প্রাথমিক বিদ্যালয় গোল্ডকাপ
খুদে ফুটবলারদের লড়াইয়ে চ্যাম্পিয়ন ঢাকার বাইরের দুই স্কুল
বালক বিভাগে চ্যাম্পিয়ন বরিশালের বাকেরগঞ্জ উপজেলার দাড়িয়াল মিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। বালিকা বিভাগের চ্যাম্পিয়ন পাবনার সাঁথিয়া উপজেলার জোরগাছা ইউনাইটেড সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।
ঢাকার বাংলাদেশ আর্মি স্টেডিয়াম সেজে উঠেছিল অন্য রকম এক সাজে। পুরো গ্যালারিতে প্যান্ডেল, যার বড় অংশ জুড়ে দেওয়া হয়েছিল ছাদ। সেই ছাদের নিচে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের হাজারো খুদে ছাত্রছাত্রী। পুরো গ্যালারি যেন কোলাহলের মহাসমুদ্র।
সবুজ মাঠের একটা অংশে বসানো হয় গোলপোস্ট। সব মিলিয়ে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য আকর্ষণীয় এক আয়োজন। মাঠের চারপাশের বর্ণিল বিলবোর্ড আর ‘প্রাথমিক বিদ্যালয় গোল্ডকাপ’ লেখা প্ল্যাকার্ডগুলো জানান দিচ্ছিল আয়োজনটা বিশাল এক ফুটবল টুর্নামেন্টের ফাইনালের।
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আয়োজনে দেশব্যাপী বিভিন্ন স্তরের খেলা শেষে আজ শনিবার ছিল চূড়ান্ত দিন। ফাইনালে বালক ও বালিকা দুই বিভাগের চারটি দলই ছিল ঢাকার বাইরের। বালক বিভাগের ফাইনালে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে বরিশালের বাকেরগঞ্জ উপজেলার দাড়িয়াল মিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। শিরোপার লড়াইয়ে স্কুলটি ১-০ গোলে হারায় ময়মনসিংহের ত্রিশাল উপজেলা সদরের দরিরামপুর মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে। বালিকা বিভাগের শিরোপা গেছে পাবনার সাঁথিয়া উপজেলার জোরগাছা ইউনাইটেড সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। ফাইনালে ময়মনসিংহের নান্দাইল উপজেলার আচারগাঁও উত্তরপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় তাদের কাছে হেরে গেছে ৪-২ গোলে।
দুপুরে বালকদের ফাইনাল শেষে ও মেয়েদের ফাইনাল শুরু হওয়ার আগে মাঠে আসেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। জাতীয় সংগীত শেষে সরাসরি সবুজ ঘাসের মাঠে যান প্রধানমন্ত্রী, চার দলের খুদে খেলোয়াড়দের সঙ্গে করমর্দন ও কুশল বিনিময় করেন। একপর্যায়ে প্রধানমন্ত্রী গ্যালারির দিকে যান কচি-কাঁচাদের শুভেচ্ছা জানাতে। প্রধানমন্ত্রীকে এত কাছে পেয়ে উদ্বেলিত খুদে শিক্ষার্থীদের অনেকেই গ্যালারির দেয়াল টপকে সামনে চলে আসে। এ সময় তৈরি হয় অভূতপূর্ব এক দৃশ্য। আনন্দ-উৎসবের আবহে প্রধানমন্ত্রী লাল-সবুজ রঙের বেলুনের বিশাল এক তোড়া আকাশে উড়িয়ে ফাইনালের উদ্বোধন করেন।
আমাদের খেলার মাধ্যমে অনেক দূর যেতে হবে। শুধু ক্রিকেট দিয়ে নয়; ফুটবল, হকিসহ অন্য খেলা দিয়ে বাংলাদেশকে চেনাতে হবে।প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান
বিশ্বকাপ ফুটবলের উন্মাদনার মধ্যেও দেশের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের খুদে ফুটবলারদের জন্য এই বিকেলটা স্মরণীয় হয়ে থাকবে। এই টুর্নামেন্টে খেলেই আজকের ঋতুপর্ণা চাকমা, মনিকা চাকমা, মারিয়া মান্দারা উঠে এসেছেন। শক্তিশালী হয়েছে বাংলাদেশের নারী ফুটবল। কয়েক বছর ধরে নিয়মিত টুর্নামেন্টটি আয়োজিত হওয়ায় উঠে এসেছেন অনেক নারী খেলোয়াড়। সেই ভিত্তিটা আরও শক্ত করতে গত ৬ এপ্রিল ইউনিয়ন ও পৌরসভা পর্যায় থেকে শুরু হয় এবারের টুর্নামেন্টের যাত্রা। এটি এখন বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ফুটবল টুর্নামেন্ট, যাতে অংশ নেয় দেশের ৬৫ হাজারের বেশি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।
টুর্নামেন্টে অংশ নেওয়া খেলোয়াড় সংখ্যা ২২ লাখের বেশি। বালক বিভাগে ৬৫ হাজার ৩৪২টি দলের ১১ লাখ ১০ হাজার ৮১৪ জন এবং বালিকা বিভাগে ৬৫ হাজার ৩২১টি দলের ১১ লাখ ৩ হাজার ২৯১ জন শিক্ষার্থী নেমেছিল মাঠে। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর জানিয়েছে, টুর্নামেন্টজুড়ে বালক ও বালিকা দল মিলিয়ে মোট ১ লাখ ২৩ হাজার ৯৭৪টি ম্যাচ হয়েছে।
সেরা খেলোয়াড় হয়েছে বালক বিভাগে চ্যাম্পিয়ন দলের শাহাদাত ইসলাম, সর্বোচ্চ গোলদাতা একই দলের আবু রোদোয়ান। বালিকা বিভাগে সর্বোচ্চ গোলদাতা রানার্সআপ দলের পরশ মনি, সেরা খেলোয়াড় চ্যাম্পিয়ন দলের মারিয়া খাতুন।
চ্যাম্পিয়ন দল পেয়েছে ট্রফিসহ তিন লাখ টাকা অর্থ পুরস্কার, রানার্সআপ দল ট্রফিসহ দুই লাখ টাকা এবং তৃতীয় হওয়া দল এক লাখ টাকা। শীর্ষ তিনটি দলের খেলোয়াড়দের যথাক্রমে ১৫, ১০ ও ৭ হাজার টাকা করে দেওয়া হয়েছে। টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড় ও সর্বোচ্চ গোলদাতা পেয়েছে ৩০ হাজার টাকা করে। সেরা খেলোয়াড় হয়েছে বালক বিভাগে চ্যাম্পিয়ন দলের শাহাদাত ইসলাম, সর্বোচ্চ গোলদাতা একই দলের আবু রোদোয়ান। বালিকা বিভাগে সর্বোচ্চ গোলদাতা রানার্সআপ দলের পরশ মনি, সেরা খেলোয়াড় চ্যাম্পিয়ন দলের মারিয়া খাতুন।
পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান শেষে ঝুম বৃষ্টি নামে। বৃষ্টি থামলে বাড়ি ফেরার তোড়জোড় শুরু করে দলগুলো। ফেরার সময় বালক বিভাগে উচ্ছ্বসিত চ্যাম্পিয়ন দলের কোচ ইমরান খান প্রথম আলোকে বলেন, ‘প্রাথমিক বিদ্যালয় টুর্নামেন্টে আমরা প্রথম খেলি ২০২২ সালে। কিন্তু সেবার আমরা শুরুতেই বিদায় নিই। এবার চ্যাম্পিয়ন হলাম। এই আনন্দ ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়।’
খেলোয়াড় ও কোচদের আনন্দ অনেকটাই বাড়িয়ে দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। খেলোয়াড়দের সঙ্গে ছবি তুলেছেন তিনি, দিয়েছেন অনুপ্রেরণামূলক বক্তব্য। ‘কেমন লাগল এই মাঠে ফুটবল খেলতে’—খুদে শিক্ষার্থীদের প্রতিক্রিয়া জানতে চেয়ে প্রধানমন্ত্রী তাদের উদ্দেশে বলেন, ‘আমরা এই খেলা বন্ধ করব না, বছরের পর বছর খেলব। তোমাদের ২২ লাখ বন্ধু খেলছে এই টুর্নামেন্টে।’
মাধ্যমিক পর্যায়েও এমন টুর্নামেন্ট হবে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী। আগামী বছর প্রাইম মিনিস্টারস কাপ আয়োজনেরও ঘোষণা দেন তিনি। শিশু–কিশোরদের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, ‘খেলাধুলার পাশাপাশি ভালো পড়াশোনা করতে হবে। তোমাদের বড় হয়ে দেশ চালাতে হবে। এই আত্মবিশ্বাস থাকতে হবে। আজ বিশ্বকাপ ফুটবলে রোনালদো, মেসি, এমবাপ্পেরা খেলছেন, তোমাদের মধ্য থেকেও এমন হতে হবে। আমাদের খেলার মাধ্যমে অনেক দূর যেতে হবে। শুধু ক্রিকেট দিয়ে নয়; ফুটবল, হকিসহ অন্য খেলা দিয়ে বাংলাদেশকে চেনাতে হবে।’
পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ, তথ্য প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী, প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা মাহদী আমিন এবং চ্যাম্পিয়ন ও রানার্সআপ দলগুলোর এলাকার সংসদ সদস্য, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. সাখাওয়াৎ হোসেন।