্ধ করে দুজনের নাম নেবেন না, একটু দ্বিধা, একটু সংশয় মনে জাগবে।

নিশীথার মাধ্যমে যেমন অষ্টপ্রহর শেষ হয়, তেমনি উষার মাধ্যমে নতুন এক দিনের সূচনাও হয়। এরই মধ্যে বিশ্ব ফুটবলে সে নতুন দিনের সূচনা করেছেন কিলিয়ান এমবাপ্পে-আর্লিং হলান্ড। রাশিয়া বিশ্বকাপ জিতে ইতিহাসের পাতায় জায়গা করে নিয়েছেন এমবাপ্পে।

চ্যাম্পিয়নস লিগ এখনো জেতা না হলেও ক্লাব ফুটবলে এখন তিনিই সবচেয়ে দামি তারকা। এমবাপ্পের সঙ্গে টক্কর দিচ্ছেন হলান্ডও। যদিও নরওয়ে বিশ্বকাপ বাছাইয়ে বাদ পড়ায় বিশ্বকাপ খেলা হচ্ছে না এই ম্যান সিটি তারকার। তবে কয়েক মৌসুম ধরে হলান্ড যেভাবে পারফর্ম করছেন, তাতে তিনিও যে থাকতে এসেছেন, সেই বাজি ধরাই যায়। আর কাতার বিশ্বকাপ জন্ম দিতে পারে আরও নতুন কোনো তারকার। প্রতিটি বিশ্বকাপই তো নতুন কোনো না কোনো তারকার জন্ম দেয়। বিশ্বকাপের পর নতুন তারকারা সেই ছন্দ ধরে রাখতে পারেন কি না, সেটা ভিন্ন আলোচনার বিষয়।

বিশ্বকাপটা যাঁদের জন্য নতুন তারকা হয়ে ওঠার মঞ্চ হতে পারে, সেই তালিকায় সবার আগে নামটা আসতে পারে গাভির। বয়স মাত্র ১৮। তবে এরই মধ্যে বার্সেলোনার মধ্যমাঠের প্রাণভোমরা হয়ে উঠেছেন। সবচেয়ে কম বয়সে স্পেনের হয়ে অভিষেক ও গোলও তাঁর দখলে।

মাঠের খেলায় গাভির সবচেয়ে বড় গুণ ‘পজিশনাল প্লে’, অর্থাৎ বল পায়ে এগিয়ে যাওয়া সতীর্থের রেখে যাওয়া খালি স্থান তিনি দারুণভাবে পূরণ করতে পারেন। চলতি বছরে গোল্ডেন বয় অ্যাওয়ার্ড পেয়েছেন এই স্প্যানিশ ফুটবলার। ভোরের আকাশ যদি সঠিক পূর্বাভাস দেয়, গাভির ফুটবল–বিশ্ব মাতানো এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা।

গাভির মতো ভোরের আকাশ সুন্দর গাভির সতীর্থ পেদ্রিরও। পেদ্রি উইং থেকে ডিফেন্সিভ মিডফিল্ড—মোটামুটি সব পজিশনেই খেলতে পারেন। মাঝেমধ্যে সেন্টার ফরোয়ার্ড হিসেবেও। প্লেমেকিংয়ে দুই পায়ের ব্যবহার, বল নিয়ন্ত্রণ, ভিশনের সঙ্গে গতি ও স্ট্যামিনায় তাঁর খেলায় জাভি-ইনিয়েস্তার মিশেল দেখেন অনেকেই। ১৯ বছর বয়সী এই মিডফিল্ডার কাতার বিশ্বকাপে নিজের ছাপ রেখে যেতে পারেন।

চোখ রাখতে হবে ফিল ফোডেনের ওপরও। উইং ধরে আক্রমণে যেতে পারেন এরই মধ্যে ম্যানচেস্টার সিটির বড় আস্থা হয়ে ওঠা এই তরুণ। গোল করার পাশাপাশি করাতেও পারেন। ২২ বছর বয়সী এই উইঙ্গার ইংল্যান্ড জাতীয় দলের জার্সি গায়ে চড়িয়েছেন ২০২০ সালে। এখন পর্যন্ত ১৮ ম্যাচ খেলে গোল মাত্র ২টি। তবে ক্লাব ফুটবলে আছেন দারুণ ছন্দে। ম্যান সিটির হয়ে গত মৌসুমে ৪৫ ম্যাচে করেছিলেন ১৪ গোল, এবার প্রথম ১৫ ম্যাচেই এক হ্যাটট্রিকসহ ৭ গোল।

১৯ বছর বয়সী তরুণ মিডফিল্ডার জামাল মুসিয়ালাও এরই মধ্যে নজর কেড়েছেন ক্লাব ফুটবলে। বায়ার্ন মিউনিখে মূলত মিডফিল্ডার হলেও প্রতিপক্ষের ডি-বক্সে তাঁর উপস্থিতি থাকে সব সময়। ২০২১ সালে জার্মানির হয়ে অভিষেক হয় তাঁর। দেশের জার্সিতে এখন পর্যন্ত আট ম্যাচ খেলেছেন। বায়ার্ন মিউনিখের হয়ে চলতি মৌসুমে গোল করেছেন ১০ টি, করিয়েছেন আরও ১০ গোল। জার্মান মাঝমাঠও বিশ্বকাপে তাকিয়ে থাকবে তাঁর দিকে। 

এক যুগের বেশি সময় ধরে ফুটবল–বিশ্বে রাজত্ব করেছেন মেসি-রোনালদোরা। তবে নেইমার, লুকা মদরিচ, লুইস সুয়ারেজ, জাভি, ইনিয়েস্তারাও আলো ছড়িয়ে গেছেন পাশাপাশি। ফুটবল–বিশ্ব যখন মেসি-রোনালদোর আগমনী গান শুনছিল, তখনো তারকা হয়ে জ্বলজ্বল করছিলেন জিদান, ফিগো, রোনালদো নাজারিওরা।

এখন মেসি-রোনালদোদের অস্তরাগের সময়। জাভি-ইনিয়েস্তারা আগেই চলে গেছেন। মদরিচ-সুয়ারেজদেরও সময় শেষ হতে চলল। নেইমার তাঁদের চেয়ে কিছুটা পরে এসেছেন, তবে তাঁরও যে মেঘে মেঘে অনেক বেলা হলো। কাতার বিশ্বকাপ থেকেই হতে পারে নতুন যুগের শুরু, নতুনদের পথচলা।