২০২৬ বিশ্বকাপ দিয়ে শেষ হলো যাঁদের পথচলা
প্রতি বিশ্বকাপই কিছু নতুন নায়কের জন্ম দেয়, আবার কিছু কিংবদন্তির শেষ অধ্যায়েরও সাক্ষী হয়। ২০২৬ বিশ্বকাপও তার ব্যতিক্রম নয়।
এই বিশ্বকাপের পর আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় বলেছেন জার্মানির মানুয়েল নয়্যার, ব্রাজিলের নেইমার, আলজেরিয়ার রিয়াদ মাহরেজ, মেক্সিকোর গিয়ের্মো ওচোয়া, চেক প্রজাতন্ত্রের প্যাট্রিক শিক এবং ফ্রান্সের কোচ দিদিয়ের দেশম।
দীর্ঘদিন দেশের জার্সিতে সাফল্য, স্মরণীয় মুহূর্ত আর অসংখ্য স্মৃতি উপহার দেওয়া এই তারকারা বিদায় নিলেও ফুটবলপ্রেমীদের মনে থেকে যাবেন অনেক দিন।
মানুয়েল নয়্যার
২০০৯ সালে জার্মানির জার্সিতে অভিষেকের পর গোলকিপিংয়ের সংজ্ঞাই যেন বদলে দিয়েছিলেন মানুয়েল নয়্যার। নিজের বক্স ছেড়ে অনেক দূর পর্যন্ত উঠে এসে খেলা, পায়ে বলের নিখুঁত নিয়ন্ত্রণ আর মুহূর্তেই সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা তাঁকে আধুনিক ফুটবলের ‘সুইপার–কিপার’-এর প্রতীক বানিয়েছে।
জার্মানির হয়ে খেলেছেন ১২৮টি আন্তর্জাতিক ম্যাচ, অংশ নিয়েছেন পাঁচটি বিশ্বকাপে। ২০১৪ সালে বিশ্বকাপজয়ী জার্মান দলের অন্যতম নায়ক ছিলেন তিনি। সেই আসরেই টুর্নামেন্টের সেরা গোলরক্ষক হিসেবে জেতেন গোল্ডেন গ্লাভ। জাতীয় দল থেকে অবসর নেওয়ার পর আবারও ফিরে এসেছিলেন। তবে ২০২৬ বিশ্বকাপের পর এবার স্থায়ীভাবেই শেষ করলেন জার্মানির জার্সির অধ্যায়।
নেইমার
২০১০ সালে মাত্র ১৮ বছর বয়সে প্রথমবার ব্রাজিলের জার্সি গায়ে তোলেন নেইমার। শুরু থেকেই বোঝা গিয়েছিল, অসাধারণ প্রতিভার এক ফুটবলারের আগমন ঘটেছে। সময়ের সঙ্গে সেই সম্ভাবনাকে বাস্তবেও রূপ দিয়েছেন তিনি। একের পর এক গোল করে ব্রাজিলের ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতাও হয়েছেন। জাতীয় দলের হয়ে ১৩০ ম্যাচে তাঁর গোল ৮০টি।
দলীয় সাফল্যও পেয়েছেন। ২০১৩ সালে ব্রাজিলকে জিতিয়েছেন কনফেডারেশনস কাপ, আর ২০১৬ অলিম্পিকে এনে দিয়েছেন দেশটির প্রথম পুরুষ ফুটবলের সোনার পদক। শুধু বিশ্বকাপ ট্রফিটাই অধরা থেকে গেল। এবার বিশ্বকাপের শেষ ষোলো থেকে ব্রাজিলের বিদায়ের পর জাতীয় দলকে বিদায় বলে দিয়েছেন নেইমার।
রিয়াদ মাহরেজ
আলজেরিয়ার সোনালি প্রজন্মের সবচেয়ে উজ্জ্বল মুখগুলোর একজন রিয়াদ মাহরেজ। ২০১৪ সালে জাতীয় দলে অভিষেকের বছরই বিশ্বকাপে আলজেরিয়াকে ইতিহাসে প্রথমবারের মতো শেষ ষোলোতে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
তবে তাঁর সবচেয়ে বড় সাফল্য আসে ২০১৯ সালে। অধিনায়ক হিসেবে আলজেরিয়াকে জেতান আফ্রিকা কাপ অব নেশনস। সেই আসরের সেমিফাইনালে নাইজেরিয়ার বিপক্ষে তাঁর দুর্দান্ত ফ্রি-কিক গোলটি আজও আলজেরিয়ান ফুটবলের অন্যতম স্মরণীয় মুহূর্ত। আগেই আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানানোর ঘোষণা দিয়েছিলেন মাহরেজ। তাই ২০২৬ বিশ্বকাপই হয়ে থাকল তাঁর শেষ আন্তর্জাতিক আসর।
গিয়ের্মো ওচোয়া
২০০৫ সালে মেক্সিকোর জার্সিতে অভিষেকের পর টানা ছয়টি বিশ্বকাপে খেলেছেন গিয়ের্মো ওচোয়া। বিশ্বকাপ এলেই যেন নিজেকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে যেতেন এই গোলরক্ষক।
২০১৪ সালে স্বাগতিক ব্রাজিলের বিপক্ষে তাঁর দুর্দান্ত গোলকিপিং এখনো বিশ্বকাপের অন্যতম সেরা ব্যক্তিগত পারফরম্যান্স হিসেবে স্মরণ করা হয়। ২০১৮ সালে জার্মানির বিপক্ষেও আলো ছড়ান। ২০২২ বিশ্বকাপে রবার্ট লেভানডস্কির পেনাল্টি ঠেকিয়ে আবারও প্রশংসা কুড়ান। এমন বর্ণিল আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শেষটা তিনি বেছে নিয়েছেন নিজের দেশের মাটিতেই।
প্যাট্রিক শিক
প্যাট্রিক শিকের নাম উঠলেই ফুটবলপ্রেমীদের চোখে ভেসে ওঠে ২০২০ ইউরোর সেই অবিশ্বাস্য গোল। স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে প্রায় ৫০ গজ দূর থেকে নেওয়া তাঁর শট জায়গা করে নিয়েছিল টুর্নামেন্টের সেরা গোলের তালিকায়।
তবে জাতীয় দলে তিনি আগে থেকেই ভালো করছিলেন। ২০১৬ সালে মাল্টার বিপক্ষে অভিষেক ম্যাচেই গোল করেছিলেন চেক ফরোয়ার্ড। ২০২৬ বিশ্বকাপে সেই পুরোনো ঝলক দেখা না গেলেও, তাঁর ক্যারিয়ারকে মনে রাখার জন্য সেই একটি গোলই হয়তো যথেষ্ট।
দিদিয়ের দেশম
খেলোয়াড় হিসেবে বিশ্বকাপ জিতেছেন, কোচ হিসেবেও জিতেছেন। ফুটবল ইতিহাসে এমন কীর্তি গড়া মানুষের সংখ্যা হাতে গোনা, দিদিয়ের দেশম তাঁদেরই একজন।
১৯৯৮ সালে অধিনায়ক হিসেবে ফ্রান্সকে প্রথম বিশ্বকাপ জেতান তিনি। দুই দশক পর, ২০১৮ সালে কোচ হিসেবেও বিশ্বকাপ এনে দেন দেশকে। ফ্রান্সের ডাগআউটে কাটিয়েছেন ১৪ বছর। এই সময়ে জিতেছেন ২০১৮ বিশ্বকাপ ও ২০২১ উয়েফা নেশনস লিগ। ২০২৬ বিশ্বকাপ শুরুর আগেই দায়িত্ব ছাড়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন দেশম। তাঁর শেষটাও হলো জয় দিয়ে—ইংল্যান্ডকে হারিয়ে তৃতীয় স্থান নিশ্চিত করে।